kalerkantho


কোটা সংস্কার আন্দোলন

আন্দোলনকারীদের হত্যার হুমকি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



আন্দোলনকারীদের হত্যার হুমকি!

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর ও রাশেদ খানকে পিস্তল নিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার রাত দেড়টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে এই ঘটনা ঘটে। ফেসবুক লাইভে এসে ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক তিন নেতার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেন নূর।

এই ঘটনায় পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন এবং নূর, রাশেদসহ কয়েক শ নেতাকর্মী শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলেও পুলিশ তা নেয়নি বলে জানা গেছে।

অভিযুক্তরা হলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সদ্য সাবেক সহসভাপতি ইমতিয়াজ বুলবুল বাপ্পি, মুহসীন হল শাখার সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী ও চারুকলা অনুষদের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফাহিমুল ইসলাম লিমন।

এদিকে ওই হুমকির প্রতিবাদে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়।

মিছিল শেষে সেখানে সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর বলেন, ‘আমি ও রাশেদ আমার রুমে ছিলাম। এর মধ্যে রাত ১২টার দিকে চারুকলা অনুষদের ছাত্রলীগের সেক্রেটারি লিমন ফোন দিয়ে হুমকি দেন যে আমাদের পিটিয়ে হল থেকে নামিয়ে দেওয়া হবে। আমরা নাকি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি ইমতিয়াজ উদ্দিন বাপ্পি ফোন নিয়ে বলেন, ছাত্রদলের সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে মারছি। তোদের মতো পোলাপানকে খেয়ে দিতে দুই সেকেন্ডও লাগবে না। তোগোরে গুলি কইরা মারি নাই শুধু কিছু সিনিয়রের নিষেধ ছিল। তা না হলে তোদের মতো কুলাঙ্গারদের রাখতাম না এই দেশে। শুধু কিছু সিনিয়রদের নিষেধ থাকার কারণে তোরা বেঁচে গেছস। তবে তোরা বাঁচবি না। কিছুদিন পর প্রজ্ঞাপনটা জারি হোক। দেখি তোদের কোন বাপ ঠেকায়।’

নূর আরো বলেন, ‘হুমকির কিছু সময় পরে রাত দেড়টার দিকে মুহসীন হলের ১১৯ নম্বর কক্ষে আসেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি ইমতিয়াজ বুলবুল বাপ্পি, মেহেদী হাসান সানী ও ফাহিম ইসলাম লিমন। এ সময় রাশেদ খান আমার কক্ষে ছিল। তাঁরা রাশেদ আর আমাকে হত্যার হুমকি দেন। বাপ্পি হাফ প্যান্ট পরা অবস্থায় ছিলেন। তাঁর প্যান্টের পকেটে পিস্তল দেখা যায়।’

নূরের ভাষ্য, ‘বাপ্পি বলেন, তোরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিস। তোদের একটাকেও ছাড়া হবে না। প্রজ্ঞাপনটা জারি হলে তোদের কুত্তার মতো পেটানো হবে। কুকুরের মতো গুলি করে রাস্তায় মারা হবে। তোরা তো কেউ বাঁচবি না। বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। শেষবারের মতো মা-বাবার দোয়া নিয়ে নিস। শুধু প্রজ্ঞাপনটা জারি হোক। দেখ তোদের কী অবস্থা করি।’ এ সময় সানী ও লিমন বারবার মারার জন্য তেড়ে আসেন। তবে সেখানে উপস্থিত অন্যরা নিবৃত্ত করেন।

ছাত্রসমাজকে দুর্বল না মনে করে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে নূর বলেন, ‘নাইলে যেকোনো ষড়যন্ত্র ছাত্রসমাজ প্রতিহত করবে।’

সংবাদ সম্মেলনে রাশেদ খান বলেন, ‘তাঁরা আমাদের হত্যার হুমকি দিয়ে মা-বাবার কাছে থেকে দোয়া নিতে বলেন। আমরা প্রাণনাশের শঙ্কায় আছি। আমরা পুলিশি নিরাপত্তা চাই।’

এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দ্বিতীয়বারের মতো কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারীরা। এতে নূর বলেন, ‘আমরা শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়েছিলাম। আধাঘণ্টা ধরে ডায়েরি লেখার পর কর্তব্যরত পুলিশ জানায় এটা সাধারণ কোনো আন্দোলন নয়, ওপরের মহলের অনুমতি ছাড়া মামলা নিতে পারব না। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইমতিয়াজ বুলবুল বাপ্পি বলেন, ‘এ রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। নূর আমার এক ছোট ভাইয়ের আইডি হ্যাক করে বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট দিত। পরে তার সঙ্গে এই বিষয়ে বাগিবতণ্ডা হয়।’ তবে পিস্তল দেখানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সাজানো নাটক।’

মেহেদী হাসান সানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সেখানে গিয়েছিলাম যাতে আমার হলে কোনো ঝামেলা না হয়। বাপ্পি ভাই তাকে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন, এটা সত্য। তবে পিস্তল দেখানোর বিষয়টা ভিত্তিহীন।’

তবে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্রীড়া সাংবাদিক শেখ আশিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারা প্রথমে মোবাইলে হুমকি দেয় এবং পরে দলবল নিয়ে আসে। আমি তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করেছি।’

আন্দোলনকারীদের জিডি না নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের অভিযোগ তো ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি, রাখা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে। সব সময় জিডি বা মামলা নথিভুক্ত করেই তদন্ত করতে হবে, তা নয়। পুলিশের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ এলেই তদন্তপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্য শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনগত ব্যবস্থা নিই। এখানেও সেভাবেই তদন্ত করা হচ্ছে।’

 


মন্তব্য