kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

থিয়েটারটাকে প্রফেশনাল জায়গায় নিয়ে যেতে না পারাটা আমাদের জন্যও কষ্টের

লাকী ইনাম। একুশে পদকজয়ী নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনেত্রী। নাটক নিয়ে প্রায় এক হাজার শোতে মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন। অভিনয় করেছেন প্রায় ৩০০ টিভি নাটকে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান এবং গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি। তাঁর পথচলার কথা জেনেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



থিয়েটারটাকে প্রফেশনাল জায়গায় নিয়ে যেতে না পারাটা আমাদের জন্যও কষ্টের

ছোটবেলা কেমন কেটেছে?

আমার জন্ম ১৯৫২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বাবার কর্মস্থল রংপুরে। পৈতৃক নিবাস ফেনী। বাবা কলিমুল্লাহ ভূঁইয়া ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের অফিসার। মা মহুয়া গৃহিণী ছিলেন; তবে সমাজসেবামূলক কাজও করতেন। এখন যেটা বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, পাকিস্তান আমলে ছিল আপোয়া (অল পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন)। মা সেটিতে জড়িত ছিলেন। সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে পদাধিকারবলে সভাপতি হয়েছিলেন। সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন মা। ছোটবেলায় আমাদের পাঁচ ভাই-বোনকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। নাচ, গান, আবৃত্তি, খেলাধুলা—প্রতিটি জায়গায় আমাদের স্পেশালাইজড করে দিয়েছেন মা-বাবা। তবে এ ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকাই বেশি। বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব কেটেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়, বিভিন্ন অঞ্চলে। বলা যায় বাংলাদেশের শিকড়ের যে স্বাদ, রূপ, মাটির  সোঁদা গন্ধ—এসব নিয়েই বড় হয়েছি।

 

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আপনার হাতেখড়ি?

আমার সৌভাগ্য, বাংলাদেশে তখন শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাটা ছিল একেবারে নিখুঁত। প্রতি জেলায় সংগীত ও নৃত্যের ওস্তাদ ছিলেন। তাঁদের সাহচর্যে এসেছি। যখন কুষ্টিয়ায় ক্লাস ওয়ানে পড়ি, শফি আহামেদ নামে একজন নৃত্যশিল্পী ছিলেন। ওনার একটি স্কুল ছিল। আমি সেই স্কুলে ভর্তি হলাম। শুক্র ও শনিবার তিনি বাড়িতে এসেও আমাকে আর আমার ছোট বোনকে নাচ শেখাতেন। অন্যদিকে বিশিষ্ট নজরুলসংগীত শিল্পী খালিদ হোসেনের বাড়িও কুষ্টিয়ায়। আমার বড় বোন ও ছোট বোন তাঁর কাছে গান শিখত। বাড়িতে নাচের ও গানের শিক্ষক আসায় শিল্প-সংস্কৃতিচর্চাটা আমাদের কাছে ছিল একেবারে পড়াশোনার মতোই। বাড়ি থেকেও চাপ ছিল—সর্বগুণে গুণান্বিত হতে  হবে, ক্লাসেও ফার্স্ট হতে হবে।

 

আপনার বেড়ে ওঠার সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে...

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় রাজনীতি বোঝার মতো উপলব্ধি আমার হলো। তখন পড়তাম কিশোরগঞ্জে। এসএসসি পাস করেছি কিশোরগঞ্জ এস ভি গার্লস স্কুল থেকে। মেধাতালিকায় ঢাকা বোর্ডে ষষ্ঠ হয়েছিলাম। সেখানে গুরুদয়াল কলেজ ছিল। সেই কলেজের ভিপি ছিলেন আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। স্কুলের অনুষ্ঠান কলেজে হতো। আমি যেহেতু নাচতাম, তাই সেসব অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতাম। এসএসসি পাস করার পর গুরুদয়াল কলেজে ভর্তিও হয়েছিলাম। ছয় মাস পড়েছিলাম। এরপর বাবা বদলি হয়ে গেলে আমরা কুমিল্লায় চলে আসি। কুমিল্লা উইমেন্স কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। এরপর সরাসরি ছাত্ররাজনীতিতে ঢুকে যাই। কোথাও বন্যা হলে চাল, ডাল নিয়ে যেতাম। মুরাদপুরে একবার খুব ঝড় হলো। আমরা নৌকায় বস্তাভর্তি খাবারদাবার নিয়ে সেখানকার দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করেছি। এভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ধীরে ধীরে জড়িয়ে গেলাম। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো।

 

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল?

একটা সময় ফেনীতে, নিজেদের বাড়িতে বন্দি হয়ে গেলাম। তবে তখন ফেনীর বিলোনিয়া বর্ডারের কাছে কাজ করতাম। আমাদের কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তৈরি করা খাবার নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া। আমরা ভাই-বোনরা সবাই সেই দলটিতে কাজ করতাম। তা ছাড়া অনেক হিন্দু পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ার কাজও আমরা করেছি। নিজেদের বাড়িতে, অন্যের বাড়িতে তাঁদের লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করেছি। যুদ্ধের পর আমরা ঢাকায় স্থায়ী হয়েছি।

 

সদ্যঃস্বাধীন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু আপনার...

তখন একটা অসাধারণ মুক্তমন নিয়ে আমরা কাজ করেছি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়েছি। এ সময় লেখাপড়ার পাশাপাশি থিয়েটার চর্চায় জড়িয়ে পড়ি। বলা যায়, একটা হৈহৈ রৈরৈয়ের মধ্যে কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন।

 

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের মাধ্যমে আপনার মঞ্চ অভিনয় শুরু...

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল ইনাম (ড. ইনামুল হক)। আমাকে এটির সদস্য করে নেওয়া হলো। ছোটবেলা থেকেই তো নাচ-গান করেছি, তাই মঞ্চে ওঠাটা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ ছিল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রথম প্রযোজনা। আমি সেই নাটকে প্রতিমা চরিত্রে অভিনয় করেছি। আমার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেন আবুল হায়াত। আমাদের নির্ধারিত কোনো মঞ্চ ছিল না। মহিলা সমিতির কার্যক্রম তখন শুরু হয়নি। আমরা একটা মঞ্চ আবিষ্কার করি ওয়াপদা মিলনায়তন। ইনামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গোলাম রাব্বানী ছিলেন ওয়াপদার ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর সাহায্যে সেই মিলনায়তন ব্যবহারের সুযোগ পাই। সে বছরের ১৭ ও ১৮ জুলাই পর পর দুটি শো হয়। একেবারে হাউসফুল। মঞ্চনাটকে আমার সেটিই প্রথম দাঁড়ানো। সে বছরই বিটিভিতে অডিশন দিয়ে টিভি নাটকে অভিনয় শুরু করি। বেতারেও নাটক শুরু করেছি একই সময়ে।

 

মঞ্চের বিশেষ স্মৃতি?

মঞ্চে তো অসংখ্য স্মৃতি। প্রায় ৫০ বছর হতে চলল মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত আছি। এক হাজারের মতো শো করেছি। মজার অভিজ্ঞতাও আছে, আবার কষ্টেরও। শুরুর দিকের সেই বন্ধুদের অনেকেই মঞ্চ ছেড়ে দিয়েছেন। একবার একটা নাট্যোৎসবে আমরা বগুড়া গিয়েছিলাম। নাটক শেষে রাতে ফিরব। একটা বড় বাসে আমরা সবাই উঠেছি। একজন দর্শক আমাকে বললেন, ‘আপনার জন্য উপহার আছে।’ একটা ব্যাগ এগিয়ে দিলেন। ব্যাগটা নিয়ে মনে হলো, ভেতরে কিছু নড়ছে। চিৎকার করে উঠলাম, ‘কী আছে এর ভেতরে?’ তিনি বললেন, ‘পুকুর থেকে ফ্রেশ মাগুর, শিং, কই মাছ আপনার জন্য ধরে এনেছি!’ এ রকম উপহার আমি আর কখনো পাইনি। এর মধ্যে যে মায়া ছিল, অবিশ্বাস্য। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডনের নাট্যদল ‘টেগোরিয়াস’-এর ইচ্ছা হলো, ওরা নাটক করবে। ওই দলের মূল কর্তা বুয়েট থেকে পাস করা এবং ইনামের খুব প্রিয় ছাত্র। তিনি ঢাকায় এসে ইনামকে বললেন, ‘আমাদের কম খরচের একটা নাটক দরকার।’ একটি নাটক করতে গেলে অনেক চরিত্র এসে যাবে। তখন আতা ভাই (আতাউর রহমান)  রবীন্দ্রনাথের চারটি নাটককে একসঙ্গে একটি কোলাজ করলেন। নাম দেওয়া হলো ‘আগল ভাঙার পালা’। এটি নিয়ে আমরা লন্ডন গিয়েছিলাম। সেখানে দুটি শো করেছি। এর মধ্যে একটি করেছি এক স্কুলে। ব্রিটিশরা আমাদের নাটক দেখেছে, আবার বাঙালিরাও ছিল। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

 

কষ্টের স্মৃতি?

১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে’ যুক্ত ছিলাম। ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি নতুন দল গড়ি—‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন’। তখন এটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। নতুন দল, নতুন ছেলে-মেয়ে, নতুন নাটক লিখছি, নির্দেশনা দিচ্ছি। ‘কাদের’ নামের একটি ছেলে আমার থিয়েটার স্কুল থেকে কোর্স করে ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গনে’র সদস্য হয়েছিল। খুবই থিয়েটারপ্রেমী ছিল। তখন আমরা ‘প্রাগৈতিহাসিক’ করছিলাম। একদিন আমাদের শো, অথচ কাদের এলো না। ওর স্ত্রী জানাল, সে বেশ অসুস্থ। ও যে চরিত্রে অভিনয় করে, বদলি এক অভিনেতাকে দিয়ে সেদিন সেটি করানো হলো। শো শেষ হওয়ার ১০-১৫ মিনিট আগে জানতে পারলাম কাদেরের ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি। শো শেষ করে আমরা মেকআপ না তুলেই যে যার পোশাক পরে ছুটে গেলাম। আমরা হাসপাতালে পৌঁছানোর পাঁচ মিনিট আগে মারা গেল কাদের। এর আগে নাটকটির প্রায় ৫০টি শো হয়েছে, সবগুলোতেই অভিনয় করেছে সে। ওকে অকালে হারানোর বেদনা এখনো অনুভব করি। অন্যদিকে কলকাতার একটা স্মৃতি আছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তির উপায়’ নাটকটি করেছিলাম। বিচারপতি কে এম সোবহানের ছেলে ছিল আমাদের দলে। নাটক চলা অবস্থায় ঢাকা থেকে টেলিফোনে খবর পেলাম কে এম সোবহান মারা গেছেন। তাঁর ছেলে কিন্তু তখন মঞ্চে। শো শেষ হওয়ার পর আমি ওকে খবরটা জানালাম। একটু স্তব্ধ হয়ে গেল। ওকে কী সান্ত্বনা দেব? দূতাবাসে গিয়ে খুব কষ্ট করে টিকিট জোগাড় করে ওকে ঢাকা পাঠালাম।  

 

বেশ কিছু নাটক নির্দেশনা দিয়েছেন...

নিজের নির্দেশিত নাটকের মধ্যে সবার আগে ‘প্রাগৈতিহাসিক’-এর নাম নিতে চাই। অন্যদিকে ‘পুষিবেড়াল ও একজন মানুষ’ নাটকটির অনুবাদ করেছে ও নাট্যরূপ দিয়েছে আমার ছোট মেয়ে। আমাদের বেশ কিছু নাটকের শততম মঞ্চায়ন হয়েছে। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের কিছু নাটক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু নাটকও নির্দেশনা দিয়েছি। ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ আমার একক অভিনীত নাটক। ৫০টি শো হয়েছে।

 

থিয়েটার আন্দোলনের কর্মী হিসেবে ভূমিকা?

বাংলাদেশে যখনই কোনো ক্রাইসিস এসেছে, থিয়েটার আন্দোলনের কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমরা চাই দেশে গণতন্ত্র থাকুক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি থাকুক। এই শক্তিকে আরো শক্তিশালী করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন কিংবা শিল্পীদের বিপক্ষে যাওয়া যেকোনো লড়াইয়ে আমি সব সময়ই সক্রিয় অংশ নিয়েছি। এখনো নিচ্ছি।

 

সমসাময়িক অভিনেতাদের মধ্যে কার কার কাজ ভালো লাগে?

সবার কাজই ভালো লাগে। প্রত্যেকেরই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল বলে আমাদের শিল্পটা এখানে এসেছে। এখনকার শিল্পীরা নাটকের চরিত্রের চেয়ে নিজের ব্যাপারে বেশি সজাগ—মেকআপটা, হেয়ার স্টাইলটা ঠিক হলো কি না! আমাদের সময়ে এমনটা ছিল না।

 

আপনাদের সময় এবং বর্তমান সময়ের মঞ্চনাটকের মধ্যে বড় পার্থক্য চোখে পড়ে?

আমাদের মঞ্চনাটক প্রথম প্রথম সেটনির্ভর ছিল। আমরা সেট ভাঙতাম, ঠেলাগাড়িতে তুলতাম। রাত ১১টায় মহিলা সমিতি থেকে বের হতাম। এখন কনসেপ কিছুটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। এখন সেট খুব হালকা। একটা ভ্যানে আনা-নেওয়া সম্ভব। ছেলে-মেয়েরা যেন অফিস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষ করে এসে ঝটপট সেটটা লাগিয়ে ফেলতে পারে, এ রকম ব্যবস্থা হয়েছে। অন্যদিকে আবহ সংগীতেও পরিবর্তন এসেছে। আমরা সীমিত কিছু ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে এটা করতাম। এখন বলা যায়, পৃথিবীর সংগীত আমাদের কাছে চলে এসেছে। ফলে আবহ সংগীতও অনেক ভালো হচ্ছে। যেমন—পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বাঁশির সুর আমার সংগ্রহে আছে। এগুলো আমরা নাটকের আবহ সংগীতে কাজে লাগাই। এখনকার দিনে অনেক নাটকে আমরা লাইভ মিউজিক করি। ভারী কস্টিউমের দরকার পড়ে না। হালকা কস্টিউমই যথেষ্ট। এভাবে কনসেপ্টগুলো আধুনিক ও ইতিবাচক হয়েছে। নেতিবাচক দিক হলো, ছেলে-মেয়েরা থিয়েটার করছে খুব কষ্ট করে। তাদের কোনো ফিন্যানশিয়াল সাপোর্ট দিতে পারছি না। ফলে তাদের পরিবার থেকে বাধা আসে। নিজেরাও কষ্টে ভোগে। থিয়েটারটাকে প্রফেশনাল জায়গায় নিয়ে যেতে না পারাটা আমাদের জন্যও কষ্টের। আমাদের শিল্পকলা একাডেমি রয়েছে। সেখানে মহড়াকক্ষের নানা অসুবিধা রয়েছে এখনো। কক্ষ সংখ্যাও সীমিত। দল বেড়ে গেছে, থিয়েটারের গ্রুপ বেড়ে গেছে, সেই অর্থে পর্যাপ্ত মহড়াকক্ষ নেই। তাই মহড়াকক্ষ বাড়াতে হবে।

 

নতুন অভিনেতা ও নির্দেশকদের প্রতি পরামর্শ?

এখন অনেক নির্দেশক কাজ করছেন। নতুন শিল্পী, নতুন নাট্যকারও এসেছেন। এটা খুব আশার বিষয়। মঞ্চের জন্য আমি মনে করি, একটা চমৎকার প্ল্যাটফর্মে আছি এখন। প্রতিভার বিচ্ছুরণ হচ্ছে। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে আমি সব নাটক দেখতে পারি না। তবে যেগুলো দেখেছি, প্রতিটিতে চমকে উঠেছি। এগুলো নবীনরাই করছে। ওদের জন্য পরামর্শ হলো, থিয়েটারটাকে যেন অবহেলা না করে। থিয়েটারের কাজটা যেন চালিয়ে যায়।

 

টেলিভিশন নাটকের বিশেষ স্মৃতি?

তিন শর মতো টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছি। প্রথম অভিনয় করি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিরকুমার সভা’য়। ওটাতে খুব জাঁদরেল অভিনেতারা অভিনয় করেছেন। চার বোনের নাটক। ছোট বোনটির চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম—যে নাচতে পারে, গাইতে পারে। অভিনয় করতে গিয়ে একদিকে যেমন রোমাঞ্চ কাজ করেছে, অন্যদিকে ভীতিও ছিল। আমরা খুব মজা করে রিহার্সাল করেছিলাম। বড়দের সঙ্গে কাজ করার উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত কাটিয়েছি। তিনটি ক্যামেরার সামনে শুটিং করার সেই অভিজ্ঞতাও ছিল দারুণ। বিটিভিতে আমার সবচেয়ে ভালোলাগার স্মৃতি হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে। তিনি বিদেশ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে এসে যখন সারা দেশে পরিচিত হয়ে উঠলেন, তখন তাঁর নাম আমরা সবাই জানি, কিন্তু কেউ সামনাসামনি দেখিনি।  ইনাম তখন বুয়েটের কেমিস্ট্রির হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট। একদিন ইনামের কাছে একটি  ইয়াং ছেলে এলো। বলল, ‘স্যার, আসতে পারি?’ ‘আসো, বসো। তোমার নাম?’ ‘আমার নাম ‘হুমায়ূন আহমেদ।’ ইনাম বলল, ‘তুমি কোন হুমায়ূন আহমেদ?’ ‘নন্দিত নরকের?’ বলল ‘হ্যাঁ। আমি দেশে ফিরেছি। আপনার কাছে একটা কাজে এসেছি। নাটক লেখার খুব শখ। টেলিভিশনের জন্য লিখব। মাকে জানাতেই বললেন, এখন তো টেলিভিশনের নাটক মানেই ড. ইনাম। আপনি আমাকে টেকনিক, ফরম্যাট নিয়ে একটু বলবেন? আপনার দু-একটি স্ক্রিপ্ট যদি পাই...!’ ইনাম বলল, ‘অবশ্যই! তুমি বাসায় এসো।’ এর ঠিক তিন দিন পরে হুমায়ূন আহমেদ গুলতেকিন ভাবি এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়ে আমাদের বাড়ি এলেন। ইনাম আমাদের টিভি নাটকের দু-তিনটি স্ক্রিপ্ট হুমায়ূন ভাইকে দিয়েছিল। এরপর হুমায়ূন ভাই লিখলেন—‘প্রথম প্রহর’। এটি বিটিভির জন্য লেখা তাঁর প্রথম নাটক। আমি আর আবুল হায়াত অভিনয় করেছি।

 

টেলিভিশনের নাটকে নির্দেশনাও দিয়েছেন...

প্যাকেজ নাটক শুরু হওয়ার পর টিভি নাটক নির্দেশনায় এলাম। এটাকে ‘নির্দেশনা’ না বলে ‘পরিচালনা’ বলি আমরা। বহু নাটক পরিচালনা করেছি। এর মধ্যে ১০৬ পর্বের একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক ‘আমাদের আনন্দবাড়ি’ও ছিল। ইনামের ‘গৃহবাসী’ মঞ্চনাটকটির থিম নিয়ে এটি বানিয়েছিলাম। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এর জন্য অনেক পুরস্কারও পেয়েছি।

 

নাটকের বাইরের জীবন?

স্কুলজীবনের শুরু থেকেই ক্লাসে ফার্স্ট হতাম, বোর্ডের মেধাতালিকায় জায়গা পেয়েছি। এ কারণে ভালো ছাত্রী হিসেবে বন্ধুমহলে সুনাম ছিল। অন্যদিকে খুবই হেল্পফুল হিসেবে আত্মীয়-স্বজনের কাছে নামডাক আছে আমার। আমার পরিবারে তো আমাকে ছাড়া কিছু হয়ই না!

 

ড. ইনামুল হকের সঙ্গে পরিচয়?

মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি, ইনামের সঙ্গে তখনই কুমিল্লায় পরিচয়। ওর মামা সেখানকার সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। মামার বাড়িতে বেড়াতে এসে আমাকে কোথায় যেন দেখেছিল। দেখার পর প্রমিজ করে, বিয়ে করলে আমাকেই করবে! কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অর্থনীতির শিক্ষক আনিসুর রহমান ছিলেন ইনামের বন্ধু। তাঁর সাহায্যে ইনাম আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করল। আমি এসবের কিছুই জানি না। দুই পরিবারের সম্মতিতে আমাদের বাগদান হয়ে গেল। বিয়ে হলো ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আর্মির ব্ল্যাকলিস্টে নাম ছিল ইনামের। কারণ ২৩ মার্চ ওর লেখা যে নাটক পিটিভিতে (পাকিস্তান টেলিভিশন) প্রচার হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর আন্ডারগ্রাউন্ডে তরুণ ছেলে-মেয়েদের দেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে নামার প্রেক্ষাপটে সেটি লেখা। নাম ‘আবার আসিব ফিরে’। ইনাম তখন নিরাপত্তার জন্য বুয়েটের বাসায় থাকত না। আজিমপুরে বোনের বাসায় এবং মগবাজারে চাচার বাসায় ঘুরে ঘুরে থাকত। এভাবে যুদ্ধের পুরো ৯ মাস নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে। এ সময় বর্ডার ক্রস করতে চাওয়া, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’ কাজ করতে চাওয়া শিল্পীদের একটা লিংক তৈরি করে দিত সে।

 

আপনাদের সংসারজীবন?

আমাদের সংসারজীবন শুরু হয়েছে ১৯৭৪ সালে। এর আগে ১৯৭২ সালের শেষ দিকে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ গিয়েছিল ইনাম। আমাদের দুই কন্যা হূদি হক ও প্রৈতি হক। হূদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএ  করেছে। এখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যবসা করছে। ১০০ শতাংশ ব্যবসায়ী সে। এক দিকে দল চালাচ্ছে, আরেক দিকে তার সংস্থা ‘টিকিট’ চালাচ্ছে। আমি চালাচ্ছি আমাদের থিয়েটার ইনস্টিটিউট। প্রৈতি ম্যানেজমেন্টে অনার্স, মাস্টার্স করে ধানমণ্ডির একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ায়। 

 

একুশে পদকসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন...

আগের পদকগুলোর মধ্যে প্রিয় একটি হলো চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের ‘সিকুয়েন্স’ পত্রিকার ‘সিকুয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার’। এটা খুব মূল্যবান ছিল। তা ছাড়া সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন নাট্যোৎসবে সম্মাননা পেয়েছি। কলকাতায় একটি আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব হয়েছিল—‘থিয়েটার ফর উইমেন’। নির্দেশক সবাই নারী। বাংলাদেশ থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি সেই উৎসবের উদ্বোধক ছিলাম। আমি মনে করি, একজন মানুষ যদি তাঁর বোঝার ক্ষমতার বয়স থেকে খুব সিনসিয়ারলি, সততার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যায় তাতে সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের লাভ হয়।

 

শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিকল্পনা?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে শিশু একাডেমির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন, এতে আমি গর্বিত। এখানে কাজের একটা সুন্দর পরিবেশ পেয়েছি। শিশুদের নিয়ে কাজ করতে আমি পছন্দ করি। এখানে কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। আমাদের শিশুরা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত। সেগুলো দূর করতে চাই। ইচ্ছা আছে শিশু একাডেমির সব শাখা ঘুরে দেখব। প্রতিটি শিশু একাডেমিকে যতটা সম্ভব শিল্পক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। স্বপ্ন দেখি, শিশু একাডেমি হবে ওয়ান্ডারল্যান্ডের মতো। গেট দিয়ে ঢুকতেই শিশুরা মনে করবে, ওরা ওদের নিজেদের স্বপ্নরাজ্যে প্রবেশ করেছে। শিশু একাডেমিগুলোর অনেক শাখারই যথাযোগ্য বিল্ডিং নেই। ভাড়া করা অফিসে কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি শিশু একাডেমিতে একটি প্রাঙ্গণ তৈরি করার ইচ্ছা আছে, যেন যাঁরা সেখানে চাকরি করেন, তাঁরা তো থাকতে পারবেনই, শিশুরাও এসে নির্বিঘ্নে সাংস্কৃতিক চর্চা করতে পারে। এ কারণে প্রতিটি জেলায় শিশু একাডেমির নিজস্ব ভবন তৈরির উদ্যোগ নেব।

 

শিশু একাডেমির বাইরে ব্যস্ততা?

‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অব ড্রামা’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ক্লাস, পরীক্ষা, ছয় মাসমেয়াদি একেকটি কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠান, সার্টিফিকেট বিতরণ—এসব নিয়ে ব্যস্ততা আছে।  এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের’ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কাজ করছি। এত ব্যস্ততার মধ্যে অবসর তেমন পাই না। তবু যতটুকু পাই, বই পড়ে কাটাই। বাড়িতে একটা দারুণ লাইব্রেরি আছে। সেটির কৃতিত্ব ড. ইনামুল হকের।

 

(শিশু একাডেমি, ঢাকা; ১২ নভেম্বর ২০১৯)

শ্রতলিখন : জুবায়ের আহম্মেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা