kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আবাদ

পাহাড়ের ঢালে কৃষকের হাসি

আবুল কাশেম, খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে   

২০ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাহাড়ের ঢালে কৃষকের হাসি

খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে পাহাড়ের ঢালে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা আমবাগান। ছবি : কালের কণ্ঠ

মেঘ ছুঁই ছুঁই সুউচ্চ পাহাড়। পাশেই সুগভীর গিরিখাত। দুর্গম বিপজ্জনক পায়ে হাঁটা পথ। রাস্তা থেকে তাকালে কেবলই ধোঁয়াশা মনে হয় পাহাড়গুলো। এসব কিছুই অজেয় নয় পাহাড়ের চাষিদের কাছে। সুবিশাল পাহাড়ের সুউচ্চ ঢালে শোভা পাচ্ছে সারি সারি আম্রপালির বাগান, লাল টুকটুকে মিষ্টি আনারসের সুঘ্রাণ। সমতলের মানুষের কাছে যেখানে পা ফেলাটাও মৃত্যুভয়ের কারণ, সেখান থেকে কলার ছড়ি নির্ভয়ে নামাচ্ছেন পাহাড়ের চাষিরা। জুমচাষও বাড়ছে দিন দিন। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দুর্গম পাহাড়গুলোর আগাছা দূর হয়েছে, সেখানে ফুটে উঠছে কৃষকের হাসি। পাহাড়িদের আবাস বলতে পাহাড়ের চূড়ায় বাঁশ, বেত বা ছনের ঘরের চিরাচরিত চিত্র পাল্টে গেছে গত কয়েক বছরে। ইট-পাথরের ভবন, রঙিন টিনের চালা আর পাকা মেঝের ঘর পাহাড়ের চাষিদের সমৃদ্ধির স্মারক হয়ে উঠছে।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চাষি ম্র্যাচিং মারমার জীবনও বদলে দিয়েছে পাহাড়ের কৃষি। সুবিশাল দুই পাহাড়ে গড়া তাঁর বাগানের কলা ট্রাকে ভরে চলে আসছে ঢাকায়। পাহাড়ের লাল মাটিতে ফলা মিষ্টি বেল ও আনারস যাচ্ছে পাশের জেলা চট্টগ্রামে। দুই সন্তানের একজনকে পড়াচ্ছেন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যজন পড়ছে খাগড়াছড়ি শহরের একটি ভালো স্কুলে। বাঁশের চোঙায় হুক্কা টানতে টানতে ম্র্যাচিং বললেন, ‘পাহাড়ে কৃষির সম্ভাবনা বিপুল। আগে পাহাড়িরা শুধু নিজেদের খাওয়ার চাহিদা মেটানোর জন্য চাষাবাদ করত। বেশির ভাগ পাহাড়ই জঙ্গলে ভরে থাকত। এখন আর সে দিন নেই। আমাদের কাছে দুর্গম বলেও কিছু নেই। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নিয়ে দুর্গমতা জয় করছি আমরা।’

১৯৮৪ সালে রংপুরে পৈতৃক ভিটে ফেলে মানিকছড়িতে গিয়ে বসত গড়েন রহিম মিয়া। জানালেন, বেশ ভালোই আছেন দুই সন্তান নিয়ে। পাহাড়ে আগের চেয়ে চাষাবাদ বাড়ছে, কৃষিরও বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। তাঁদের উত্পাদিত পণ্য চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে রাজধানীতেও বাজারজাত হচ্ছে। সরকার থেকে প্রতি মাসে দুই মণ করে চাল পাচ্ছেন বসতিরা। ফলে পরিবারে অভাব নেই, কমেছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অত্যাচারও। ফলে শান্ত পাহাড়ে স্বস্তিতেই আছেন পাহাড়ি ও বাঙালিরা।

খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা, মহালছড়ি ও পানছড়ি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন পাহাড়ের ঢালে জুম চাষে। চাষাবাদে ব্যবহার করছেন দেশি-বিদেশি কিংবা বহুজাতিক কম্পানির কীটনাশক, আগাছানাশক, ফল ও ফসলের দ্রুত বিকাশের নানা রাসায়নিক। তা ছাড়া পাহাড়ের উর্বর জমিতে ইউরিয়া ছাড়া অন্য কোনো সার ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না তাঁদের। ফলে তুলনামূলক কম খরচে অধিক ফলন পাচ্ছেন পাহাড়ের চাষিরা।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাহাড়ের চাষাবাদের প্রথম পর্বটাই সবচেয়ে কঠিন। তা হলো পাহাড় পরিষ্কার করা। প্রথমে ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্ভিদ কেটে ফেলা হয়। পরে ছোট ছোট আগাছা পরিষ্কার করতে ব্যবহার করা হয় প্যারাকুয়েট, যা সকালে স্প্রে করলে বিকেলেই আগাছা মরে যায়। পরে সেখানে শুরু হয় জুমচাষ।

স্থানীয় সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীরা জানান, অধিক চাষাবাদের কারণে পাহাড়ে প্যারাকুয়েটের চাহিদা বেশি। এই সুযোগে বিভিন্ন কম্পানি বিদেশ থেকে আমদানি করা প্যারাকুয়েট প্যাকেট বা বোতলজাত না করেই সরাসরি ড্রামে করে বাজারজাত করছে। আর সামান্য সাশ্রয়ের আশায় বিষাক্ত এই রাসায়নিক খোলা অবস্থায় কিনে নানা রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন চাষিরা। এ ছাড়া কেরোসিনসহ নানা উপকরণ মেশানো ভেজাল প্যারাকুয়েট কিনে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তাঁরা। অথচ যেকোনো ধরনের আগাছানাশক ও কীটনাশক খোলা বিক্রি করা নিষেধ। বোতলজাত বা প্যাকেটজাত করে লেবেলিং করে ব্যবহার বিধি ও ব্যবহারে সতর্কতাসহ তা বিক্রি করতে হয়। কিন্তু এ আইন মানছে না প্যারাকুয়েট আমদানিকারক, বাজারজাতকারক বিভিন্ন কম্পানি, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা।

খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলার বিক্রেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, সদর উপজেলার আবুল কালাম আজাদ খোলা প্যারাকুয়েট সরবরাহ করেন জেলাজুড়ে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘অপরাধ করে থাকলে যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।’

২০ মার্চ জেলার পানছড়ি উপজেলা বাজারের মেসার্স এ বি ট্রেডার্সে প্রকাশ্যেই ড্রামে করে প্যারাকুয়েট বিক্রি হতে দেখা গেছে। দোকান মালিক উল্লাস কান্তি দে বলেন, অন্যরা বিক্রি করছে, তাই আমিও বিক্রি করছি। মাটিরাঙ্গা বাজারের খালেক স্টোরের কবির হোসেন জানান, বাজারের ১১টি দোকানের প্রায় সব কটিতেই খোলা অবস্থায় প্যারাকুয়েট বিক্রি হচ্ছে। মেসার্স আবদুল হাকিম স্টোরে কর্মরত ইয়াসিন জানান, মাটিরাঙ্গার মতো পানছড়ি, দীঘিনালা ও মারিশ্যায় খোলাবাজারে প্যারাকুয়েট বিক্রি হয়। একই বাজারে আট বছর ধরে কীটনাশকের ব্যবসা করা আক্তার হোসেন বলেন, এক সময় বাধ্য হয়ে খোলাবাজারে প্যারাকুয়েট বিক্রি করেছি। নিষিদ্ধ থাকায় এখন আর তা করি না।

খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তরুণ ভট্টাচার্য এ ব্যাপারে বলেন, ‘খোলাবাজারে প্যারাকুয়েট বিক্রি বন্ধে আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং ও তদারকি করছি। কোনোক্রমেই যাতে খোলা প্যারাকুয়েট বিক্রি না হয় সে ব্যাপারে ডিলারদের নির্দেশ দিয়েছি।’

খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট প্রোটেকশন উইংয়ের পরিচালক মো. গোলাম মারুফ বলেন, ‘আইন অমান্য করে খোলাবাজারে প্যারাকুয়েট বিক্রি বন্ধে উদ্যোগ নিচ্ছি। এ ব্যাপারে প্রতিটি জেলা-উপজেলা অফিসের কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু আগেভাগে খবর পৌঁছে যাওয়ায় কাউকেই হাতেনাতে ধরা যাচ্ছে না।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হান্নান বলেন, কোনো অবস্থাতেই খোলাবাজারে প্যারাকুয়েট বিক্রি হওয়ার কথা নয়। যারা ড্রামে করে প্যারাকুয়েট সরবরাহ করছে তাদের লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা