kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

তিনি আমার জীবনটাই বদলে দিলেন

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



তিনি আমার জীবনটাই বদলে দিলেন

বাংলার রাখালিয়া জীবনের চিত্রকর আবদুস শাকুর শাহ্। তাঁর শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে গ্রামীণ বাংলা, নকশিকাঁথা, টেরাকোটা, পুঁথি, গীতিকবিতা ও লোকজীবনের নানা রূপ। তাঁর ছবি শহরের মানুষের কাছে গ্রামীণ জীবনের নস্টালজিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের সাবেক এই শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করেছেন শেখ হাসান রুহানি। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

 

আপনার জন্মস্থান বগুড়ায়

হ্যাঁ, আমার জন্ম ১৯৪৬ সালে। বাবা ওসমান আলী শাহ। তিনি ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। মা হালিমা খাতুন। দুজনই খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। বাবা সব সময় পড়াশোনার প্রতি খেয়াল রাখতেন। মা শাসন করতেন বেশি। ৯ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আমি সপ্তম। ভাই-বোনেরা মিলেমিশে থাকতাম। বাড়িতে নিয়মিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আসত। পাঠ্য বই পড়ার পাশাপাশি নিয়মিত সেসব পড়তাম। বলা যেতে পারে, এসব পড়াশোনার ব্যাপারে আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা চলত। ছেলেবেলায় আমি পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম। বেড়াতে যেতাম। তা ছাড়া বগুড়া তো পুরনো ঐতিহ্যবাহী শহর। বেড়ানোর অনেক জায়গা ছিল।

 

ভাই-বোনেরা কে কোথায় আছেন?

এক ভাই আবদুল মজিদ ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই। তিনি সরকারি চাকরি করে অবসরে, বগুড়ায় থাকেন।

 

আপনার প্রাথমিক পড়াশোনা তো বগুড়ায়...

হ্যাঁ, প্রাথমিক লেখাপড়া বগুড়ায়ই। ওই সময় বগুড়ার একটি সাধারণ স্কুলে পড়েছি। তবে আমাদের সময় প্রাইমারি স্কুলে ভালো ভালো শিক্ষক ছিলেন। তাঁরা আমাদের ভালো বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। ছাত্র-ছাত্রীদের মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতার শিক্ষাও দিতেন। কারো মধ্যে কোনো প্রতিভা দেখলে তাকে উৎসাহ দিতেন। ভালো মানুষ হওয়ার পরামর্শ দিতেন। এভাবে ছেলেবেলায় শিক্ষকরা আমাদের জীবনে একটা মূল্যবোধ গড়ে দিয়েছিলেন।

 

ছবি আঁকতে আগ্রহী হলেন কখন?

শিল্পী হব—এ রকম কোনো পরিকল্পনা ছেলেবেলায় ছিল না। ছবি আঁকতাম শখের বসে। আমাকে আকর্ষণ করত বইয়ে কিংবা পত্রিকায় ছাপা ইলাস্ট্রেশন। ওসব দেখে বইয়ের পাতায়, অঙ্কের খাতায় ছবি এঁকে ভরে ফেলতাম। মা মাঝেমধ্যে বইপত্র, খাতা দেখে আমাকে বকাঝকা করতেন। আমি কিন্তু আনন্দ নিয়েই আঁকতাম। এরপর ছবি এঁকেছি কাঠ-কয়লা, মাটি বা কম দামি রং—এগুলো দিয়ে। গ্রামে যখন নির্বাচন হতো, পোস্টার তৈরি করতাম তখন। বগুড়ায় বিভিন্ন পূজা-পার্বণ হতো, মেলা হতো। সেসব মেলা দেখতে যেতাম। খুব ভালো লাগত। অসাধারণ সব মাটির তৈরি পুতুল দেখতাম সেখানে। আমার মনে দাগ কাটত ওই ফর্মগুলো। পূজামণ্ডপ, মহররমে বিভিন্ন ডেকোরেশন করা হতো, সেগুলোও আমার খুব ভালো লাগত। ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে আমার আগ্রহ জন্মে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে। একদিন বগুড়ার নামকরা সাইনবোর্ড পেইন্টার সুলাইমানকে জিজ্ঞেস করলাম—আচ্ছা, আঁকাআঁকি শেখার কোনো স্কুল নেই? তিনি বললেন, বগুড়ায় এ রকম কোনো স্কুল নেই। তবে বগুড়ার একজন শিল্পী ঢাকায় থাকেন, তিনি হয়তো এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। খোঁজ নিয়ে জানলাম, ম্যাট্রিক পাস না করলে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া যায় না। এর মধ্যে বগুড়া আজিজুল হক কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলাম। সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর সেই বড় ভাই আমাকে খবর পাঠালেন আর্ট কলেজে ভর্তি ফরম ছেড়েছে। তারপর আর কি, ঢাকায় চলে এলাম।

 

আর্ট কলেজে ভর্তি হলেন?

ভর্তি হলাম। ১৯৬৫ সালে। আর্ট কলেজ দেখে আমার চিন্তাটাই বদলে গেল। এত সুন্দর ও পবিত্র একটা স্থান। মনে হলো, আমার স্বপ্নের জায়গা। মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল আমি শিল্পী হতে পারব। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, আমিনুল ইসলাম, সফিউদ্দীন আহমদ, কাজী আবদুল বাসেত, মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী প্রমুখ শিক্ষক। তাঁরা প্রত্যেকেই বিখ্যাত। তাঁদের নাম এত শুনেছি! প্রথম দিকে ভর্তি হয়ে তো বুঝিনি আর্ট কলেজে পড়ে কী হবে? ভর্তির দিন আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন স্যার। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—আর্ট কলেজে পড়ে কী করবে? আমি বললাম, ছবি আঁকা শিখব। তিনি বললেন, ঠিক আছে ভর্তি হবে হও, বিকেলে ইন্টারমিডিয়েটটা পড়ো। আবেদিন স্যারের পরামর্শ আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিলে। তিনি আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করে নিচ্ছেন আবার পরামর্শ দিচ্ছেন সিটি কলেজে ভর্তি হতে! তাহলে ছবি এঁকে কোনো ভবিষ্যৎ নেই! আমি সিটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছিলাম। এদিকে আর্ট কলেজে নিয়মিত ক্লাস করছি। সারা দিন আর্ট কলেজে পড়ে থাকি। ড্রয়িং করি। স্কেচ করি। মনে পড়ে, আবেদিন স্যার আমাদের দু-এক দিন ক্লাস নিয়েছিলেন। তারপর তিনি পাকিস্তান সরকারের ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন বিভাগের ডিরেক্টর পদে চলে যান, পাশাপাশি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাও করতেন। মহৎ মানুষ। শিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ ছিলেন। ওই সময় বাংলাদেশে চিত্রশিল্পের চর্চা কঠিন ব্যাপার ছিল। তিনি এ দেশের সংস্কৃতিকে তাঁর ছবিতে তুলে ধরেছিলেন। আমাদের শিক্ষকরা সব সময় বলতেন, সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে দেশপ্রেম বাড়ে। দায়বদ্ধতা বাড়ে। প্রথম দিকে এসব বুঝতাম না, পরে বুঝেছি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা ছিলেন দেশপ্রেমী। দেশের শিল্প-সাহিত্যের, দৃশ্য-সংস্কৃতির রুচি প্রতিষ্ঠায় তাঁরা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। আমাদের আউটিং ক্লাসে সংগীতশিল্পী, কবিদেরও যুক্ত করতেন। কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পী আব্দুল লতিফ, আব্দুল আলিম যোগ দিতেন আউটিং ক্লাসে। তাঁদের সঙ্গে মতবিনিময় হতো। আমরা প্রেরণা পেতাম। আসলে আমাদের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীরা অনেক পরিশ্রম করে বাংলাদেশের চিত্রশিল্পকে বিশ্বজনীন মর্যাদা দিয়েছেন।

 

আপনার শিল্পকর্মে গ্রামীণ জীবনের

চিত্র ফুটে উঠেছে

ছেলেবেলায় গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতি আমাকে খুব টানত। তখন বাংলাদেশ ছিল গ্রামপ্রধান। বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করত। জেলা শহরগুলো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তার মূল কারণ আমাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে আজকের বাংলাদেশ। যেহেতু আমার ছেলেবেলা গ্রামে কেটেছে, গ্রাম সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা ছিল। ছবি আঁকতে বসে গ্রামের কথা মনে পড়ত। সেই গ্রাম্য মেলা যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে কুমার সম্প্রদায়ের লোকজন নিয়ে আসত নানা রঙের মাটির জিনিসপত্র। আর্ট কলেজে একাডেমিক পাঠের পাশাপাশি পরবর্তী সময় নিজস্ব চিত্রভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছি। কতটুকু সফল হয়েছি জানি না।

 

আপনার পেশাগত জীবন শুরু হয় কবে?

১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস থেকে বিএফএ ডিগ্রি লাভ করি। ওই বছর ডিসেম্বর মাসেই শিক্ষকতার চাকরি পাই সিলেট রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে যোগদানের উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিরিবিলি ছবি আঁকা। আমি চা বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে একটি সিরিজ শিল্পকর্ম আঁকতে চেয়েছিলাম। ওই পরিকল্পনাটা এসেছিল শিল্পী গগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকর্ম দেখে। কলেজ কোয়ার্টারেই থাকতাম। দেশ তখন গণ-আন্দোলনে উত্তাল। রাজনৈতিক আন্দোলনের খোঁজখবর রাখতাম। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা ভালো, আমাদের আর্ট কলেজের শিক্ষকরা প্রত্যেকেই ছিলেন রাজনীতি সচেতন মানুষ। ছয় দফা, গণ-আন্দোলন, পরে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হলো। সদ্যঃস্বাধীন দেশে আমাদের কমিটমেন্ট আরো বেড়ে গেল। কিভাবে দেশটাকে আরো সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। আবার চাকরিতে যোগ দিলাম। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সিলেটেই কাজ করেছিলাম। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য চলে যাই। তত দিনে স্বাধীন দেশে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃৃতি—সবকিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। তারপর ভারত সরকার আমাকে উচ্চশিক্ষার জন্য একটি বৃত্তি দেয়। চলে গেলাম ভারতের বড়দা মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

সেখানে তো কে জি সুব্রামানিয়ানকে পেয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে

কে জি সুব্রামানিয়ান ছিলেন খ্যাতিমান শিল্পী, তাত্ত্বিক, দার্শনিক। তাঁকে আমি কাছ থেকে দেখেছি একজন শিক্ষক, গুরু এবং মহৎ মানুষ হিসেবে। আমার মানসজগৎ পরিবর্তন করে দিলেন তিনি। প্রথমত বললেন, শুধু ছবি আঁকলে হবে না, পাশাপাশি প্রতিটি কাজের নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা গড়ে তুলতে হবে। শুধু প্রচুর আঁকলেই হবে না, নিরীক্ষাপ্রবণ ছবি আঁকার মাধ্যমে নিজস্ব শিল্পশৈলী গড়ে তুলতে হবে। তাঁর এসব বক্তব্য আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করত। তিনি ক্যাম্পাসে এসে প্রত্যেকের কাজ পর্যবেক্ষণ করতেন। বিশ্লেষণ করতেন। ত্রুটি পেলে সংশোধন করে দিতেন। বারবার সংশোধন করাতেন। এতে অনেক কিছু শিখেছি। জেনেছি প্রতিটি শিল্পকর্মের নিজস্ব সত্তা থাকে। সে সত্তা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করা শিল্পীর কাজ। দায়সারা কাজ তিনি পছন্দ করতেন না। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন বিনয়ী, মার্জিত, পরোপকারী। তাঁর অধীনে দুই বছর কাজ করার সুযোগ পাই। তিনি আমার জীবনটাই বদলে দিলেন। ১৯৭৮ সালে দেশে ফিরে আবার চট্টগ্রাম ট্রেনিং কলেজে যোগ দিই। এরপর ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। এখানে আমাকে নিয়ে এসেছিলেন মূলত কাজী আবদুল বাসেত স্যার। অতঃপর দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করে কারুশিল্প বিভাগ থেকে ২০১২ সালে অবসর নিই।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন?

আমাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এটি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সিলেটে ছিলাম। একদিন দুপুরবেলা ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আমাদের কলেজ প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ঠিক ওই সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটা লরি এসে থামে কলেজের সামনে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৈন্যরা গুলি ছোড়া শুরু করে। হতভম্ব হয়ে সবাই জীবন বাঁচাতে এদিক-সেদিক ছুটে যান। ওই দিন নেহাত ভাগ্যগুণেই বেঁচে গিয়েছিলাম। সুরমা নদী পার হয়ে পরিচিত এক শিক্ষকের কাছে আশ্রয় পেয়েছিলাম। কিন্তু সুরমা নদীর ওপারে তখন বাঙালি পুলিশ-ইপিআরের সদস্যরা প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তুলেছেন। পরে বিভিন্ন স্থানে জীবন কাটিয়েছি। একবার আমরা ৯ জন শিক্ষক ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু বর্ডারের কাছে গিয়ে ডাকাতির মুখে পড়ি। ফলে ওখান থেকেই ফিরে এসেছিলাম। গোটা মুক্তিযুদ্ধকালেই পরিবারের কোনো খবর পাইনি।

 

আপনার প্রথম শিল্পকর্মের প্রদর্শনী কবে হয়

প্রথম একক প্রদর্শনী হয় রাজশাহীতে ১৯৭৫ সালে। বেশ কিছু শিল্পকর্ম ওই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল।

এ পর্যন্ত দেশ-বিদেশে প্রায় কুড়িটি একক চিত্রপ্রদর্শনী হয়েছে। অন্যদিকে যৌথভাবে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করছি ছাত্র অবস্থায়। ১৯৬৯ সালে পটুয়া গ্রুপের সদস্য হিসেবে খুলনা ও ঢাকায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু। এরপর দেশ-বিদেশে দেড় শতাধিক যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছি।

 

প্রচুর বইয়ের ইলাস্ট্রেশন ও প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছেন আপনি?

তা করেছি। তবে বইয়ের প্রচ্ছদ করেছি একেবারে বেছে বেছে। কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি মুহাম্মদ সামাদসহ অনেকের বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছি। প্রচ্ছদ এঁকেছি মনের আনন্দে। তা ছাড়া শিল্পকর্ম সবার সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে একটি বই অনেকের কাছে একজন চিত্রশিল্পীর চিন্তা প্রচার করে। আমাদের কালের সেরা প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। স্যারের প্রচ্ছদে বইয়ের মর্মবস্তুর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠত। হাশেম খানও প্রচুর নান্দনিক প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছেন। পরবর্তী সময় আমাদের ছাত্ররা দারুণ সব প্রচ্ছদ করেছে, এখনো করছে। কেউ কেউ কম্পিউটারের গ্রাফিকসের সহায়তায় এ শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন। আমি এখন নিয়মিত কালি ও কলম পত্রিকায় এবং অনিয়মিতভাবে দু-একটি দৈনিকে ইলাস্ট্রেশন করি।

 

এখন কোন ধরনের কাজ করছেন?

আমার ক্যানভাসে বাংলার লোকজ জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। স্থান পেয়েছে ময়মনসিংহ গীতিকা, পুঁথিসহ বিভিন্ন বিষয়। বিভিন্ন সময় সিরিজ কিছু কাজ করেছি। অতি সম্প্রতি একটি সিরিজ আঁকা শেষ করলাম। এগুলো একেবারে নতুন আঙ্গিকে আঁকা হয়েছে। বয়স বাড়লে ভাবনাগত পরিবর্তন আসে। ছবি পরিণতি লাভ করে। এ ছবিগুলো একটু ব্যতিক্রম। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে শিশুদের উপযোগী অনেক ছবি এঁকেছি। বইয়ের লেখার পাশাপাশি ছবি, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তিনটি পেইন্টিং করলাম। এখন আঁকছি ময়মনসিংহ গীতিকার ওপর নতুন ধরনের কিছু ছবি।

 

আপনি আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন...

আমার ক্ষুদ্র জীবন। এখন বয়স হয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতাগুলো টুকে রেখেছিলাম। আমার ছেলেবেলা, মা-বাবা, গুরুজন, শিক্ষক; ঢাকা আর্ট কলেজ, চট্টগ্রাম ও বড়দায় আমার শিল্পশিক্ষা ও কর্মজীবনের স্মৃতি, ছবি আঁকার নানা পর্যায় সব কিছু এ বইয়ে স্থান পাবে। এটাকে ঠিক আত্মজীবনী বলা যাবে কি না জানি না। তবে জীবনকথা বলা যেতে পারে। সে জীবনকথার কয়েকটি পর্ব এরই মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কিন্তু পাণ্ডুলিপি এখনো শেষ হয়নি। আরো একটু সময় লাগবে। অন্যদিকে আমার চিত্রচর্চার বিভিন্ন পর্বের একটি বিশদ বইয়ের পরিকল্পনা চলছে। ছবি বাছাই করছি। কবি তারিক সুজাত ও তাঁর প্রকাশনী সংস্থা বইটি প্রকাশের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছে। এ কাজটি হয়তো আগে শেষ করব।

 

তরুণ শিল্পীদের প্রতি আপনার উপদেশ কী?

উপদেশ নয়, পরামর্শ আছে। আমি মনে করি, আমাদের তরুণ শিল্পীরা অনেক মেধাবী। আমরা যখন ছবি আঁকতে শুরু করি, তখন প্রযুক্তি আমাদের হাতের কাছে ছিল না। ওদের সামনে প্রযুক্তি আছে। ওরা চাইলে পৃথিবীর যেকোনো শিল্পীর শিল্পকর্ম এক মুহূর্তে দেখতে পারে। তাদের শিল্পশৈলী স্টাডি করতে পারে। তাদের চিন্তার ক্ষেত্র উন্মুক্ত। এ ক্ষেত্রে অন্যের কাজে সহজেই প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সুতরাং নিজস্ব শিল্পভাষা তৈরি করতে হলে দেখতে হবে প্রচুর, নিজের দেশ, সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করতে হবে। আমরা ছবি আঁকার জন্য ভালো রং, কাগজ, ক্যানভাস পাইনি। কিন্তু এখন বিশ্বসেরা রং, কাগজ, ক্যানভাস হাতের নাগালে। তরুণদের ছবির বাজার উন্মুক্ত। বাংলাদেশে ছবির যে বাজার সেখানে তাদের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে হবে। এখন এশিয়া বিয়েনাল হচ্ছে। এটা বিরাট সম্মানের। আমাদের সম্ভাবনা বিশাল। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সম্মান আরো বাড়াতে হবে।

 

আপনার শিল্পীজীবনে অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পান

শিল্পী যামিনী রায়, কে জি সুব্রামানিয়ান, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী—এ রকম বেশ কিছু শিল্পী বিভিন্ন সময়ে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। কে জি সুব্রামানিয়ান আমাকে বলেছিলেন, তোমার যদি বুদ্ধি থাকে, দেশপ্রেম থাকে তাহলে তুমি ছবি আঁকতে পারবে নতুবা পারবে না। ওই কথাটা এখনো আমার মনে গেঁথে আছে। কে জি এক অসাধারণ ব্যক্তি। সাধারণ স্যান্ডেল, খদ্দরের পাঞ্জাবি পরতেন। বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে থাকতেন। কোনো গাড়ি ছিল না। অসংখ্য অসচ্ছল ছাত্রকে তিনি সহযোগিতা করেছেন। নিজে অতি সাধারণ জীবনযাপন করে অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতেন। এ কাজ যে কেউ পারে না। তাঁর রুচি, দেশপ্রেম আমাকে ভাবিয়ে তুলত বারবার। তিনি ইচ্ছা করলেই রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারতেন। তাঁর মতো মহৎ শিল্পী ভারতে দ্বিতীয় কেউ নেই। মানুষটি আজ বেঁচে নেই। তাঁর শিল্পকর্ম আছে। ভারতীয় চিত্রচর্চার ইতিহাসে তিনি অমর, অক্ষয় হয়ে থাকবেন। তাঁর শিল্পকর্মের মৌলিকত্ব, ব্যক্তিত্ব, সততা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আসলে দেশ, প্রকৃতি ও মানুষ শিল্পীদের মূল প্রেরণা। গোটা শিল্পীসমাজ সর্বত্রই দেশের স্বার্থে কাজ করে। তাঁরা দেশকে নিয়ে চিন্তা করে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে পটুয়া কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, মোহাম্মদ কিবরিয়া কিংবা কাইয়ুম চৌধুরী প্রত্যেকেই তাঁদের শিল্পকর্মে দেশকে তুলে ধরেছেন। বড়রা আমাদের পথ দেখিয়েছেন। সেসব গুরুশিল্পীর প্রতি আমৃত্যু শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।

 

এ বছর কোনো একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর পরিকল্পনা রয়েছে কি না?

একটি গ্যালারি আমার একক একটি প্রদর্শনী করতে চায়। সে জন্য নতুন আঙ্গিকে কিছু ছবি আঁকছি।

 

আপনার পরিবারের কথা বলুন।

স্ত্রী ফরিদুন নাহার, গৃহিণী। এক ছেলে, এক মেয়ে—শাফায়াত জামিল ও ফারহা তানি।

 

অবসরে কী করেন

অবসর বলে কিছু নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পর আবার সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছি। ছাত্রদের ক্লাস নিতে যাই। নতুন ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে কথা বলি। ওদের কাজ দেখি। চিন্তা বিনিময় করি। ওদের কাজ আমাকে বিশেষ অনুপ্রাণিত করে। বাসায় ফিরে ছবি আঁকি। ডুবে থাকি ছবি আঁকায়। জীবনে আর কিছু চেষ্টা করিনি। একজন সামান্য শিল্পী হতে চেয়েছি।

উত্তরা, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা