kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

গবেষণা ও জাগতিক স্বার্থ একসঙ্গে হয় না

ব্রিটিশ রয়েল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, ব্রিটিশ একাডেমি, ফুলব্রাইট, কমনওয়েলথ ফেলো ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাবেক সভাপতি। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’, ‘বাংলাপিডিয়া’, ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ সিরিজসহ আন্তর্জাতিক মানের একাধিক গ্রন্থ। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন শেখ মেহেদী হাসান। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



গবেষণা ও জাগতিক স্বার্থ একসঙ্গে হয় না

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা...

আমার জন্ম ১৯৩৯ সালের ২১ অক্টোবর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের থানারকান্দি গ্রামে। বাবা মাজেজুল ইসলাম। মা শিরিন ইসলাম। পাঁচ ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি পঞ্চম। একেবারে কৃষি পরিবারে আমার বেড়ে ওঠা। তখন পুরো বাংলাদেশ ছিল কৃষি অর্থনীতিনির্ভর। এর দুটি স্তর। একদল মাটি খুঁড়বে, কঠোর পরিশ্রমে ফসল ফলাবে। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের নিয়ন্ত্রণে উপরি একটা শ্রেণি ছিল। তাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। তবে কৃষি ছিল সম্মানজনক পেশা। আমার বড় চাচা মাওলানা ওয়াসেক কলকাতায় পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর নিজস্ব একটা ধর্ম ধারণা ছিল। শরিয়তের কঠোরতা এড়িয়ে উদারনৈতিক ভাবনা ছিল সেই ধর্মাদর্শের মূলনীতি। উদারনৈতিক চিন্তার মাধ্যমে তিনি সমাজের পরিবর্তন চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মকে যুগের সঙ্গে মেলাতে না পারলে ধর্ম ও জীবন টিকবে না।

 

ধর্ম তো রাষ্ট্রপূর্ব যুগের ব্যাপার। আপনার চাচা নিশ্চয় বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন?

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ধর্মের মাধ্যমে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। রাষ্ট্র কার্যকর হয়েছে মোগল আমলে। সুুলতানি আমলে রাষ্ট্রব্যবস্থা অতখানি পরিষ্কার ছিল না। আরো শক্ত হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। তবে আধুনিক যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থা বিশ্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা, মানুষের অধিকার, শান্তি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা বিশ্বমানে আছি। এটা বড় অর্জন। তবে ধর্ম নিয়ে আমাদের দেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে নানা সময় শৃঙ্খলাহীনতা দেখা যায়। আগের যুগে ধর্মের যেসব স্তরবিন্যাস ছিল, আধুনিক যুগে এই স্তরবিভাজন ক্রমান্বয়ে ভেঙেছে। পরিবার কাঠামো ভেঙেছে। অন্যদিকে ধনী-গরিব সব দেশে, সব সময় ছিল, থাকবে। চাচাকে না পেলেও তাঁর ধর্মচিন্তা আমাকে ভাবিয়েছে। ধর্মের সংস্কারের জন্য তিনি ধর্মীয় রীতি, শরিয়তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তবে ধর্মের সত্যিকারের মতাদর্শের বাইরে যাননি। তিনি প্রচার করতেন, সৃষ্টিকর্তাকে পেতে হলে বুদ্ধি দরকার, বিদ্যা দরকার, একাগ্র সাধনা ও চর্চা দরকার। সেকালে আমার চাচা নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সামাজিকভাবে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। তার পরও হাল ছাড়েননি।

 

আপনি গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বিদেশে পড়েছেন...

মাধ্যমিক পড়াশোনা পর্যন্ত পুরোপুরি গ্রামে ছিলাম। গ্রামের সহজ, সরল মানুষ, প্রাকৃতিক পরিবেশ ভালো লাগত। ম্যাট্রিক পাস করি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষ্ণনগরের তালশহর হাই স্কুল থেকে। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ি ভৈরবের হাজি আসমত কলেজে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। আমাদের সময় ভালো ছাত্ররা অর্থনীতি, নয়তো ইংরেজিতে পড়ত। আমি ইতিহাস নিয়েছিলাম নিজের ইচ্ছায়। ছাত্র ভালো ছিলাম। ওই যুগে ভালো ছাত্র তাকেই বলা হতো যে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে। ধারণাটি যদিও ঠিক নয়। অনেকেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও উচ্চচিন্তা করতে পারে না। বিশ্ব ইতিহাসে শেকসপিয়ার বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাস করা লোক ছিলেন না। প্রাচীন ও মধ্যযুগে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবানদের সমাজে প্রভাব ছিল। সমাজকে তাঁরাই এগিয়ে নিয়েছেন। আলোকিত করেছেন।

 

শিক্ষকতায় যোগ দিলেন কবে?

