kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

চট্টগ্রামে একে-২২সহ ৯ অস্ত্র ও বিস্ফোরক জব্দ, আটক ৮২

দুই কলেজে অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম   

১৯ মার্চ, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চট্টগ্রামে একে-২২সহ ৯ অস্ত্র ও বিস্ফোরক জব্দ, আটক ৮২

গতকাল অভিযানকালে চট্টগ্রামে মহসিন কলেজ-সংলগ্ন পাহাড়ের গুহা ও নালা-নর্দমায় তল্লাশি চালায় পুলিশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রামে দুটি সরকারি কলেজে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবরুদ জব্দ করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অভিযানকালে একটি একে-২২ রাইফেলসহ ৯টি অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়। অস্ত্র ও গোলাবরুদ ছাত্রাবাসের অদূরে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় ছিল। এ সময় কলেজের ছাত্রাবাস থেকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে ৭২ জনকে। হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ছাত্রাবাস থেকে জব্দ করা হয়েছে পেট্রল, বিস্ফোরক দ্রব্য ও হাতবোমা তৈরির সরঞ্জাম। কলেজের অদূরে পাহাড়ের গুহা থেকে ছাত্রশিবির সন্দেহে আটক করা হয়েছে ১০ জনকে। গত মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে গতকাল বুধবার বিকেলে প্রায় ৫টা পর্যন্ত টানা অভিযান চলে। দুটি কলেজই ছাত্রশিবিরের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। আটককৃত বেশির ভাগই দুই কলেজের ছাত্র।

একই রাতে রাজধানীর লালবাগ এলাকায় যুবদলের কেন্দ্রীয় এক নেতার বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৭৪টি হাতবোমা (ককটেল) জব্দ করেছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকও জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এ বিস্ফোরক দিয়ে প্রায় দেড় হাজার বোমা তৈরি করা যেত। বাসাটি যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নেওয়াজ আলীর। তবে অভিযানের সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। পুলিশ বাসার দুই কর্মচারীকে আটক করেছে। এ ছাড়া গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ১৮টি ককটেল উদ্ধার করেছে র‌্যাব।

চট্টগ্রাম কলেজ থেকে জব্দ করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে একটি একে-২২ রাইফেল, একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, তিনটি পিস্তল, তিনটি সিঙ্গেল ব্যারেল বন্দুক, একটি দোনলা বন্দুক, পাঁচটি রকেট ফ্লেয়ার, ৬১টি কার্তুজ ও ২৭টি গুলি। অস্ত্রগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে লেখা ব্যানার দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় ছিল।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপকমিশনার কুসুম দেওয়ান কালের কণ্ঠকে জানান, প্রথমে চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা ছাত্রাবাসে অভিযান চালানো হয়। রাতে সেখানে অভিযানকালে ৭২ জনকে শিবিরকর্মী সন্দেহে আটক করা হয়। ছাত্রাবাসের পাশে চট্টগ্রাম কলেজের স্টাফ কোয়ার্টারের অদূরে একটি গর্তে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় একে-২২ রাইফেলসহ ৯টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রাম কলেজের পর অভিযান চালানো হয় পাশের মহসিন কলেজের ছাত্রাবাসে। সেখানে অভিযানের সময় কলেজের অদূরে পাহাড়ের গুহা থেকে ১০ জনকে আটক করা হয়। মহসিন কলেজ থেকে পেট্রল, বিস্ফোরক দ্রব্য ও হাতবোমা তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া যায়। আটককৃতদের কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ থানা হাজতসহ বিভিন্ন থানায় রাখা হয়।

দুই কলেজে অভিযান এবং অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে সিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, 'গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দুই কলেজে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রসহ ৮২ জনকে আটক করা হয়। নিরীহ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে জন্য তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'

নগর পুলিশের কমিশনার আরো বলেন, একে-২২ রাইফেল সেনাবাহিনী ব্যবহার করে, 'ছাত্রাবাসে কেন এসব অস্ত্র আসবে? ছাত্রাবাস তো মিনি ক্যান্টনমেন্ট হতে পারে না। তাই কারা, কী উদ্দেশ্যে এসব অস্ত্র ছাত্রাবাসে এনেছে তা তদন্ত করে বের করা হবে।' ছাত্রাবাসে অস্ত্রশস্ত্র থাকায় এর সঙ্গে শিক্ষকদের সন্দেহ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'সন্দেহ করা হচ্ছে, শিক্ষকদের কেউ কেউ অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, না হলে ছাত্রাবাসে ভারী অস্ত্র আসবে কিভাবে? এই বিষয়গুলো তদন্ত পর্যায়ে বেরিয়ে আসবে।'

অভিযানে অংশ নেওয়া সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম তানভীর আরাফাত এবং কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার শাহ মো. আবদুর রউফ জানান, ছাত্রলীগ কলেজের হল দখল করতে পারে- এমন গুজব থেকে এবং নাশকতার জন্যই ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী ও সন্ত্রাসীরা ছাত্রাবাসে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয়। এর আগে ছাত্রাবাসগুলোতে একাধিকবার তল্লাশির কারণে দাগি আসামিরা হল ত্যাগ করলেও পরে তারা ফের ছাত্রাবাসে ফিরে আসে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান শুরুর পর সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হলো। অভিযানের সময় জামায়াতে ইসলামীর সংবিধান, ছাত্রশিবির নেতাদের ডায়েরিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে অস্ত্রশস্ত্র জব্দ এবং ছাত্রদের আটকের বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ জেসমিন আক্তার ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির প্রধান করা হয়েছে অধ্যাপক শাহেদা ইসলামকে।

অধ্যক্ষ জেসমিন আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, 'কলেজ ক্যাম্পাস থেকে অস্ত্র এবং ছাত্র আটকের বিষয়ে সার্বিকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়।'

অস্ত্রশস্ত্র জব্দের ঘটনায় হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ কর্তৃপক্ষও ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কলেজের অধ্যক্ষ অঞ্জন নন্দী বলেন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক তাহমিনা ইসলামকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে।

যুবদল নেতার বাসা থেকে বোমা-বিস্ফোরক জব্দ : যুবদল নেতা আলী নেওয়াজ থাকেন লালবাগ এলাকার জেএন সাহা সড়কের সাততলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশ ও র‌্যাব সেখানে যৌথ অভিযান চালায়।

লালবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় তালা ভেঙে ওই ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে বোমা ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরে ওই বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক বাদশা মিয়া (৪৪) ও দারোয়ান মোহাম্মদ আনিসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। যুবদল নেতাকে পাওয়া যায়নি। তাঁকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।

গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, যুবদল নেতার বাসা থেকে জব্দ করা বিস্ফোরক দিয়ে দেড় হাজার বোমা তৈরি করা সম্ভব। সেখান থেকে ৭৪টি হাতবোমাও জব্দ করা হয়েছে। এগুলো চলমান নাশকতায় ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত বাসাটি বোমা তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে আটককৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।

অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাব-১০-এর অপারেশন অফিসার (এএসপি) খায়রুল আলম জানান, যুবদল নেতার বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরেই বোমা তৈরি করে নাশকতায় ব্যবহার করা হতো বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া গতকাল ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন তিন নেতার মাজারের সামনে থেকে ১৮টি ককটেল উদ্ধার করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সহকারী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাকসুদুল আলম বলেন, র‌্যাব-৩-এর টহলদল পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেলগুলো উদ্ধার করে।

মন্তব্য