kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফোকফেস্ট

বন্দে মায়া লাগাইছে...

নওশাদ জামিল   

১১ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বন্দে মায়া লাগাইছে...

আর্মি স্টেডিয়ামে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্টের উদ্বোধনী দিনে নৃত্য পরিবেশনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

গানের দেশ বাংলাদেশ। জারি-সারি, পালা, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি আর বাউলগানের ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এ দেশের মানচিত্র। রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনের আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎব। দেশের শিল্পীদের পাশাপাশি বিশ্বের নামজাদা লোকসংগীত শিল্পীরা যোগ দিয়েছেন উৎবে। 

গতকাল উৎবের প্রথম দিন শিকড়সংলগ্ন মায়াবী সুরে উতলা ছিল শ্রোতারা। মাটির গানের সুর তাদের অন্তর আত্মাকে সিক্ত করে তোলে। দেশ-বিদেশের শ্রোতানন্দিত লোকসংগীত শিল্পীদের পরিবেশনায় মোহাবিষ্ট ছিল পুরো উৎব। প্রথম দিনে গান শোনান বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের শিল্পীরা। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে লোকজ গানে সাজানো এ সংগীত আসর।

গতকাল হেমন্ত সন্ধ্যায় উৎবের শুরু হয় লোকগানের সুরে লোকনৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে। বর্ণিল পোশাকে মঞ্চে আসেন একঝাঁক নৃত্যশিল্পী। ‘হেইয়া রে হেইয়া জোরে মারো টান’, ‘বকুল ফুল বকুল ফুল সোনা দিয়ে হাত কেন বান্ধাইলি’ গানের আশ্রয়ে নাচ করে পল্লবী ড্যান্স গ্রুপ।

আন্তর্জাতিক এ লোকগীতির আসরে প্রথম গান শোনান হবিগঞ্জের আবদুর রহমান বাউল। প্রকৃতির প্রেরণাদীপ্ত শিল্পীর কণ্ঠে শুরুতেই গীত হয় ‘আমি তোমার হইতে পারলাম না’। দেহতত্ত্ব ও ভাবতত্ত্বের মাঝে জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরা বাউল গানে গানে বলে যান ‘তুমিও মানুষ আমিও মানুষ’। এরপর গেয়ে শোনান বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের গান ‘কি জাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে’। পরের গানে বলে যান সম্প্রীতির কথা, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম/আমরা আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম/গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম’।

গতকাল সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে এ উৎব উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক প্রতিষ্ঠান সান ইভেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। এ ছাড়া বক্তব্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক, গ্রামীণফোনের চিফ মার্কেটিং অফিসার ইয়াসির আযমান, ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ও মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবির।

উদ্বোধনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘আমাদের সাধারণ মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নাচ ও গান। সে কারণেই আমাদের সংস্কৃতিটাও স্বভাবজাত। তাই আমরা যতই অশিক্ষিত হই, আমাদের রুচি যথেষ্ট পরিশীলিত। এটা আমাদের গর্ব।’

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চে আসেন কুষ্টিয়ার শিল্পী টুনটুন বাউল। লালনের অনুসারী এ শিল্পীর কণ্ঠে শোনা য়ায় লালনের বিখ্যাত গানগুলো। যুক্তরাজ্যের সাইমন থ্যাকার্স সাভারা কান্তির সঙ্গে ভারতের রাজু দাস বাউল ও বাংলাদেশের ফরিদা ইয়াসমিনের পরিবেশনাটি ছিল অনবদ্য। একেবারে পাশ্চাত্যের লোকসংগীতের সঙ্গে প্রাচ্যের খাঁটি লোকসংগীতের অপূূর্ব সংমিশ্রণ বলা যায়।  

এরপর মঞ্চে আসেন পাকিস্তানের শিল্পী জাভেদ বশির। ক্লাসিক্যাল ঘরানার এ শিল্পী বাংলাদেশে অধিক পরিচিতি লাভ করেন বলিউডের ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাই দোবারা’ চলচ্চিত্রে ‘ইয়ে তুনে ক্যায়া কিয়া’ গানের মধ্য দিয়ে। সেই সঙ্গে ইউটিউবে ‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’ দেখেও যে তাঁর বড় ধরনের ভক্ত এ দেশে তৈরি হয়েছে, এর প্রমাণ মিলল তাঁর নাম ঘোষণা হতেই।

প্রথম দিনের অন্তিমলগ্নে উৎবের সবটুকু আলো যেন নিজের দিকে টেনে নেন লোকগানে বাংলার অহংকার মমতাজ বেগম। এই শিল্পী মঞ্চে হাজির হতেই করতালির মাধ্যমে শ্রোতারা জানিয়ে দেয় তাঁর প্রতি অনুরাগের কথা।

সব মিলিয়ে তিন দিনের এ উৎবের প্রথম দিনেই সুরের কাছে সমর্পিত সংগীতানুরাগীদের আগমনে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে লোকগানের এই মহাসংগীতযজ্ঞ। তারুণ্যের প্রাধান্য থাকলেও নানা বয়সী সংগীতানুরাগীর মাঝেও সুরের এই বৈভব বয়ে যায়। এবারের উৎবে বাংলাদেশসহ ছয় দেশের শতাধিক শিল্পী অংশ নিচ্ছেন।

দ্বিতীয়বারের মতো এ উৎবের আয়োজন করছে সান ইভেন্টস। মেরিল নিবেদিত উৎবে সহযোগিতায় রয়েছে জিপি মিউজিক, ঢাকা ব্যাংক ও মাইক্রোসফট বাংলাদেশ।

আজকের আয়োজন : আজ শুক্রবার ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎবের দ্বিতীয় দিন। বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে এদিন পরিবেশনায় অংশ নেবেন জালাল ও লতিফ সরকার। আরো থাকছেন বাউল শফি মফ্ফল আর লাবিক কামাল গৌরবের যুগলবন্দি। এদিন বিশেষভাবে শ্রোতাদের নজর কাড়বেন ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কৈলাস খের। নিজেদের গান নিয়ে আসবে ভারতের লোক ব্যান্ডদল ইন্ডিয়ান ওশেন। লোকজ সুরের সঙ্গে ফ্লামেঙ্কো নাচের যূথবদ্ধ পরিবেশনায় থাকবে স্পেনের কারেন লুগো ও রিকার্ডো মোরো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা