kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের চিঠি

উমেদার উচ্ছেদে এবার অভিযান শুরু হচ্ছে

আপেল মাহমুদ   

৭ মার্চ, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভূমি অফিসের 'বহিরাগত কর্মী' যাঁরা উমেদার হিসেবে পরিচিত, তাঁদের উচ্ছেদের জন্য অচিরেই অভিযান শুরু করবে ঢাকা জেলা প্রশাসন। সরকারি চাকরি না করেও তাঁরা অফিসে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসেন এবং সেবাপ্রার্থীদের কাছে তাঁরা নিজেদের অফিসের কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। উমেদার হিসেবে কাজ করার অন্তরালে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ নথি জালিয়াতি, দাগ-খতিয়ান নম্বর কারসাজিসহ ঘুষ আদায়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন- এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শুধু উচ্ছেদই নয়, তাঁদের গ্রেপ্তারের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে বলে ঢাকা জেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ভূমি অফিসে কর্মরত উমেদারদের বিরুদ্ধে তাদের দপ্তরে একাধিক অভিযোগ এসেছে। এমনকি ওই বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নামজারি কিংবা খাজনা দিতে গিয়ে উমেদারদের হাতে প্রতারিত হয়েছেন কিংবা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিকার চাওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ গত বছর ৭ জুলাই উমেদারদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানা যায়নি।

ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অচিরেই ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঢাকা জেলার সব এসিল্যান্ড অফিসে উমেদার উচ্ছেদ করার জন্য লিখিতভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত সে চিঠিতে বলা হয়েছে, এসিল্যান্ড ও তাঁদের নিয়ন্ত্রিত তহশিল অফিসে কর্মরত উমেদাররা যাতে আর কাজ করতে না পারে তা নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসনকে জানানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। ঢাকার ১৬টি এসিল্যান্ড অফিসে গত মাসের ২৮ তারিখে প্রেরিত চিঠিতে আরো বলা হয়, 'জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আওতাধীন সব এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার, ভূমি) অফিসে কর্মরত উমেদাররা নামজারি জমাভাগসহ ভূমি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ভূমি প্রশাসনের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন্ন করছেন বলে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে।' এসব এসিল্যান্ড অফিস ছাড়াও ঢাকা জেলার তহশিল অফিসে কমপক্ষে ৫০০ উমেদার রয়েছেন, যাঁদের অধীনে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাউট-দালাল কাজ করে। তাদের বেশির ভাগই ঘুষ ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত।

এ চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আবুল ফজল মীর কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এ চিঠি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এসিল্যান্ডদের তাঁদের কার্যালয় থেকে উমেদার উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা ব্যর্থ হলে উমেদারদের বিরুদ্ধে আমরাই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। একই সঙ্গে কোনো কোনো উমেদার জালিয়াতি এবং হয়রানির সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।' কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা জেলার প্রতিটি এসিল্যান্ড ও তহশিল অফিসে শুরু থেকেই উমেদারদের উপস্থিতি রয়েছে। এমন অনেক তহশিল অফিস রয়েছে, যেখানে কর্মচারীদের চেয়ে উমেদারদের সংখ্যা বেশি। অনেক অফিসে কর্মচারীরা যায়-আসে, কিন্তু উমেদাররা রয়ে যায়। মোহাম্মদপুর তহশিল অফিসের সবচেয়ে প্রবীণ উমেদার আবুল হাসেম বলেন, 'সবাই নয়, কেউ কেউ জালিয়াতি কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ৪০ বছর ধরে উমেদারের কাজ করেও কোনো চাকরি পাইনি। এখন ছেলেরা উমেদারের কাজ করছে। তারা চাকরি পাবে কি না জানি না।' উমেদার হারুন বলেন, 'পেটের দায়ে কাজ করি, কোনো খারাপ কাজ করি না। কেউ জালিয়াতি কিংবা সরকারি নথি ছেঁড়ার সঙ্গে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।'

জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে উমেদারদের একটি তালিকা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সে তালিকা অনুযায়ী ঢাকায় এমন অনেক উমেদার রয়েছেন, যাঁরা একাধিক বাড়ি-গাড়ির মালিক। এসিল্যান্ডদের চেয়েও তাঁদের আয়-রোজগার বেশি। তেজগাঁও এসিল্যান্ড অফিসে কর্মরত ছোট সোলেমান, মিরপুর এসিল্যান্ড অফিসে কর্মরত লায়েক ও সামসু, ডেমরা তহশিল অফিসের মনির, ক্যান্টনমেন্ট এসিল্যান্ড অফিসে কর্মরত মজিবুর, নন্দীপাড়া তহশিল অফিসের বড় হালিম- এদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণসহ একাধিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ রয়েছে। ফারসি 'উম্মিদ' থেকে উমেদার শব্দের উদ্ভব ঘটেছে। এর আভিধানিক অর্থ হলো- 'চাকরি প্রত্যাশী হিসেবে কালেক্টরেট, কোর্ট-কাচারি ও ভূমি অফিসে অবৈতনিক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীবিশেষ'। মুঘল আমল থেকেই এ শ্রেণির কর্মচারীর উদ্ভব ঘটেছে। শুধু জেলা প্রশাসনই নয়, জজকোর্ট, কাস্টমস, পোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে উমেদার রয়েছেন। ঢাকা জেলা প্রশাসনে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে উমেদারদের একটি স্বীকৃতি ছিল। তাঁদের মধ্য থেকে বাছাই করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর চাকরি দেওয়া হতো। এ জন্য প্রতিটি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে একটি ফাইল রাখার বিধান ছিল। তেমনি একটি ফাইল ঢাকা জেলা প্রশাসনে ছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে একজন ডিসি সে ফাইল ছিঁড়ে ফেলেন। ভূমি অফিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মচারী দাবি করেন, উমেদাররা চাকরি না করলেও তাঁরা ভূমি অফিসের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে তাঁদের মধ্যে দুই-চারজন উমেদার যে অসৎ কাজে লিপ্ত নেই, সে কথা বলা যাবে না।'

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা