kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পবর্তারোহণ

মেরার চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেরার চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা

হিমালয়ের মেরা পর্বত চূড়ায় বাংলাদেশের চার পর্বতারোহী। ছবি : সংগৃহীত

‘মেরা পর্বতের চূড়ায় উঠে প্রচণ্ড কাঁপছিলাম। বাতাসের প্রবল বেগের কাছে নিজেকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ঝিরঝির বৃষ্টি, প্রবল বেগে বাতাস আর পায়ের নিচের বরফের ঠাণ্ডায় কিছুই মনে আসছিল না। মনে হচ্ছিল, এখনই পুরো শরীর বরফ হয়ে যাবে। এ কারণে প্রথম পর্বতে ওঠার অনুভূতির কথাটাই ভুলে গেছি।’

সস্প্রতি হিমালয়ের মেরা পর্বত শিখর জয় করেছেন বাংলাদেশের চার পর্বতারোহী। তাঁরা মেরা পর্বতের চূড়ায় গেড়েছেন বাংলাদেশের পতাকা। এঁদের একজন শায়লা পারভীন। নিজের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন তিনি। দলের অন্য পবর্তারোহীরা হলেন সাদিয়া, কাজী বাহলুল মজুন ও দলনেতা এভারেস্টজয়ী এম এ মুহিত।

অনুভূতি জানাতে গিয়ে আরেক পবর্তারোহী সাদিয়া বলেন, ‘যখন মেরা পর্বতে উঠলাম তখন শুনছিলাম—‘ও, তোমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছ? বাংলাদেশে এত বড় বড় পর্বত আছে?’ আরো কত প্রশ্ন। সবাই তো আমাদের দেখে অবাক। তবে সবচেয়ে অবাক হয়েছি, যাঁরাই মুহিত ভাইকে দেখেছেন, তাঁরাই ওনার সঙ্গে ছবি তুলেছেন। অনেকেই জানতে চান, ‘মুহিত তুমিও এসেছ?’ আসলে মুহিত ভাইকে বিশ্বের পবর্তারোহীদের বেশির ভাগই চেনেন। একই কারণে সবাই আমাদের চেনে। তবে গর্বে বুকটা ফুলে উঠেছে, যখন মেরা পর্বত শিখরে দুই হাত প্রসারিত করে লাল-সবুজের পতাকা তুলে ধরলাম।’

গত শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স কক্ষে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা শুনছিলেন  অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও সুলতানা কামাল। আরো উপস্থিত ছিলেন অভিযানের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান আজিম গ্রুপের উপমহাপরিচালক ফারহান মোহাম্মদ আজিম, এম এম ইস্পাহানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর হান্নান, অ্যান্টার্কটিকা ও সুমেরু অভিযাত্রী ইনাম আল হক প্রমুখ।

চার পবর্তারোহীর মধ্যে শায়লা পারভীনের জন্য এটা ছিল প্রথম পর্বতারোহণ। তিনি বলেন, ‘অভিযানের মাত্র এক মাস আগে মুহিত ভাই বললেন, তুমি মেরা পর্বতে যাবে? আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। তারপর রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু বিপত্তি বাধালেন আমার বাবা। তিনি এতে কোনোমতেই রাজি হলেন না। পরে ওনার আপত্তিকে উপেক্ষা করে রওনা হলাম। তবে এখন আমার ওপর অনেক খুশি বাবা।’

প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে শায়লা পারভীনের দক্ষতার প্রশংসা করেন এম এ মুহিত ও বাহলুল মজনু। মুহিত বলেন, ‘শায়লাকে নিয়ে আমার ভয় ছিল। এত পথ সে শেষ করতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দিহান ছিলাম। বিশেষ করে ছয় হাজার ফুট ওপরে ওঠার পর শায়লা অসুস্থ হয়ে যায় কি না তা নিয়ে ভয় ছিল। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, ওর কোনো সমস্যাই হয়নি। আসলে শায়লা সব কিছু উপভোগ করছিল।’

মুহিত বলেন, ‘প্রথম পবর্তারোহী হিসেবে শায়লা ছিল খুবই আপ্লুত। তাই পবর্ত শিখরে আমাদের আগেই দুই হাত প্রসারিত করে সে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা তুলে ধরে। আমরা বাকি তিনজন পরে তাঁর সঙ্গে যোগ দিই। তবে শায়লার মতো অন্যরা কখনোই আবেগে আপ্লুত হতে পারত না, যদি ইনাম আল হক স্যার আমাদের পবর্তারোহণে না নিয়ে যেতেন। আমরা পুরো জাতি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।’

সবার অগোচরে পবর্তারোহীরা দেশকে ব্র্যান্ড করছে জানিয়ে মুহিত বলেন, ‘সেখানে গেলে বিদেশিরা আমাদের দেখে অবাক হয়। তারা মনে করত বাংলাদেশ মানে দরিদ্র, দুর্ভিক্ষ আর বন্যা। তবে সবচেয়ে ভালো লাগে যখন বিদেশিরা আমাদের সঙ্গে আগবাড়িয়ে কথা বলে, ছবি তুলতে চায়। এটা আমাদের জন্য, দেশের জন্য সম্মানের। এভাবেই আমাদের দেশ বিশ্বের কাছে ব্র্যান্ডিং হয়।’

শায়লাদের মেরা পর্বত আরোহণের পেছনে যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছে, তার মধ্যে অন্যতম আজিম গ্রুপ। আজিম গ্রুপের ডিএমডি ফারহান মোহাম্মদ আজিম বলেন, ‘সাদিয়া ও শায়লারা আমাদের জন্য, দেশের জন্য গর্বের। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে তারা নতুনভাবে তুলে ধরছে। আমরা তাদের সব সময় পৃষ্ঠপোষকতা করব—এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’

নতুন পর্বতারোহীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে সুলতানা কামাল বলেন, ‘পর্বতারোহণের কথা শুনলে আমারও যেতে ইচ্ছা করে। যদিও জীবনে ২০০ মিটারও দৌড়াইনি। পবর্তারোহীদের দেখলে আমার মেয়ে বলত, মা, ওদের মাথা খারাপ। না হলে এটা কী সম্ভব। আমি বলি, মাথা খারাপ না হলে ভালো কাজ করা যায় না। তাই মাথা খারাপ শায়লাদের জন্য আমরা গর্বিত।’

ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে জাফর ইকবাল বলেন, “কম বয়সে আমিও পর্বতারোহীদের দলে ছিলাম। তখন আমাদের বলা হয়েছিল, ‘যদি কোনো কারণে বরফের নিচে চাপা পড়ে যাও, তবে বাঁচার চেষ্টার কোরো না। সেখানেই মরে যেয়ো।’ আসলে বিষয়টা যে কত কঠিন তা বাস্তবে না দেখলে বোঝা যায় না। তাই পর্বতারোহী সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।”

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা