kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বাংলাদেশের ১৫০ কোটি টাকার পণ্য আটকা সিঙ্গাপুর বন্দরে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২৮ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলাদেশের ১৫০ কোটি টাকার পণ্য আটকা সিঙ্গাপুর বন্দরে

দেড় শ কোটি টাকার আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার সিঙ্গাপুর বন্দরে পড়ে আছে তিন মাস ধরে। দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে হানজিন শিপিং কম্পানির নিজস্ব কনটেইনারে থাকা এসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে আনা যাচ্ছে না। আর অন্য কম্পানির কনটেইনারে স্থানান্তর করেও এসব পণ্য দেশে আনতে বিপুল পরিবহন খরচ হবে। এ অবস্থায় দোটানায় পড়েছে দেশের অন্তত ৫০ আমদানিকারক।

এই জটিল অবস্থার মধ্যে সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ পণ্যগুলো সরিয়ে নিতে আগামী ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সব পণ্য নিলামে তুলবে সেখানকার বন্দর কর্তৃপক্ষ। সে কারণে ৫৩০ একক কনটেইনার ভর্তি পণ্য নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে আমদানিকারকরা।

আটকা পড়া এসব পণ্যের মধ্যে আছে ইলেকট্রনিক পণ্য, ভারী যন্ত্রপাতি, কাপড়, সুতা, স্টিল ও আয়রন, মার্বেল পাথর, রাসায়নিক পদার্থ, ঘরোয়া সামগ্রী, খেলনা যন্ত্রাংশ প্রভৃতি।

জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার শিপিং কম্পানি হানজিন দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো চট্টগ্রাম বন্দরেও এসব কনটেইনার নামতে দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে গত মাসে ৭৪টি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে এলেও ফেরত পাঠানো হয়। এতে আসা-যাওয়া মিলিয়ে দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়ে আমদানিকারকরা।

জানতে চাইলে হানজিন শিপিংয়ের বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মাসুদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক মাস আগেও পণ্যভর্তি চার হাজার একক কনটেইনার সিঙ্গাপুর বন্দরে আটকা ছিল। কিছু আমদানিকারক পরিবহন খরচ বেশি হওয়ার পরও পণ্যগুলো অন্য কম্পানির কনটেইনারে স্থানান্তর করে চট্টগ্রাম নিয়ে আসে। আর কিছু আমদানিকারক বাড়তি পরিবহন খরচের ঝুঁকি নিতে চায়নি। তাই গত ২১ নভেম্বর পর্যন্ত ৫৩০ একক পণ্যভর্তি কনটেইনার সিঙ্গাপুর বন্দরে আটকা পড়েছে।’

মাসুদ জানান, এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান আটকা পড়া পণ্য দেশে আনবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। তবে হানজিন শিপিং কর্তৃপক্ষ চাইছে বাকি কনটেইনারের পণ্যগুলোর বিষয়ে সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই একটি সিদ্ধান্ত জানাতে। তা না হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিতে পড়তে হবে এসব আমদানিকারককে।

বাড়তি পরিবহন খরচের ঝুঁকি নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে চার কনটেইনার ডুপ্লেক্স বোর্ড এনেছেন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারখানায় কাঁচামাল সংকট এড়াতে বাধ্য হয়ে চার কনটেইনার পণ্য দেড় মাস পর সিঙ্গাপুর থেকে চট্টগ্রাম নিয়ে আসি। এতে প্রতি কনটেইনারে তিন-চার হাজার মার্কিন ডলারের মতো বাড়তি খরচ হয়েছে। এই টাকা বিদেশি সরবরাহকারী তো দেবে না, কারণ আগেই ভাড়া পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আমদানিকারক ও ইনডেন্টর মিলে পরিশোধ করবে।’

কাঁচামাল সংকট সামাল দিতে বাড়তি ভাড়া দিয়ে এসব পণ্য নিজেদের কারখানায় আনার ঝুঁকি নিচ্ছেন না অনেক ব্যবসায়ী। তাঁদের একজন সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট রোসানি এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার নজরুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আটকা পড়া এক কনটেইনার সোডিয়াম সালফেটের দাম দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু চট্টগ্রাম আনতে পণ্য পরিবহন ও সিঙ্গাপুর বন্দর মাসুল দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের মতো। এত আর্থিক ক্ষতি গুনে সেগুলো কেন আনব?’

এরই মধ্যে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদেশি সরবরাহকারী এবং সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা ব্যাংককে জানানো হয়েছে বলেও জানান নজরুল ইসলাম।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হানজিন দেউলিয়ার দায় শোধ করতে হচ্ছে দেশের ব্যবসায়ীদের। চার হাজার একক কনটেইনার অন্য কম্পানির কনটেইনারে করে দেশে আনতে বাড়তি গুনতে হবে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা। এই টাকা দেশের ব্যবসায়ীদের পকেট থেকেই দিতে হচ্ছে।’

মাহফুজুল হক বলেন, আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য না পাওয়ায় কারখানার উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটেছে, পণ্য জাহাজীকরণ বিলম্বিত হয়েছে—এই ক্ষতির অঙ্ক হিসাব করা কঠিন।

উল্লেখ্য, গত ৩১ আগস্ট সিঙ্গাপুর আদালতে হানজিন শিপিংয়ের দেউলিয়া হওয়ার আবেদন আদালতে জমার পর থেকে চার হাজার ১৩৭ একক পণ্যভর্তি কনটেইনার সিঙ্গাপুর বন্দরে আটকা পড়েছিল। এর মধ্যে ব্যবসায়ীরা বেশির ভাগ কনটেইনার অন্য কম্পানির কনটেইনারে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করেন। সেগুলো এরই মধ্যে চট্টগ্রাম আসছে পর্যায়ক্রমে।

জানা গেছে, সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ গত ১২ নভেম্বর হানজিনের কনটেইনার সরিয়ে নিতে একটি নোটিশ দিয়েছে। ২৮ নভেম্বরের মধ্যে এসব কনটেইনার সরিয়ে না নিলে নিলামে তোলা হবে অথবা সেগুলো সরিয়ে ফেলে নিজেদের জিম্মায় নেওয়া হবে বলে নোটিশে বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে এসব কনটেইনার সরিয়ে নিলে সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ মাসুলেও অনেক ছাড় দেবে বলে জানা গেছে।



সাতদিনের সেরা