kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

সাঈদীর চাঁদে আরোহণের বর্ষপূর্তি আজ!

জামায়াতের কর্মসূচি নেই বিচার হয়নি সহিংসতার

রাজীব আহমেদ    

৩ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাঈদীর চাঁদে আরোহণের বর্ষপূর্তি আজ!

আমেরিকানরা চাঁদে গিয়েছিল ১৯৬৯ সালে। ২০ সেপ্টেম্বর আমেরিকাবাসী চন্দ্রজয়ের ৪৫ বছর পূর্তি পালন করবে। এরপর এখন পর্যন্ত আর কোনো দেশের লোকজনের সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। শুধু সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশের পিরোজপুরের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বা ‘দেইল্লা রাজাকারের’। মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির রায় হওয়ার পর গত বছর ২ মার্চ রাতে জামায়াত-শিবির সাঈদীকে চাঁদে দেখার খবর রটিয়ে দেয় সারা দেশে। আজ সাঈদীর সেই চন্দ্রাভিযানের এক বছর পূর্তি হলো।
সাঈদীকে চাঁদে দেখতে পাওয়ার ‘আজগুবি গল্পটি’ শুরুতে ধর্মান্ধ কিছু লোককে বিশ্বাস করাতে সমর্থ হয়েছিল জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং অশিক্ষিত লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে থানায় হামলা করে, সরকারি কার্যালয় পুড়িয়ে, পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দিয়ে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল জামায়াত-শিবির। সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার কথা বলাকেও এখন সাধারণ মানুষ ‘কুফরি’ বলে মনে করে। খোদ শিবিরের কর্মীরাই বিশ্বাস করে না এই তথ্য। জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো সাঈদীকে চাঁদে দেখার বিষয়টি সত্যি বলে দাবি করা হয়নি। পত্রিকার খবর, সাঈদী নিজেও এটি বিশ্বাস করেননি। কিন্তু সেই গল্প ফেঁদে চালানো নজিরবিহীন সহিংসতায় ৬৭ জন নিহত হয়েছিল।
সাঈদীর চন্দ্রাভিযানের বর্ষপূর্তি হলেও জামায়াত-শিবির দিবসটি পালনের কোনো আয়োজন করেনি। রবিবার রাতে কোনো দোয়া-মাহফিলের কথাও জানা যায়নি। অন্যদিকে ওই সময় সহিংসতাকারীদের বিচার হয়নি এখনো। অভিযুক্তরা জামিনে বেরিয়ে গেছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ফাঁসির রায় হয় জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর। ওই দিনই জামায়াত-শিবিরের সহিংসতায় তাদের কর্মীসহ সারা দেশে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়। পরের কয়েক দিন দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছিল। রায়ের পরদিন শুক্রবার নিহত হয় তিনজন ও শনিবার ছয়জন।
রবিবার থেকে শুরু হয় জামায়াতের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল। হরতালের আগের দিন রাতে দেশজুড়ে মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে, গভীর রাতে ফোন দিয়ে সাঈদীর মুখ চাঁদে দেখা গেছে বলে প্রচার করা হয়। মসজিদের মাইক ব্যবহার করে বলা হয়, ‘চাঁদের গায়ে সাঈদীর মুখ দেখা যাচ্ছে। তার মানে, তিনি ইমানদার লোক। তাঁকে বাঁচানো সবার ইমানি দায়িত্ব।’ ফলে ভোররাতে চাঁদ দেখতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ। তাদের উত্তেজিত করে হামলা চালানো হয় থানাসহ সরকারি দপ্তরে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছিল বগুড়ায়। সেখানে পাঁচটি থানা ও ছয়টি পুলিশ ফাঁড়িতে একযোগে হামলা করা হয়। কয়েকটি ফাঁড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রাণ নিয়ে পালান পুলিশ সদস্যরা। নন্দিগ্রাম উপজেলায় উপজেলা পরিষদ ভবনের ১৬টি অফিস, থানা ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। ওই দিন সারা দেশে নিহত হয় ২২ জন। সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত পাঁচ দিনে ৬৭ জন নিহত হয়।
সাঈদীর মুখ কবে চাঁদে দেখা গিয়েছিল তা নিয়ে মতান্তরও আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘শিবির পরিচালিত’ পেইজ বাঁশের কেল্লায় ২ মার্চ রাতের দুই দিন আগে থেকেই সাঈদীর মুখসহ চাঁদের ছবি প্রচার করা হচ্ছিল। ফটোশপের মাধ্যমে সম্পাদনা করে চাঁদের বুকে সাঈদীর মুখ সেঁটে দেওয়া সেই ছবি দ্রুতই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। আর দেশজুড়ে ২ মার্চ রাতে সাঈদীকে চাঁদের বুকে দেখা যাওয়ার গুজব ছড়ানো হয়।
অবশ্য জামায়াত কেন্দ্রীয়ভাবে কখনো সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সত্যি বলে দাবি করেনি। গতকাল বা আজ সোমবার তাদের এ নিয়ে কোনো কর্মসূচি ছিল বা আছে কি না জানতে চাইলে জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর এক নেতা বলেন, এ নিয়ে তাঁদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘সাঈদী সাহেবকে চাঁদে দেখার ঘটনা উদ্ভট ও কাল্পনিক। কে বা কারা এ প্রচার চালিয়েছিল তা আমাদের জানা নেই। সাঈদী সাহেব নিজেও এ ঘটনাকে উদ্ভট ও কাল্পনিক বলে মনে করেন।’
এ নিয়ে যে নজিরবিহীন সহিংসতা হয়েছিল তা এখনো ভোলেনি বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ। তবে ওই ঘটনায় দায়ের করা শত শত মামলার একটিরও বিচার হয়নি। আসামিদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে গেছে।
সাঈদীর ফাঁসির পরে সহিংসতার ঘটনায় ৬০টি মামলা হয়েছিল। অধিকাংশ মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। ৩ মার্চের পর জামায়াত ও শিবিরের প্রায় ২০০ নেতা-কর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল, যার ২০ জনের মতো এখনো কারাগারে আছে। অন্যরা জামিনে মুক্ত।
সাঈদীকে চাঁদে দেখার ঘটনাকে কুফরি বলে অভিহিত করেছিলেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। তখন কালের কণ্ঠকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন। যারা চাঁদে সাঈদীর চেহারা দেখার অপপ্রচার করছে তারা কি সাঈদীর শরীর দ্বিখণ্ডিত দেখতে চায়? নবী করিম (সা.)-সহ এখন পর্যন্ত কোনো নবী, রাসুল ও সাহাবাদের প্রতিচ্ছবি চাঁদে দেখা যায়নি। চাঁদে প্রতিচ্ছবি দেখা যদি পবিত্রতার পরিচয় হতো, তাহলে তাঁদের ছবিই দেখা যেত।’
২৮ ফেব্রুয়ারি ফাঁসির রায়ের পর এক বছর পেরিয়ে গেছে। এখন আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়ে সাঈদীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি। অবশ্য এর মধ্যে জামায়াতের নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

 

মন্তব্য