kalerkantho

হাওরে কৃষকের কান্না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হাওরে কৃষকের কান্না

পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বৃষ্টির পানির তোড়ে ভেঙে যাওয়া অষ্টগ্রামের বিলমাকসা হাওরের বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা করছে কৃষকরা। ছবিটি গতকাল সকালে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ক্ষেতে কাঁচা ধান দেখে রাতে ঘুমাতে গিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের ‘দেখার হাওর’ এলাকার বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম। এই হাওরে গতবার অর্ধেক ফসল হারিয়ে এবার ধার-দেনা করে এই প্রান্তিক চাষি আবারও প্রায় চার বিঘা জমিতে ফসল লাগিয়েছিলেন। কিন্তু রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, তাঁর স্বপ্নের ফসল পানির নিচে। দেখার হাওরের উথারিয়া বাঁধ ভেঙে সর্বনাশ ডেকে এনেছে তাঁর মতো হাজারও কৃষকের। গতকাল রবিবার পর্যন্ত এই হাওরে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, গত ফেব্রুয়ারিতে বাঁধটির সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিতে কাজই শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। এর প্রতিবাদে গতকাল কৃষকরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছে।

এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায়ও। কিশোরগঞ্জের তিন উপজেলার বিভিন্ন হাওরে অন্তত আট হাজার ৬০০ হেক্টর  জমির বোরো জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এলাকাবাসী এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিকে দায়ী করেছে। এ ছাড়া জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় রয়েছে কৃষকরা। বাঁধ রক্ষায় এগিয়ে আসতে মসজিদে মসজিদে মাইকিং চলছে।

সুনামগঞ্জ : গত ২৯ মার্চ থেকে প্রতিদিন ডুবছে দেখার হাওরের কাঁচা ধান। সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত জেলার বৃহত্তম হাওর দেখার হাওর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে, এই হাওরে প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়ে থাকে। ফসলের উৎপাদনমূল্য ১৪০ কোটি টাকা। গতকাল বিকেল ৫টায় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বাঁধ ভেঙে এবং বিভিন্ন স্থানে বাঁধ উপচে হাওরের পাঁচ হাজার হেক্টর জমির বোরো তলিয়ে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, বাঁধ ভেঙে দেখার হাওরে পানি ঢুকছে। এই হাওরের মতো অন্যান্য হাওরেও একই অবস্থা। ধান কাঁচা থাকায় এবার কোনো ফলনই ঘরে তুলতে পারবে না কৃষক। সব হাওরই ঝুঁকিতে রয়েছে।

দেখার হাওরপারের বাহাদুরপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইবার ডিগা (কাঁচা) ধান নিছেগি। চৈত মাসে কোনো বালা (সময়) ফসল ডুবাইছে না। ইলা (এ রকম) বিপদ আমার ঠারে (স্মরণে) দেখি নাই।’ একই গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘ইবার কিতা খাইয়া বাঁচমু। আল্লায় আমরারে একটার পর একটা বিপদ কেনে দের?’ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘চোরেরা বান্দ না বাইন্দা টাকা মাইরা খাওয়ায় আমরার রিজিক নষ্ট হচ্ছে। এই চোররার কুন্তা (কিছু) অয় না। ইবার সরকার আমরার বাদি না চাইলে উপাস থাকতো অইব।’

প্রসঙ্গত, চলতি মৌসুমে সরকার সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ৫৫ কোটি টাকা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য বরাদ্দ দেয়। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শুরুর কথা থাকলেও সেই কাজ শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে এসে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফসর উদ্দিন বলেন, অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেখার হাওরসহ অন্যান্য হাওরে পানি প্রবেশ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই ফসলহানি হচ্ছে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে, দেখার হাওরের ফসলডুবির প্রতিবাদে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে হাজারো কৃষক। এর ফলে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও কৃষকদের প্রতি সংহতি জানান। পরে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে বিকেল সাড়ে ৫টায় অবরোধ তুলে নেয় কৃষকরা।

কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের চার উপজেলার অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও করিমগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি নদী ও খালবিলগুলো উপচে পানি গ্রাস করে ফেলছে ফসলি জমি। কৃষি বিভাগের সূত্র মতে, গত তিন দিনে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলের এই তিন উপজেলায় আট হাজার ৬০০ হেক্টর (প্রায় ২১ হাজার ৫০০ একর) বোরো জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫৪ কোটি। তবে কৃষকরা বলছেন, তিন দিনে অন্তত ৩০-৩২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রতিদিনই পানির উচ্চতা বাড়ছে। কৃষকরা বলেন, সাধারণত, ধান পাকার পর কাটা-মাড়াইয়ের শুরুর সময় হাওর তলিয়ে যায়। কিন্তু এবার ধান পাকার আগেই নদী ও খালের পানি উপচে ফসল তলিয়ে দিচ্ছে। এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অষ্টগ্রামের বিভিন্ন হাওরের। এ উপজেলার অন্তত আট হাজার ২০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়েছে। এ ছাড়া মিঠামইনে ৩০০ হেক্টর, ইটনায় ৫০ হেক্টর ও করিমগঞ্জে আরো ৫০ হেক্টর বোরো জমির ফসল তলিয়েছে। মোহনগঞ্জ : নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার চরহাইজদা ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধের জালালের কুঁর নামক স্থান দিয়ে শনিবার রাতে বাঁধ ভেঙে যায়। এতে উপজেলার ডিঙ্গাপোতা ও হাইজদা হাওরসহ ছোট-বড় ২০টি হাওরের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নেত্রকোনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে থাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজনের বাঁধ মেরামতে গাফিলতির কারণেই এ ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে।

চরহাইজদা বেড়িবাঁধসংলগ্ন মান্দারুয়া গ্রামের কৃষক শৌজুয়ান মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এবার আমি বাড়ির সামনের হাইজদা হাওরে প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করে ২৮ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলাম। আমার জমির ধান সবেমাত্র পাকতে শুরু করেছিল। আর পাঁচ-ছয় দিন পরেই জমির ধান কাটা শুরু করতাম; কিন্তু নেত্রকোনার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও তাদের অধীনে গঠিত পিআইসি কমিটির লোকজন সময়মতো সঠিকভাবে বাঁধ মেরামত না করায় এই অসময়ে পানিতে তলিয়ে আমার সব শেষ হয়ে গেল।’

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তাহের কালের কণ্ঠকে বলেন, এ সময়ে বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ আমাদের পক্ষ থেকে এই বাঁধ মেরামত ও তদারকিতে কোনো ধরনের কমতি ছিল না।

খালিয়াজুরী : নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এলাকাবাসীর মনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিভিন্ন মসজিদ থেকে এলাকাবাসীকে বাঁধ রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বাঁধ রক্ষায় এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে দিন-রাত বাঁধগুলো রক্ষার জন্য কাজ করছে। পানি বৃদ্ধি পেলে তলিয়ে যাবে উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার একর জমির বোরো ফসল।

খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত পানির চাপে গত দুই দিনে খালিয়াজুরী সদরের চুনাই বাঁধ ও গংগাবদর বাঁধ আংশিক ভেঙে গেছে। এ দুটি বাঁধের ওপর দিয়ে পানিপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসী জানিয়েছে, পানি স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। যদি রাতে বৃষ্টি হয় বা পানি বেড়ে যায় তাহলে এসব বাঁধের ওপর দিয়ে প্রায় ২০ ফুট নিচের সব হাওরের ফসল তলিয়ে যাবে। [প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধি হাওরাঞ্চল এবং সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা প্রতিনিধি।]

মন্তব্য