kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

পেছনে শত্রু রেখে সামনের শত্রুকে মোকাবেলা করা যায় না

লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী। মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন ৮ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক। শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে আহ্বায়ক করে গঠিত ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র অন্যতম সদস্য। স্বাধীনতা পদকজয়ী এই বীরের সঙ্গে কথা বলেছেন শেখ হাসান রুহানি। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



পেছনে শত্রু রেখে সামনের শত্রুকে মোকাবেলা করা যায় না

শৈশবেই মাকে হারিয়েছেন?

আমার জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ জানুয়ারি, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার মদনেরগাঁও গ্রামের চৌধুরী পরিবারে। সেখানেই বেড়ে উঠেছি। আব্বা আবদুল আজিজ চৌধুরী ছিলেন স্কুল শিক্ষক। আদর্শবান এই মানুষটির রীতি-নীতি, নিয়মানুবর্তিতা ছোটবেলায় আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছে। সব সময় ভালো বই পড়তে উৎসাহিত করতেন তিনি। মা মাজেদা খাতুন ছিলেন হাজীগঞ্জ থানার কাঁঠালি গ্রামের কাজী পরিবারের সন্তান। ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। ৯ বছর ঘরসংসারের পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে তিনি অকালে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর সময় আমার বয়স মাত্র দুই বছর। আজীবন তাঁর শূন্যতা আমাদের ভাই-বোনদের বেদনায় নিমজ্জিত রেখেছে।

 

পড়াশোনা?

প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছি মদনেরগাঁওয়ের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে। ১৯৪৫-৪৬ সালে পাশের গ্রামের মানিকরাজ জুনিয়র হাই স্কুলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। ১৯৪৭ সালে আবার নিজ গ্রামের চান্দ্রা ইমাম আলী হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে চার বছর পর, ১৯৫১ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করি। তখন প্রথম বিভাগ পাওয়া খুব গৌরবের বিষয় ছিল। আত্মীয়-স্বজনসহ মহল্লার অনেকেই আমাকে দেখতে এসেছিল। এরপর ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে সেখানে পড়াশোনা চালানো সম্ভব হয়নি। ওই সময় মারাত্মক কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলাম। ১৯৫৪ সালে চাঁদপুর কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৫৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি।

 

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি?

আমি কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়াইনি। তবে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণাটি আমার তরুণ মনকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল। তখন ঢাকা কলেজে পড়ি। এই কলেজের একাধিক ছাত্র ভাষা আন্দোলনে জড়িত ছিল। তাঁদের মধ্যে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন সেই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। তিনিই তো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি লিখেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আমারও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে যোগদানের বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল। আমি মিছিলে অংশ নিয়েছি। মনে পড়ে, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে আমিও একত্র হয়েছিলাম। ঐতিহাসিক সে সভায় সিদ্ধান্ত হলো, আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করব। শুরু হয় হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর মিছিল ও পদযাত্রা। আমাদের মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে শুরু হয় ব্রাশফায়ার। গুলিবিদ্ধ হলেন রফিক। তাঁর অবস্থান ছিল আমার থেকে মাত্র দু-তিন গজ দূরে। মুহূর্তেই তাঁর মাথার খুলি উড়ে গিয়ে মগজ মাটিতে পড়ে যায়। ওই দৃশ্য দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। সংবিৎ ফিরে পেয়ে আমরা তিনজন রফিকের মৃতদেহ তুলে নিয়ে যাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমার মনে দারুণ রেখাপাত করে। ভাষাশহীদ রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত, শফিউরের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের রাষ্ট্রভাষা। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে চাই, ভাষা আন্দোলন ছিল ছাত্রদের আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্ররা যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তা ছিল বিরল দৃষ্টান্ত।

 

সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন কখন?

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভের পর পরই ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিমানবন্দরে এয়ারপোর্ট অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাই। এ পদের প্রশিক্ষণে থাকাকালেই সেনাবাহিনীতে পরীক্ষা দিই। পাস করায় আন্ত বাহিনী নির্বাচন বোর্ডে উপস্থিত হওয়ার জন্য ডাক পাই। সেটিও সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করি। সেই সময়ে সেনাবাহিনীতে যোগদানের ব্যাপারে পরিবারের তেমন সমর্থন পাওয়া যেত না। তাই আমি সেনা অফিসার ক্যাডেট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর আব্বা মনে একটু কষ্ট পেয়েছিলেন; তবে বারণ করেননি। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে আমি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় অবস্থিত অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে (ওটিএস) যোগ দিই। সেখানে ৯ মাসের কঠিন প্রশিক্ষণের পর ১৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করি। পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করার পর ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে মেজর হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি।

 

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালি অফিসার হিসেবে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন নিশ্চয়?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাংলার মুক্তি সনদ’ ছয় দফা প্রণয়নের পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সহ্য করতে পারত না। রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে আমরা বিষয়টি অনুভব করতাম। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি অফিসারদের প্রতি নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তারা আমাদের অবদমন করে রাখার অপতৎপরতা চালায়। সে সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বাঙালিদের প্রতি নিয়মিত অন্যায়-অত্যাচারের পরিধি দেখে হতাশ হয়ে পড়ি। মনে মনে প্রতিকারের পথ খুঁজছিলাম। এমন সময় এলো সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের বিজয়ে বাঙালিদের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হলো। আমি তখন লাহোর সেনানিবাসে কর্মরত। নির্বাচনোত্তর পরিবেশ ও পরিস্থিতি দেখে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়নি, অচিরেই বাংলার ওপর নেমে আসবে বিরাট আঘাত। তাই রাওয়ালপিন্ডি সেনাসদরের দুজন বাঙালি অফিসারের সহায়তায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে বদলি নিয়ে সুদূর কলম্বো ঘুরে ঢাকায় চলে আসি ১৯৭১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। পিলখানা থেকে আমাকে পাঠানো হয় চুয়াডাঙ্গা ৪ নম্বর উইংয়ের অধিনায়ক হিসেবে। এই উইংয়ের ইতিহাসে আমিই প্রথম বাঙালি অধিনায়ক। উইংয়ের দায়িত্ব নিই ২৫ ফেব্রুয়ারি। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের অঙ্গনে পা রেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, এখানকার প্রত্যেক বাঙালি সেনা ঘোরতরভাবে পাকিস্তানবিরোধী। ৪ নম্বর উইংয়ের সব কম্পানি অধিনায়কই ছিলেন বাঙালি। তবে ২০ শতাংশের মতো সেনা ছিল অবাঙালি, যার বেশির ভাগই থাকত উইং সদরে।

 

মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হলেন কবে?

২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানিরা বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর ২৬ মার্চ চুয়াডাঙ্গায় নিজের উইং সদরে এসে বুঝতে পারলাম, প্রত্যেক সৈনিক আমার হুকুমের অপেক্ষায়। শুধু তা-ই নয়, অবাঙালি সেনাদেরও নিরস্ত্র ও গৃহবন্দি করে রেখেছে। কালবিলম্ব্ব না করে জরুরিভিত্তিতে স্থানীয় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নেতা, স্কুল-কলেজের প্রধান, ছাত্রনেতা, পুলিশ, আনসার ও বেসামরিক বিভিন্ন স্তরের অফিসারকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলাম। বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে বললাম, ‘ভাইসব, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরই মাটিতে বসে আমাদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা শুরু করেছে। শাসনভার হস্তান্তরের দেনদরবার সব ভাঁওতাবাজি, বরং বুলেটের মাধ্যমে তারা বাঙালিদের ঠাণ্ডা করে চিরতরে গোলাম করে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে। টিক্কা খানের হাতে সেই নীলনকশা হস্তান্তর করে ইয়াহিয়া পালিয়ে গেছে তার দেশে। আপনারা শুনেছেন, এর মধ্যে তারা ইপিআর হেডকোয়ার্টার পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মেরে দিয়েছে গণকবর। সারা দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আমরা জানি না, দেশের কোথাও কেউ তাদের এ গণহত্যার প্রতিবাদ করেছে কি না। আমরা জানি না, কেউ তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে কি না। এ অবস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা আত্মহত্যারই নামান্তর, তবু আমরা জীবন দিয়ে হলেও এ জঘন্যতম গণহত্যার প্রতিবাদে বিদ্রোহ করব; পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষ যেন বলতে না পারে, বাঙালি বুলেটের ভয়ে গোলামিকেই বেছে নিয়েছে।’ উপস্থিত সবাই আমার ঘোষণায় ‘জয় বাংলা’ বলে ওঠে এবং সর্বশক্তি দিয়ে আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার শপথ নেয়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ছিল আমাদের প্রেরণার উৎস। সবকিছু পর্যালোচনা করে বৈঠক শেষে বাইরে এসে দেখি, হাজার হাজার মানুষ আমাদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। জনতার মিছিল নিয়ে আমরা উইং সদরে কোয়ার্টার গার্ডের সামনে সমবেত হই। পাকিস্তানি পতাকা অপসারণ করে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি এবং ‘রাষ্ট্রীয় অভিবাদন’ জানাই। সে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তারপর অনেক রাত পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করি। বেতার বার্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমানায় অবস্থিত চার কম্পানি সেনাকে আমার পরবর্তী নির্দেশের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলি। ওই সময় আমি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ‘বিবিসি’কে আমাদের প্রস্তুতির কথা জানাই। পদ্মা-মেঘনার পশ্চিমাঞ্চলকে ‘দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন’ নামকরণ করে আমি সর্বসম্মতিক্রমে এলাকার সর্বাধিনায়ক রূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করি।

 

প্রথমেই কুষ্টিয়াকে শত্রুমুক্ত করার কারণ?

২৬ মার্চ আমি যখন নিজ বাহিনী নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করি, তখন আমার অবস্থান ছিল কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা সদরে। ২৭ মার্চ যশোর থেকে আসা পাকিস্তানি এক ক্যাপ্টেন ও তিন সৈনিক আমার এলাকায় ছোট একটি সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পর আমি আন্তর্জাতিক সীমানায় অবস্থিত চার কম্পানি সৈন্যকে অগ্রগামী করে স্থানীয় জনগণের সহায়তা নিয়ে ৩০ মার্চ কুষ্টিয়া আক্রমণ করি। সেখানে অবস্থানরত চার অফিসার ও ২০০ পাকিস্তানি সৈন্যের এক বিরাট বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে কুষ্টিয়া জেলা শত্রুমুক্ত করেছিলাম। আসলে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তেই বুঝতে পেরেছিলাম, যশোরকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে হলে প্রথমে কুষ্টিয়াকে মুক্ত করতে হবে। কারণ পেছনে শত্রু রেখে সামনের শত্রুকে মোকাবেলা করা যায় না। তাই সঙ্গে সঙ্গে ডা. আসহাবুল হক, অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী ও ব্যারিস্টার বাদল রশীদের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ ডেকে, তাঁদের সঙ্গে আক্রমণের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেই পরিকল্পনা তৈরি করেছিলাম। ২৮ মার্চ কম্পানিগুলো সমবেত হওয়ার পর ক্যাপ্টেন এ আর আজম চৌধুরীকে কুষ্টিয়ার রণাঙ্গনের সার্বিক সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৩০ মার্চ ভোর ৪টায় আক্রমণের সময় নির্ধারণ করে কুষ্টিয়া আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক সুবেদার মেজর মোজাফফরের কম্পানি কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনস, ক্যাপ্টেন আজমের বাহিনী কুষ্টিয়া জেলা স্কুল এবং নায়েব সুবেদার মুনিরুজ্জামানের কম্পানি মোহিনী মিল ও ওয়ারলেস স্টেশন একযোগে আক্রমণ করে।

 

সেক্টর কমান্ডার হিসেবে আপনার কার্যক্রম?

১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার আমাকে দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করে। ১৭ এপ্রিল আমার নিয়ন্ত্রণাধীন মেহেরপুরের অন্তর্গত বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আমবাগানে বিশ্বের ৩৯টি দেশের শতাধিক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ প্রকাশ্যে বাংলার মাটিতে শপথ গ্রহণ করার পর আমি নিজের এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে মন্ত্রিপরিষদকে গার্ড অব অনার প্রদান করি। সেই অনুষ্ঠানে আমার স্ত্রী বেগম নাজিয়া ওসমান সারা বাংলার নারী জাতির প্রতিনিধিত্ব করেছিল।

১৫ মে থেকে নিয়মিতভাবে প্রত্যেক কম্পানিকে সাপ্তাহিক অপারেশনাল টাস্ক দিতে থাকি। ২৭ মে ভোর ৪টায় পাকিস্তানিরা দুই কম্পানি সৈন্য নিয়ে সাতক্ষীরার ভোমরায় অবস্থানরত আমার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে। শুরু হয় তীব্র যুদ্ধ। আমরা তাদের প্রতিহত করতে সমর্থ হই। ১৭ ঘণ্টা স্থায়ী ওই যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রায় ৩০০ সৈন্য হতাহত হয়। এদিকে পাকিস্তানি ব্যাটালিয়নের দ্বিতীয় কমান্ডার, একজন ক্যাপ্টেন ও কয়েকজন জওয়ানও ওই হামলায় নিহত হয়। এক তথ্যে দেখা গেছে, এই সেক্টরে গড়ে প্রতি মাসে ৭০০ শত্রুসেনা নিধন হয়েছে।

১১ আগস্ট বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। স্থলাভিষিক্ত হন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর এম এ মঞ্জুর। আমাকে তখন মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর মুজিবনগরে অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অব স্টাফ (লজিস্টিকস)-এর দায়িত্ব পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় যৌথ বাহিনী শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে একের পর এক এলাকা জয় করতে থাকে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। স্বাধীন হওয়ার পর জনমনে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস। পরে আমাকে ছাড়া সব সেক্টর কমান্ডার ও অন্যদের বীরত্বপূর্ণ পদক প্রদান করা হয়। এ নিয়ে আমার কোনো দুঃখবোধ নেই। স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, জাতীয় পতাকা পেয়েছি—এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছুই হতে পারে না।

 

সেনাবাহিনী থেকে দ্রুত অবসরে গেলেন কেন?

যুদ্ধোত্তরকালে একপর্যায়ে আমাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে যথোচিত অনুসন্ধানের পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি দিয়ে কোরের (এএসসি) পরিচালক পদে নিযুক্ত করেন। ওই পদে তিন বছর থাকার পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহে গুলশানের বাড়িতে আমাকে না পেয়ে সিপাহিরা আমার স্ত্রী বেগম নাজিয়া ওসমানকে হত্যা করে। তারপর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ নিয়োজিত তৎকালীন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ আমাকে অন্যায়ভাবে অকালীন অবসর প্রদান করে।

 

শুরু থেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সোচ্চার থেকেছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত ‘গণ-আদালতে’র অন্যতম বিচারক হিসেবেও আমি কাজ করেছি। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, বিচারপতি কে এম সোবহান, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ড. আহমদ শরীফসহ আরো অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জাতির কলঙ্কমোচনের জন্য এটা ছিল অনন্য উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে একাধিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। কারো কারো সাজা বাস্তবায়ন হয়েছে। আমি এখনো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র অন্যতম সংগঠক হিসেবে এবং ‘সেক্টর কমান্ডারস ফোরামে’র অধীনে নিরলস কাজ করছি। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই—এ আমার পবিত্র অঙ্গীকার।

 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একাধিক বই লিখেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। বিশ্বের বুকে স্বাধীন জাতির মর্যাদা লাভ এক অনন্য গৌরব। এই গৌরব অর্জনে আমারও সামান্য ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়েছে। এটা আমার পরম সৌভাগ্য। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় চোখের সামনে নানা ঘটনা দেখেছি। জীবনের সেই বিরল অভিজ্ঞতা নিয়ে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতায় উত্তরণের ধারাবাহিক ইতিহাস বিষয়ে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বইটি লিখেছি। এ ছাড়া আমার লেখা ‘সময়ের অভিব্যক্তি’, ‘সোনালী ভোরের প্রত্যাশা’, ‘একনজরে ফরিদগঞ্জ’, ‘বঙ্গবন্ধু : শতাব্দীর মহানায়ক’ প্রভৃতি বইও প্রকাশিত হয়েছে। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বইটিকে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে পুরস্কৃত করে; এটির জন্য আমি আলাওল সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছি।

 

সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত আছেন...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাঁদপুরে ‘ফরিদগঞ্জ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ প্রতিষ্ঠা করেছি। এ ছাড়া ঢাকার ‘ফরিদগঞ্জ থানা সমিতি’র প্রধান পৃষ্ঠপোষক, চন্দ্রা ইমাম আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছি। অন্যদিকে ফরিদগঞ্জের শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে নিয়োজিত আছি। চাঁদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। আসলে মানুষের জন্য কাজ করতে আমার ভালো লাগে।

 

স্বাধীনতার স্বপ্ন কতটুকু পূরণ হয়েছে?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ ছিল সমষ্টিগত মুক্তি। সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ। স্বাধীনতার চার দশক পর যদি মূল্যায়ন করতে যাই, তাহলে সাফল্য-ব্যর্থতা—দুটোই লক্ষ করব। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছি, তার মধ্যে রাজনৈতিক ব্যাপারটা মোটামুটি সফল হয়েছে। আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি। আমাদের নিজস্ব মানচিত্র আছে। আছে সংবিধান। আমরা স্বশাসিত জাতি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এ জাতির কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো আসেনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের এ দেশটাকে এগিয়ে নিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের যদি সুযোগ করে দেওয়া হয়, তাহলে দেশ তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নে পৌঁছতে পারবে না। আগে যেমনটি হয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি না আসার অন্যতম কারণ স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র। অথচ আমি এমন বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে থাকবে না দারিদ্র্য; হবে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, রাজাকারমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজিমুক্ত একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ। দেশের ভালো সব কিছুতে জড়িয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা। সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করতে হবে। সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের স্মৃতি ভুলে গেলে চলবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ শহীদের রক্তের অমর্যাদা করে।

 

এখন সময় কাটে কিভাবে?

বয়স হয়েছে। আগের মতো চলাফেরা করতে পারি না। সকাল-বিকেল একটু হাঁটতে বের হই। ডাক্তারের অনেক নিষেধ-বারণ মেনে চলতে হয়। ওষুধ খেতে হয়। মাঝেমধ্যে টিভি দেখি। খবরের কাগজ পড়ি।

 

তরুণদের উদ্দেশে কী বলতে চান?

স্বাধীনতার মূলমন্ত্র দেশপ্রেম। তাই তরুণদের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা আমাদের কর্তব্য। তাদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সুতরাং দেশের উন্নয়নের স্বার্থে তাদের একযোগে কাজ করতে হবে। চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের সীমিত সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটাতে হবে; তা না হলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন একটি সমৃদ্ধ, মানবিক বাংলাদেশ। সেই মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আজকের তরুণদের কাঁধে।       (ধানমণ্ডি, ঢাকা; ১০ ডিসেম্বর ২০১৯)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা