kalerkantho


জেনেভা ক্যাম্পে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার ১৫৩

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



জেনেভা ক্যাম্পে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার ১৫৩

রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে মাদকবিরোধী অভিযানে আটকদের এভাবেই বেঁধে নিয়ে যায় র‌্যাব সদস্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীতে মাদকের সবচেয়ে বড় আখড়া বলে পরিচিত মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই অভিযানে মাদক কারবারিসহ সন্দেহভাজন ৫০০ ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫০ জনকে ছেড়ে দেয় র‌্যাব। ১৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৭ জনকে বিকেলে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অন্যদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। ওই মাদক কারবারিদের কাছ থেকে প্রায় ১৩ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি এবং ৩০ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়। তবে জেনেভা ক্যাম্পের বড় মাদক কারবারিদের কেউই অভিযানে ধরা পড়েনি।

ঢাকার অন্যতম ‘ইয়াবা ডিলার’ ইশতিয়াক, নাদিম হোসেন ওরফে পঁচিশসহ ক্যাম্পের ৪৯ জনের নাম মাদক কারবারি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তাদের কারো ধরা পড়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মোহাম্মদপুরে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ওই রিলিফ ক্যাম্পে অভিযান শেষে র‌্যাব-২ কার্যালয়ের সামনে ভিড় করে কয়েক শ মানুষ। অনেকের অভিযোগ, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের গণহারে আটক করে হয়রানি করা হয়েছে। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবারিদের শনাক্ত করতেই পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। গতকাল থেকে জেনেভা ক্যাম্পে স্থায়ীভাবে নজরদারি শুরু করেছে র‌্যাব। 

র‌্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল ভোর থেকে জেনেভা ক্যাম্পের চারদিকে অবস্থান নিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। তখন ক্যাম্পে প্রবেশের ছয়টি প্রধান পথই বন্ধ করে দেওয়া হয়। র‌্যাবের ৩৬টি টিম, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড অভিযানে অংশ নেয়। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চালানো অভিযানে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষকে আটক করা হয়।

অভিযানের পর জেনেভা ক্যাম্প প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। 

অভিযান শেষে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘যাচাই-বাছাই করার পর যাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের আটক রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হবে। জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবার আজকের নয়, অনেক পুরনো। ঘনবসতির কারণে এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। আমরা সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একাধিক টিম নিয়ে অভিযান চালিয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে কখনো ক্যাম্পে এমন অভিযান চালানো হয়নি। আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো না। এ জন্য সর্বোচ্চ প্রিপারেশন ছিল আজকের অভিযানে। তবে কোথাও কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি।’

এর আগে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছিলেন ডিএনসির কর্মকর্তারা। একই বছরের ১৮ মার্চ পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছিল মাদক কারবারিরা। গত বছরের ৩ নভেম্বর অভিযান চালিয়ে ডিএনসি গ্রেপ্তার করেছিল সেখানকার শীর্ষ মাদক কারবারি নাদিম হোসেন ওরফে পচিশকে। পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার মাদক কারবার শুরু করে সে।

র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার উজ জামান বলেন, ‘শীর্ষ ছয় কারবারিকে ধরা না গেলেও অনেকেই ধরা পড়েছে। তাদের কাছ থেকে ১৩ হাজার ইয়াবা ও ৩০ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়েছে।’ রাত ৮টার দিকে তিনি বলেন, ‘অভিযানে পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ, তরুণকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে সাড়ে তিন শ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ১৫৩ জন আটক আছে। মোবাইল কোর্ট চলছে। অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিচ্ছেন আদালত। তাদের মধ্যে চার-পাঁচজন নারী আছে। বাকি আসামিদের নামে থানায় মামলা দেওয়া হচ্ছে।’

লে. কর্নেল আনোয়ার উজ জামান বলেন, ‘এই অভিযানের মাধ্যমে জেনেভা ক্যাম্প পুরোপুরি আমাদের নজরদারিতে চলে এসেছে। এখানে সব সময় নজর থাকবে। কেউ মাদক বিক্রি বা সেবন করতে পারবে না।’

জানা গেছে, মাদকের সবচেয়ে বড় কারবারি জেনেভা ক্যাম্পের ইশতিয়াক এখন সাভারের আমিনবাজারে থাকে। তালিকাভুক্ত ৪৯ জন কারবারির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইশতিয়াক ও পচিশের সহযোগী মোল্লা আরশাদ ও তানভীর আদনান; পাপিয়া ও তার স্বামী পাচু; ভুলু, সেলিম ভাইয়া, তাওয়া, জনি, চুসতা সেলিম।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, র‌্যাবের অভিযানে তালিকাভুক্ত শীর্ষ কারবারিরা ধরা পড়েনি, বরং সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছে। আটক অনেকের স্বজনরা দুপুরে আগারগাঁওয়ে র‌্যাব-২ কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন। সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আটক হওয়া ফাহমিদার মা বানু বলেন, ‘সি ব্লকে আমাদের বাসা। সকালে বাসার সবাই ঘুমে ছিল। তখন আমার মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে র‌্যাব।’ সুলতানা টগর নামের এক নারী বলেন, তাঁর দেবর সাইদুল হাওলাদার নয়ন ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিল নয়ন। সেখান থেকে সকাল ১১টার দিকে তাকে ধরে এনেছে র‌্যাব।

গাড়িচালক বাদলের মা নাসিমা বেগম বলেন, সকাল ১১টার দিকে তাঁর ছেলে কাজে যাওয়ার সময় র‌্যাব সদস্যরা তাকে আটক করে। বাদল মাদকে জড়িত নয় বলে দাবি করেন নাসিমা।

সেলুনকর্মী আলী হোসেনের মা শাহনাজ বেগম বলেন, তাঁর ছেলে সকালে ঘুমে ছিল। র‌্যাব অভিযান চালিয়ে আটক করে নিয়ে গেছে।


মন্তব্য