kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

বঙ্গবন্ধুর কাছে শত্রু-মিত্র আলাদা ছিল না

অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব। সিএসপি অফিসার। পরে হন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করেই দেশের অর্থনীতি আরো এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। মুজিববর্ষে তাঁর মুখোমুখি হয়েছেন আফছার আহমদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর কাছে শত্রু-মিত্র আলাদা ছিল না

আপনি তো হবিগঞ্জের সন্তান?

আমার বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার রতনপুর গ্রামে। ১৯৪০ সালের ৬ জুন জন্ম। কিন্তু বাবা ও হেডমাস্টার বাবু মিলে আমার জন্ম থেকে দুই বছর গায়েব করে দিয়েছেন। ফলে কাগজে-কলমে আমার জন্ম ১৯৪২ সালে। আমার বাবা মাহতাবউদ্দিন ছিলেন মাধবপুর থানার তত্কালীন ২৫ নম্বর সার্কেলের সরপঞ্চ ও শিক্ষানুরাগী। তখন আসাম প্রদেশের পঞ্চায়েতব্যবস্থার অধীনে এই পদ চালু চিল। আমার মায়ের নাম চমকচান। মা ছিলেন গৃহিণী। আমরা ৯ ভাই-বোন। তিন ভাইয়ের মধ্যে আমি মেজো। বোনদের মধ্যে তিনজন বড়, তিনজন ছোট।

 

আপনাদের সময় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা একটু ভিন্ন ছিল। শৈশব কেমন কেটেছে?

আমার প্রথম স্কুল রতনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমাদের সময় প্রাইমারি স্কুল ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ এবং প্রথম ও তৃতীয় মান—এই ধাপে। বর্তমানের কেজি স্কুলের মতো অনেকটা। তৃতীয় মান শেষ করে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে হতো হাই স্কুলে। আমি দ্বিতীয় মান শেষ করে সরাসরি হাই স্কুলে ভর্তি হই। তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলাম ১৯৫০ সালে, জগদীশপুর যোগেশচন্দ্র হাই স্কুলে। আমরা দল বেঁধে হেঁটে সাড়ে তিন মাইল দূরে হাই স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। আমাদের গ্রামের পরিবেশটা বেশ ভালো ছিল। প্রচুর খেলাধুলা করেছি। প্রাইমারিতে থাকা অবস্থায় প্রাইমারির ছাত্র পড়ানো ছিল আমার নেশা। নিজ গরজে বিনা পয়সায় পড়াতাম। ওই সময় বাবা মারা গেলেন, ১৯৫২ সালে। আমার বয়স তখন ১২। তার পর থেকে মা-ই আমাকে মানুষ করেন। আমি বৃত্তি পেতাম। তখন বড় বিষয় ছিল ভাষা আন্দোলন। আমরা জগদীশপুর স্কুল থেকে ইটাখোলা রেলস্টেশন পর্যন্ত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে প্রতিদিনই মিছিল করতাম।

 

সিলেট সদরে শিক্ষাজীবনের বড় একটা সময় কাটল আপনার?

ষষ্ঠ শ্রেণি পাস করে সিলেটে চলে যাই। আমাদের এলাকার আব্দুল হাশেম তখন এমসি কলেজের পদার্থবিদ্যার প্রভাষক। তিনি আমাকে সিলেটে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। ভাইসাব, ভাবি আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো রাখতেন। হাশিম ভাইসাব আমাকে সিলেটে রাজা গোবিন্দ চন্দ্র হাই স্কুলে ভতি করে দেন, সপ্তম শ্রেণিতে। এর পর থেকে উনার স্নেহ-মমতা ও দিকনির্দেশনায়ই চলে আমার লেখাপড়া। ওই স্কুলে প্রথম ক্লাস ছিল ইংরেজির। ক্লাস টিচার ছিলেন হেডমাস্টার জনাব সুরুজ আলী। খুুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক। ইংরেজি বিষয়ে তাঁর পর পর তিনটি প্রশ্নের উত্তর শুধু আমি দিতে পারি। উত্তর শুনে তিনি অবাক হয়ে সিলেটি ভাষায় বলেন, ‘তোমাকে কি গো পিছনে বোয়াইছে? সামনে বও।’ তিনি আমাকে সামনে এনে বসালেন। এই যে হেডমাস্টারের প্রশংসা, তাতে জীবনে বড় ধরনের ধাক্কা (অনুপ্রেরণা) পেলাম। আমার জীবনে এটি বিশাল প্রভাব ফেলল। পরে নাইনে উঠে সিলেট সরকারি স্কুলে ভর্তি হলাম।

একটা কথা বলে রাখি, তখন বাংলাদেশে সব জেলায় একটা করে সরকারি হাই স্কুল থাকত বলে তাকে জিলা স্কুল বলা হতো। কিন্তু আসামের অধীনে সিলেট জেলার প্রতিটা মহকুমায়ই একটা করে সরকারি হাই স্কুল ছিল বলে তাকে জিলা স্কুল বলা হতো না, সরকারি স্কুল বলা হতো। সেখানে প্রতিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ছিলেন। আমি পিএইচডি পর্যন্ত পড়েছি; কিন্তু সিলেট সরকারি স্কুলের নবম-দশম শ্রণিতে যে মানের লেখাপড়া, তা আর কোথাও পাইনি। ১৯৫৮ সালে আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেই। তখন বলাবলি হতো, আমি মেট্রিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হবো। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পূর্ব পাকিস্তান বোর্ডে পঞ্চম হলাম। পরে সিলেট মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় পূর্ব পাকিস্তান বোর্ডে ১৭তম হই।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হলেন। অর্থনীতিবিদ হওয়ার লক্ষ্য ছিল?

হাশেম ভাইসাবের পরামর্শে অর্থনীতিতে ভর্তি হলাম। তিনিই পরামর্শ দিলেন অর্থনীতিতে ভালো করব বলে। পরে অর্থনীতিতে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলাম, ১৯৬২ সালে।

 

এর পরই ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন? এসএম হল ছাত্র সংসদের ভিপিও হলেন...

বাষট্টিতে শিক্ষা আন্দোলনে যোগ দিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের কাজী জাফর ও মোহাম্মদ ফরহাদ আমাকে এসএম হলে নিয়ে এলেন। তিন-চার দিন পর কাজী জাফর বললেন, ‘তোমাকে আনার একটা উদ্দেশ্য আছে। তোমাকে হল সংসদ নির্বাচনে কনটেস্ট করতে হবে।’ আমি তো আকাশ থেকে পড়ি। আমাকে বলা হলো, এ টি এম শামসুল হুদা (পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার) হিস্ট্রি থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। সে এনএসএফ থেকে প্রার্থী হচ্ছে। তার সমকক্ষ কাউকে পাচ্ছি না। তোমাকে ভিপি পদে লড়তে হবে। এটা ১৯৬৩ সালের কথা। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ মিলে জোট করলাম। আমি ছাত্র ইউনিয়ন থেকে এসএম হলে ভিপি পদে জিতলাম। তখন ডাকসুর ভিপি হন রাশেদ খান মেনন। পরে এমএ পরীক্ষা দিলাম। অল্প নম্বরের জন্য ফার্স্ট ক্লাস পেলাম না। সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হলাম।

 

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে এনএসএফ ও ছাত্রশক্তির জোট প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল?

আইয়ুব সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠন এনএসএফ ও খেলাফতে রব্বানী পার্টি সমর্থিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রশক্তি একজোট হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে। ছাত্রশক্তি খুব দক্ষিণপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী ছিল। তখন ছাত্রশক্তির নেতা ছিলেন মওদুদ আহমদ (বিএনপি নেতা), শাহ আবদুল হালিম, মিজানুর রহমান শেলি প্রমুখ। এনএসএফের নেতা ছিলেন আবুল হাসনাত।

 

কর্মজীবন শুরু কিভাবে?

ফার্স্ট ক্লাস না পেলেও এমএ পাস করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি বিভাগে লেকচারারের কাজ পেলাম। সেটা ১৯৬৪ সালে। তখন এমনটাই নিয়ম ছিল, পোস্ট খালি থাকলে যে ফার্স্ট হবে তাকে শিক্ষক হিসেবে নেওয়া হবে।

তখন ইচ্ছা ছিল কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে পড়তে যাব। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের চাপে ’৬৬ সালে সিএসপি পরীক্ষা দিলাম। ১৩তম হলাম। ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে লাহোরে ট্রেনিংয়ে গেলাম। লাহোর থেকে ফেরার পর ময়মনসিংহে সহকারী কমিশনার পদে যোগ দিলাম। পরে জামালপুরের এসডিও হই। তখন দেশ উত্তাল আইয়ুববিরোধী গণ-আন্দোলনে। আমার বিরুদ্ধে জামালপুরে ছাত্র আন্দোলনে নমনীয়তার অভিযোগ এলো। আমাকে বদলি করে ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে করাচি পাঠানো হলো। এর আগে মাস্টার্সের রেজাল্ট শুনে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান আমার কাছে সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগপত্র পাঠায়। রাজি হয়নি।

একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বাদ দে ওসব। উপসচিবটচিব হওয়ার দরকার নাই। প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসাবে তোরে নিয়োগ দিলাম। কাল থেকে কাজ করবি। মসিয়া (মসিউর রহমান, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) হবে প্রাইভেট সেক্রেটারি-১ আর তুই হবি প্রাইভেট সেক্রেটারি-২।’ তারপর ব্রিফিং দিয়ে শেষে বললেন, ‘বাবা দেখ, আমার কাছে তো অনেক লোক আসে। তোর মতো, আমার মতো ভালো কাপড়চোপড় পরা যারা আসবে, তারা কিন্তু তাদের কাজ করিয়ে নিতে পারবে। তাদেরকে সাহায্য করিস বা না করিস, আমার কাছে আসতে পারুক বা না পারুক, তারা তাদের কাজটা করিয়ে নিবে। কিন্তু যারা গরিব মানুষ আমার বন্ধু, চাষাভুষা, শ্রমজীবী মানুষ, তারা যদি তুই পর্যন্ত আসতে পারে, তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে দিস না, বাবা। একান্তই যদি আমার কাছে পাঠাতে না পারিস, তাদের কাজটা করে দিস।’ এই হলেন আমাদের জাতির পিতা

মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন?

১৯৭১ সালের জুন মাসে আমাকে বদলি করে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়। পোস্টিং হলো ময়মনসিংহে, অ্যাডিশনাল ডিসি হিসেবে। সেখানে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দু লোকদের সহযোগিতা করার। একদিন রাত ১টায় আদেশ দিয়ে পরদিন সকালেই রাজশাহীতে রওনা দিতে বলা হলো। যুদ্ধের বাকি সময়টা রাজশাহীতেই কাটে।

 

বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব কখন হলেন?

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমাকে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে বদলি করা হলো, উপসচিব (নথি-২) হিসেবে। আমি যোগদান করলাম পুরনো গণভবনে (বর্তমান সুগন্ধা)। সেখানে দোতলায় বসতেন জাতির পিতা। প্রথম দিনই আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি গিয়ে কদমবুসি করে দাঁড়ালাম। উনি তাকালেন। তাঁর প্রথম শব্দই ছিল ‘তুই’। উনি বললেন, ‘কিরে, উপসচিব হয়ে নাকি আইছস? সবাই বলে, তুই নাকি ছাত্র ইউনিয়নের লোক? কিন্তু ছাত্রলীগের সবাই তো তোরে ভালো কয়। ব্যাপারটা কী? মনি, রাজ্জাক, এমনকি সিরাজুল আলম খানও দেখি তোর সম্পর্কে ভালো বলে। জামালপুরে এসডিও থাকতে নাকি দলের লোকেরা তোরে নিজেদের লোক মনে করত? তুই কি রাজনীতি করতে চাস নাকি?’ একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বাদ দে ওসব। উপসচিবটচিব হওয়ার দরকার নাই। প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসাবে তোরে নিয়োগ দিলাম। কাল থেকে কাজ করবি। মসিয়া (মসিউর রহমান, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) হবে প্রাইভেট সেক্রেটারি-১ আর তুই হবি প্রাইভেট সেক্রেটারি-২।’ তারপর ব্রিফিং দিয়ে শেষে বললেন, ‘বাবা দেখ, আমার কাছে তো অনেক লোক আসে। তোর মতো, আমার মতো ভালো কাপড়চোপড় পরা যারা আসবে, তারা কিন্তু তাদের কাজ করিয়ে নিতে পারবে। তাদেরকে সাহায্য করিস বা না করিস, আমার কাছে আসতে পারুক বা না পারুক, তারা তাদের কাজটা করিয়ে নিবে। কিন্তু যারা গরিব মানুষ আমার বন্ধু, চাষাভুষা, শ্রমজীবী মানুষ, তারা যদি তুই পর্যন্ত আসতে পারে, তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে দিস না, বাবা। একান্তই যদি আমার কাছে পাঠাতে না পারিস, তাদের কাজটা করে দিস।’ এই হলেন আমাদের জাতির পিতা।

 

আপনি পিএইচডি করলেন কখন?

আমি তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করি। তাঁকে হাতে-পায়ে ধরে পিএইচডি করার অনুমতি নিলাম। তখন যুগ্ম সচিব মনোয়ারুল ইসলাম ও আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে জিও নিলাম। আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে আমাদের পিএইচডি করা ঠিক হলো। আমাদের আমেরিকায় যাওয়ার কথা ছিল ১৭ আগস্ট। আমি চার্জ দিলাম ১২ আগস্ট, সৈয়দ রেজাউল হায়াতের কাছে। আমরা তখন ওএসডি।

 

একান্ত সচিব হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে কেমন দেখলেন?

একেবারে মানুষের নেতা যাকে বলে, তিনি তেমন ছিলেন। দু-একটা ঘটনা বলি। কে বড়লোক, কে বড়লোক না, এগুলো তিনি দেখতেন না। এমনকি শত্রু-মিত্র আলাদা করতেন না। তিনি প্রথম যে প্রশাসন সাজিয়েছিলেন, সেখানে ১৪-১৫ জন শিক্ষক ছিলেন এবং সবচেয়ে ভালো শিক্ষক। আরেকটা দিক ছিল, বঙ্গবন্ধু গাড়ি বানাবেন বাংলাদেশে, তো গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুল্লাহ খানকে ডাকলেন। অথচ তিনি পারিবারিকভাবে খাঁটি মুসলিম লীগার। তাঁকে বললেন, ‘তুই গাড়ি বানিয়ে আগামী বছর দিবি।’ আসলে যে যে কাজে উপযুক্ত, বঙ্গবন্ধু তাকে সেই কাজে নিয়োগ দিতে চাইতেন। তিনি আসলে দেশটা গড়তে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে জাসদ তখন খুবই অস্থিরতা তৈরি করে। এই জ্বালাও, পোড়াও, ভাঙো। জাসদের শাজাহান সিরাজ তখন তাদের একজন। এর মধ্যেই তাঁর স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ এলেন। বললাম, আপনার সঙ্গে কি বঙ্গবন্ধু দেখা করতে চাইবেন? উনি বললেন, বলেই দেখেন। আমি যোগাযোগ করলাম। অবাক ব্যাপার। তিন-চার মিনিটের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু রাবেয়া সিরাজকে ডেকে পাঠালেন। রাবেয়া বঙ্গবন্ধুকে বললেন, জেলে শাজাহান সিরাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমে থাকে। বই পড়তে পারে না। খাওয়াদাওয়ার কষ্ট হয়। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, ‘যা যা চায়, করে দিবি। আমার হুকুম।’ করে দিলাম। একদিন এলেন মেজর শরীফুল হক ডালিম। এর মধ্যে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। র্যাংক কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সে এসে প্রায় নিজেই ঢুকে পড়বে এমন অবস্থা। তাকে আটকালাম। বললাম, আপনি কি মনে করেন বঙ্গবন্ধু আপনাকে সাক্ষাত্ দেবেন? সে বলল, ‘অবশ্যই, বলে দেখুন।’ তাকেও বঙ্গবন্ধু সাক্ষাত্ দিলেন।

 

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ দেখা কখন?

কর্নেল জামিল তখন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে ডাইরেক্টর ফোর্সেস অব ইন্টেলিজেন্স হিসেবে বদলি হবেন। তিনি, যুগ্মসচিব মনোয়ার স্যার আর আমি প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে বিদায় নিচ্ছি। আমাদের তিনজনের ফেয়ারওয়েল হবে ১৪ আগস্ট রাতে। আমরা গেলাম। বঙ্গবন্ধুর চলে যাওয়ার সময় গাড়ির দরজা খুলে দিলাম। এটা আমি পিএস থাকাকালে নিয়মিত করতাম। তখন ক্যু হতে পারে বলে নানা ধরনের গুজব ছিল। গণভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর যাওয়ার সময় তাঁকে একটা কালো রঙের গাড়ি দেওয়া হলো। কালো রংটা যেকোনো কারণেই হোক বঙ্গবন্ধু অপছন্দ করতেন। বঙ্গবন্ধু যাওয়ার আগে বললেন, ‘আমারে আজ কালো গাড়িটা দিল রে?’ তখন রাত ৮টা।

 

বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর পেলেন কিভাবে?

আমরা যে ফ্ল্যাটে থাকতাম, সেটা গণভবনের কাছে। আমরা ১৭ তারিখ দেশের বাইরে যাব বলে আমার বাসায় তখন আমার মা, শাশুড়ি, ভাই-বোনরা। ১৫ আগস্ট ভোরে ফোন করলেন আব্দুল মালেক ভুইয়া (প্রধানমন্ত্রীর অফিসের গোপন শাখায় কর্মরত) জানালেন বঙ্গবন্ধুর হত্যার কথা। আমি হতবাক। রেডিও ধরতেই শুনতে পাই মেজর ডালিমের ঘোষণা। আমি তখন ৩২ নম্বরে ফোন দিলাম। কেউ ধরে না। ফোন করলাম কর্নেল জামিলকে। আগের রাতে তাঁর আর আমার ফেয়ারওয়েল হয়। ধরলেন তাঁর স্ত্রী। ভাবি বললেন, ‘ভাই, দেখেন না, কী ফাইজলামি। এত সহজ সব কিছু? আপনার ভাই ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠিয়েছে। নিজেও যাচ্ছে ৩২ নম্বরে। সব নাকি ঠিক হয়ে যাবে।’ আমি টেলিফোন রেখে লুঙ্গি পরা অবস্থায়ই দৌড়ে রাস্তায় বের হলাম। দেখি,  কর্নেল জামিলের লাল রঙের গাড়িটা চলে যাচ্ছে। জোরে চিত্কার করি। শুনল না। তত্ক্ষণাত্ ৩২ নম্বরের উদ্দেশে রিকশায় রওনা দিলাম। কিন্তু মানিক মিয়া এভিনিউ মোড়ে আর্মিরা ফিরিয়ে দিল। ওই রিকশাচালক ছিলেন মুজিবভক্ত। খুবই বিচলিত ছিলেন। আমার কাছ থেকে ভাড়া না নিয়েই চলে গেলেন।

 

পরে বিদেশ যেতে কোনো অসুবিধা হলো?

মনোয়ার স্যার ও আমি প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে বঙ্গভবনে দেখা করতে গেলাম। আমরা জানতে চাইলাম, আমাদের চাকরি আছে কি না, আমাদের যেতে দেওয়া হবে কি না। আমাদের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে মোশতাক জিও দিয়ে দিলেন। আমরা ১৭ আগস্টের পরিবর্তে ২১ আগস্ট প্লেনে উঠলাম, বোস্টনের উদ্দেশে, লন্ডন হয়ে যাব। আমাদের ফ্লাইট তখন আটকে দিল আর্মিরা। বলা হলো, আমি বাইরে গিয়ে শেখ মুজিব হত্যার বিচারে ক্যাম্পেইন করব। দুই ঘণ্টা আটকানোর পর আমাদের বিমান যেতে দিল।

লন্ডনে নামার পর খবর পেয়ে বিবিসি, অন্যান্য মিডিয়ার লোকজন বিমানবন্দরে এলো। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করল আমাকে এক্সাইল (নির্বাসন) করা হয়েছে কি না। কেউ কেউ বলল, আমি মোশতাক সাহেবের পক্ষে ওকালতি করব। নানা কথা। দুই দিন লন্ডনে ছিলাম। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে গেলাম। পিএইচডি করে ’৭৯ সালে দেশে ফিরি। চাকরিতে পুনরায় যোগ দিই। তখন জিয়াউর রহমান সরকার আমাকে পদোন্নতি দিল না। সাড়ে ১১ বছর আমাকে উপসচিব হয়ে থাকতে হলো।

 

বিদেশ যাওয়ার আগে মোশতাক সরকারের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়েছিল?

না। উনার কাছ থেকে জিও আনা ছাড়া আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। এটা নিয়ে কিছু লোক আমার বিরুদ্ধে কথা বলে। আমাকে ঠেকাতে চায়। এই বয়সে আমাকে ঠেকানোর কী আছে. আমার পাওয়ারই বা কী আছে?

 

জাতিসংঘে চাকরি নিয়ে কখন গেলেন?

১৯৮৫ সালে (লিয়নে) জাতিসংঘের চাকরিতে গেলাম। ইউএনডিপির উপপ্রতিনিধি হয়ে। স্থায়ী চাকরি। ’৯১ সালে মনে করলাম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে; কিন্তু এলো না। তাই সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিলাম। জাতিসংঘে চাকরিটাই অব্যাহত রাখলাম। ’৯৬ সালে আমার ছেলে স্ট্যানফোর্ড থেকে এমবিএ পাস করল। মেয়ে লন্ডন থেকে এমএ পাস করল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় এলো। তাই ভাবলাম, আর বাইরে থাকা নয়, দেশেই থাকব। দেশে এসে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি করি। এটা এখন দেশের সেরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির একটা।

 

দেশে ফেরার পর গভর্নর হলেন?

১৯৯৮ সালে গভর্নর করা হয়। গভর্নর হয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করি। পঁচাত্তরের বিয়োগান্ত ঘটনার পর দেশের সব নোট থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি বাদ দেওয়া হলো। আমি তা পুনর্বহাল করলাম। এটা নিয়ে আমি আবেগতাড়িত ছিলাম। ডিজাইন দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বেশ আবেগপ্রবণ হয়েছিলেন।

 

অর্থনীতি নিয়ে আপনার লেখালেখি?

আমার তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে ‘গণতন্ত্রের পথেই অর্থনৈতিক মুক্তি,’ ‘প্রথম দর্শনে বঙ্গবন্ধু’ ও ‘কোন পথে বাংলাদেশের অর্থনীতি’। আরেকটা বই লেখার কাজ করছি, গঙ্গারিদ্ধি থেকে সোনার বাংলার ইতিহাস নিয়ে।

 

অর্থনীতিবিদ হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? আয়বৈষম্য ও ভোগবাদকে কিভাবে দেখছেন?

সুন্দর প্রশ্ন। এখন তো করোনাভাইরাস কোন দিকে গড়ায়, দেশের অর্থনীতির জন্য সেদিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। বৈষম্যের বিষয়ে আসি। যেমন মাও সেতুং বলে গেছেন, জানালা খুললে মুক্ত বাতাস যেমন আসবে, তেমনি দু-একটা পোকামাকড়ও আসতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, পঁচাত্তরের শাসকরা যখন বাজার অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হয়, পরে শেখ হাসিনার পক্ষে এটা উল্টে দেওয়া সম্ভব নয়। বৈশ্বিক অবস্থাই এমন দাঁড়িয়ে গেছে। আরেকটা বিষয় হলো, যখন খুব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে, শিল্পায়ন হয়, তখন মানুষের কোমল অনুভূতিগুলো দুর্বল হয়ে যায়। অনুভূতি কম থাকে, দয়ামায়া কমে যায়। দ্বিতীয় দিকটি হলো, আয়বৈষম্য তৈরি হলেও ’৭২ সালের দরিদ্র লোকটির সঙ্গে আজকের দরিদ্র লোকটিরও অনেক   তফাত রয়েছে।

 

আয়বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়?

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দুইটা দিক আছে। একটা হলো মানুষকে স্বাবলম্বী করা, ঐশ্বর্যশালী করা। আরেকটা হলো সোনার মানুষ গড়া, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক করা। কিন্তু ’৭৫-পরবর্তী শাসকরা তাঁর আদর্শ বদলাতে চাইল, বাজার অর্থনীতি করতে চাইল। তবে এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে সেটা উল্টে দেওয়ার বিষয়টাও কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ফর্মুলার মধ্যেই আছে। ফর্মুলার একটা হবে সমবায়। আরেকটা হলো গ্রামে-গঞ্জে শিল্পায়ন। যে কারণে বঙ্গবন্ধু পল্লী বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপন করেন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে যে পরিমাণ মানুষ কাজ হারাবে, তার মোকাবেলাও করা যাবে এই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দিয়ে। এর মধ্যে আত্মকর্মসংস্থানে জোর দিতে হবে। এসবে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন। উন্নত দেশের দিকে যেতে হলে আমাদের তিনটা কাজ করতে হবে। দুইটা হয়ে গেছে প্রায়—বিদ্যুত্ ও ক্ষুদ্র শিল্প। তৃতীয় হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা। আমাদের বর্তমান শিক্ষাটা পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন গুণগত মানসম্পন্ন   করতে হবে।

 

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আমাদের কী করণীয়?

প্রথমেই আমাদের কর আদায়ে সাফল্য দেখাতে হবে। কেন আমাদের দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে কম কর-জিডিপির দেশ হবে—এই প্রশ্ন করতে হবে। প্রগতিশীল করব্যবস্থা চালু করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা আছে, ‘প্রয়োজনে বিত্তবানদের ওপর বেশি হারে কর ধার্য করে কম ভাগ্যবানদের জন্য বিনিয়োগ করতে চাই। যাতে তাদের আয়বৃদ্ধি গড় আয়বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়।’

আরেকটা কথা, ২০৩০ সালে পৃথিবীর ২৮তম অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে উন্নত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকব কি না জানি না। তবে সোনার বাংলায় জয় বাংলা প্রতিধ্বনিত হবেই শাশ্বতভাবে। এখন দেশে করোনাভাইরাস সাময়িক একটি আপদ। তবে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ রীতি অনুসারে বাঙালি ও বাংলাদেশ শিগগিরই গা ঝাড়া দিয়ে আবার বিপুল অগ্রগতির মহাসড়কে যাত্রা শুরু করবে।

 

সব মিলিয়ে এখন কেমন আছেন? আপনার শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক জীবন কেমন চলছে?

আমি খুবই ভালো আছি। কাজকর্ম করতে পারি। অনেক ছোটাছুটি করি। প্রতিদিন অন্তত দেড় ঘণ্টা হাঁটি। খাওয়াদাওয়া খুব নিয়ম মেনে করি। আমার স্ত্রীও শারীরিকভাবে ভালো আছে। পারিবারিকভাবেও বেশ ভালো আছি। ’৬৬ সালে আমাদের বিয়ে। আমার স্ত্রী আসমা ও আমার—কারো মধ্যে কোনো হা-হুতাশ নেই। গত ফেব্রুয়ারিতে আমাদের দাম্পত্য জীবনের ৫৪ বছর হলো। আমরা সুখে-দুঃখে মানুষ। বড় ধরনের কোনো ঝগড়াঝাঁটি নেই। আমার ছেলে তমাল। তার বয়স ৫০-এর বেশি। তার ঘরে নাতি-নাতনি দুইটা। যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। মেয়ে সোমা। তার ঘরেও নাতি-নাতনি দুইটা। ওরা এখন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। এই মুহূর্তে কুয়ালালামপুরে থাকে। আর আমরা দুজন ঢাকায় থাকি। বছরে অন্তত একবার কুয়ালালামপুর বা যুক্তরাষ্ট্রে যাই।

গুলশান-১, ঢাকা, ২৪ মার্চ ২০২০

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা