kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কোনো বিচারকই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে



কোনো বিচারকই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। প্রখ্যাত আইনজীবী। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন দুবার। আইন পেশায় ৪৬ বছর পার করা এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি এম বদি-উজ-জামান। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

ছোটবেলা কেমন কেটেছে?

আমাদের আদি বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার দৌলতপুর গ্রামে। সেখানেই ১৯৪৬ সালের ১৪ জুলাই আমার জন্ম। গ্রামে জন্মালেও পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরেই থাকতাম। তবে বছরে দুইবার গ্রামে যাওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। একবার কোরবানি ঈদে, আরেকবার পূজার ছুটিতে। বাবা নুরুল আলম চৌধুরী আইনজীবী ছিলেন। পূজা উপলক্ষে কোর্টে এক মাসের ছুটি হতো। এই সময় এক বা দুই সপ্তাহ গ্রামে কাটাতাম। মা রাবেয়া খানম ছিলেন পুরোদস্তুর গৃহিণী। আমরা পাঁচ ভাই, দুই বোন। ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় বোন রওশন আরা বেগম। এরপর বড় ভাই সাইফুদ্দিন মাহমুদ। তিনিও ব্যারিস্টার। এরপর আমি। আমার পরেই আরেক বোন আছিয়া পারভীন। সে কম বয়সেই মারা গেছে। তৃতীয় ভাই আনিস উদ্দিন মাহমুদও মারা গেছে। এরপর তারিক উদ্দিন মাহমুদ। আর সবচেয়ে ছোট ভাই নিয়াজ উদ্দিন মাহমুদ থাকে আমেরিকায়। ছোটবেলায় ভাই-বোনেরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম। তবে কারো সঙ্গে কোনো দিন  ঠোকাঠুকি হয়নি।

 

স্কুলের স্মৃতি?

পড়তাম চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে। বাবার গাড়িতে করে আমাদের স্কুলে আনা-নেওয়া করা হতো। আমি গাড়িতে খুব একটা আসা-যাওয়া করতে চাইতাম না। কারণ তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন অভিভাবকের গাড়ি ছিল। বাকি ছাত্ররা স্কুলে হেঁটে আসা-যাওয়া করে অথচ আমি গাড়িতে যাব? লজ্জা লাগত। একদিন ছোট বোন স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাকে নিতে গাড়ি নিয়ে স্কুলে এলো। ওর সঙ্গে না গিয়ে বললাম, ‘আর কোনো দিন আমাকে নিতে আসবে না।’ এর পর থেকে হেঁটেই বাসায় ফিরতাম। বাবা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট ছিলেন। চট্টগ্রাম জেলা আদালতে আইন পেশা শুরু করে অবসরের আগ পর্যন্ত সেখানেই প্র্যাকটিস করেছেন। তাঁকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সরকারি প্লিডার (জিপি) নিয়োগ করা হয়। ১৯৭২ সালে অবসর নেন। বাবা চাইতেন তাঁর কোনো সন্তান যেন আইনজীবী হয়। মনে আছে, স্কুলে পড়ার সময় ‘কার কী হওয়ার ইচ্ছা’ বিষয়ে শ্রেণি শিক্ষক রচনা লিখতে দিয়েছিলেন। স্যারকে বলেছিলাম, ‘বাবা বলে দিয়েছেন আমাকে ব্যারিস্টার হতে হবে। এ নিয়ে যেহেতু এখনো তেমন কিছু জানি না, তাই লিখতে পারব না।’ আমার কথা শুনে সবাই হেসেছিল। স্কুলটিতে আমি ১৯৫৪ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেখান থেকেই ১৯৬১ সালে এসএসসি, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে আইএ এবং ১৯৬৫ সালে বিএ পাস করেছি।

 

কলেজের দিনগুলো?

১৯৬২ সালে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। তখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষার্থীদের গোটা পূর্ব পাকিস্তান সফরের একটা সুযোগ ছিল। মেধাবী ও সামর্থ্যবানরাই এই সুযোগ পেত। আমি ওই সফরে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। মাত্র ২০ জনের ট্যুর। ট্যুরের প্রথম স্থান ছিল সিলেট। এরপর ঢাকা হয়ে উত্তরবঙ্গ গেলাম। তারপর কুষ্টিয়া, খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চল শেষ করে আবার ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম ফিরেছি। টানা ১০ দিনের সেই ট্যুর আমার জীবনের এক বিরাট অভিজ্ঞতা।

কলেজজীবনে আমরা কয়েকজন খুবই দুষ্টু ছিলাম। কেউ একজন একবার প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ করল। প্রিন্সিপাল স্যার অভিভাবকদের চিঠি দিয়ে ডাকলেন। চিঠি পেয়ে বাবা খুব খেপে গেলেন। কারণ এটা তাঁর জন্য খুবই অপমানের। আমি ভয়ে ভয়ে আছি। বাবা কারণ জানতে চাইলে বললাম, ‘তেমন কিছু না। ভয় দেখানোর জন্য চিঠি দিয়েছে। তোমার যাওয়ার দরকার নেই।’ বাবা বললেন, ‘তোমার কারণে আমার মানসম্মান নষ্ট করতে পারব না!’ বাবা গেলেন না। শেষ পর্যন্ত মাত্র একজন ছাত্রের অভিভাবক এসেছিলেন। বন্ধুদের কাছে শুনেছি, বাকি প্রত্যেকের বাবা বলে দিয়েছেন, তাঁরা কলেজে আসতে পারবেন না। যার যারটা তাকেই সামলাতে হবে। ঘটনাটি মনে পড়লে এখনো হাসি পায়।

 

সময় বাঁচাতে অনার্স পড়েননি?

অনার্স পড়তে চেয়েছিলাম। বাবা বললেন, ‘অনার্স পড়ে এক বছর সময় নষ্ট করবে কেন? তোমাকে ব্যারিস্টারি পড়তে হবে।’ তাই বিএ পাস করার পর সব কাগজপত্র নিয়ে ভিসার জন্য ব্রিটিশ দূতাবাসে আবেদন করতে ঢাকায় এলাম। টাকা জমা দিলাম। কিন্তু ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বেধে গেল। পাকিস্তান সরকার দেশ ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল। আমার আর ওই বছর লন্ডনে যাওয়া হলো না। ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিলাম। সেখানে থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি ও পলিটিক্যাল সায়েন্সে ভর্তি হলাম। তখন এলএলবি ছিল সন্ধ্যাকালীন কোর্স। কিন্তু রাতে ক্লাস ঠিকমতো করতে পারিনি। এ কারণে পরীক্ষা দিতে অসুবিধা হচ্ছিল। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। একজন পরামর্শ দিল সেগুনবাগিচার সেন্ট্রাল ল কলেজে যোগাযোগ করার। অনেক দেনদরবার করে, তাদের শর্ত মেনে পরীক্ষায় বসলাম। এ জন্য আমার কাছ থেকে তারা দুই বছরের বেতনসহ সব চার্জ নিল। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির রেজিস্ট্রেশন ছিল, তাই পরীক্ষা দিতে অসুবিধা হয়নি। পাস করে অবশেষে ১৯৬৮ সালের জুন মাসে ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডন গেলাম।

 

দুই ভাই একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন?

বড় ভাই আমার চেয়ে এক বছর ৯ মাসের বড় হলেও আমরা দুই ভাই এক শ্রেণিতে পড়েছি। একসঙ্গে এসএসসি, এইচএসসি, বিএ, এলএলবি, ব্যারিস্টারি পাস করেছি। ব্যারিস্টারিতে ‘কল টু দ্য বার’ হয়েছিও একসঙ্গে। ‘কল নাইট’-এ বিশেষ কোনো ঘটনা থাকলে তা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হতো। ওই সময় আমাদের দুই ভাইয়ের একসঙ্গে বার-এট-ল করার কথা সেখানে বলা হলো। আমাদের যমজ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো! দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই। আসলে স্কুলে একই ক্লাসে ভর্তি হওয়ার সময় দুই ভাইয়ের জন্ম তারিখ এক করে দিয়েছিলেন আমার এক চাচাতো ভাই। দুই ভাইয়ের একসঙ্গে পড়ার কারণ বড় ভাইয়ের চোখে সমস্যা ছিল। ছোটবেলা থেকেই হাই পাওয়ারের চশমা পরতেন। ডাক্তার তাঁর চোখের ওপর প্রেসার দিতে নিষেধ করেছিলেন। ডাক্তারের পরামর্শেই তাঁকে আমার ক্লাসে ভর্তি করা হয়। আমি পড়তাম, তিনি শুনতেন।

 

প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল?

আমরা বড় দুই ভাই লন্ডনের লিংকনস-ইন-এ পড়ছি। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের ঢেউ তখন সেখানেও লেগেছে। বিভিন্ন জায়গায় স্বাধীনতার সপক্ষের কর্মসূচি চলছে। সেগুলোতে অংশ নেওয়ায় লেখাপড়ায় কিছুটা অসুবিধা হলো। রেজাল্ট খারাপ হওয়ার ভয়ে ১৯৭১ সালে পরীক্ষা দিলাম না। ভালো করে পড়াশোনা করে পরেরবার দিলাম। এর পেছনে আরো একটা কারণ ছিল। আমাদের দুই ভাইয়ের প্রত্যেকের জন্য প্রতি মাসে হাবিব ব্যাংকের মাধ্যমে ৫৬ পাউন্ড পাঠাতেন বাবা। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় ছিল চট্টগ্রামে। বাবা ছিলেন এই ব্যাংকের আইন উপদেষ্টা। এ কারণে প্রতি মাসের ২ তারিখের মধ্যেই টাকা পেয়ে যেতাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় টাকা পাঠাতে সমস্যা হলো।

 

আইন পেশা শুরু করেন কবে?

চাচাতো ভাই জামাল উদ্দিন আহম্মেদও (পরবর্তীকালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন) বিলেতে পড়েছেন। তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট ছিলেন। শুধু জামাল উদ্দিন নন, আমাদের পরিবারের অনেকেই বিলেতে পড়াশোনা করেছেন। বার-এট-ল হওয়ার পর ১৯৭২ সালে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু বাবা, চাচাতো ভাইসহ আত্মীয়-স্বজন সবাই ওই মুহূর্তে ফিরতে নিষেধ করলেন। কারণ তখনো দেশের অবস্থা স্থিতিশীল হয়নি। আমরা ফিরলাম ১৯৭৩ সালে। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হলাম। অবশ্য এলএলবি পাস করার পরই তালিকাভুক্ত হতে পারতাম। কিন্তু তা করতে গেলে যদি ব্যারিস্টারি পড়তে যেতে বিলম্ব হয়? তালিকাভুক্ত হওয়ার পর নিয়মের বেড়াজালে পড়ে চট্টগ্রাম বারে (আইনজীবী সমিতি) যোগ দিলাম। এ সময় বাবা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিত্সার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে গেলাম। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মারা যান তিনি। ১৯৭৬ সালের ৬ জানুয়ারি আমি সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য হলাম। এরপর আর চট্টগ্রাম বারের সদস্যপদ রাখিনি। একাধিক আইনজীবী সমিতির সদস্য থাকার পক্ষে আমি নই। টি এইচ খান তখন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি। একদিন বারের নোটিশ বোর্ডে দেখলাম, বেলজিয়াম সরকার একটি ফেলোশিপ দিচ্ছে ইউনিভার্সিটি অব ব্রাসেলসে এলএলএম কোর্সের জন্য। আবেদন করলাম। টি এইচ খান আমার পক্ষে সুপারিশ করলেন। এভাবে ১৯৭৭ সালে বেলজিয়াম গেলাম এলএলএম করতে। এলএলএম করে দেশে ফিরলাম পরের বছর। সেই থেকে এখনো সুপ্রিম কোর্টে আছি। সাংবিধানিক (রিট আবেদন) এবং ব্যবসাসংক্রান্ত (করপোরেট)—আমি মূলত এ দুটি বিষয়ে মামলা লড়ি। তবে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে কিছু ফৌজদারি মামলাও লড়েছি।

 

ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের সঙ্গে সম্পর্ক...

ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার আইন পেশার পুরোটা জীবন একসঙ্গেই কাটিয়েছি। বাংলামোটরে একই ভবনে দুজনের পাশাপাশি চেম্বার থাকলেও মতিঝিলে (ইসলাম চেম্বার) আমার একটি নিজস্ব চেম্বার ছিল। শুরুর দিকে সারা দিন কোর্ট, মতিঝিলের নিজের চেম্বার করে সন্ধ্যায় বাংলামোটরে ইশতিয়াক ভাইয়ের চেম্বারে যেতাম। পরবর্তীকালে বাংলামোটরের চেম্বারেই বসতাম। তাঁর সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক ছিল, এ রকম সম্পর্ক এই পেশায় আর কারো সঙ্গে কারো আছে বলে মনে হয় না। তাঁর সঙ্গে ইউরোপ, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। তিনি আমার আদর্শ, সিনিয়র, বন্ধু, বড় ভাই, ফিলোসফার ও গাইড ছিলেন। সব সময় আমাকে সাহায্য করেছেন। কখনো কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেননি। এমনকি আমাদেরকেও কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দিতেন না। একদিন আদালতে এক আইনজীবীর সঙ্গে আমার বচসা হয়। ইশতিয়াক ভাইয়ের কাছে ওই আইনজীবী নালিশ দিলেন। ইশতিয়াক ভাই তাঁকে যা বলার বললেন। কিন্তু আমাকে ডেকে বললেন, ‘আপনি কী করেছেন, ইয়াং ম্যান! লোকটি তো মনে কষ্ট পেয়েছে। কারো সঙ্গে কটু ব্যবহার করা উচিত নয়।’ এটা আমার জীবনের এক শিক্ষণীয় ঘটনা। ওই রকম আর দু-একটি ঘটনা যদি ঘটাতাম, তাহলে হয়তো কোনো দিন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি হতে পারতাম না।

 

আপনাদের প্রজন্ম আর বর্তমান প্রজন্মের আইনজীবীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন?

আগে সিনিয়র আইনজীবীকে জুনিয়ররা সম্মান করতেন। আদালতকক্ষে সামনের সারি সিনিয়রদের জন্য ছেড়ে দিতেন। এখন সিনিয়রদের প্রতি সম্মান দেখানো কমে গেছে। এর একটা কারণও আছে। আমরা যখন সুপ্রিম কোর্ট বারে প্র্যাকটিস শুরু করি, তখন সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র শ দুয়েক। তাঁদের সবাই প্রতিদিন আদালতে আসতেন না। ফলে দুপুরের আগেই বার ফাঁকা হয়ে যেত। এখন কয়েক হাজার আইনজীবী। এর প্রভাব পড়বেই। আইনজীবীদের মধ্যকার এই প্রভাব বিচার বিভাগেও পড়েছে। কারণ আইনজীবীদের মধ্য থেকেই তো বেশির ভাগ বিচারপতি নিয়োগ করা হয়। দেখুন, একজন সত্ ও দক্ষ আইনজীবী ছাড়া কোনো দিনই সত্ ও দক্ষ বিচার বিভাগ পাওয়া যাবে না।

 

একদিন এরশাদ ও জিনাত মোশাররফ আমার বাসায় এলেন। তাঁরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানালেন। কাজিও ঠিক করে ফেলেছেন। তাঁরা দুজনই খুব আবেগপ্রবণ। পরবর্তীকালে এ নিয়ে এরশাদ ও জিনাত মোশাররফের সঙ্গে আমার আলাদা আলাদা কথা হয়। একদিন এরশাদকে সাগরিকা সিনেমাটি দেখতে বললাম। ওই সিনেমায় কী আছে তিনি জানতে চাইলেন। বললাম, সেখানে একটি ডায়ালগ আছে—‘ভালোবাসা হচ্ছে বিয়ের সূর্যোদয়। আর বিয়ে হচ্ছে ভালোবাসার সূর্যাস্ত। এ কথা শুনে তিনি খুব হাসলেন। জিনাত মোশাররফকেও আলাদাভাবে যা বলার বলেছি। এরপর তাঁদের বিয়েটি আর হয়নি।

 

 

বিচার বিভাগ নিয়ে মূল্যায়ন?

আগে যাঁরা বিচারপতি হতেন তাঁদের বিদ্যা, বুদ্ধি, সামাজিক অবস্থান—সবই থাকত। তাঁদের প্রতি বারের সব সদস্যের অগাধ শ্রদ্ধা ছিল। এখন অনেক বিচারপতি। আগের মতো সব খুঁজলে প্রয়োজনীয়সংখ্যক আদর্শবান বিচারপতি পাওয়া কঠিন হবে। এই বাস্তবতা মানতেই হবে। লাখ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য অনেক বিচারপতি দরকার—এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্যদিকে আইনজীবীদের মধ্যকার অবক্ষয়ের প্রতিফলন বিচারপতিদের মধ্যেও পড়েছে। বিচারপতিদের সবাই যে খারাপ, তা নয়। অল্প কয়েকজন বিচারপতির বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে কিছু কথা শোনা যায়। আমার কথা স্পষ্ট—যাঁদের বিরুদ্ধে কথা শোনা যায়, তাঁদের বিচার বিভাগ থেকে সরিয়ে দিলেই তো হয়। এরই মধ্যে তিনজন বিচারপতিকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে তো বারের কোনো উচ্চবাচ্য নেই। তবে এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারত। শুনেছিলাম এই সংখ্যা ১৪ জনের কাছাকাছি। হয়তো প্রধান বিচারপতি মনে করেছেন, একসঙ্গে এতজন বিচারপতির বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আমি বলব, ১৪ জন না হোক, আরো তিন-চারজনের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আরেকটা কথা মনে রাখা দরকার, কোনো বিচারকই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। বিচারকেরও দোষ-ত্রুটি থাকতে পারে। একজন আইনজীবী, চিকিত্সক, রাজনীতিবিদ, আমলা, সাংবাদিকের সমালোচনা যদি করতে পারেন, তবে বিচারকের সমালোচনা কেন করা যাবে না? বিচারকদের কি দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে? তা তো না। যদি তাঁদের সমালোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তখন যদি সমালোচনা করা না হয়, তাহলে বিচার বিভাগের অধঃপতন হবেই। সেটিই এখন হয়েছে। তবে বিচারকের বিরুদ্ধে লিখলে সেটা হতে হবে গঠনমূলক। আর বিচারকদেরও স্বচ্ছ সমালোচনা সহ্য করতে হবে।

 

বিচার বিভাগে শুদ্ধি অভিযান নিয়ে কথা বলেছেন?

বহুল আলোচিত ক্যাসেট কেলেঙ্কারি মামলার কথা শুনেছেন নিশ্চয়ই? সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে হাইকোর্টের একজন বিচারপতির (বিচারপতি লতিফুর রহমান) কথোপকথনের অভিযোগ নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট করা হয়। এ ঘটনায় ‘মানবজমিন’ পত্রিকার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি হলো। আমি পত্রিকাটির সম্পাদকের পক্ষের আইনজীবী। একদিন শুনানিকালে বললাম, ‘এই বেঞ্চে কী বিচার হচ্ছে? মানুষ কি ন্যায়বিচার পাচ্ছে?’ আমার এই বক্তব্য সেই বিচারপতির উদ্দেশে ছিল না। আমার টার্গেট ছিল বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি। তখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন আরেক লতিফুর রহমান। ওই সময় প্রধান বিচারপতির দৃঢ় পদক্ষেপের কারণেই হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি লতিফুর রহমানকে সরে যেতে হয়েছিল। অন্যদিকে আমি যখন বারের সভাপতি, তখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন কে এম হাসান। ওই সময় হাইকোর্ট বিভাগের এক বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল। অভিযোগকারী সাবেক এক বিচারপতির মেয়ে। তিনি আমার কাছে এলেন। আমি বিষয়টি নিয়ে বারের মিটিংয়ে বক্তব্য রাখলাম। পরদিন পত্রপত্রিকায় বড় বড় করে খবর ছাপা হলো। প্রধান বিচারপতি আমাকে ফোনে জিজ্ঞেস করলেন, ওই কথা আমি বলেছি কি না? শুনেছি, প্রধান বিচারপতি অভিযোগকারীর পিতাকেও ফোন করে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। তখনকার প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান আমার বক্তব্য বা পত্রিকার খবরের ওপর নির্ভর করেননি। তিনি ক্রসচেক করেছেন। এই অভিযোগ ওঠার পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হলো। হাইকোর্ট বিভাগের অভিযুক্ত বিচারপতিকে অপসারণ করা হলো। এ রকম দৃঢ়তা আমি আর দেখিনি। আরেকটি ঘটনা বলি, তখনো আমি বারের সভাপতি। হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতির এলএলবি সনদ নিয়ে কথা উঠল। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামে। আমার জুনিয়র ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। কিন্তু আমি সেসব দেখিনি। অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়েছি। ওই বিচারপতিকেও বিচার বিভাগ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। আমি বারের নেতা ও একজন আইনজীবী হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে খুবই সোচ্চার ছিলাম। আমার কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বসেছে। এর আগে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যবস্থা শুধুই সংবিধানের পাতায় লিপিবদ্ধ ছিল। বিচার বিভাগকে কলুষমুক্ত করতে ভূমিকা রাখতে পারাটা আমার জন্য একটি আত্মতৃপ্তির ব্যাপার।

 

বিচারক নিয়োগে আইন থাকা দরকার?

আমাদের সংবিধানে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই আইন আজও হয়নি। মনে রাখতে হবে, আমেরিকা বা ইংল্যান্ডেও যে সরকার ক্ষমতায় আসে, সেই সরকার তার দলের অনুসারীদের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই দেশের দলীয় লোক নিয়োগের আগে তাঁর দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা, দেশপ্রেম দেখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের এসবের কতটুকু দেখা হয় তা তো সবাই জানে। দলীয় লোক নিয়োগ হোক, তাতে আপত্তি নেই। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যোগ্য, সত্ ও মেধাসম্পন্ন হতে হবে। এই নিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা থাকতে হবে।

 

সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল...

এইচ এম এরশাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়। স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় বিদেশি আসামিদের আইনজীবী ছিলাম আমি। বিচার হয় নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কারাগারের পাশের লাল ভবনে। সেখানে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হতো। তিনি তখন কারাবন্দি। এরপর তাঁর আরো কিছু মামলায় লড়েছি। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। একদিন এরশাদ ও জিনাত মোশাররফ আমার বাসায় এলেন। তাঁরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানালেন। কাজিও ঠিক করে ফেলেছেন। তাঁরা দুজনই খুব আবেগপ্রবণ। পরবর্তীকালে এ নিয়ে এরশাদ ও জিনাত মোশাররফের সঙ্গে আমার আলাদা আলাদা কথা হলো। একদিন এরশাদকে ‘সাগরিকা’ সিনেমাটি দেখতে বললাম। ওই সিনেমায় কী আছে তিনি জানতে চাইলেন। বললাম, সেখানে একটি ডায়ালগ আছে—‘ভালোবাসা হচ্ছে বিয়ের সূর্যোদয়। আর বিয়ে হচ্ছে ভালোবাসার সূর্যাস্ত।’ এ কথা শুনে তিনি খুব হাসলেন। জিনাত মোশাররফকেও আলাদাভাবে যা বলার বলেছি। এরপর তাঁদের বিয়েটি আর হয়নি।

 

দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন?

অনেকেই বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় আমি নাকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলা ফেরত দিয়েছিলাম। এই অভিযোগ সত্য নয়। সে সময় আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল। আমাকে প্রায়ই সেনানিবাসে ডেকে নেওয়া হতো। মাঝেমধ্যে আমার চেম্বারে সেনা কর্মকর্তারা হানা দিতেন। তাঁরা আমাকে দিয়ে বিভিন্ন রকম বিবৃতিতে স্বাক্ষর করাতে চেয়েছিলেন। এ পরিস্থিতিতেও আমি শেখ হাসিনার মামলা লড়ে যাচ্ছিলাম। আমার ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছিল। তবু তাঁদের প্রস্তাবে রাজি হচ্ছিলাম না। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর আদালতে শেখ হাসিনার মামলা চলছিল। এ অবস্থায় খবর পেলাম, আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কী করব—ভেবে পাচ্ছিলাম না। কারো সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করতেও পারছিলাম না, যদি ফাঁস হয়ে যায়! শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিলাম। গোপনে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত। কিন্তু শেখ হাসিনার মামলা আমার কাছে। কী করব? যেদিন মামলাটি কোর্টে যাবে, তার আগের দিন ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে বললাম, ‘ধরুন, কোনো কারণে যদি আগামীকাল আমি আদালতে হাজির থাকতে না পারি, তাহলে কী করণীয়?’ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সাহেবকে রাখা নিয়ে কথা হলো। তাপস জানতে চাইলেন, আমি দেশের বাইরে যাচ্ছি কি না? কিন্তু তাঁকে সে উত্তর না দিয়ে শুধুই বললাম, ‘কোনো কারণে যদি উপস্থিত হতে না পারি, তাহলে বিষয়টি আপনি সামাল দিয়েন।’ পরদিন ব্যাংকক চলে গেলাম। সেখানে আমাকে বেশ কিছুদিন থাকতে হয়েছিল। ড. কামাল হোসেন বুঝতে পেরেছিলেন, আমি পালিয়ে এসেছি। ফোন করে জানতে চাইলেন, ব্যাংকক যাওয়ার আগে আমাকে আটক রাখা হয়েছিল কি না? বললাম, ‘সে রকম কিছু না। নিজেই চলে এসেছি।’ খবর পেয়ে আমার স্ত্রীও সেখানে এলো আমাকে নেওয়ার জন্য। আমি কিন্তু তাঁর সঙ্গে যেতে পারছিলাম না। তাঁকে বলতেও পারছিলাম না, দেশ থেকে পালিয়েছি। সেখানে দুই সপ্তাহের বেশি থেকে তারপর সুইজারল্যান্ডে চলে গেলাম।

 

আপনার ব্যক্তিগত জীবন?

লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় আইরিনের সঙ্গে পরিচয়। সুইজারল্যান্ড থেকে লন্ডনে পড়তে এসেছিল সে। ১৯৭৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আমরা বিয়ে করি। পরে দুই পরিবারের মধ্যে আচার-অনুষ্ঠান হয়েছে। আমাদের ছেলে রিফাত আলম মাহমুদ সুইজারল্যান্ডে ব্যাংকার ছিল। চাকরি ছেড়ে এখন ব্যবসা করছে। মেয়ে সারাহ জেরিন মাহমুদ ব্যারিস্টার। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে প্র্যাকটিস করছে। স্ত্রী আইরিন মাহমুদ পুরোপুরি গৃহিণী। সে এখন সুইজারল্যান্ডে থাকে। ৪০ বছর এ দেশেই ছিল। আমার সংসার সে-ই সামাল দিত। নিজে গাড়ি চালিয়ে ছেলে-মেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়া করত। বাজার করত। গুলশানে আমার বাসার পাশের রাস্তায়ই হলি আর্টিজান। সেখানে ভয়াবহ হামলার পরদিনই সে সুইজারল্যান্ড চলে গেছে। যদিও সে এখন বাংলাদেশে আসতে চায়। কিন্তু আমি তাকে বারণ করি। কারণ বিদেশিদের জন্য বাংলাদেশ আগের মতো এখন আর নিরাপদ নেই।

 

রাজনীতি করার কথা ভেবেছিলেন কখনো?

আমি প্রত্যক্ষভাবে জাতীয় বা দলীয় রাজনীতি করি না। বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলে, সেই রাজনীতি আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়। কারণ আমি ঠোঁটকাটা মানুষ। মুখের ওপর বলে দেওয়া মানুষ। আমাদের রাজনীতিতে যেভাবে সকালে এক রকম, বিকেলে আরেক রকম কথা চলে—এটা আমাকে দিয়ে হবে না। আমি পরিচ্ছন্ন জীবনের প্রত্যাশী। রাজনীতিবিদ হতে হলে চামড়া মোটা হতে হয়। অবশ্য ২০০৬ সালের শেষ দিকে এবং ২০০৭ সালের শুরুতেই ধানমণ্ডি আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। প্রথমে রাজি হইনি। তবে যেহেতু তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করিয়েছেন, তাই তাঁর সম্মানে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছিলাম। যদিও সেই নির্বাচন আর হয়নি। আমারও আর জাতীয় রাজনীতি করা হয়নি।  

(গুলশান, ঢাকা; ২৫ অক্টোবর ২০১৯)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা