kalerkantho


ঋণের সুদ উল্টো বাড়ছে বিপদে ব্যবসায়ীরা

শেখ শাফায়াত হোসেন   

২৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



ঋণের সুদ উল্টো বাড়ছে বিপদে ব্যবসায়ীরা

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী ঋণের সুদহার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নানা সুবিধা আদায় করে নিলেন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা। আমানতের বিপরীতে এত দিন যে পরিমাণ নগদ জমার বাধ্যবাধকতা (সিআরআর) ছিল, তা ১ শতাংশীয় মাত্রায় কমিয়ে আনায় বাড়তি ১০ হাজার কোটি টাকার মতো তারল্য ব্যাংকগুলোর হাতে গেল। ফলে তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর কলমানি মার্কেট থেকে ধার করার খরচ বেঁচে গেল। তা ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আমানতও আগের থেকে বেশি পাওয়ার ব্যবস্থা হলো। ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয় করতে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এসব সুবিধাই দেওয়া হলো ব্যাংক উদ্যোক্তাদের দাবি অনুযায়ী। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঋণের সুদহার কমানোর বেলায় শুধুই তাঁদের সময়ক্ষেপণ। নানা অজুহাত দেখিয়ে ঋণের সুদহার কমাতে আরো সময় লাগবে উল্লেখ করে আরো সুযোগ-সুবিধা চাচ্ছেন ব্যাংক পরিচালকরা। এখন উঠছে সরকারি ব্যাংকের আমানতও স্বল্পসুদে পাওয়ার দাবি।

ঋণের সুদহার কমিয়ে সিঙ্গেল তথা এক ডিজিটে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পর ব্যাংকগুলো এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর হয়নি, বরং সুদের হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। এ কারণে বড় ধরনের অস্বস্তিতে আছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা।

গত ৩০ মার্চ বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলো যাতে পায় সেই ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়। গত ১ এপ্রিল সোনারগাঁও হোটেলে বিএবির নেতাদের নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠক থেকে বেরিয়ে সিআরআর ১ শতাংশীয় মাত্রায় কমানোর সিদ্ধান্তের কথা বলেন তিনি। এতে এক মাসের মধ্যে সুদের হার কমে আসবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। কিন্তু বিএবির নেতারা তখন থেকেই ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনতে আরো বেশি সময় লাগবে বলে আসছেন। প্রায় দুই মাস হতে চলেছে, ঋণের সুদের হার কমেনি, উল্টো বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নির্বাচনের আগে একটি মহল ব্যাংকঋণের সুদের হার নিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তা না হলে এভাবে কমানোর বদলে সুদের হার উল্টো বাড়ানো হতো না। তাঁরা আরো বলছেন, এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা কঠিন। সুদের হার কমানোর কথা বললেই খেলাপি ঋণের কথা ওঠানো হয়; কিন্তু খেলাপি ঋণ বাড়ার দায় ব্যবসায়ীদের নয়। এখনই ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে না আনলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আরো রুগ্ণ হয়ে পড়বে। এতে খেলাপি ঋণ আরো বাড়বে বৈ কমবে না। এমনিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সংকট চলছে, তার ওপর ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়তে থাকলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঋণের সুদের হার যত সহনীয় হবে, ব্যবসা করা ততই সহায়ক হবে। গত বছর ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামতে শুরু করেছিল। প্রধানমন্ত্রীরও নির্দেশনা ছিল সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার। যদি সুদের হার কমানোর বিষয়টি সঠিকভাবে তদারকি করা না হয়, তাহলে সেটা উল্টো বাড়তে থাকবে। এতে ব্যবসার খরচ বেড়ে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়বে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আবার অস্বস্তি দেখা দিয়েছে।’

ব্যাংকগুলোকে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে গড়িমসির বিষয়ে এই ব্যবসায়ীর মন্তব্য, ‘সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ব্যাংকগুলো এই গড়িমসি করার সুযোগ পাচ্ছে। এখনই যদি সব কিছু সমন্বয় করা যায় তাহলে ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনা সম্ভব।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, ব্যাংক মালিক ও এমডিদের সংগঠন এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বসে সরকারের উচিত ঋণের সুদহার যত দ্রুত সম্ভব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া।

ভুক্তভোগী এক গ্রাহক কালের কণ্ঠকে জানান, বেসরকারি একটি ব্যাংক থেকে গৃহঋণ নেওয়ার পাঁচ মাসের ব্যবধানে সুদহার ২ শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করে চিঠি দিয়েছে। এভাবে কয়েক মাসে এক লাফে ২ শতাংশ সুদহার বাড়ানো অস্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পঋণের বিপরীতে উদ্যোক্তাদের সুদ গুনতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফিসহ অন্যান্য ফি মিলিয়ে এ হার পড়ছে ২০ শতাংশের ওপরে।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে অর্থ সংকটে ভুগছে ব্যাংকগুলো। খেলাপি ঋণের পরিমাণ না কমলে সুদহারও কমানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সরকারি আমানতের পর এবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অলস অর্থও ব্যবহারের সুযোগ চান বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দেনদরবারও শুরু করেছেন তাঁরা। কিন্তু এই পর্যন্ত তাঁদের কতগুলো সুবিধা দেওয়া হলো অথচ এর পরও ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনতে পারেননি তাঁরা।’

ব্যাংকগুলোকে উচ্চ মুনাফার লক্ষ্য থেকে সরে আসার তাগিদ দিয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘ব্যাংক ম্যানেজারদের টার্গেট দিয়ে উচ্চ মুনাফা করাটা যুক্তিযুক্ত নয়। মুনাফা বাড়াতে হবে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে। তহবিল খরচও কম ধরতে হবে। মন্দ ঋণ কমানো এবং অবলোপন করা ঋণ আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। এর বিপরীতে প্রভিশন করতে গিয়ে এই ঋণের বোঝা পড়ছে নতুন গ্রাহকদের ওপর। তা ছাড়া ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) সারা পৃথিবীতেই ৩ শতাংশের মধ্যে। আমাদের এখানে ৫ শতাংশ। এটা কমিয়ে আনতে হবে।’

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরাও চাই ঋণের সুদ কমাতে। কিন্তু সিআরআর কমানোর ফলে ব্যাংকগুলো ১০ হাজার কোটি টাকা ফেরত পেলেও সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশের সুবিধা এখনো পাওয়া যায়নি। এ কারণে সিআরআর কমানোর খুব বেশি প্রভাব পড়ছে না।’

সূত্র জানায়, বিগত বছরগুলোতে নানা প্রচেষ্টায় কমে আসা ঋণের সুদহার বাড়তে শুরু করে গত বছরের শেষের দিকে। তারল্য সংকটের অজুহাতে বাড়ানো হয় ঋণের সুদহার। সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের আগে দেওয়া ঋণের সুদ ২ থেকে ৩ শতাংশে বাড়িয়ে চিঠি ধরিয়ে দেওয়া শুরু করেছে।

ঋণের সুদহারের লাগাম টানার দাবি জানিয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কেউ ব্যবসা করে মুনাফা করতে পারবে না। মুনাফা না হলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধও করতে পারবে না। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। কর্মসংস্থানও সংকুচিত হয়ে আসবে।’

 

 

 


মন্তব্য