kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

শাস্ত্রীয় সংগীত উৎসব

বাঁশি-বেহালার যুগলবন্দি

নওশাদ জামিল   

২৫ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাঁশি-বেহালার যুগলবন্দি

উৎসবের প্রথম রাতে উচ্চাঙ্গসংগীত পরিবেশন করেন সেনিয়া ও বেনারস ঘরানার প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী ৮৭ বছর বয়স্ক বিদুষী গিরিজা দেবী। ছবি : তারেক আজিজ নিশক

এরই মধ্যে দেশে তৈরি হয়ে গেছে বিদগ্ধ হাজারো শ্রোতা। শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে পুরো একটি বছর তারা ছিল প্রতীক্ষায়। অবশেষে সেই অপেক্ষার প্রহর ঘুচল। জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হয়ে গেল শাস্ত্রীয় সংগীতের পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব। উৎসবস্থলের ঠিকানা যথারীতি আর্মি স্টেডিয়াম।

রাজধানীর বনানীসংলগ্ন আর্মি স্টেডিয়ামের সামনের চত্বর ছাড়িয়ে বিশাল ফুটপাতজুড়ে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকেই সংগীতপিপাসুরা ভিড় জমায়। স্টেডিয়ামের প্রবেশমুখে দেখা যায় মানুষের দীর্ঘ সারি। কড়া নিরাপত্তা আর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা স্টেডিয়ামের ভেতর-বাইরে। নিরাপত্তার ঘেরাটোপ পেরিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল উৎসব উপলক্ষে ভেতরের বর্ণিল সাজ। মাঠের মাঝখানে শামিয়ানা ঢাকা উজ্জ্বল মঞ্চ। চারদিকে আলোকসজ্জা, সংগীতের ভাবের সঙ্গে সংগতি রেখে যথাযথ আলোর প্রক্ষেপণ, মঞ্চের পটভূমিতে সুন্দর দৃশ্যের উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ যথার্থই উপভোগ্য, আকর্ষণীয়। বরেণ্য শিল্পী ও সংগীতানুরাগীদের পোস্টার, ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে সর্বত্র। সেই চিরচেনা অবয়বের মধ্য দিয়ে গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় পর্দা উঠল পঞ্চম বেঙ্গল শাস্ত্রীয় সংগীত উৎসবের। রাতজাগা পাখির মতো গতকাল থেকে টানা পাঁচ দিন জেগে থাকবে আর্মি স্টেডিয়াম, জেগে থাকবে হাজারো বিদগ্ধ শ্রোতা।

নিশ্চিত করেই বলা যায়, দর্শক-শ্রোতার জন্য এই উৎসব এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে এত বিশাল সুশৃঙ্খল আয়োজন সারা বিশ্বে বিরল। রাতভর গান শোনার এই উৎসব এরই মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে দেশ-বিদেশের সংগীতানুরাগীদের। এ ছাড়া বিপুল শ্রোতার আগমনে এরই মধ্যে এটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম শাস্ত্রীয় সংগীত উৎসবে।

গতকাল হেমন্তের সাঁঝবেলায় শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত গান আর তালের মায়ায় মুগ্ধতার বীজ বুনে কেটে যায় বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের প্রথম দিন। এদিনের পরিবেশনা ছিল এবারের আসরের প্রবীণতম শিল্পী বিদুষী গিরিজা দেবীর খেয়াল। আরো ছিল ড. এল সুব্রহ্ম্যণনের বেহালা বাদন, ওস্তাদ আশিষ খানের সরোদের সুর এবং প্রবীণ গোডখিণ্ডির বাঁশি ও রাতিশ তাগড়ের বেহালার সমন্বিত সুর।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে উৎসর্গ করা হয়েছে এবারের উৎসব। পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই উৎসবের আয়োজক বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। স্কয়ার নিবেদিত উৎসবে সহযোগিতা করছে ব্র্যাক ব্যাংক। এই উৎসব চলবে সোমবার পর্যন্ত। এতে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশের ১৬৫ জন শিল্পী। ভারত থেকে আসা শিল্পীর সংখ্যা ৮২।

গতকাল উৎসবের শুরুতেই ছিল ‘রবি করোজ্জ্বল’ শিরোনামের শাস্ত্রীয় নৃত্য পরিবেশনা। নৃত্যশিক্ষক শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় নৃত্যনন্দন দলের প্রায় ষাটজন শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল গান ও ভাঙ্গা গানে মণিপুরি, ভরতনাট্যম, ওড়িশি ও কত্থক রীতির রূপায়ণ পরিবেশন করেন। নাচের মুদ্রার সঙ্গে বেজে ওঠে ‘বাসন্তী, হে ভুবনমোহিনী’, ‘বিপুল তরঙ্গ রে’, ‘ওই পোহাইলো তিমির রাতি’ গানের সুর। এ ছাড়া ছিল ব্রজবুলী ভাষার গান।

এরপর উৎসবে ভেসে বেড়ায় বাঁশি ও বেহালার যুগলবন্দি সুর মূর্ছনা। বিভিন্ন দেশে বড় বড় উৎসবে বাঁশি বাজিয়ে অশেষ সুনাম কুড়ানো শিল্পী প্রবীণ গোডখিণ্ডি। তাঁর বাঁশির সঙ্গে যুগলবন্দিতে ছিল ভারতের মিউজিশিয়ানস ফেডারেশনের সভাপতি রাতিশ তাগড়ের বেহালা বাদন। বাঁশি আর বেহালার ঐকতানে এক স্বর্গীয় অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে উৎসব আঙিনায়। তাঁদের তবলায় সংগত করেন রামদাস পালসুল।

যুগলবন্দি পরিবেশনা শেষে ছিল উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সেলিম আর এফ হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের।

এর আগে শাস্ত্রীয় সংগীতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র সদ্যপ্রয়াত শিল্পী বালমুরালি কৃষ্ণ ও ওস্তাদ আলী আহমেদ হোসেনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের এ আসর শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শিল্পী বালমুরালি কৃষ্ণ। উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের চতুর্থ আসরে এই মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। আর ওস্তাদ আলী আহমেদ হোসেনের সানাই পরিবেশনা ছিল বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের প্রথম আসরে। প্রয়াত এ দুই শিল্পীকে নিয়ে প্রদর্শিত হয় প্রামাণ্য চিত্র।

পরে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘এবারের উৎসবের সবচেয়ে বড় অর্জন ৮৭ বছরের বিদুষী গিরিজা দেবীর পরিবেশনা।’ তিনি আরো বলেন, ‘উচ্চাঙ্গসংগীত অনুধাবন করতে হলে কান প্রস্তুত করতে হয়। এর জন্য সময় লাগে। যার কান তৈরি হয়ে যায় তিনি কখনো হিংস্র হতে পারেন না। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন এই উচ্চাঙ্গসংগীতের অনুষ্ঠানকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাস্ত্রীয় উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারা।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘সকল অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এবারও এ উৎসব আয়োজিত হচ্ছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ।’ তিনি হলি আর্টিজান, শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণ করেন। বলেন, ‘এর প্রতিরোধ করতে হবে আমাদের সংস্কৃতির ধারক, বাহক রুচিশীল মানুষদের।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা চমৎকার বাংলায় বক্তৃতা করেন। তিনি উৎসবের প্রশংসা করে বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষত্ব—প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান শিল্পীদের একই মঞ্চে এনে উচ্চাঙ্গসংগীতের দুয়ার সবার কাছে খুলে দিতে পারা। আমি বিশ্বাস করি, এই অনুষ্ঠান ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’ 

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের বলেন, ‘সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলার প্রতি এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ আমাদের এই উৎসব।’ তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি টিভি চ্যানেল যদি প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে উচ্চাঙ্গসংগীতের জন্য বরাদ্দ করে তবে আমাদের উদ্যোগের মাধ্যমে যেসব শিল্পী তৈরি হবে তাঁদের কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।’

উদ্বোধনী পরিবেশনা শেষে খেয়াল নিয়ে মঞ্চে আসেন বিদুষী গিরিজা দেবী। সেনিয়া ও বেনারস ঘরানার প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী গিরিজা দেবী মুগ্ধতা ছড়ান তাঁর কণ্ঠ মাধুর্যে। তাঁর সঙ্গে তবলায় ছিলেন গোপাল মিশ্র। আর সারাঙ্গিতে সংগত করেন মুরাদ আলী খান।

বিদুষী গিরিজা দেবীর পরিবেশনা শেষে সরোদ বাদন নিয়ে মঞ্চে আসেন আলাউদ্দিন খাঁর দৌহিত্র ও আলী আকবর খাঁর ছেলে ওস্তাদ আশিষ খাঁ। গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পাওয়া এই শিল্পীর সঙ্গে তবলায় সংগত করেন পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ।

এরপর ‘জাসরাঙ্গি’ শিরোনামে খেয়াল যুগলবন্দি নিয়ে মঞ্চে আসেন জয়পুর আত্রৌলি ঘরানার অন্যতম শিল্পী বিদুষী অশ্বিনী ভিদে দেশপান্ডে ও মেওয়াতি ঘরানার প্রখ্যাত শিল্পী পণ্ডিত সঞ্জীব অভয়ংকর। তাঁদের সঙ্গে তবলায় ছিলেন আজিঙ্কা যোশি ও রোহিত মজুমদার।

প্রথম দিনের আয়োজন শেষ হয় গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত ড. এল সুব্রহ্ম্যণনের বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে। তাঁকে তবলায় সংগত করেন পণ্ডিত তন্ময় বসু।

আজকের আয়োজন : আজ শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই ওড়িশি নৃত্য পরিবেশন করবেন বিদুষী মাধবী মুডগাল ও তাঁর শিষ্য আরুশি মুডগাল। দলীয় তবলা পরিবেশন করবেন বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থী শিল্পীরা। খেয়াল পরিবেশন করবেন বাংলাদেশের শিল্পী প্রিয়াঙ্কা গোপ। সন্তুরে সুর তুলবেন শিল্পী রাহুল শর্মা। দলীয় শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করবেন মোহাম্মদ শোয়েব ও তাঁর দল। সেতার পরিবেশন করবেন পূর্বায়ণ চট্টোপাধ্যায়। খেয়াল পরিবেশন করবেন পণ্ডিত উলহাস কশলকার। উৎসবে নতুন যুক্ত হওয়া ম্যান্ডোলিন বাদনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দ্বিতীয় দিনের আয়োজন। সঙ্গে থাকবে বাঁশি। পরিবেশন করবেন বংশীবাদক পণ্ডিত রনু মজুমদার ও ম্যান্ডোলিনে ইউ রাজেশ।



সাতদিনের সেরা