১৯৬২ সালে। এমএ পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়ার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দিই। আমাদের সময় ভালো ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে সিভিল সার্ভিসে যেত। আমি যাইনি। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা আমার কাছে সর্বাধিক মহত্ ও আদর্শপূর্ণ মনে হতো। আমার উদ্দেশ্য ছিল, শিক্ষকতার মাধ্যমে পড়াশোনার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে নিজের চিন্তা বিনিময় করা। শিক্ষকতা শুরুর এক বছরের মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি পেয়েছিলাম। তারপর ১৯৬৩ সালে পিএইচডি করতে চলে গেলাম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে জ্ঞানচর্চার নতুন পরিবেশ পেলাম। লাইব্রেরিতে পড়ে থাকতাম। আমার অভিসন্দর্ভ ছিল ‘পারমান্যান্ট সেটলমেন্ট অব বেঙ্গল’। এ বিষয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে প্রচুর ডকুমেন্ট, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলাম। নির্দিষ্ট সময়ে পিএইচডি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ফিরে আসি। পরে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি-উত্তর উচ্চতর গবেষণা করেছি।

 

পেশাগত জীবনে একাধিক উচ্চতর গবেষণার সুপারভাইজ করেছেন...

দেশে-বিদেশে যেখানে পড়াশোনা করেছি নিষ্ঠার সঙ্গে, সুচারুভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছি। পঠন-পাঠনে সব সময় ন্যায্যতা মেনে চলেছি। আলস্য আমাকে স্পর্শ করেনি। পেশাগত জীবনে আমার অধীনে একাধিক এমফিল ও পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। ফেলোদের প্রতি যত্নবান থেকেছি। তাঁদের মধ্যে দেশপ্রেম, মূল্যবোধ, আদর্শের বীজ বপনের চেষ্টা করেছি। সত্যিকারের একজন স্কলার তৈরি হতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। এ হলো বিপুল তরঙ্গমালা পাড়ি দিয়ে কূলে পৌঁছানোর মতো।

 

এশিয়াটিক সোসাইটি আপনার সম্পাদনায় তিন খণ্ডে ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থ বের করেছে। গবেষণার ক্ষেত্রে আপনি যৌথ ভাবনা, বিশ্লেষণ, তূলনামূলক পর্যালোচনাকে স্থান দিয়েছেন...

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রণয়নে অনেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন যদুনাথ সরকার, আশুতোষ ভট্টাচার্যসহ একাধিক খ্যাতিমান অধ্যাপক। ওই সিরিজ প্রকল্প থেকে মাত্র দুটি বই বের হয়েছিল। তারপর দেশ ভাগ হওয়ায় স্কলাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ভারতে চলে যাওয়ায় ওই প্রকল্প থেমে যায়। একসময় দেখলাম, বাংলাদেশের একটি নিরপেক্ষ ইতিহাস প্রণয়ন সময়ের দাবি। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ থেকে আমি উদ্যোগ নিলাম। কাজটি করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত কিছু নীতিমালা তৈরি করেছি। আমি বিশ্বাস করি, এককভাবে নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। সুতরাং বিষয়ভিত্তিক স্কলার নির্বাচিত অধ্যায় রচনা করবেন। প্রতিটি রচনা হবে নিরপেক্ষ, বিশ্লেষণধর্মী, তুলনামূলক পর্যালোচনাভিত্তিক। শুধুই বর্ণনামূলক রচনা স্থান পাবে না। প্রথাগত গবেষণা চর্চা থেকে আমরা বের হওয়ার চেষ্টা করেছি। এর আগে গবেষণার নামে যে কল্পকাহিনি প্রচলিত ছিল তা থেকে বিরত থেকেছি। ইউরোপ, আমেরিকার যত ইতিহাসের গুণগত মান বজায় রেখে আমরা আমাদের ইতিহাস রচনার চেষ্টা করেছি। প্রতিটি রচনা একাধিকবার রিভিউ, সেমিনার ও সম্পাদনার পর বইয়ে স্থান দিয়েছি। এভাবে প্রণীত হয়েছে ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ (১৭০৪-১৯৭১)। তিন খণ্ডে এ বই প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে।

 

‘বাংলাপিডিয়া’ সম্পাদনা করেছেন। এটি তথ্য ও জ্ঞান বিস্তারে কেমন প্রভাব ফেলছে?

‘বাংলাপিডিয়া’ আমাদের জাতীয় জ্ঞানকোষ। আমাদের দেশে এ ধরনের বই আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি। প্রতিবেশী দেশেও ছিল না। এটি বড় কাজ। এর জন্য দরকার ছিল পুঁজি, সময় ও স্কলারলি সহযোগিতা। আমাদের দেশে এসব ধারণা আগে ছিল না। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ধারণা ছিল, অধ্যাপক মানে নিজে নিজে পণ্ডিত। ১৫০ পাতার বই লিখে স্কলার হয়ে যেতেন। বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এ চিন্তার বদল ঘটেছে। আমরাও কিছু পরিবর্তন এনেছি। তখনকার গবেষণায় সীমিত সাফল্যের জন্য দায়ী যুগের ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানের অভাব। ফান্ড না পাওয়ায় নিজের ওপর নির্ভরতা ছিল। নিজের সামর্থ্য, সময়ের ওপর গবেষণা নির্ভর করত। এর গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন থাকত। তখন স্কলারলি সোসাইটি ছিল না। ব্রিটিশরা আমাদের শাসন করলেও বিদ্যা দেয়নি। পাকিস্তান আমলে গবেষণা তুখোড়ভাবে শুরু হয়। এখন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে। আমরা সবকিছু মাথায় নিয়ে ‘বাংলাপিডিয়া’র কাজে হাত দিই। ফান্ড সংগ্রহের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। নানা পর্যায়ের স্কলারদের সম্পৃক্ত করেছি। আমরা এলিটদের জ্ঞানচর্চা জনমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। অনেকে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। অবহেলা করেছে। তার পরও হাল ছাড়িনি। দেশি-বিদেশি স্কলার বন্ধুদের পরামর্শ নিয়েছি। তাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। মনে রাখতে হবে, ‘বাংলাপিডিয়া’ বাঙালিদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মিলিত গবেষণা প্রচেষ্টা। ২০০৩ সালে ‘বাংলাপিডিয়া’ (২০ খণ্ড) প্রকাশিত হয় একযোগে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়, মাল্টিমিডিয়া, সিডি এবং অনলাইনে। সে হিসেবে এটি বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ পাঠক সৃষ্টি করেছে। সিডি ও অনলাইনে থাকায় বিশ্বজুড়েই ‘বাংলাপিডিয়া’র পাঠক সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি বড় সার্চইঞ্জিনে এটি লিংক করা আছে। ফলে প্রতি মাসেই লাখ লাখ পাঠক ‘বাংলাপিডিয়া’ সাইট হিট করছে। এর সার্বিক প্রভাব অসাধারণ।

 

এটি তো একটি ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত?

‘বাংলাপিডিয়া’র বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে আমরা এশিয়াটিক সোসাইটির অধীনে একটি ট্রাস্ট স্থাপন করেছি। ‘বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট’। এই ট্রাস্টের প্রধান কাজ নতুন নতুন সংস্করণের মাধ্যমে ‘বাংলাপিডিয়া’কে ক্রমাগত উন্নত করা ও যুগোপযোগী রাখা, রেফারেন্সবিষয়ক আরো নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা। এরই মধ্যে ‘বাংলাপিডিয়া’র দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়েছে।

‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ সিরিজ গ্রন্থ বাংলাপিডিয়া ট্রাস্টের অধীনে ছিল?

হ্যাঁ, বাংলাপিডিয়া ট্রাস্টের অধীনেই ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ সিরিজ প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। ১২ জন পণ্ডিতের সম্পাদনায় এবং দুই শতাধিক গবেষকের অংশগ্রহণে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গবেষকরা মাঠপর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে পেপার জমা দিয়েছিলেন। প্রতিটি রচনা রিভিউ এবং সম্পাদনার মাধ্যমে গ্রন্থভুক্ত করেছি। বাংলাদেশে এর আগে আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে কোনো মাঠ জরিপ হয়নি। এ ধরনের বইও প্রকাশ পায়নি। ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ ইংরেজি ও বাংলায় প্রিন্ট ভার্সন ও সিডিতে পাওয়া যাচ্ছে। আমি ছিলাম এ প্রকল্পের প্রধান সম্পাদক।

 

‘ছোটদের বাংলাপিডিয়া’ করেছেন...

বাংলা ভাষায় দুই খণ্ডের একটি ‘জুনিয়র বাংলাপিডিয়া’ প্রণয়ন করেছি। এটি আট রঙের একটি বিশ্বমানের সচিত্র শিশুতোষ গ্রন্থ। একটি অনলাইন ন্যাশনাল বায়োগ্রাফি। এ ছাড়া ইউনিভার্সেল ল্যাঙ্গুয়েজ নেটওয়ার্কিংসহ একাধিক কাজ করেছি। ইউনিভার্সেল ল্যাঙ্গুয়েজ নেটওয়ার্কিং একটি ডিজিটাল প্রকল্প। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর প্রায় ১৫০টি ভাষায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে কম্পিউটারে তাত্ক্ষণিক অনুবাদ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

 

এশিয়াটিক সোসাইটিতে একাধিক গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন...

একাধিক গবেষণাকেন্দ্র ও ট্রাস্ট আছে। ঢাকা গবেষণাকেন্দ্র থেকে ঢাকা নগরীবিষয়ক গবেষণা হয়েছে। এ গবেষণা পরিচালনা করেছেন প্রফেসর শরীফউদ্দীন আহমদ। তিনি একজন বড় মাপের ঢাকাবিদ। রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রফেসর শরীফ তিন বছরমেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ১৯টি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। আরেকটি বড় কেন্দ্র হলো উদ্ভিদ ও প্রাণিবিদ্যা কেন্দ্র। এ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর জরিপ চালিয়ে মোট ২৮ খণ্ডের একটি চাররঙা, অতিকায় সচিত্র সিরিজ প্রকাশিত হয়েছে। এর চাহিদা বিপুল ও অভূতপূর্ব। দেশ ও বিদেশের বাজারে এ সিরিজের লক্ষাধিক টাকার বই প্রতি মাসেই বিক্রি হচ্ছে। আরেকটি খুব ব্যস্ত কেন্দ্র আমাদের আর্ট গ্যালারি। এ গ্যালারিতে নবীন শিল্পীদের চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হচ্ছে। গ্যালারি কেন্দ্র খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ঐতিহ্য জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছি। এসব সম্ভব হয়েছে আমার তত্কালীন সহকর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতায়। তাঁদের কৃতিত্ব দিতে চাই। বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক মাহফুজা খানম দূরদর্শী মানুষ। তিনি প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে নিতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন।

 

কাজ করতে গিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন?

এ ধরনের কাজ যেহেতু এ দেশে এর আগে হয়নি, ফলে সরকার কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও শুরুর দিকে ফান্ড দিতে আগ্রহ দেখায়নি। অন্যদিকে লেখকেরও সংকট ছিল। আবার অনেকেই অ্যাসাইনমেন্ট নিয়েও লেখা দেননি। এ কারণে তরুণ গবেষকদের যুক্ত করে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এরপর সেমিনারের আয়োজন করেছি। সেখানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সিনিয়র ব্যক্তিবর্গসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তখন এ কাজের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন। এখন অবশ্য এ ধরনের সমস্যা নেই।

 

তরুণ গবেষকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা...

আমার সঙ্গে অনেক তরুণ গবেষক কাজ করেছে। আমি বিশ্বাস করি, তরুণদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করা না গেলে জ্ঞানের উন্নতি হবে না। ব্যক্তিগত গবেষণায় জাতীয় পরিবর্তন আসবে না। জাতীয় ইতিহাস নির্মিত হবে না। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ সে দায়িত্ব পালন করছে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সুপারভাইজর আমাকে বলেছিলেন, ‘নতুন কোনো ভাবনা এলে সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়ো। সময় নষ্ট কোরো না। হাতে সময় খুব কম। সময়কে কাজে লাগাও।’ শিক্ষকের এই পরামর্শ সারা জীবন মনে রেখেছি। আমি বড় কাজ করতে চেয়েছি। চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে চেয়েছি তরুণদের সঙ্গে নিয়ে। তরুণরাই ভবিষ্যত্ রচনা করে। তারা জ্ঞানচর্চায় আরো নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে। দেশ, সমাজকে এগিয়ে নেবে। বাংলাদেশের মর্যাদা বহুগুণে বাড়াবে।

 

এত বড় সব প্রকল্পের অর্থ জোগাড় করলেন কিভাবে?

এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ একটি অরাজনৈতিক, অমুনাফামুখী স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। এর আয় আসে বিভিন্ন উত্স থেকে। যেমন—সদস্যদের চাঁদা, প্রকাশনা বিক্রয়, ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান। সরকার সোসাইটিকে প্রদেয় সব অনুদানকে আয়করমুক্ত ঘোষণা করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশে অনেক ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান সোসাইটিতে ট্রাস্ট স্থাপন করেছে। ট্রাস্ট স্থাপনে সর্বনিম্ন অঙ্ক পাঁচ লাখ টাকা। ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে। এ পর্যন্ত এখানে প্রায় ৩০টি ট্রাস্ট স্থাপিত হয়েছে। এগুলোর মোট সম্পদ ১০ কোটি টাকার বেশি। বড় প্রকল্পগুলোতে সরকারও আংশিক বা কখনো কখনো পূর্ণ অর্থায়ন করেছে। তা ছাড়া সোসাইটি সরকারের একটি বার্ষিক অনুদান পায়, যার পরিমাণ অকিঞ্চিত্ হলেও আমরা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছি। সরকারীকরণ হলে সোসাইটিকে প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেটভুক্ত করা হবে—এমন প্রস্তাব পাওয়ার পরও আমরা অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম। সরকারীকরণ হওয়ার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এরশাদের শাসনামলে একবার সোসাইটিতে সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। এক বছর পর সে নিষেধাজ্ঞা অবশ্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এখন গবেষণার ফান্ড দিতে সরকার, বিদেশি সংস্থা, দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আগের চেয়ে বেশি আন্তরিক।

 

এশিয়াটিক সোসাইটির কাজের তেমন প্রচারণা নেই কেন?

প্রচারণার ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা স্বীকার করি। প্রথম থেকেই সোসাইটি প্রচারবিমুখ। প্রফেসর ড. আহমদ হাসান দানী, প্রফেসর ড. এ বি এম হবিবুল্লাহ আমাদের প্রচারে নয়, গবেষণা প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকতে শিখিয়েছেন। প্রচার ছাড়া প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকার ঐতিহ্য এখনো অনেকটা বিদ্যমান। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ যেসব গবেষণামূলক কাজ করেছে তার উচ্চমূল্য আছে। জ্ঞানপিপাসু পাঠক ঠিকই আমাদের গবেষণাগ্রন্থ খুঁজে নেন। তা ছাড়া এগুলো তো রেফারেন্স বই। তৈরি পাঠকের পাঠ্য। তার পরও বলব, অনেকেই জানেন না আমরা কী করেছি? সবাইকে জানাতে হবে আমাদের কর্মকাণ্ড। প্রকাশনার বিক্রয় বাড়াতে এর বিকল্প নেই। পত্রপত্রিকায় যাঁরা কাজ করেন, পাঠকদের জানানো তাঁদেরও দায়িত্ব।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই অবসর নিয়েছেন...

এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ থেকে আমরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছিলাম। এসব প্রকল্প নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করতে প্রচুর সময় প্রয়োজন ছিল। সুষ্ঠুভাবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং গবেষণা পরিবেশের একটি স্থায়ী ভিত্তি স্থাপনে পার্টটাইম কাজ করলে চলে না। তা ছাড়া গবেষণা ও জাগতিক স্বার্থ একসঙ্গে হয় না। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছি। বড় কাজের জন্য ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হয়।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে আপনার অভিমত?

শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতিতে নাম, যশ, স্বীকৃতি, ক্ষমতা, এমনকি অর্থাগমও আছে। অতএব শিক্ষক-ছাত্রদের পক্ষে রাজনীতি করাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। ব্রিটিশ আমলে ছাত্রদের চেয়ে শিক্ষকরাই রাজনীতি করতেন বেশি। তবে তখন প্রেক্ষাপট ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। ১৯৩০ সালের দিকে কংগ্রেসের আদলে মুসলিম লীগ একটি ছাত্রসংগঠন করেছিল—‘অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’। ওই সংগঠনের সঙ্গে মুসলিম ছাত্রদের চেয়ে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা ছিল বেশি। যেমন—হুগলি বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পদাধিকারীদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাই ছিলেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই সংগঠনের কয়েকটি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার এ এফ রহমানও ১৯৩৫ সালে বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। তবে আগে শিক্ষক ও ছাত্ররা রাজনীতি করতেন অর্থের জন্য নয়, নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য নয়; বরং মুসলিম জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করার জন্য। এতে ব্রিটিশ সরকারেরও মদদ ছিল। বর্তমানেও সরকার মদদ দিয়ে থাকে, তবে তা দেওয়া হয় ক্ষমতা লাভের জন্য, ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য। এ প্রক্রিয়ায় দলীয় শিক্ষক ও ছাত্ররা যদি দুর্নীতি করে তাও সরকার হজম করে নেয়। এতে রাজনীতিতে বিরোধী দলের ছাত্র-শিক্ষকরা নানাভাবে নির্যাতিত হয়, বঞ্চিত হয়। দল ক্ষমতায় গেলে সেটা তারা সুদে-আসলে তুলে নেয়। এ রাজনীতি কাম্য হতে পারে না। এ রাজনীতি ধ্বংসাত্মক। এ রাজনীতি জনগণকে আড়াল করে দেয়, বিচ্ছিন্ন করে দেয় রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে। এর পরিণাম ভালো হতে পারে না।

 

এখন সময় কাটে কিভাবে?

সকালে উঠে মর্নিংওয়াকে বের হই। নাশতা সেরে কম্পিউটারে বসি, গবেষণা করি। মাঝেমধ্যে শরীর বেঁকে বসে। বয়স হয়েছে তো! সুতরাং কাজের সময় কমে আসছে। দুপুরে লাঞ্চ শেষে বিশ্রাম নিই। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বই পড়ি। গবেষণা উপাদান সংগ্রহ করি। কখনো কখনো রাতে অবসর পেলে একটু টিভি দেখি। নিয়মিত রুটিনমাফিক পড়াশোনা করি। বিপুলা পৃথিবীর কতটুকু বা জানি!

 

এখন আপনার বন্ধু কারা?

বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তরুণ স্কলার, ফেলো আসে ওদের গবেষণার কাজ নিয়ে। ওদের সময় দিই। ওদের সঙ্গে নিজের চিন্তা বিনিময় করি। সহকর্মীদের অনেকেই তো চলে গেছেন। এ জন্য আমার হাতে যতটুকু সময় আছে, তার পূর্ণ ব্যবহার করতে চাই।

 

ব্যক্তিগত জীবন?

স্ত্রী মির্জা বানু সব সময় আমার পড়াশোনা ও গবেষণায় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। অসম্ভব সাপোর্ট পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে। দু-তিন দিন রেস্টে থাকলে নিজ থেকেই পেন্ডিং কাজের কথা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কাছে আমার অশেষ ঋণ। আমাদের বড় ছেলে ড. টিটু ইসলাম প্রকৌশলী। ছোট ছেলে ড. বিন্দু ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। দুজনই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। একমাত্র মেয়ে ড. আশা ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। তিন সন্তানই পিএইচডি করেছে। তারা নিজেদের পেশাগত জীবনে সফল।

 

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস; ১ অক্টোবর, ২০১৯)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা