kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

আমরা সবাই দায়ী

ছটকু আহমেদ। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, চিত্রনাট্যকার, কাহিনি ও সংলাপ রচয়িতা। তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনি ও সংলাপ লিখেছেন; এখনো লিখছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ২১ মিনিটে



আমরা সবাই দায়ী

আপনি বড় হয়েছেন কোথায়?

পৈতৃক ভিটা বিক্রমপুর হলেও আমার জন্ম পুরান ঢাকার নারিন্দায়, ৬ অক্টোবর ১৯৪৬ সালে। বাবা সারফুদ্দীন আহমেদ ছিলেন সিভিল ডিফেন্সের ট্রেনিং অফিসার। তাঁর চাকরিসূত্রে নানা জায়গায় থেকেছি। মা জোহরা খান বেগম ছিলেন নারায়ণগঞ্জ গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা। আমার বেড়ে ওঠার বেশির ভাগ সময় নারায়ণগঞ্জেই কেটেছে।

স্কুলজীবনে নাটক করতেন?

নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান, শমসের আহমেদ আর আমি—একসঙ্গেই পড়তাম। স্কুলজীবনে আমরা নাটকের দল ‘সুরভী নাট্যসংঘ’ বানিয়েছিলাম। সেটির হয়েই ১৯৬২ সালে প্রথম নাটকের নির্দেশনা দিই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’। কঠিন নাটক ছিল। শুরুতে বড় বড় ডিরেক্টরদের ধরেছিলাম। কেউ রাজি না হওয়ায় বন্ধুরা আমাকে বলল, ‘তুই-ই ডিরেকশন দে।’ এরপর একের পর এক নাটক পরিচালনা করেছি। ১৯৬৪ সালে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হলাম ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে।

পলিটেকনিকের দিনগুলো কেমন ছিল?

ঢাকা পলিটেকনিকের প্রথম নাটকটি আমি ডিরেকশন দিয়েছি—নারায়ণ ঘোষের ‘পরিণতি’। এখানে পড়ার সময় বিখ্যাত নাট্যপরিচালক তো ছিলামই, ইন্টার ইস্ট পাকিস্তান ইনস্টিটিউট প্রতিযোগিতার টেবিল টেনিসের সিঙ্গেলস ও ডাবলসে এবং দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। ক্রিকেট খেলতাম সেকেন্ড ডিভিশন লিগে। ব্যাডমিন্টনও দারুণ খেলতাম। দাবায় নারায়ণগঞ্জের লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি ছয়বার। তা ছাড়া ছায়ানাটিকা করতাম। মানে, সামনে বসে গান গাওয়া আর পেছনে ছায়ার মাধ্যমে অভিনয় করা। পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়েছি ১৯৬৭ সালে। এরপর বিশেষ করে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রচুর ছায়ানাটিকা করেছি। বন্ধুরা আমাকে বসিয়ে দিয়ে বলত, ‘লিখ’। আমি লিখতাম, ডিরেকশনও দিতাম। আর চাকরিতে ঢুকেছি ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে, একটি সরকারি সংস্থার সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ দিয়ে চলচ্চিত্রে এসেছেন?

চাকরিতে সেকশন অফিসার পদে আমার যখন ঠাকুরগাঁওয়ে পোস্টিং, ওখানেও অনেক নাটক করেছি। এ সময়ই একদিন ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞপ্তি দেখি, ঋত্বিক ঘটককে দিয়ে হাবিবুর রহমান খান একটি ছবি বানাবে, সেই ছবির জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর লাগবে। পরের দিন হাবিব আমাকে ফোন করে বলল, ‘তুই চলে আয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হবি।’ চলে এলাম। প্রথম সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক ঘটককে বললাম, ‘আমি তো ফিল্মের কিছু জানি না...।’ তিনি বললেন, ‘জানা লাগবে না! কাজ করতে করতে সব শিখে যাবে।’ কাজ করতে গেলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে। একটা লঞ্চ ভাড়া করে পুরো ইউনিট সেটির ভেতরেই ছিলাম। এদিকে আমি যেহেতু সরকারি চাকরি করি, বাইরে কাজ করতে হলে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি তো নেওয়া হয়নি। আমার প্রাতিষ্ঠানিক নাম কিন্তু সৈয়দ উদ্দীন আহমেদ। এই নাম তো চলচ্চিত্রে ব্যবহার করতে পারব না। কী করব? বাবা আমাকে ‘ছোটকা’ ডাকতেন। সবাই মিলে আমার নাম ঠিক করা হলো—ছোটকা আহমেদ। কিন্তু শুনতে ভালো লাগে না। তাই সৈয়দ হাসান ইমাম নামের সংশোধন করে দিলেন—ছটকু আহমেদ। এ নামেই চলচ্চিত্রে ঢুকলাম। চাকরি করি আর চলচ্চিত্র করি। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর পুরো কাজটি অবশ্য আমি করতে পারিনি। প্রথম লটের শুটিং শেষ হওয়ার পর চাকরিতে ফিরে গেলাম। কারণ ঋত্বিক ঘটকের অগোছালো কাজ আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। আমি তো শেখার উদ্দেশ্যে এসেছিলাম, শেখাটা ঠিকমতো হচ্ছিল না।

চলচ্চিত্রে নিয়মিত হলেন কখন?

এরপর হাবিব আরেকটি ছবি শুরু করল বেবী ইসলামকে দিয়ে—‘চরিত্রহীন’। সেই ছবিতে আমাকে আবার ডাকল। তত দিনে আমি ঢাকায় বদলি হয়ে এসেছি ডিএনডি (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা) প্রজেক্টের সেকশন অফিসার হিসেবে। এ সময় হাবিব একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলল—‘শাওন সাগর লিমিটেড’। আমি, ফখরুল হাসান বৈরাগী, তমিজ উদ্দীন রিজভী, আখন্দ সানোয়ার মোরশেদ, শমসের আহমেদ, আওলাদ হোসেন চাকলাদার, এ জে মিন্টু—এই সাতজন ছিলাম এটির ডিরেক্টর। চলচ্চিত্রকার মহীউদ্দিন ছিলেন চেয়ারম্যান। সৈয়দ হাসান ইমামের তখন আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও আমাদের সঙ্গে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন। আমরা পরিকল্পনা করলাম, ছয়জন ডিরেক্টরের প্রত্যেকেই বাই-রোটেশনে ছবি ডিরেকশন দেব, বাকি পাঁচজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করব। প্রথম সিনেমা বানালাম বৈরাগীকে দিয়ে—‘সেয়ানা’। অলিভিয়া আর প্রবীর মিত্র নায়ক-নায়িকা। বিখ্যাত ফিল্ম এডিটর আতিকুর রহমান মল্লী সেটির স্ক্রিপ্ট রেডি করেছিলেন। আমরা একটা হোটেলে বসে সেটি পড়লাম। তত দিনে অনেক নাটক লিখেছি, কিন্তু সিনেমার স্ক্রিপ্ট তো করিনি। সে-ই প্রথম আমি দেখলাম—ফিল্ম স্ক্রিপ্ট কী জিনিস।

প্রথম চিত্রনাট্য কবে লিখলেন?

‘সেয়ানা’ ফ্লপ করার পর হাবিব বলল, ‘আরেকটা ছবি করার মতো টাকা নেই। কী করি?’ আমি বললাম, ‘নাটক করি?’ মহিলা সমিতিতে নাটক করলাম—‘আলোকিত অন্ধকার’। যথারীতি নির্দেশনার দায়িত্ব আমার ওপর। এ জে মিন্টু, বৈরাগী—আমাদের লোকেরা সবাই অভিনয় করবে। রোজিনা নামের এক নায়িকাকে নিয়ে আসা হলো। দর্শনীর বিনিময়ে আমার প্রথম নাটক। পাঁচ রজনী নাটকটির পরিবেশনা করতে পেরেছিলাম। কারণ রোজিনা তখন ছবি করবে। হাবিব বলল, ‘চলো, ছবি করা যাক।’ দুই হাজার, তিন হাজার করে নিজেদের হাত খরচের টাকা জমিয়ে আমরা আবার ছবি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। বৈরাগীর পর এ জে মিন্টুর পালা। তিনি একটি ছবির আইডিয়া করলেন—‘মিন্টু আমার নাম’। ‘জনি মেরা নাম’ নামের একটি বলিউডি ছবি থেকে নামটি নিয়েছিলেন। আমাকে গল্পের আইডিয়া শুনিয়ে বললেন, ‘আপনি স্ক্রিপ্টটা লিখে দেন।’ বললাম, ‘আমি তো কখনো স্ক্রিপ্ট লিখিনি।’ বললেন, ‘আপনাকেই লিখতে হবে। অন্য কাউকে দিলে সে হয়তো ইন্ডিয়ান ছবিটা দেখে এসে নকল করবে। আমি নকল চাচ্ছি না।’ লিখলাম। ছবিটা বাম্পার হিট হলো। আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান একটু আলোর মুখ দেখল। যাহোক, সেই ছবিতে শুরুতে রোজিনাকে নায়িকা করা হলেও তাঁকে যাঁরা চলচ্চিত্রে এনেছিলেন সেই ‘গডফাদাররা’ চুক্তিবদ্ধতার দোহাই দিয়ে আটকে দিলেন। আমরা রোজিনার বদলে ববিতাকে নিলাম।

আপনি নির্দেশনা দিলেন কখন?

এর পর আরেকজনের ছবি করার কথা থাকলেও এ জে মিন্টুকে দিয়েই আরেকটি ছবি করানো হলো—‘প্রতিজ্ঞা’। এটাও আমার লেখা। এটাও বাম্পার হিট। এরপর  সৈয়দ শামসুল হকের স্ক্রিপ্টে তমিজ উদ্দীন রিজভী ছবি বানালেন ‘ছোট মা’। বিধায়ক ভট্টাচার্যের লেখা বিধবা বিবাহের ওপর একটি গল্প অবলম্বনে ১৯৮২ সালে আমি বানালাম আমার জীবনের প্রথম ছবি ‘নাত বৌ’। রাজ্জাক-ববিতা তখন সুপার কাস্ট। সুধীজনরা খুবই প্রশংসা করলেন। তত দিনে ছবির লাইনে মোটামুটি চলে এসেছি। আমার স্ক্রিপ্টের খুব ডিমান্ড। কিন্তু ‘শাওন সাগর লিমিটেড’-এর নিয়ম ছিল, এই ইউনিটে থাকাকালীন বাইরে কোনো কাজ করা যাবে না। তাই স্ক্রিপ্ট লেখার অনেক অফার পেলেও ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু এ জে মিন্টু ইউনিট ছেড়ে চলে গেলেন মির্জা খালেকের ‘প্রতিহিংসা’ ছবিটি পরিচালনা করতে। বৈরাগীও বের হয়ে গেলেন। কারণ তিনি ডিরেক্টর হয়ে যাওয়ার পর অ্যাসিস্ট্যান্সি করাটাকে সমুচিত মনে করেননি। রয়ে গেলাম আমি, তমিজ উদ্দীন রিজভী...এরা।

রাজ্জাকের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা?

‘নাত বৌ’ যখন করি, সবাই বলেছিল, “রাজ্জাক সাহেবকে নিয়ে ছবি করবেন? জানেন, রাজ্জাক সাহেব কয়েক দিন আগে কী করেছেন? দীলিপ বিশ্বাস একটি সেট বানিয়েছিলেন বেঙ্গল স্টুডিওতে। রাজ্জাকের সেটি পছন্দ হয়নি, তাই বলে এসেছেন—‘আমি শুটিং করব না। এটা ভেঙে ফেলেন।’ শুটিং প্যাকআপ হয়ে গেছে। প্রচুর লস। আপনি নতুন ডিরেক্টর। তাঁকে সামলাতে পারবেন?”  এসব শুনে আমি একদিন সকালবেলা রাজ্জাক ভাইয়ের বাসায় গিয়ে বললাম, ‘রাজ্জাক ভাই, শুনেছি আপনি নাকি ৭টা-৮টার শুটিংয়ে ১২টায় আসেন? ইচ্ছে হলে আসেন না, ইচ্ছে হলে সেট ভেঙে দেন? আমার সেটে কখন আসবেন?’ ‘আপনি কখন চান?’ তখন ৮টা থেকে শিফট শুরু হতো। বললাম, ‘৮টায় তো শুটিং শুরু হয়, আপনি ৯টায় আসেন?’ ‘আমি ৯টায় তো পারব না, ১০টায় মেকআপ নিয়ে আপনার সেটে হাজির থাকব।’ বিশ্বাস করুন, যত দিন শুটিং করেছি, তিনি ঠিক ১০টায় হাজির হয়েছেন। সেটে এসেই অন্যদের ওপর এমন খবরদারি করতেন, যেন নতুন ডিরেক্টর হিসেবে আমাকে কেউ অবহেলা করতে না পারে।

এরপর আর কী কী চলচ্চিত্র করেছেন?

‘নাত বৌ’র পর একটা পোশাকি ছবি বানালাম অঞ্জু ও ওয়াসিমকে নিয়ে, ‘রাজদণ্ড’। তখন পোশাকি ছবির খুব চল ছিল। এরপর ‘গৃহবিবাদ’, ‘অত্যাচার’, ‘চেতনা’ বানালাম। মাঝখানে ‘মায়া-মমতা’ বানিয়েছিলাম রেহানা (এখন মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন) নামের এক নতুন নায়িকা আর সুজন নামের এক নতুন নায়ককে নিয়ে। কোনো ডিস্ট্রিবিউটর পাইনি। এর পরের ছবি ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ বাম্পার হিট হলো। পরে ‘বুকের ভেতর আগুন’, ‘মিথ্যার মৃত্যু’, ‘বুক ভরা ভালোবাসা’, ‘বর্ষা বাদল’, ‘শেষ যুদ্ধ’, ‘মহা তাণ্ডব’, ‘আজকের রূপবান’ এবং সর্বশেষ ২০০৫ সালে ‘প্রতিবাদী মাস্টার’ বানিয়েছি।

‘সত্যের মৃত্যু নেই’-এর গল্প?

‘মায়া-মমতা’র ডিস্ট্রিবিউটর না পেয়ে অনেক টাকা লস হয়েছে। তখন এ জে মিন্টুর এক শুটিংয়ে গিয়েছি কক্সবাজারের রামু পাহাড়ে। এ সময় প্রডিউসার পানাউল্লাহ আহমেদ সেখানে গিয়ে হাজির। বললেন, ‘হাজি সাহেব পাঠিয়েছেন।’ হাজি সাহেব মানে যমুনা ফিল্মসের শফি বিক্রমপুরীর বড় ভাই। হাজি সাহেব তখন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ডমিনেট করতেন। তিনি আমাকে দিয়ে ‘দেনমোহর’ ছবির কাহিনি লেখিয়েছিলেন। সালমান শাহর সেই ছবি বাম্পার হিট হয়। এর পর থেকে হাজি সাহেব আমাকে খুব সমীহ করতেন। পানাউল্লাহ সাহেব বললেন, ‘আপনাকে দিয়ে ছবি করাতে চাই। কত টাকা নেবেন?’ বললাম, ‘হাজি সাহেব যেহেতু আপনাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর কাছ থেকেই জেনে নেবেন। কিন্তু গল্পটা কী হবে?’ ‘আপনি যদি আপত্তি না করেন, একটা আইডিয়া দিতে চাই।’ ‘দেন।’ ‘মা দেখেছে তার সন্তান একটি খুন করেছে। মায়ের সাক্ষ্যতে সন্তানের ফাঁসি হয়। কিন্তু সন্তান খুনটি করেনি।’ ব্যস, এটুকুই। আমার পছন্দ হলো।

শমী কায়সারের অভিনয় করার কথা ছিল?

সালমানকে যখন নিলাম, সে বলল, ‘নায়িকা কাকে নেবেন?’ সবাই সালমান-শাবনূর জুটির খুব ভক্ত। এই জুটিকে নিয়ে আমাদের গ্রুপের ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ও ‘তুমি আমার’ও বাম্পার হিট হয়েছিল। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ আমারই লেখা। আমরা ভেবেছিলাম শাবনূরকে নেব। সালমান বলল, ‘শমী কায়সারকে নেন, আংকেল।’ ‘কেন?’ ‘ওর সঙ্গে একটা নাটক করেছি; খুব ভালো অভিনয় করে।’ ‘শমী কায়সার করবে?’ ‘আমি ওর সঙ্গে আলাপ করেছিলাম। আপনি বললে করবে।’ সালমানকে সঙ্গে নিয়েই শমীর বাসায় গেলাম। তাঁর মা অধ্যাপিকা পান্না কায়সার গল্পটা শুনতে চাইলেন। শোনালাম। পছন্দ করলেন। বললেন, ‘আমাকে একটা দিন ভাবতে দিন।’ বললাম, ‘আপনি সাত দিন ভাবেন। তারপর আমাকে জানিয়েন।’ এর মধ্যে ‘চিত্রালী’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় বড় বড় শিরোনামে খবর ছাপা হলো, ‘শমী কায়সার ছটকু আহমেদের ছবি করছেন।’ সাত দিনের দিন পান্না কায়সার আমাকে ফোন করে একা বাসায় যেতে বললেন। যাওয়ার পর বললেন, ‘আমি কিছুদিন আগে রাজবাড়ী গিয়েছিলাম। এক সিনেমা হলের সামনে একটা ব্যানার দেখেছি, কী যে বিচ্ছিরি ব্যাপার। মেয়েটাকে এত বাজেভাবে এঁকে রেখেছে। আমার স্বামীর (শহীদুল্লা কায়সার) এত নাম। আমার মেয়ের যদি এমন ছবি আঁকে, কী হবে, বলেন?’ আমি বললাম, ‘আমার ছবিতে তো এ রকম কোনো স্কোপ নেই।’ ‘আপনার ছবিতে নেই কিন্তু পোস্টার যারা আঁকে, কী সব যে করে! তখন আমার মানসম্মান কোথায় যাবে, বলেন? আমি চাই না আমার মেয়ে ছবিটা করুক।’ বললাম, ‘আপনি না চাইলে আমিও শমীকে নেব না।’ পরে শাহনাজকে নেওয়া হলো।

মায়ের চরিত্রে শাবানাকে নিতে ভোগান্তি হয়েছে?

শাবানা তখন সুপারহিট নায়িকা। জসীম, আলমগীর—এঁদের সঙ্গে একের পর এক ছবি করছেন। শাবানা ছাড়া এঁদের সঙ্গে জুটি হওয়ার মতো কোনো নায়িকা নেই। সবাই আপত্তি করল—‘শাবানাকে দিয়ে মা চরিত্র করালে আমরা কাকে নায়িকা বানাব?’ বললাম, ‘মা তো এই ছবির মেইন ক্যারেক্টার।’ বলল, ‘না, না, বাংলাদেশের দর্শকদের চেনেন না? মা চরিত্র করে ফেললে নায়িকা হিসেবে আর গ্রহণ করবে না।’ আমাকে মানাতে না পেরে সবাই শাবানা ও তাঁর স্বামী ওয়াহিদ সাদিককে ধরল। শাবানা আমাকে কখনো তুই, কখনো তুমি, কখনো আপনি করে বলতেন। শাবানা বললেন, ‘আমি করব না রে ছটকু!’ ‘কেন করবি না?’ ‘একবার মা হয়ে গেলে সবাই মা চরিত্রই দেবে। আর আমার যদিও ইচ্ছে ছিল কিন্তু সাদিক সাহেব নারাজ।’ সাদিক সাহেব খুব খেপে গেলেন, ‘আপনি আমার বউরে কী সব মা-টা বানাচ্ছেন?’ বললাম, ‘না করুক কিন্তু গল্পটা তো শুনুন? গল্প শুনে মানা করে দিলে আমি প্রডিউসারকে জানাতে পারব।’ শাবানা একদিন গল্প শোনার জন্য দাওয়াত দিলেন। গেটে আমাকে দেখেই সাদিক সাহেব খেপে গেলেন, ‘আবার আপনি এসেছেন?’ বললাম, ‘শাবানা আমাকে আসতে বলেছে।’ ‘অ্যাই, তুমি ওনাকে আসতে বলেছ?’ শাবানা বললেন, ‘হ্যাঁ, ছটকু ভাই আসেন...।’ আমাকে খাবারের টেবিলে বসিয়ে শাবানা বললেন, ‘ছটকু ভাই, আমি এই ছবি করব না। যদি করি সাদিক, জসীম, আলমগীর...সবাই খেপে যাবে।’ তবু গল্প শুনতে রাজি করালাম ওকে। খেতে খেতে, গল্প শুনতে শুনতে শাবানা অধীর আগ্রহী হয়ে উঠলেন। একপর্যায়ে চোখের পানি ছেড়ে দিলেন তিনি। বললেন, ‘আমি করব।’ সাদিক সাহেব বললেন, ‘তুমি করলে জানো না কী হবে?’ শাবানা বললেন, ‘যা-ই হোক, আমি করবই।’ প্রতিদিন শুটিংয়ে তিনি সময়মতো সেটে আসতেন, মন দিয়ে কাজ করতেন। অনেক সহযোগিতা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি।

 

কিছুদিন ধরেই শিডিউল ফাঁসানো নিয়ে সালমানের বেশ সমালোচনা চলছিল। আমাকে একদিন ডেকে নিয়ে বলল, ‘আংকেল, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনার শিডিউল ঠিকমতোই পাবেন।’ ‘বুকের ভেতর আগুন’-এর শুটিং যখন অর্ধেক শেষ, আমি একদিন (৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬) বাসায় বসে টিভিতে ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলা দেখছি। সেদিন আবার আমার স্ত্রীর জন্মদিন। ঠিক করেছি বাসায়ই থাকব। এর মধ্যে আমার ব্যাবসায়িক অংশীদার ও তখনকার প্রযোজক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আখন্দ সানোয়ার মোরশেদ বাসায় এসে আমাকে বলল, ‘কী করো ছটকু?’ ‘খেলা দেখছি।’ ‘তুমি তো খেলার পাগল। সালমানের শুটিং কবে তোমার?’ ‘কেন? ও তো শিডিউল দিয়েছে অমুক তারিখে।’ ‘ও কি তোমার শিডিউল ঠিক রাখবে?’ ‘কেন ঠিক রাখবে না?’ ‘নাহ! ও তোমার শিডিউলে এবারও ঘাপলা করবে।’ ‘ঘাপলা করবে কেন?’ ‘মনে করো, তোমার শুটিং সে করল না?’ ‘ইয়ার্কি মেরো না তো! যা বলার, সরাসরি বলো।’ বলল, ‘সালমান মারা গেছে!’ আমি স্বাভাবিকভাবেই নিলাম। বললাম, ‘কী সব ইয়ার্কি করো? আসো, খেলা দেখি।’ একটু পর দেখি টেলিভিশনের স্ক্রলে ভেসে উঠল—‘সালমান শাহ আর নেই!’

 

সালমান শাহর ফাঁসির দৃশ্য...

এফডিসির এক নম্বর ফ্লোরে ফাঁসির দৃশ্যের সেট। সালমান বলল, ‘আমার স্ত্রী, পরিবারের লোকজন আসবে শুটিং দেখতে।’ বললাম, ‘আসুক। তোর গলায় রশি পরালেই হবে, সামনে থেকে শট নেব।’ সালমান বলল, ‘আপনি তো ফাঁসি দেখেননি। ফাঁসিতে আসামির হাত পেছন থেকে বেঁধে দেয়, দুই পা একসঙ্গে বেঁধে দেয়, তা না হলে তো সে রশি খুলে ফেলতে চাইবে।’ বললাম, ‘ক্যামেরার সামনে থেকে তো দেখা যাবে না। তুই হাত দুটো পেছনে রাখলেই তো চলে। বাঁধার কী দরকার? পা তো ফ্রেমে থাকছে না।’ বলল, ‘না, না, আমার তাহলে এক্সপ্রেশন আসবে না।’ আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যদি কোনো কারণে ফাঁস লেগে যায়? বললাম, ‘সালমান, আমি তো সাহস পাচ্ছি না!’ বলল, ‘আপনি বসেন তো! ওনাকে কেউ চেয়ার দাও!’ সে নিজে রশি এনে হাত-পা বাঁধাল, তারপর প্রস্তুত হয়ে বলল, ‘এবার শট নেন।’ সালমান সব সময়ই এ রকম পারফেকশন খুঁজত। দৃশ্যটির প্রতি ওর এত বেশি প্রেম কেন হয়েছিল, আমি বুঝিনি। পরে যখন শুনলাম, এভাবেই গলায় ফাঁসি দিয়ে ও মারা গেছে, তখন খুব খারাপ লাগল। ওর মৃত্যুর সাত দিন পর ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল।

‘বুকের ভেতর আগুন’?

কিছুদিন ধরেই শিডিউল ফাঁসানো নিয়ে সালমানের বেশ সমালোচনা চলছিল। আমাকে একদিন ডেকে নিয়ে বলল, ‘আংকেল, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনার শিডিউল ঠিকমতোই পাবেন।’ ‘বুকের ভেতর আগুনে’র শুটিং যখন অর্ধেক শেষ, আমি একদিন (৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬) বাসায় বসে টিভিতে ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলা দেখছি। সেদিন আবার আমার স্ত্রীর জন্মদিন। ঠিক করেছি বাসায়ই থাকব। এর মধ্যে আমার ব্যাবসায়িক অংশীদার ও তখনকার প্রযোজক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আখন্দ সানোয়ার মোরশেদ বাসায় এসে আমাকে বলল, ‘কী করো ছটকু?’ ‘খেলা দেখছি।’ ‘তুমি তো খেলার পাগল। সালমানের শুটিং কবে তোমার?’ ‘কেন? ও তো শিডিউল দিয়েছে অমুক তারিখে।’ ‘ও কি তোমার শিডিউল ঠিক রাখবে?’ ‘কেন ঠিক রাখবে না?’ ‘নাহ! ও তোমার শিডিউলে এবারও ঘাপলা করবে।’ ‘ঘাপলা করবে কেন?’ ‘মনে করো, তোমার শুটিং সে করল না?’ ‘ইয়ার্কি মেরো না তো! যা বলার, সরাসরি বলো।’ বলল, ‘সালমান মারা গেছে!’ আমি স্বাভাবিকভাবেই নিলাম। বললাম, ‘কী সব ইয়ার্কি করো? আসো, খেলা দেখি।’ একটু পর দেখি টেলিভিশনের স্ক্রলে ভেসে উঠল—‘সালমান শাহ আর নেই!’ এরপর একের পর এক ফোন আসতে থাকল। আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। কোথাও গেলাম না। সেই যে থ মেরে বাসায় বসলাম, বেশ কিছুদিন বের হইনি।

‘বুকের ভেতর আগুন’-এর সমাধান?

অর্ধেক শুটিং হয়েছে, বাকি অর্ধেক কিভাবে শেষ করব? সালমান শাহর অসম্পন্ন ছবিগুলোতে অনেকেই ডামি ব্যবহার করেছে। আমি সেটা করতে চাইলাম না। একসময় প্লাস্টিক সার্জারির আইডিয়া মাথায় এলো। একটা দৃশ্য লিখলাম। সালমানের মুখ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। যেহেতু গ্রামের ছেলে, ওর মায়ের কাছে ওর কোনো ছবি নেই, ডাক্তার প্লাস্টিক সার্জারি করার পর ওর চেহারা পাল্টে যাবে। সেই চেহারায় যদি অন্য একটা হিরো আসে, তাহলে গল্পটা নষ্ট হবে না। সালমানই গল্প শেষ করবে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে বলবে—‘এটা কে?’ কিন্তু এই চরিত্রে কে অভিনয় করবে? ভাবলাম, সালমান শাহর তখন যা ক্রেজ, সেটিকে ওভারকাম করতে হলে তাঁর চেয়েও বড় তারকা লাগবে। তা না হলে দর্শক গ্রহণ করবে না। বলিউডের সালমান খানকে চিঠি লিখলাম। জানি না চিঠিটা পৌঁছেছিল কি না, তবে কোনো সাড়া পাইনি। কিন্তু কাকে নেব? এফডিসির এক সেটেই সোহানুর রহমান সোহানের শুটিং চলছিল। সোহান এক ছেলেকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ফেরদৌস নাম। সুযোগ খুঁজছে। তাকে পরের দিন আমার অফিসে আসতে বললাম। এলো। দেখি তার সামনের একটা দাঁত একটু ফাঁকা। বললাম, ‘দাঁত ট্রিমিং করলে ফাঁকটা যাবে?’ ‘হ্যাঁ, যাবে।’ ‘কত লাগে?’ ‘দুই হাজার টাকা।’ পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বললাম, ‘দাঁত ঠিক করে নিয়ে আসো। আমার একটা ছবি আছে। সালমান শাহর বদলে অর্ধেকটা করবে। যদি রাজি থাকো...।’ ফেরদৌসকে নিয়েই ছবিটা শেষ করলাম। টাকা উঠে গেছে, তবে ছবিটা ভালো চলেনি।

চলচ্চিত্রের রমরমা অবস্থা দেখেছেন, বিপর্যয়ও দেখেছেন। বিপর্যয়ের কারণ কী?

নদীর ভাঙন থেকে বাঁচার জন্য বাঁধ দিতে হয়। আমাদের চলচ্চিত্রের ভাঙনে সেই বাঁধ কেউ দেয়নি। চলচ্চিত্র যখন ভাঙতে শুরু করল, তাতে কিছু বড় তারকারও দায় আছে। তাঁরা অনেকেই সময়মতো শুটিংয়ে আসতেন না। সেটের পর সেট পড়ে থাকত। লস হতো। তখন চলচ্চিত্রের কিছু লোক ভাবল, শর্টকাটে কিভাবে ছবি করা যায়। তখন তারা নগ্নতাকে উপজীব্য করল। নগ্নতা আসার জন্য বড় বড় শিল্পীরা বিরক্তিকর একটি সিচুয়েশন তৈরি করে গেছেন। তখন ‘কাটপিস’ শব্দটা চলে এলো ফিল্মে। কাটপিস ব্যবসা তখন রমরমা। হলের মালিকরা এদিকে ঝুঁকে পড়ল। থার্ড পার্টি ব্রোকাররা লাভবান হলো। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘ম্যানেজ’ করে কাটপিস চালাতে থাকল। এই ম্যানেজ করতে করতেই চলচ্চিত্রে ধস নামিয়ে আনল। ভালো ডিরেক্টররা, প্রডিউসাররা সিনেমা বানানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। কারণ এদের সঙ্গে কম্পিটিশনে পারছে না। ভালো ছবির জন্য আরেকটি বাধা হয়ে এলো ভিডিও পাইরেসি। কারণ এগুলো পাইরেটেড হতো;  ঘরে বসে সপরিবারে লোকে দেখত। তাই সিনেমা হলে এই ছবিগুলো দুয়েক দিনের বেশি চলত না। দুই দিক দিয়ে ভালো সিনেমা মার খেল। এ ছাড়া এ সময় আরেকটি ধারা এলো। আপামর জনগণের কথা মাথায় না নিয়ে ৫-১০ শতাংশ দর্শকদের জন্য ‘আর্ট সিনেমা’ বানানো শুরু করল। ৯০ শতাংশ দর্শক, যাদের বেশির ভাগই খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের মূল বিনোদন মাধ্যম সিনেমা—এই ডিরেক্টরদের ছবি তারা বোঝেই না! নগ্নতার দিকে এই দর্শকদের ঝুঁকে যাওয়ার এটিও একটি কারণ। নগ্নতার এই জোয়ারে ভালো ছবি, ভালো লোক...সব ভেসে গেল। এই ভেসে যাওয়া ছিল অন্যায়। তাঁরা যদি ‘ছবি চলে না’র দোহাই না দিয়ে আরো ছবি বানাত, তাহলে এই ক্রাইসিস তৈরি হতো না। এই ক্রাইসিসের জন্য খারাপ ডিরেক্টররা তো দায়ীই, ভালো ডিরেক্টররাও দায়ী; আমরা সবাই দায়ী। আমরা যদি সবাই মিলে ধাক্কা দিতাম—এগুলো চলতে দেব না, সেন্সর বোর্ড যদি তখন স্ট্রং হতো, ভিডিও পাইরেসি বন্ধে যদি সত্যিকার অর্থেই পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তাহলে বিপর্যয় ঠেকানো যেত।

উত্তরণের পথ দেখেন?

বাঙালির স্বভাবেই আছে—মার খেয়ে খেয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বিদ্রোহ করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ খেয়াল করুন? আমার ধারণা, এই যে চলচ্চিত্র নিয়ে ধাক্কা খাচ্ছি, একসময় ঠিকই বিদ্রোহ করে আবার সামনে চলে আসব।

আপনার ব্যক্তিগত জীবন?

১৯৭৯ সালের একদিন হাসান ইমাম ভাই বললেন, ‘ছটকু কি শুধু ছবিই করবা, নাকি বিয়েও করবা?’ বললাম, ‘কেন?’ ‘বয়স কত?’ ‘৩৪।’ ‘৩৪! এখনো বিয়ে করোনি। তাহলে আর জীবনেও বিয়ে করো না!’ ‘কেন?’ ‘কবে বিয়ে করবে? কবে সন্তান হবে? কবে মানুষ করবে? বিয়ে করলে এ বছরই করবে, না হলে নয়।’ হাসান ইমাম ভাই, লায়লা হাসান ভাবি—এঁরাই দেখেশুনে সে বছর আমাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। স্ত্রী মসরুরা আহমেদ আমার ‘বুক ভরা ভালোবাসা’ ও ‘বুকের ভেতর আগুন’ ছবির প্রডিউসার। আমাদের চার সন্তান। বড় মেয়ে সাদিয়া আহমেদ ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স পাস করে এখন গৃহিণী, মেজো মেয়ে ফারিয়া আহমেদ এমবিএ পাস করে গৃহিণী, সেজো মেয়ে শাহরিয়া আহমেদ ফার্মেসিতে মাস্টার্স পাস করে চাকরি করছে, ছোট মেয়ে নাজিয়া আহমেদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস থার্ড হয়ে সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটি ও মোহাম্মদপুর কলেজিয়েট ইউনিভার্সিটির লেকচারার।

সিনেমায় ব্যস্ত হওয়ার পর চাকরি চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন?

চাকরি আমি ছাড়িনি, যাইও না! সিনেমায় কন্টিনিউ করার পর আমার বিবেকই বলল, দুই নৌকায় পা দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। তখন আমি ডিএনডি প্রজেক্টে। অফিসে গিয়ে সিগনেচার করে চলে আসাটা খুব মানসিক যন্ত্রণার ছিল। আস্তে আস্তে আর যাইনি। রিজাইন লেটারও জমা দেওয়া হয়নি। অফিস থেকে আমাকে বারবার বলা হয়েছিল জয়েন করার জন্য। তখন ইঞ্জিনিয়ারের খুব সংকট ছিল। এখন আমার বন্ধুরা বলে, ‘তুই এত দিনে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যেতিস। তোর বাড়ি-গাড়ি সব থাকত। এখন কী আছে?’ আমি বলি, ‘আমার অনেক কিছু আছে। টেকনাফ, তেঁতুলিয়ায় গিয়ে জিজ্ঞেস কর, ছটকু আহমেদকে চিনে কি না? দেখবি, চিনবে সবাই। গাড়ি-বাড়ি কিছুই করিনি, কিন্তু এই সম্মান আমি পেয়েছি।’

বর্তমান ব্যস্ততা?

‘শাওন সাগর লিমিটেড’ থেকে বেরিয়ে আসার পর আমার স্ক্রিপ্টের ডিমান্ড খুব বেড়ে গেল। এ পর্যন্ত তিন শতাধিক ছবির কাহিনি ও সংলাপ লিখেছি। প্রথম প্রফেশনাল কাহিনি লিখি মোতালেব হোসেনের ‘হিংসা’। ২০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। বাম্পার হিট হয়েছিল। এই মুহূর্তেও আমার হাতে তিন-চারটি স্ক্রিপ্টের কাজ আছে। এখনো লেখার এই প্রচেষ্টা ধরে রেখেছি। ‘সত্যের মৃত্যু নেই’সহ দু-একটি ছাড়া সিনেমার ডিরেকশন দিয়ে আমার কিন্তু খুব একটা লাভ হয়নি; কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেই জীবিকা নির্বাহ করছি। ‘সত্য মিথ্যা’র সংলাপ লিখে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। বাচসাসের একই বছর তিনটি পুরস্কার পেয়েছি, ‘গৃহবিবাদ’-এর জন্য—গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে। এ ছাড়া প্রচুর পুরস্কার পেয়েছি। এখনো ছবির মধ্যে আছি। আমি দেখেছি, ছবি যদি ছবির মতো করা হয়, তাহলে ছবি ঠিকই চলে। ছবি যদি নাটকের মতো করা হয়, তখন লোকের আর দেখার আগ্রহ থাকে না। এভাবে হলগুলো খালি হয়ে গেছে।   (এফডিসি, ঢাকা; ১৪ জানুয়ারি ২০২০)

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা