kalerkantho

সোমবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৭ । ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৩ সফর ১৪৪২

রাস্তার জন্য ডাক্তার দরকার

১০ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



রাস্তার জন্য ডাক্তার দরকার

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের অধ্যাপক শামছুল হক। দেশের পরিবহন প্রকৌশল (ট্রান্সপোর্ট ইঞ্জিনিয়ারিং) গবেষণায় এক উজ্জ্বল নাম। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কুড়িল ইন্টারচেঞ্জসহ বিভিন্ন উড়াল সেতুর পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল প্রকল্পের ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ও কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনালের মাস্টারপ্ল্যানারও তিনি। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যানসহ সরকারের নানা উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এ প্রকৌশলীর মুখোমুখি হয়েছেন পার্থ সারথী দাস।

ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

আপনার জন্ম তো রংপুরে?

আমার জন্ম ১৯৬২ সালের ১ মে রংপুর সদরে। আমার বাবা মো. ইছমত আলী, মা রেজিয়া বেগম। বাবা বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তরে কাজ করতেন। পেশাগত কারণে বাবা বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করতেন। আমাদের মূল বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার শাখতলা গ্রামে।  তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়।

 

শৈশব কেমন কেটেছে? বিশেষ কোনো স্মৃতি?

ঢাকার মতিঝিল এজিবি কলোনিতে বড় হয়েছি। জীবনের সুন্দর সময় কেটেছে ওখানে। ওখানে বারবার যাই। কিন্তু আগের সেই মাঠ নেই। বড় ভবন উঠেছে সেখানে। আগের মতো কোনো কিছুই নেই। সবাই মিলে আমরা যেন একটি বড় পরিবার ছিলাম কলোনিতে। বড়দের প্রতি আলাদা শ্রদ্ধাবোধ ছিল। অনেক ছোট ছোট সুখময় স্মৃতির কথা মনে পড়ে। হেসেখেলে সময় চলে যেত। কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না মনে। তখন বন্ধুর অভাব ছিল না। এখন জীবন গণ্ডির মধ্যে চলে এসেছে। তখন তো বাধাহীন ছোটাছুটি ছিল আমাদের। আমি পাঁচ থেকে ১৬ বছর বয়সের সময়গুলোর কথা বলছি।

 

ছোটবেলার স্বপ্ন কী ছিল?

বিজ্ঞানী হওয়ার শখ ছিল। সেটা স্বপ্নও ছিল। কারণ আমি সব সময় নতুন কিছু উদ্ভাবনের কথা ভাবতাম। পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অঙ্ক করতাম নিজে নিজে। কোনো গৃহশিক্ষক ছিলেন না। নিজে নিজে ছোট ছোট উদ্ভাবন করতাম। কেউ শেখাত না। আমিই সমাধান করতাম। নিজে দ্রুততম সময়ে কোনো কিছু উদ্ভাবন করতাম। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ত।

 

আপনার স্কুলজীবন?

আমি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। তারপর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৭১ সালের পর সম্ভবত ১৯৭২ সালের দিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেখান থেকেই ১৯৭৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করি। আমি সব কিছু তাড়াতাড়ি বুঝতে পারতাম। ম্যাট্রিকে পাঁচটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই। শুধু বাংলায় লেটার মার্কস পেলাম না। আমাদের কাছে এই রেজাল্ট ছিল বিরাট প্রাপ্তি। তখন আমার ভেতর দায়িত্ববোধের চাপও তৈরি হলো। আমাকে আরো ভালো করতে হবে। বলা যায়, ওই রেজাল্ট আমার জীবনের ভিত রচনা করল। তখন পরিবার আর্থিক সংকটে। ফলে আমাকে দায়িত্ব নিতে হলো।

 

পড়াশোনায় নিশ্চয়ই খুব মনোযোগী ছিলেন?

না। ছোটবেলায় মোটেও মনোযোগী ছিলাম না পড়াশোনায়। খেলাধুলাই বড় নেশা ছিল। কখন সময় চলে যেত বুঝতে পারতাম না। দুপুরবেলায়ও খেলতাম। পড়াশোনায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অমনোযোগী ছিলাম। বরাবরই ব্যাকবেঞ্চার ছিলাম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আমি মনোযোগী হয়ে উঠি।

 

এই মনোযোগী হয়ে ওঠার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ঘটনা আছে?

হ্যাঁ ছিল। একটি ঘটনাই সব বদলে দিল। এরপর বন্ধুরা ডাকলেও খেলার জন্য যেতাম না। বসে থাকতাম। সেই ক্ষোভ থেকে পথে বন্ধুরা আমাকে ল্যাং মেরে ফেলে দিত। কারণ আমি তাদের গোলকিপার ছিলাম; কিন্তু আমাকে তারা পেত না। গোলকিপার না পেয়ে তারা রাগে এসব আচরণ করত। আমি আসলে বদলে গেলাম। বলা যায় আমূল বদলে গেলাম। এর পেছনে ঘটনাটি হলো অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার বোন রোকেয়া বেগম আমাকে একটি পাইলট কলম দিয়েছিলেন। সেটি আমি হারিয়ে ফেলি। আমার ওই বোন আমাদের মানুষ করেছেন। তিনি ছিলেন অন্যতম অভিভাবক। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া কলম হারানোর পর আমি ভাবছিলাম বড় বোনকে কী জবাব দেব? এই অনুশোচনায় দগ্ধ হওয়ার পর বদলে যাই। শান্ত হয়ে যাই। পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠি। আগে তো আমার রোল নম্বর থাকত ২৭-২৮ ক্রমিকে। অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উঠতে গিয়ে দেখি আমার রোল দুই হয়েছে। স্যাররা বাবাকে বলতেন, ওর নম্বর তো কাটাই যায় না। সেটি আমি শুনতাম।

 

উচ্চ মাধ্যমিকে পড়লেন কোথায়?

নটর ডেম কলেজে সুযোগ পেয়েও ভর্তি হলাম না। কারণ দিনের বেলা আমাকে টিউশনি করাতে হতো। একেক করে তিনটি ব্যাচ পড়াতে হতো। কাজেই আমার লক্ষ্য ছিল এমন কলেজে পড়তে হবে, যেখানে নাইট শিফট আছে। আমি ভর্তি হলাম টিঅ্যান্ডটি কলেজের নাইট শিফটে। সেখানে রাতে ক্লাসে যা শিখতাম, পরদিন দিনের বেলায় তা-ই ছাত্রদের পড়াতাম। সময়টা ১৯৭৭-৭৮ সাল হবে। আমি যে ক্লাসে পড়তাম, সেই ক্লাসের ছাত্রদেরই প্রাইভেট পড়াতাম। যখন উচ্চ মাধ্যমিক ফার্স্ট ইয়ারে পড়েছি তখন ফার্স্ট ইয়ারের এবং সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রদের পড়াতাম। তখন রাতে লোডশেডিং হতো। টিঅ্যান্ডটি কলেজের শিক্ষকরা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে থাকতেন। কিন্তু আমি তাঁদের কাছে গিয়ে বলতাম একটু শিখিয়ে দেওয়ার জন্য। কারণ পরদিনই আমাকে পাঠদান করতে হবে। টিঅ্যান্ডটি কলেজে নাইট শিফটে শিক্ষকতা করতেন নটর ডেম কলেজ, শাহীন স্কুলের শিক্ষকরাও। শাহীন স্কুলের এক শিক্ষক গণিত পড়াতেন। লোডশেডিংয়ের জন্য ক্লাস না হলে আমি ওই শিক্ষকের কাছে গিয়ে গণিত শিখতাম। তিনি একদিন জানতে চাইলেন কেন শিখতে হবে আজই, কিসের এত তাড়া? আমি যখন বললাম, আমি টিউশনি করাই, তাতে তিনি বিস্মিত হন। একই সঙ্গে উৎসাহ দেন। আমাকে শিখিয়ে দিতেন। পরদিন গিয়ে তিনটি ব্যাচ পড়াতাম। আর ওই শিক্ষক ছিলেন একজন চমৎকার মানুষ। বিদ্যুৎ না এলেও তিনি গণিতের পাঠদান করাতেন আমাকে। ইন্টারমিডিয়েট থেকে বুয়েটে অধ্যয়নকালে তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত আমি টিউশনি করাতাম। টিউশনি আসলে আমাকে করাতে হয়েছে। সেটি পারিবারিক অবস্থার কারণে। আমি পরিবারকে সাপোর্ট দিয়েছি; কিন্তু রেজাল্টে আমি কম্প্রোমাইজ করতে চাইনি। তখন আমার অনেক ছাত্র ছিল। আমি ইন্টারমিডিয়েটে তিনটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই।

 

পরে তো বুয়েটে ভর্তি হলেন। এখানে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন ছিল?

মতিঝিল এজিবি কলোনিতে কয়েকজন বড় ভাই বুয়েটে পড়তেন। তাঁরা ছিলেন খুবই ভদ্র। ১৯৬৭-৬৮ সালের কথা। শীতকালে রাতে মাদুরে বসে তারা গ্রুপ স্টাডি করতেন। সেখানে বাইরে থেকে আসতেন আরো তিনজন। তখন তাঁদের কাছে থাকত স্লাইড ক্যালিপার্স। এটি ক্যালকুলেটরের মতো হিসাব কষার কাজে ব্যবহার করা হতো। সেই স্লাইড ক্যালিপার্সে তাঁরা টিপতে থাকতেন, হিসাব কষতেন। আমি দেখতাম। আমি অঙ্ক করা পছন্দ করতাম। সেই দৃশ্য আমি তাই মনের মধ্যে গেঁথে রাখি। বলা যায়, তাঁদের সেই গ্রুপ স্টাডি আমাকে খুবই আকৃষ্ট করে। তখন আমার মনে বুয়েটে পড়ার স্বপ্নের বীজ বপন হয়। ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্টের পর আমার হয়ে গেল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ। কিন্তু ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাব, সেখানে কী রকম পরিবেশ—সব কিছু ভেবে বড়দের কাছে জানতে চাই কী করব। তখন বুয়েটেও পরীক্ষা দিয়েছি। বুয়েটে ভর্তি নিয়ে একটি কাহিনিও আছে।

 

ভর্তির কাহিনিটি কী?

বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা বেশ কঠিন হয়েছিল। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাই রেজাল্টটিও দেখতে যাইনি। অন্যদের জানতে বলেছিলাম। আমাদের এজিবি কলোনি থেকে সাতজন পরীক্ষা দিয়েছিল। তারা জানাল আমার হয়নি। আমার নম্বর নোটিশ বোর্ডে নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম ময়মনসিংহ মেডিক্যালে ভর্তি হব। কিন্তু একজন বলল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য। আমি সে অনুসারে প্রস্তুতি নিই। কার্জন হলের সামনে দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ভর্তি পরীক্ষার ফরম কিনতে রওনা দিলাম। দেখি, বেশ আগেভাগে এসে গেছি। এ সময় এশিয়া কাপ ফুটবল চলছিল দেশে। জমজমাট আয়োজন। বুয়েটের মাঠে আমি দেখেছিলাম জাপানিরা প্র্যাকটিস করছে। আমি সময় কাটানোর জন্য বুয়েটের মাঠের দিকে যাই। মনে মনে ইচ্ছা সেই জাপানিদের দেখা পাওয়া। ফরসা চেহারার সেই মানুষদের দেখতে পেলাম না। ফলে আমি কী জানি কী মনে করে বুয়েটের অফিসে নোটিশ বোর্ডের দিকে যাই। বুয়েটে পরীক্ষার রেজাল্ট নোটিশ বোর্ডে আছে। দেখি কিছু অংশ ছিঁড়েও গেছে। তার পরও দেখি ‘৪২৪’ নম্বর (ভর্তি পরীক্ষার রোল) চোখে পড়ছে। পাশে নাম লেখা শামছুল হক। আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। বারবার চোখ রাখছিলাম। পরে জানতে পারি আমি উত্তীর্ণ হয়েছি। এটি হলো আমার বুয়েটে ভর্তির কাহিনি।

 

গণিতের প্রতি আগ্রহই শেষ পর্যন্ত আপনাকে বুয়েটে নিয়ে গেল?

বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় নম্বর ছিল ৬০০। এর মধ্যে ২০০ পেতে হয়। গণিত, পদার্থ ও রসায়ন বিষয়ে ১০ নম্বরের ২০টি করে প্রশ্ন। গণিতের সব কটির সঠিক জবাব দিয়েছিলাম। আরো কোনো একটি প্রশ্নের জবাব সঠিকভাবে দিয়েছিলাম। ফলে আমার বড়জোর প্রাপ্য ধরে নিয়েছি ২১০। যেখানে ২০০ পেতে হয় সেখানে ২১০ পাওয়ার মতো জবাব লিখলে আশা কম থাকারই কথা। তবে শেষ পর্যন্ত আমি উত্তীর্ণ হই। আসলে আমি গণিতে ওস্তাদ হয়েছিলাম টানা দুই বছর তিনটি ব্যাচ পড়িয়ে। আমি তো গণিত নিয়ে খেলতাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল পুরান ঢাকার সেই সময়ের জগন্নাথ কলেজে। গণিত পরীক্ষার দিন প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে যানজট সৃষ্টি হলে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে আমার ১৫ থেকে ২০ মিনিট দেরি হয়। আমি দেরিতে গেছি দেখে পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বরত একজন শিক্ষক বললেন, ‘কী আর করবা। তাড়াতাড়ি বসো।’ আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। আমি কম সময়েও পারব। শেষ পর্যন্ত দেখি সবার আগে আমি পরীক্ষার খাতা জমা দিয়েছি। এটি বললাম এ কারণে যে আমি গণিতে আসলে ওস্তাদ হয়ে গিয়েছিলাম। যা হোক, বুয়েটে ভর্তির বিষয়টি আমার কাছে মিরাকল মনে হয়। এটি ছিল স্বর্গীয় আশীর্বাদ।

 

আমাদের দেশে উন্নয়ন দর্শন সঠিক নয়। বিজ্ঞানকে অনুসরণ করে পরিকল্পিত উন্নয়ন এখানে হচ্ছে না। আমি বলি, আমরা আহাজারির উন্নয়ন দেখছি। আমাদের দেশে বছরের পর বছর এই আহাজারির পর উন্নয়ন হচ্ছে। প্রথমে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, পরে আহাজারি না করলে উন্নয়ন হয় না। উন্নয়ন করতে গেলে গবেষণা ও পরিকল্পনা জরুরি। এখানে তা হচ্ছে না। এখানে আমি আমার মতো উন্নয়ন করব—এই দর্শন বিরাজ করছে। উন্নয়ন তাই পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না। বিনিয়োগ করা হলেও তার সুফল মিলছে কম। জাপানের জমি উর্বর নয়, কিন্তু তারা এগিয়েছে বিজ্ঞানের ওপর ভর করে। তাদের অত সম্পদও নেই। আমাদের দেশে উন্নয়ন টেকসই হচ্ছে না। কারণ তা পরিকল্পিত নয়। এখানে বেশির ভাগ প্রকল্প পরিচালক সময়ের দিকে খেয়াল রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলেই সেটিকে অর্জন বলে মনে করেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেকে আরো বিজ্ঞানসম্মত উন্নয়নের কাছে যেতে পারেন

 

বুয়েটে ছাত্রজীবন কেমন কেটেছিল?

বুয়েটে ভর্তির পর নিজেকে একঘরে মনে হতো। ঢাকা কলেজ বা নটর ডেম কলেজ থেকে যারা আসত তারা গ্রুপে গ্রুপে থাকত। কলোনি থেকে কেউ আসেনি। আমি এজিবি কলোনি থেকে এসেছি। করিম নামে আরো একজন তেজগাঁওয়ের একটি টেকনিক্যাল কলেজ থেকে এসেছে। আমি ও করিম দুজনের কোনো গ্রুপ নেই। অন্যদের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করেও পারতাম না। আমরা দুজন বাদ পড়তাম। খুব খারাপ লাগত। প্রথম দিকে ধকল গেছে। বুয়েটে সত্যিকার অর্থে মেধাবীরাই ঢোকে।  বুয়েটে যারা ভর্তি হয় তাদের বেশির ভাগই বনেদি ঘরের। আমি কলোনি থেকে এসেছি। তবে বুয়েটে ভর্তির পর দায়িত্ববোধ আরো বেড়ে গেল। মাথায় ঘুরতে থাকল—ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। আমি হলে থাকিনি। বাসায় থাকতাম। তবে বাসায় আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন বেশি থাকায় পড়াশোনার পরিবেশ ছিল না। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। প্রথম বর্ষে আমি সপ্তম হলাম। তার পর থেকে দেখি আমার সঙ্গে মেশার আগ্রহ বেড়ে গেছে অন্যদের। পারিবারিকভাবে এগিয়ে, বিত্তে এগিয়ে থাকা সহপাঠীরা আমার কাছে ভিড়ছে। তবে আমার নজর ছিল পড়াশোনায়। ১৯৮৪ সালের জুন-জুলাইয়ে বুয়েট থেকে বের হই।

 

ছাত্ররাজনীতি আপনাকে টানেনি?

কেন জানি রাজনীতিতে জড়াইনি। তবে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের জ্ঞানের পরিধি আমাকে টানত। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের সভা-সমাবেশে অংশ নিতাম। এখনো সেই ফারুক ভাই, মাহতাব ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। তাঁরা কী অসাধারণভাবে কথা বলতেন, চমৎকার সব কথা বলতেন। তাঁদের বক্তব্য শুনে আমার ভালো লাগত। বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলতেন। তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন থেকে শেখার, নেওয়ার ছিল অনেক কিছু। তাঁদের বক্তব্য ছিল গঠনমূলক। তাঁরা কেউ আবৃত্তি করতেন, কেউ বিতর্ক করতেন। এসব আমাকে টানত; কিন্তু রাজনীতি করা হয়নি।

 

কর্মজীবন শুরু কিভাবে?

১৯৮৪ সালে রেজাল্ট হওয়ার পরের মাসেই ১০ জন শিক্ষক নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি দেয় বুয়েট। শিক্ষক হব, ভাবতে ভয় হতো। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। আমি ও আরো একজন যৌথভাবে চতুর্থ হই। বুয়েটের শিক্ষক হওয়ার আগে অবশ্য বিদেশে চাকরির কথা ভাবছিলাম। জ্যাক, লবিং থাকার পরও বুয়েটে শিক্ষকতার চাকরি অনেকের হয়নি। তবে বুয়েটের ঐতিহ্যে মেধার বিবেচনাই বড়—এর প্রতি আস্থাও ছিল। বুয়েটে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই পুরকৌশল বিভাগে। এ বিভাগে চারটি শাখা। এগুলোর মধ্যে আছে অবকাঠামো, মৃত্তিকা, পরিবেশ ও পরিবহন প্রকৌশল শাখা। আমি পরিবহন শাখা বেছে নিই। বিশেষায়িত শাখায় যুক্ত হলাম।

 

পরে পরিবহন প্রকৌশল নিয়ে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত হলেন...

উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য আমি ১৯৯০ সালে যাই যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯৪ সালে ফিরি। আমি গবেষণা করি ট্রাফিক সিমুলেশনের ওপর। কম্পিউটার ওরিয়েন্টেড ট্রাফিক সিস্টেম ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করি। আমাদের দেশে আমার আগে কেউ এ বিষয়ে গবেষণা করেনি। আমি ট্রাফিক সিমুলেশনের ওপর কম্পিউটার মডেলিং করি। বিদেশে গাড়ি লেনে লেনে চলে। আমাদের দেশে লেনবিধি মানা হয় না। যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক গাড়ি চলে। ফলে আমাদের এখানে ব্যবস্থাপনার ব্যাপারটি জটিল। এখানে চালকদের প্রশিক্ষণও জরুরি। আমি এ বিষয়ে পিএইচডি করি সেখানকার সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রসঙ্গক্রমে বলি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাজ জ্ঞান তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরি করে গবেষণার মাধ্যমে। জ্ঞান তৈরি করতে হলে গবেষণা করতে হবে। এর বিকল্প নেই। ধ্যান-জ্ঞান ছড়ানোর কাজটি জরুরি। নতুন জ্ঞান তৈরি করে পরামর্শসেবা দেওয়া যায়।

 

দেশের পরিবহন অবকাঠামো সম্পর্কে কিছু বলবেন?

আমাদের দেশে উন্নয়ন দর্শন সঠিক নয়। বিজ্ঞানকে অনুসরণ করে পরিকল্পিত উন্নয়ন এখানে হচ্ছে না। আমি বলি, আমরা আহাজারির উন্নয়ন দেখছি। আমাদের দেশে বছরের পর বছর এই আহাজারির পর উন্নয়ন হচ্ছে। প্রথমে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, পরে আহাজারি না করলে উন্নয়ন হয় না। অথচ উন্নয়ন করতে গেলে গবেষণা ও পরিকল্পনা জরুরি। এখানে তা হচ্ছে না। এখানে আমি আমার মতো উন্নয়ন করব—এই দর্শন বিরাজ করছে। উন্নয়ন তাই পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না। বিনিয়োগ করা হলেও তার সুফল মিলছে কম। জাপানের জমি উর্বর নয়, কিন্তু তারা এগিয়েছে বিজ্ঞানের ওপর ভর করে। তাদের অত সম্পদও নেই। আমাদের দেশে আছে ইচ্ছামতো উন্নয়ন। ফলে উন্নয়ন টেকসই হচ্ছে না। কারণ তা পরিকল্পিত নয়। এখানে বেশির ভাগ প্রকল্প পরিচালক সময়ের দিকে খেয়াল রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলেই সেটিকে অর্জন বলে মনে করেন। কিন্তু অনেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরো বিজ্ঞানসম্মত উন্নয়নের কাছে যেতে পারেন।

 

দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে আপনি দীর্ঘদিন থেকে নানা মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে আসছেন, যার বাস্তবায়ন বলতে গেলে হয়নি। এ নিয়ে কোনো হতাশা আছে?

আমি মনে করি, পরিকল্পনা থাকতে হবে। সমন্বয় থাকতে হবে। একেক সংস্থা একেক প্রকল্প নেয় বলে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে। তবে কোনোটির সঙ্গে কোনোটি আবার সাংঘর্ষিক, যে কারণে সমন্বিত উন্নয়ন হচ্ছে না। উড়াল সেতু বানানো যথাযথ নয়। ইন্টারসেকশনের উন্নয়ন করতে হবে। আমরা উড়াল সেতুই তৈরি করছি। আবার তা করার পর রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের মনোযোগ নেই। ফলে বিনিয়োগের সুফল মিলছে না, উন্নয়ন টেকসই হচ্ছে না।

 

সরকার পরিবহন খাতে পেশাদার ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে। এ বিষয়ে আপনি আশাবাদী?

আমি আশা করব, এই সংকট পূরণ করা হবে। সরকার এটি বুঝতে পারছে। রাস্তার জন্য ডাক্তার দরকার। এ জন্য দেশে উচ্চশিক্ষায় পরিবহন প্রকৌশল বিদ্যার প্রসার ঘটানো দরকার। এটি গণপরিবহনের বর্তমান পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

 

আপনি তো বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন। পরিবহন প্রকৌশলী হিসেবে আপনার সাফল্যগুলো কী?

আমি হাতিরঝিল সমন্বিত প্রকল্পের ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার হিসেবে যুক্ত ছিলাম। এ ছাড়া যুক্ত ছিলাম কুড়িল ইন্টারচেঞ্জ, বনানী ওভারপাসসহ বিভিন্ন প্রকল্পের পরিকল্পনায়। মাস্টারপ্ল্যানার ছিলাম কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনালের। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেডের পরিচালক আমি। এখনো সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শ দিচ্ছি। সরকারের বিভিন্ন কমিটিতে আমাকে রাখা হচ্ছে। সরকারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকি। যুক্ত আছি বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২০২১ ও পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুতির সঙ্গেও।

 

আপনার পারিবারিক জীবন?

এদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান। আমি কাজপাগল মানুষ। আমার স্ত্রী আমার সব কাজের সহযোগী। স্ত্রী নিশাত আফরোজ ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার ও এনিমেটর। ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর সেখানে আমাদের যুগলজীবন কেটেছে টানা প্রায় পাঁচ বছর। ওটা ছিল হানিমুন পিরিয়ড। দুজন একসঙ্গে থাকায় একে অন্যকে বুঝতে সুবিধা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক থেকে বন্ধুত্বের পর্যায়ে উপনীত হয়ে তা আরো এগিয়েছে। আমার অনেক কাজ তাঁকে দেখাতে হয়। সদ্যঃপ্রয়াত জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে আমাকে কাজ করতে হয়েছে। সেসব কাজে এনিমেশনের কাজ করেছেন আমার স্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কাছে কুড়িল ইন্টারচেঞ্জ বা জিল্লুর রহমান উড়াল সেতুর মতো প্রকল্প উপস্থাপনায়ও তিনি ছিলেন। ওই প্রকল্পে এনিমেশনের কাজও করেছেন। তিনি ইংল্যান্ডে কলেজ লেভেলে পাঠদান করেছেন সাড়ে তিন বছর। এ ছাড়া ঢাকায় মেরি কুরি স্কুলেও পড়িয়েছেন। স্টুডিও-২৭-এ এনিমেশনের কাজ করেছেন। কোরিয়া, চীনা ও জাপানি ভাষায় তাঁর দখল রয়েছে। আমি যে পরামর্শসেবা দিই তার সহযোগী তিনি। আমাদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে শাবাব আফফানুল হক। তারপর দুই মেয়ে—পারসা সানজানা বিনতে হক ও আশনা আম্বরিন হক। সব মিলিয়ে ভালো আছি।

 

১২ মে, বুয়েট আবাসিক এলাকা, ঢাকা

 

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা