kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

জামদানি

৪০০ বছরের ঐতিহ্য টিকে আছে

আপেল মাহমুদ   

১২ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৪০০ বছরের ঐতিহ্য টিকে আছে

ডেমরার শীতলক্ষ্যার পারে ৪০০ বছর ধরে চলছে সাপ্তাহিক জামদানি হাট। ছবি : কালের কণ্ঠ

হাটটি বসে সপ্তাহে এক দিন, শুক্রবার। ভোর ৫টায় শুরু হয়ে সকাল ৮টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তিন ঘণ্টার হাটে তাঁতিরা বেচাকেনা করে তাদের উৎপাদিত জামদানি কাপড়। এভাবে প্রায় ৪০০ বছর ধরে চলছে শীতলক্ষ্যার পারে ডেমরায় জামদানি কাপড়ের আড়ং, যা স্থানীয়ভাবে ডেমরার হাট হিসেবেই পরিচিত। মুঘল আমলে মসলিন কাপড়ের জয়জয়কারের সময় ডেমরার আড়ংটির সূচনা হয়। মসলিনের পর এখান থেকেই জামদানি কাপড়ের নবযাত্রা।

তারাবো গ্রামের জামদানির তাঁতি ইমান আলী বলেন, ‘সাত পুরুষ ধরে আমরা জামদানি বুনছি। বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারিনি। ৩০০ বছর ধরে আমার বংশের লোকজন নকশা করা মসলিম ও পরে জামদানি কাপড় বোনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই কাপড় বুনে তা ডেমরার আড়ংয়ে বিক্রি করা হতো। তিনি বলেন, ‘তবে জামদানির সেই জৌলুস আর চাহিদা আগের মতো নেই। আর এত পরিশ্রমের জামদানির দামও তেমন মেলে না। একেকটি জামদানি বুনতে সপ্তাহ লেগে যায়। এখন আর পোশাতে চায় না। ফলে সংসার চালাতে এর পাশাপাশি কৃষিকাজের সঙ্গেও যুক্ত আছি।’

অতীতে ঢাকার জামদানিনগর, নওয়াবপুর, তাঁতিবাজারে মুসলিন ও জামদানি কাপড় বোনার কারিগরদের বাস ছিল। তারা অতি সূক্ষ্ম সোনা ও রুপার সুতা দিয়ে মূল্যবান জামদানি তৈরি করতেন, যা ছিল বিরল ঘটনা। জামদানি একটি ফারসি শব্দ। পারস্য দেশে এক প্রকার উত্কৃষ্ট সুরার নাম জামা। দানি অর্থ পাত্র। অর্থাৎ জামদানি অর্থ সুরার পাত্র। ফলে ঢাকার তাঁতিদের সারা বিশ্বে একটি বিশেষত্ব গড়ে ওঠেছিল। তাদের তৈরি জামদানি কাপড়ের চাহিদা ছিল ইতালি, মিসর, ব্রিটেন, তুরস্ক, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন

দেশে। কিন্তু কালের প্রবাহে মসলিনের বিভিন্ন কাপড়ের যুগ শেষ হয়ে গেলেও টিকে আছে শুধু জামদানি। আর সেটা ধরে রেখেছে ডেমরার জামদানি হাট।

প্রবীণ ইতিহাসবিদ ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৮ শতক থেকেই ঢাকা তথা ডেমরার আড়ং থেকে বিদেশে জামদানি কাপড় রপ্তানি হতো। বিভিন্ন পাইকার ও মহাজনের দেওয়া তথ্য সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মধ্যপ্রাচ্য, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি রপ্তানি হচ্ছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি দিল্লি, লক্ষ্নৌ, বাংলা, মুর্শিদাবাদ ও নেপালের নবাবরা তাঁদের প্রিয়জনদের জন্য দামি জামদানি কিনে নিতেন।

মুঘল আমলে মসলিন থেকে উদ্ভাবিত জামদানি কাপড় এখনো টিকে আছে। মূলত মসলিনের নকশা করা কাপড়কেই জামদানি বলা হয়। এ নকশার কাজে তখন ব্যবহৃত হতো সোনা ও রুপার সূক্ষ্ম সুতা। বর্তমানে সোনা ও রুপার পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন রঙের কৃত্রিম জরি-সুতা। ডেমরা হাটে ৯০ বছরের প্রবীণ তাঁতি হেদায়েত উল্লাহ কাজীর সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি দাবি করেন, এখনো সোনা ও রুপার সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে জামদানি বোনা সম্ভব। তবে সেটা হবে অনেক ব্যয়বহুল। একেকটি শাড়ির মূল্য হবে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা।

ডেমরা অঞ্চলের প্রবীণ কারিগররা জানায়, ঢাকা শহরে জামদানি তাঁতিরা ব্রিটিশ আমলেই পেশা পরিবর্তন করে কেউ শাঁখা কেউ সোনার কারিগর কিংবা ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ডেমরা, তারাবো, নোয়াপাড়া, রূপসী, দক্ষিণ রূপসী, খাদুন গ্রামগুলোয় এখনো জামদানি বোনার প্রতিযোগিতা চলে। কয়েক শ তাঁতির কর্মযজ্ঞে গ্রামগুলো জেগে থাকে গভীর রাত অবধি। তাঁতযন্ত্রের খটখটানি চলে সর্বত্র। সকালে তাঁতের খটখটানিতেই আশপাশের মানুষের ঘুম ভাঙে। শুক্রবার ভোর থেকেই তাদের নৌকা জড়ো হয় শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে ডেমরা ঘাটে। সপ্তাহব্যাপী ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল টাটকা জামদানি শাড়ি বগলে করে পৌঁছে যায় হাটে।

শুধু তাঁতিদের আগাগোনাই নয়, মহাজন, ব্যবসায়ী, দালাল-ফড়িয়াদের আনাগোনায় সরগরম হয়ে ওঠে হাট। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মহাজন এবং বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের কর্মীরাও ব্যস্ততায় সময় কাটায়। তারা এই হাটে জামদানি শাড়ি কিনতে আসে পাইকারি দামে। তাঁতিরা হাতে হাতে জামদানি শাড়ি বিক্রি করে থাকে। যে কেউ দরদাম করে পছন্দ মতো জামদানি শাড়ি কিনতে পারে। অনেকে ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমেও জামদানি কাপড় কিনে থাকে। ইদানীং বিদেশি ব্যবসায়ী, মহাজন এবং ভোক্তাদেরও সরাসরি ডেমরা হাটে এসে পছন্দমতো জামদানি কাপড় কিনতে দেখা যাচ্ছে।

জামদানিকে নকশাদার কাপড় বলা হয়। নকশার বাহাদুরিতেই এ কাপড়ের জয়গান। জ্যামিতিক ডিজাইনে জামদানির নকশা করা হয় বলে সবকিছু নির্ভুল হয়ে থাকে। তবে যে কাপড়ের ডিজাইন যত বেশি ও ভারী তার দামও তত বেশি। হাটে সাধারণত দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দামের জামদানি শাড়ি বেশি বিক্রি হয়। তবে বেশি দামের শাড়িও এখানে বিক্রি হয়। বিয়ে, ঈদ, নববর্ষ বা পূজার মতো বিশেষ উৎসবের সময় জামদানি শাড়ির কদর বেশি থাকে। তাঁতি আকবর বলেন, ‘অর্ডার পেলে আমরা দুই-চার লাখ টাকার জামদানি বুনে দেই। তবে দামি শাড়ি বুনতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লেগে যায়। তাই তাড়াহুড়ো করে এ শাড়ি বোনা যায় না।’

ডেমরা হাটের কয়েকজন তাঁতি জানায়, ক্রমান্বয়ে সুতা, রং, জরিসহ অন্যান্য সরঞ্জামের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও তারা জামদানি শাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। দিনের পর দিন এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্ডারও পাওয়া যাচ্ছে বেশি। এক সময় ডেমরা হাটে এখানকার উৎপাদিত সব কাপড় বিক্রি হলেও বর্তমানে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পার নোয়াপাড়ায় গড়ে উঠেছে আরো একটি হাট, যা ‘বিসিকের হাট’ নামে অধিক পরিচিত। কারিগররা সেখানেও কিছু জামদানি বিক্রি করে থাকে।

বিসিকের হাটে আসা মহাজন বশির উদ্দিন বলেন, ‘এখন দেশে নবাব-উজির, সম্রাট-বাদশা কিংবা রাজা-মহারাজা নেই। তাই বলে মসলিনের আমল শেষ হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী কিংবা অতিগুরুত্বপূর্ণ অনেক নারীর প্রিয় কাপড় জামদানি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বিশেষ অনুষ্ঠানে জামদানি কাপড় পরেন। তাই জামদানির ভাগ্য ভালোই বলতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা