kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ আষাঢ় ১৪২৭। ১৪ জুলাই ২০২০। ২২ জিলকদ ১৪৪১

জটিলতার জালে আটকা ক্যান্সার চিকিৎসা

তৌফিক মারুফ   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জটিলতার জালে আটকা ক্যান্সার চিকিৎসা

দেশে যত দ্রুত নানা প্রকারের ক্যান্সার রোগের বিস্তার ঘটছে এর বিপরীতে ক্যান্সার চিকিৎসার পর্যাপ্ত ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যবস্থাপনায় অনেকটাই পেছনে রয়ে যাচ্ছে দেশ। বরং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় নানা জটিলতার মুখে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের হয়রানি ও ভোগান্তির মাত্রা বেড়েই চলেছে। এমনকি হয়রানির ধকল সইতে না পেরে অনেক ক্যান্সার রোগীর স্বজনরা চিকিৎসার মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেয়। আবার এক শ্রেণির হাসপাতাল ও চিকিৎসক অপেক্ষাকৃত গরিব ক্যান্সার রোগীদের রীতিমতো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। দ্রুত তাদের বিদায় করে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায় কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। এবারের ক্যান্সার দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে—‘আমরা পারি, আমি পারি।’ দিবসটি পালনে সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি বেসরকারিভাবেই বিভিন্ন হাসপাতাল ও সংস্থা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

যশোর থেকে আসা কিষানি মিনতি রানী ১২ দিন জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ঘুরেও সিরিয়াল পাননি ক্যামোথেরাপি দেওয়ার। শেষ পর্যন্ত এক আত্মীয়র সহায়তায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ধানমণ্ডি এলাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। কিন্তু ওই হাসপাতালে এক দফায় সিট ভাড়া আর ক্যামোথেরাপির খরচ চালিয়েই টাকা-পয়সা শেষ হয়ে যায়। ধারদেনা করেও পরের দফায় নির্দিষ্ট সময়ে ক্যামো নিতে আসতে পারেননি তিনি। টাকা জোগাড় করে কয়েক দিন পর এসে ক্যামোথেরাপি দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। দ্বিতীয় ক্যামোথেরাপির তিন দিনের মাথায়ই মারা যান মিনতি।

তাঁর আত্মীয় সুকুমার দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে ক্যান্সার রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে শুনেছি।

কিন্তু সেখানে তো দেখছি সিরিয়াল পেতে পেতেই রোগীর অবস্থা আরো কাহিল হয়ে যায়। বরং কালক্ষেপণে তা দ্রুত ছড়াতে থাকে। যখন প্রাইভেট হাসপাতালে গেলাম তখন দেখলাম খরচ সামলাতে না পেরে সময়মতো চিকিৎসা শেষ করা গেল না। এর আগেই রোগী মারা গেল।’

আরেক রোগীর স্বজন আখলাকুর রহমান বলেন, ডাক্তারের কাছে গেলেই ডাক্তাররা দেশি আর বিদেশি ওষুধের ধন্দে ফেলে দেন। সাধারণত দেশি ওষুধের চেয়ে বিদেশি ওষুধের প্রতি ডাক্তারদের এক ধরনের দুর্বলতা দেখা যায়। কেউ কেউ দেশি কম্পানির ওষুধের কথা বললেও রোগীর স্বজনদের মনে ওই দেশি ওষুধের মান নিয়ে কৌশলে এক ধরনের সন্দেহ ঢুকিয়ে দেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ড. পুনম ক্ষেত্রপল গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে জানান, বিশ্বে প্রতিবছর ৮২ লাখ মানুষ ক্যান্সারে মারা যায়। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই মারা যায় নিম্নআয়ের দেশগুলোতে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব, অশিক্ষা ও অর্থনৈতিক দৈন্যও দায়ী। পাশাপাশি পরিবেশদূষণ, বায়ুদূষণ, শিল্প-কলকারখানার নানা বর্জ্য ক্ষতিকর ভূমিকা রাখে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

দেশের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে সব মিলিয়ে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। আর বছরে মারা যায় প্রায় দেড় লাখ রোগী। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশে বছরে ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় নিয়ে আসা গেলেও আড়ালে থেকে যায় আরো প্রায় আড়াই লাখ রোগী। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, জনসংখ্যা অনুপাতে বর্তমানে দেশে সব ধরনের সুবিধাসংবলিত ১৬০টি ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে এখন এমন কেন্দ্রের সংখ্যা আছে মাত্র ১৫টি। আবার এর সবই কার্যকর নয়, বেশির ভাগই চলছে জোড়াতালি দিয়ে। এ ছাড়া সারা দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ৮৫ জন।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের জনসংখ্যা বাড়ার হারের সঙ্গে ক্যান্সার রোগের প্রকোপ বাড়ছে, তা সামাল দেওয়া অনেকটাই কঠিন। এ ক্ষেত্রে সবার আগে সবাইকে সচেতন হওয়া দরকার, যাতে করে ক্যান্সারে আক্রান্ত না হতে হয়। এ জন্য তামাক সেবন থেকে শুরু করে যেসব কারণে ক্যান্সার হয় সেগুলো পরিহার করা জরুরি।

ওই কর্মকর্তা ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলেন, বর্তমান সরকার গরিব মানুষের জন্য সারা দেশে বিনা মূল্যে ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা করা গেলে সারা দেশের চাপ কেবল ঢাকার একটি হাসপাতালে এসে পড়বে না। আর সিরিয়াল সংকট কমে যাবে। এ ছাড়া ক্যান্সারের ওষুধও আগের চেয়ে অনেক সহজলভ্য এবং স্বল্পমূল্য হওয়ায় তা রোগীদের সাধ্যের মধ্যে চলে আসছে। 

এদিকে দেশে ক্যান্সারের ওষুধের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধের চাহিদার ৫০ শতাংশ আসে আমদানির মাধ্যমে, ১৫-২০ শতাংশের মতো দেশের কম্পানিগুলো উৎপাদন করে থাকে। আর বাকি ৩০-৩৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে চোরাই পথে। আর এ চোরাই পথের ওষুধের বাণিজ্য এখন বেশ রমরমা অবস্থায় রয়েছে।

তবে দেশে ২০০৯ সাল থেকে বিকন ফার্মাসিটিউক্যালস প্রথমে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি শুরু করলেও এখন রেনাটা, ইনসেপ্টা, টেকনোগ্রামের মতো চার-পাঁচটি কম্পানি ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করছে। যেগুলোর দাম বিদেশি ওষুধের তুলনায় অনেক কম।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘দেশের ওষুধগুলোর মান বিদেশিগুলোর মতোই। দেশীয় যে ওষুধের দাম ৭০০ টাকা সেই একই জেনেরিকের বিদেশি কোনো কম্পানির ওষুধের দাম তিন হাজার টাকা। তাই আমরা যেসব ওষুধ দেশে তৈরি হয় সেগুলোই প্রাধান্য দিয়ে থাকি।’

রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাগুফা আনোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ক্যান্সার রোগীর ওষুধ নিয়ে খুবই ঝামেলায় আছি। এমন অনেক রোগী আসে যাদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের অনুমোদন নেই সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে। কিন্তু ওই রোগীর চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে ওই ওষুধটি যেকোনোভাবেই হোক এনে চিকিৎসা দিতে হয়। আর অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রশাসনের লোকজন এসে অবৈধ ওষুধ বলে হয়রানির মুখে ফেলে দেয়। ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধের ক্ষেত্রে সরকারের আরো উদার হওয়া দরকার। তা না হলে রোগী মারা গেলেও আমাদের কিছু করার থাকবে না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা