kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

খালেদাকে গ্রেপ্তার না করার পেছনে আদালতের চেয়ে রাজনীতিই মুখ্য

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ মার্চ, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খালেদাকে গ্রেপ্তার না করার পেছনে আদালতের চেয়ে রাজনীতিই মুখ্য

বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দৃশ্যত 'শেষের খেলা' শুরু হলেও তা শেষ হতে সময় লাগবে। গত দুই মাসের রাজনৈতিক বাদানুবাদ এখন চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছে। জনগণ ভাবছে যেকোনো মুহূর্তে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হতে পারেন; কিন্তু সরকার গ্রেপ্তার করে খালেদাকে 'গণতন্ত্রের প্রতীক' বানাতে চায় না। এ জন্য আদালতের অপেক্ষায় আছে সরকার। যদিও খালেদাকে গ্রেপ্তার না করার পেছনে আদালতের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে বিরোধী পক্ষের মধ্যপন্থীরা দিন দিন নীরব হয়ে যাওয়ায় উগ্রপন্থীরা সে জায়গা নিচ্ছে এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি আমেরিকান-বাংলাদেশি ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার মধ্য দিয়ে তারা সেই বার্তাটি দিয়েছে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের 'বাংলাদেশে রাজনীতি : উত্তপ্ত কড়াই' (দি পলিটিকস ইন পলিটিকস : অন দি বয়েল') শিরোনামে একটি নিবন্ধে এসব মন্তব্য করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, 'শেষ পর্বের খেলা হয়তো শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু এ সপ্তাহে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, খেলা শেষ হতে সময় নেবে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অনেক মানুষই ধারণা করেছিল, এ সপ্তাহে তাঁকে পুলিশ গ্রেপ্তার করবে। খালেদা জিয়া শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীই নন, তিনি কার্যত তাঁর সরকারের সর্বশেষ প্রতিপক্ষ।

দুই মাস ধরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী যখন মুখোমুখি অবস্থানে চরম উত্তেজনায় পৌঁছেছেন, তখন মানুষ এ প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছে যে, শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে জেলে ভরার উপায় খুঁজে পাবেন কি না। বরং মানুষের এখন প্রশ্ন, তা কখন ঘটবে। গত ৪ মার্চ একটি আদালত জবাব দিয়েছেন, এখনই নয়। আদালত মামলাটির শুনানি এক মাসের জন্য স্থগিত করেছেন।'

নিবন্ধটিতে আরো বলা হয়, 'গ্রেপ্তার করা থেকে খালেদা জিয়াকে এই সাময়িক অবকাশ দেওয়ার পেছনে সম্ভবত বিচারিক বিবেচনার চেয়ে রাজনীতির প্রশ্নই বেশি জড়িত। ৪ মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জল্পনা-কল্পনা ছিল। কিন্তু এর এক দিন আগে সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, তুরস্কসহ ৯টি দেশের কূটনীতিকরা তাঁর কার্যালয়ে হঠাৎ উপস্থিত হন। কার্যালয়ের সামনে পুলিশ দুই মাস ধরে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। কূটনীতিকদের সফরে সম্ভবত সরকারের উপলব্ধি হয়েছে যে, যদি ৬৯ বছরের এই নারীকে অন্যায়ভাবে কারাগারে পাঠানো হয়, তাহলে এটা কার্যত খালেদা জিয়াকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হতে সহায়তা করবে। এর পরিবর্তে সরকার খালেদা জিয়ার বিচার প্রক্রিয়ার শেষ হওয়া পর্যন্ত নিজেদের তুষ্ট রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। সর্বোপরি খালেদা জিয়া যদি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তাঁকে আজীবন কারাগারেই বন্দি থাকতে হবে।

খালেদা জিয়া একদিকে যেমন অনানুষ্ঠানিক আটকাবস্থায় রয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর মাথার ওপর এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঝুলছে। তিনিই একমাত্র উল্লেখ করার মতো ব্যক্তি, যিনি এখনো কারারুদ্ধ নন। গত কয়েক মাসে দলটির অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাউকে জেলে পাঠানো হয়েছে, কাউকে গৃহবন্দি করা হয়েছে অথবা কেউ নির্বাসনে রয়েছেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আটক করেছে, যিনি নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করছিলেন। এই সময় কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ আদালত জামায়াতে ইসলামীর প্রধান নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, যে দলটি নির্বাচনে বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং বাংলাদেশে তৃতীয় বৃহত্তম দল। এই সময়ে রাজপথের সহিংসতায় নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১২০ জন। এর বেশির ভাগই নিহত হয়েছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নিক্ষেপ করা পেট্রলবোমায়। অন্যরা নিহত হয়েছে পুলিশের গুলিতে।

নিবন্ধে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্য কোনো নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনুকূল নয়। খালেদা জিয়া ও তাঁর প্রবীণ উপদেষ্টাদের দেখে মনে হচ্ছে, অচলাবস্থার তীব্রতা তাঁরা উপভোগ করছেন। বিরোধীপক্ষের তুলনামূলক উদারপন্থী নেতাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। আর জায়গা খালি হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের জন্য, যারা ক্রমবর্ধমান হুমকি প্রদর্শন করছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আমেরিকান-বাংলাদেশি এক লেখককে রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করে তারা সেই বার্তাটি দিয়েছে।

চলমান পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে কোনো শান্তিপূর্ণ পথ পাওয়া যাবে কি না এটি এখনো পরিষ্কার নয়। খালেদা জিয়ার উপদেষ্টারা মনে করছেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন একটি সম্ভাব্য পথ। কিন্তু শেখ হাসিনার উপদেষ্টারা জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপিকে ২০১৯ সালের পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আবার অন্য পক্ষগুলো মনে করে পরিবর্তন আসন্ন। তারা মূলত তৃতীয় শক্তি বলতে সেনাবাহিনীকেই নির্দেশ করে থাকে।

দেশটির তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি আংশীদাররা যেমন আমেরিকা, ভারত ও সৌদি আরব বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আবারও প্রত্যক্ষভাবে ভেঙে পড়তে দেখে খুশি হবে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শিগগিরই বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। তিনি হয়তো ইসলামী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থানের কারণে তাঁকে নৈতিক সমর্থন দিতে পারেন। তবে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে যতটা সম্ভব স্থিতিশীল ও সহনীয় দেখতে চাইবেন। সাধারণত সফররত একজন ভারতীয় নেতা এ ধরনের সফরে অন্তত প্রধান বিরোধী নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা করেন। তবে এবার তা জটিল বলে প্রমাণিত হতে পারে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা