kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অবরোধের দুই মাস

ক্রেতাদের অস্বস্তি বাড়েনি নিত্যপণ্যের বাজারে

রাজীব আহমেদ   

৭ মার্চ, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্রেতাদের অস্বস্তি বাড়েনি নিত্যপণ্যের বাজারে

অবরোধের কারণে ভারত থেকে গরু আমদানি কমে গেছে। এ কারণে দাম বেড়েছে গরুর মাংসের। ঢাকার বাজারে কেজিপ্রতি গরুর মাংস ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অবরোধ শুরুর আগে যা ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। এখন প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ৪০-৫০ টাকা।

গত ৫ জানুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত দুই মাসের অবরোধ ও মাঝেমধ্যে ডাকা হরতালে অস্থির হয়েছে কেবল গরুর মাংসের দাম। আরো কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে, তবে তাতে অবরোধের সংযোগ সীমিত। বরং মৌসুমের কারণে কিছু পণ্যের দাম ওঠানামা করেছে।

সব মিলিয়ে গত দুই মাসে নিত্যপণ্যের বাজারে গিয়ে স্বস্তিই পেয়েছে ক্রেতারা। ভরা মৌসুমের কারণে সবজি ও মাছের দাম তুলনামূলক কম ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারদর পড়তির দিকে থাকায় ভোজ্য তেল, আটা, চিনি ও গুঁড়ো দুধের দাম বাড়েনি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবরোধের প্রথম দিকে ট্রাকভাড়া অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল, তবে কৃষক ও আমদানি পর্যায়ে পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব সীমিত ছিল। এতে ক্রেতারা উপকৃত হয়েছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উৎপাদনকারী কৃষক।

গত ৫ জানুয়ারি দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। ৬ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত তাদের সেই কর্মসূচি চলছে। ৫ জানুয়ারি ও ৫ মার্চ বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সংসারে বেশি প্রয়োজন হয়- এমন পাঁচটি পণ্যের দামে বেশি হেরফের হয়েছে। ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, আলু, গুঁড়ো দুধ ও গরুর মাংস- এ পাঁচ পণ্যের মধ্যে দুটির দাম বেড়েছে, তিনটির কমেছে। গরুর মাংসের দামের সঙ্গে অবরোধের সংযোগ থাকলেও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ অন্য।

প্রধান খাদ্যের মধ্যে মোটা চালের দাম কেজিতে এক টাকা বেড়েছে, আটার দাম কেজিতে কমেছে এক টাকা। সবজি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও ডালের দাম অবরোধ শুরুর আগে যা ছিল, এখনো তেমনই আছে; বড় হেরফের হয়নি।

ব্যবসায়ীরা বলছে, টানা অবরোধে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল। পাশাপাশি চাহিদা কম থাকায় দাম বাড়তে পারেনি।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ভলান্টারি কনজ্যুমার ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক মো. খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এ বছর সবজির ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদরও কমতির দিকে। ফলে পণ্যের দাম বাড়েনি।'

খলিলুর রহমান মনে করেন, অবরোধে সরবরাহ যেমন কমেছে, তেমনি চাহিদা কমে গেছে। এতে চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য আসায় বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। চাহিদা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি সামাজিক অনুষ্ঠান কমে যাওয়া, খাবার হোটেলগুলোতে বিক্রি কমে যাওয়া ও মানুষের আয় কমে যাওয়াকে উল্লেখ করেন।

অবরোধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে ভোজ্য তেলের দাম। খোলা সয়াবিন তেল লিটারে ছয় থেকে আট টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারে চার টাকা কমেছে। শীতে পাম তেলের চাহিদা কম থাকায় দামে তেমন কোনো হেরফের হয়নি।

চালের জন্য ঢাকাবাসী উত্তরবঙ্গের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে অবরোধে ট্রাক ভাড়া বেশি বেড়েছে। এ কারণে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম এক টাকা বেড়েছে। সরু চাল মিনিকেট ও কয়েকটি মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা বাড়লেও এর সঙ্গে অবরোধের সম্পর্ক কম। মৌসুম শেষ হওয়ায় এর দাম বেড়েছে। গত আমনের সরু জাতের নাজিরশাইল চাল আসায় দাম কমেছে কেজিতে চার টাকা মতো। সব মিলিয়ে চালের বাজারে ভারসাম্য রয়েছে। সরু চাল কেজিপ্রতি ৪৪ থেকে ৫২ টাকা ও মাঝারি মানের চাল ৩৮ থেকে ৪৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

গত ৫ জানুয়ারির তুলনায় প্যাকেটজাত আটার দাম কেজিতে এক টাকা কমেছে, খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে আগের মতো ৩০ টাকাতেই। প্রতি কেজি চিনি ৪২ থেকে ৪৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে এক বছর ধরে। অবরোধের আগ থেকেই দেশি মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১১৫ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৫ টাকা বেড়েছিল। এর কারণ ছিল মজুদ শেষ হয়ে যাওয়া। নতুন মৌসুমের দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করায় দাম আবার কমছে।

নতুন মৌসুমের আদা, হলুদ, রসুন বাজারে আসতে শুরু করেছে। সেগুলোরও দাম কমছে। তবে এখনো বাজারে থাকা গত মৌসুমের কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। যেমন- নতুন দেশি রসুনের কেজি ৭০ টাকা; কিন্তু চীনা রসুন কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে। জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ ও এলাচের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিক্রেতাদের দাবি, অবরোধের কারণে ভারত থেকে আমদানি কমে যাওয়ায় এসব মসলার দাম কিছুটা বেড়েছে।

মাছ ও সবজির দামে স্বাভাবিক ওঠানামা আছে, তবে অবরোধের কারণে বড় ধরনের দাম বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেনি। তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ, রুই, ইলিশ ইত্যাদি বহুল বিক্রীত মাছের দাম আগের মতোই আছে। বেশির ভাগ সবজির দাম অবরোধের শুরুতে ২০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে ছিল, এখনো তেমনই আছে। তবে নতুন গ্রীষ্ম মৌসুমের সবজির দাম কিছুটা বেশি।

পুরো দুই মাস ফার্মের মুরগির ডিম হালিপ্রতি ৩০ টাকার কাছাকাছি ছিল। ব্রয়লার মুরগির দামে বড় হেরফের হলেও তা জানুয়ারির শুরুর দিকের চেয়ে বেশি হয়নি। বিভিন্ন কম্পানি বেশ কিছুটা কমিয়েছে গুঁড়ো দুধের দাম।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেলের গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও কাস্টমসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অবরোধের দুই মাসে নিত্যপণ্য আমদানি স্বাভাবিক ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারদরও স্থিতিশীল। সরবরাহ পরিস্থিতির দিকে সরকার নজর রাখছে। এসব কারণেই পণ্যের দাম বাড়েনি।'

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা