kalerkantho

ফিস্টুলা রোগীরা আমাকে ‘মা’ বলে ডাকত

অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার। খ্যাতিমান চিকিত্সক ও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ‘সায়েবাস মেথড’-এর উদ্ভাবক। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



ফিস্টুলা রোগীরা আমাকে ‘মা’ বলে ডাকত

ছোটবেলা কেমন কেটেছে?

আমার জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ মার্চ, চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায়। আব্বা মাওলানা আব্দুল মালেক ছিলেন টাঙ্গাইলের করটিয়ার সরকারি সা’দত কলেজের অধ্যাপক। তাঁর চাকরিসূত্রে শৈশব কেটেছে কলেজটির ক্যাম্পাসে। শৈশবের দিনগুলো দারুণ ছিল। কারণ আমরা ঢাকার এই বদ্ধ পরিবেশে বড় হইনি। খোলা পরিবেশে, মাঠে-ঘাটে, যখন যেখানে খুশি ঘুরে বেড়িয়েছি। পরিবারে পাঁচ বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে আমি পঞ্চম।

 

শিক্ষাজীবন কেমন ছিল?

আমার শিক্ষাজীবনের শুরু টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সে সময়ে করটিয়ায় আবেদা খানম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখান থেকেই ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করেছি। আর ১৯৬৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি সা’দত কলেজ থেকে। তারপর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছি ১৯৭৫ সালে। মেডিক্যালে প্রথম দুটি বছর আমার ভালো লাগেনি। তখন বেসিক বিষয়গুলো পড়ে আর লাশ কেটেই দিন কাটত। তবে তৃতীয় বর্ষে যখন রোগীদের সংস্পর্শে এলাম, তখন টের পেলাম তারা খুব অসহায়। তাদের সংস্পর্শে আসার পর থেকে ডাক্তারি পেশাটা ভালো লাগতে শুরু করল। সেই ভালোলাগা এখনো আছে।

 

আপনি তো মেডিক্যালে পড়তে চাননি?

ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল আব্বার মতো অধ্যাপক হব। তাঁর ইচ্ছায়ই মেডিক্যালে পড়েছি। এখনো মনে আছে, শুরুতে মেডিক্যালে ভর্তি হতে চাইনি। তখন বয়স কম ছিল, বুঝতাম না ডাক্তার হয়েও শিক্ষক হওয়া যায়! আব্বা অনেক বোঝানোর পর ভর্তি হতে রাজি হলাম। তখন আব্বা আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, ‘মা, তুমি অনেক টাকা ইনকাম করে বড়লোক হবে—সে জন্য তোমাকে ডাক্তার বানাচ্ছি না; বরং আমি চাই, তুমি যেন এই পেশার মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারো। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় যেভাবে হোক মানুষের সেবা তোমাকে করতেই হবে।’ যেদিন এমবিবিএস পাস করি, সেদিনও আব্বা এই কথাটির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। মেডিক্যালে পড়তে পড়তেই বুঝতে পেরেছিলাম, আমার পক্ষে শিক্ষক হওয়াও সম্ভব। শিক্ষকতা করতে পেরে আমি খুশি। আব্বার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

 

আপনার পেশাগত জীবন?

ইন্টার্নশিপ করেছি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। তারপর খুব অল্প সময়ের জন্য সেখানকারই লেকচারার ছিলাম। এরপর ১৯৭৮ সালে ঢাকার পিজি হাসপাতাল (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করি। তারপর ট্রেনিং করি মিটফোর্ড হাসপাতালে। এরপর চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশালসহ অনেক জায়গায় কাজ করেছি। আমি যখন ফিস্টুলা নিয়ে কাজ শুরু করলাম, তখন দেশের বড় বড় মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে ক্যাম্প করেছি। এখনো দিনাজপুরের পার্বতীপুর ল্যাম্ব হসপিটালে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করতে যাই। এই হাসপাতালে ১৯৯৬ সাল থেকেই নিয়মিত আসা-যাওয়া করি। সেখানকার ডাক্তারদের আত্মনিবেদন আমাকে এত দূরে গিয়েও কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। ওরা ওদের কঠিন অপারেশনগুলো আমার জন্য রেখে দেয়। কোনো সমস্যা হলে ফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে, পরামর্শ নেয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের সেবা দিতে আনন্দ পাই এবং নিজেকে ধন্য মনে করি।

 

‘সায়েবাস মেথড’-এর আইডিয়া পেলেন কিভাবে?

আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে যোগ দিই ১৯৯৫ সালে। অধ্যাপনা জীবনের শুরু থেকেই এটা নিয়ে ভাবছিলাম। মিটফোর্ড হাসপাতালে যখন ট্রেনিংয়ে ছিলাম, তখন অনেক রোগীকেই প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে মারা যেতে দেখেছি। তখন খুব দুঃখ হতো। রোগীরা অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমাদের কাছে আসে। কিন্তু এসে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরবে—এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেও এ রকম অনেক রোগী মারা যেত। একবার ইউনিসেফের উদ্যোগে এখানে জরুরি প্রসূতি সেবার একটি ট্রেনিং প্রগ্রাম হলো। আমি ছিলাম ট্রেনার। জানতে পারলাম, এ ক্ষেত্রে বিদেশে ‘বাকরি বেলুন’ নামে এক ধরনের বেলুন ব্যবহার করা হয়। দাম প্রায় ৩০০ ডলার। ও রকম বেলুন এনেছিলেন ট্রেনিং প্রগ্রামটির উদ্যোক্তারা। আমি তাঁদের কাছ থেকে একটা বেলুন চেয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু সেটিও একসময় হারিয়ে গেল। যেদিন বেলুনটা হারাল, তার পরের দিন ১৮ বছর বয়সী এক রোগী রক্তক্ষরণে মারা গেল। আমরা অনেক চেষ্টা করলাম, রক্ত দিলাম; তবু বাঁচাতে পারিনি। সেদিন সারা রাত আমি ঘুমাতে পারিনি। হঠাত্ মনে হলো, কনডম তো একটি মেডিক্যাল ডিভাইস। এটা তো বেলুনের মতো ফোলানো যায়। এটা যদি জরায়ুর ভেতর ঢুকিয়ে ফুলিয়ে রক্তনালির খোলামুখের ওপর চাপ দিতে পারি, তাহলে হয়তো এ ধরনের রোগীর রক্তক্ষরণ থামানো সম্ভব। এর একদিন পরই এক রোগীর খুব রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এ রকম ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে আমরা সাধারণত তার জরায়ু কেটে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সে জন্য আমাদের ডিউটি ডাক্তার যখন রেডি হচ্ছিলেন, তাঁকে একটু অপেক্ষা করতে বললাম। তারপর অপারেশন থিয়েটারের ড্রেস পরে সেখানে ঢুকলাম। আর একটা কনডম নিয়ে ক্যাথেটারের মাধ্যমে রোগীর জরায়ুতে ঢুকিয়ে স্যালাইন দিয়ে ফুলালাম, সঙ্গে সঙ্গে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। ঘটনাটি ২০০০ সালের শেষ দিকের।

 

তারপর?

আমার মুখের কথা তো কেউ বিশ্বাস করবে না। গবেষণা করে এটা প্রমাণ দিতে হবে। তাই ডা. রাশিদা বেগম, ডা. ফাহমিদা জাবিনসহ আমরা কয়েকজন চিকিত্সক মিলে এ নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। এ ক্ষেত্রে ডা. রাশিদা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০০৩ সালে গবেষণাপত্রটি মেডিস্কেপ জেনারেল মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশ করলাম। ২০০৫ সালে সেটি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব অবসটেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকলজি জার্নালে প্রকাশ পেতেই মাতৃত্ব নিয়ে কাজ করেন—এমন ডাক্তারদের মধ্যে একটা আলোড়ন তৈরি হলো। এরই মধ্যে ২০০৪ সালে ব্যাংককে এক সেমিনারে এই পদ্ধতি সম্পর্কে বলার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এভাবে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমন্ত্রণ পেতে থাকলাম। যখন সবাই দেখল, এমন পরিস্থিতিতে কনডম ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে, তখন সারা বিশ্বের চিকিত্সকদের এই পদ্ধতিটির প্রতি একটা আস্থা এলো। এই ‘সায়েবাস মেথড’টির পেটেন্ট আমরা করেছি ২০১৩ সালে।

 

এটা কিভাবে কাজ করে?

পদ্ধতিটি খুব সরল। একটি ক্যাথেটারের মাথায় কনডম বাঁধা হয়। সেই কনডম জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। ক্যাথেটারের অন্য প্রান্তে স্যালাইন লাগানো হয়। পানি ঢোকার ফলে কনডম বড় হতে থাকে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে জরায়ুর ভেতরের দেয়ালে চাপ সৃষ্টি করে। এভাবে ২৪ ঘণ্টা রাখা হয়। এরই মধ্যে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়। পুরো কিট তৈরিতে ১০০ টাকার কম খরচ পড়ে। আর উপকরণগুলো এত সহজলভ্য যে গ্রামগঞ্জে চাইলেই ধাত্রীরাও এটি বানিয়ে নিতে পারবেন। এ জন্য দরকার শুধু প্রশিক্ষণ।

‘সায়েবাস মেথড’ বা ‘সায়েবাস কিট’ কয়টি দেশে ব্যবহূত হয়?

আমার পক্ষে হিসাব করে বলা মুশকিল! তবে আমাদের দেশের পাশাপাশি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, ভারতসহ অনেক দেশেই ব্যবহূত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে এটি নিয়ে ট্রেনিং দিতেও গিয়েছি আমি। ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, পূর্ব তিমুরসহ অনেক দেশে এটি সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচির অংশ।

 

এই পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বিদেশ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন?

২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের রয়েল কলেজ অব অবসটেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকলজিস্টসের পক্ষ থেকে আমাকে এই উদ্ভাবনের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ডিগ্রি এফআরসিএস দেওয়া হয়েছে। আরো অনেক জায়গা থেকেই সম্মাননা পেয়েছি।

 

মামস ইনস্টিটিউট অব ফিস্টুলা অ্যান্ড উইমেনস হেলথ গড়ে তুলেছেন কবে?

অনেক দিন ধরেই এ ধরনের একটা হাসপাতাল তৈরির কথা ভাবছিলাম। চেয়েছিলাম নিজের জায়গায় হাসপাতালটা গড়ে তুলব। চাকরি থেকে অবসরের পর আমি ৩৫ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। সেই টাকা প্রথমে ইনভেস্ট করি এখানে। এর আগে আমার স্বামী ডা. জাহাঙ্গীর কবির উত্তরায় আমাকে আড়াই বিঘা জায়গা কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু নানা ঝামেলায় সেখানে ফিস্টুলা হাসপাতাল করতে পারিনি। একসময় বুঝতে পারলাম, জায়গা কিনে হাসপাতাল গড়ে তুলতে অনেক সময় চলে যাবে। তখন মগবাজারের এই জায়গাটা ভাড়া নিই। শুরুর দিকে রোগী ছিল ছয়-সাতজন। এখন তো আমরা মাঝেমধ্যে রোগীদের জায়গাও দিতে পারি না। ফিস্টুলা একটি বিশেষ ধরনের অপারেশন। এর জন্য দক্ষতা প্রয়োজন। কারণ এটি অনেক সময় ফেইল করে। সবাই কিন্তু ফিস্টুলা অপারেশন করতে পারেন না। কারণ এটির প্র্যাকটিস এখনো এ দেশে সেভাবে নেই। তা ছাড়া ফিস্টুলা রোগীদের বেশির ভাগই হতদরিদ্র। অন্যদিকে রোগটির কারণে তারা চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। এগুলো সহ্য করে তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য একজন চিকিত্সককে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়।

 

ফিস্টুলা সম্পর্কে একটু পরিষ্কারভাবে বলবেন?

এটা এমন এক রোগ, যার কথা জানাতেও অনেকের বাধে। গ্রামগঞ্জে সাধারণত ন্যাচারাল ওয়েতেই সন্তান ডেলিভারি করানো হয়। কোনো কেনো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অল্প বয়সী মেয়েদের বেলায় সন্তান বের হওয়ার পথটি ভালোভাবে তৈরি থাকে না। তখন বাচ্চাটা আটকে যায়। ওটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র উপায় সিজার করানো। কিন্তু গ্রামের লোকেরা মনে করে, আগে মায়ের নরমাল ডেলিভারি হয়েছে, তাহলে তার মেয়েরও হবে না কেন? তা ছাড়া সিজার করানোর আর্থিক সামর্থ্যও অনেকের থাকে না। তখন ধাত্রীরা টানাটানি করে বাচ্চাটা বের করে দেন। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ বাচ্চাই মারা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মাংসপেশির ওপর চাপ পড়া আর এভাবে টেনে বের করার কারণে প্রসূতির যোনীপথের সঙ্গে মূত্রথলি এবং পায়ুপথও ফুটো হয়ে যায়। ফলে প্রশ্রাব-পায়খানা নরমাল পথ দিয়ে না এসে যোনীপথে আসতে শুরু করে। যাদের এই রোগ হয়, তারা মলমূত্রের বেগ সামলাতে পারে না এবং নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। এ ব্যাপারে রোগীর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এ কারণে অনেক স্বামীই স্ত্রীকে ফেলে চলে যায়।

 

ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার গড়ারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন?

ফিস্টুলা নিয়ে অনেক আগে থেকেই কাজ করছি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ১৯৯৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কাটিয়েছি। ২০০৩ সালে সেখানে আমি গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হই। তখন ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার গড়ার উদ্যোগ নিই। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছেও ভীষণ কৃতজ্ঞ আমি। আসলে আমি যখন মিটফোর্ডে ছিলাম, তখন থেকেই ফিস্টুলা রোগীদের প্রতি মমতা জন্মায়। নিজের অধ্যাপককে অ্যাসিস্ট ও পোস্ট অপারেটিভ রোগীগুলোকে দেখাশোনা করার সময় আমি কথা বলে জেনেছি—কী করুণ জীবন তাদের! তখন থেকেই বিষয়টি আমাকে খুব নাড়া দিয়েছে। আমি বরিশাল মেডিক্যালে সহযোগী অধ্যাপক থাকাকালেই ফিস্টুলা অপারেশন শুরু করি। ১৯৯৯ সালে ইথিওপিয়ায় গিয়েছিলাম ট্রেনিং নিতে। ওখানে এক মাস ছিলাম। ওটা ছিল আমার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট। আদ্দিস আবাবা ফিস্টুলা হাসপাতালের অস্ট্রেলিয়ান চিকিত্সক ক্যাথেরিন হ্যামলিনকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তখন ৭৫ বছরের মতো বয়স ছিল তাঁর। এই বয়সেই রোগীদের সেবায় অন্তঃপ্রাণ ছিলেন। ওখান থেকে ফিরে ঢাকা মেডিক্যালে অনেক অপারেশন করেছি। ফিস্টুলার ওপর একটি বইও লিখেছি—‘প্রিন্সিপলস অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস ইন দ্য ম্যানেজমেন্ট অব ফিমেল জেনাইটাল ফিস্টুলা’। ইথিওপিয়ার হাসপাতালের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিরেক্টর মি. চার্লস আমাকে অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে ‘ইউএনএফপিএ’র (ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ড)। আমি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং একটা কনসেপ্ট পেপার জমা দিই। ওটা পাঁচবার মডিফাই করি। তারপর আমরা ফিস্টুলা সেন্টার করলাম। ফিস্টুলা রোগীরা আমাকে ‘মা’ বলে ডাকত। ওখানকার ডাক্তাররা আমাকে দেখলেই বলতেন, ‘মাদার অব ফিস্টুলা প্রেজেন্ট...’। ২০০৬ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর চাকরি করেছি। আমি এখনো ঢাকা মেডিক্যালে যাই। জটিল কোনো রোগী ভর্তি হলেই আমার ডাক পড়ে। কিন্তু এভাবে মাঝেমধ্যে হাসপাতালে গেলে নিজের মতো করে সব রোগীর সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আমার ভাই ডা. মোরশেদুল আজম এবং কাজিন শফিকুল বারীসহ আরো অনেকের সহযোগিতায় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে মামস ইনস্টিটিউট অব ফিস্টুলা অ্যান্ড উইমেনস হেলথের কার্যক্রম শুরু করেছি। প্রথমে তাকওয়া হাসপাতালের সাতটি বেড ভাড়া করে ওখানে অপারেশন করতাম। খরচ আমি দিতাম, কিন্তু তাকওয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক সাহায্য করেছে। খরচে তারা সাধারণত ৫০ শতাংশ, কখনো কখনো আরো বেশি ছাড় দিত।

 

আপনার হাসপাতালে কারা চিকিত্সাসেবা পায়?

গর্ভজনিত যত ধরনের সমস্যা হয়, বিশেষায়িত এই হাসপাতালে সবগুলোরই চিকিত্সা করি। শুধু ফিস্টুলা নয়, মায়েদের প্রসব-পরবর্তী অন্যান্য সমস্যা, যেমন জরায়ু নেমে যাওয়া, যোনীপথ ছিঁড়ে যাওয়া ও যোনীপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার চিকিত্সাও এখানে হয়ে থাকে। এটি সম্পূর্ণ দাতব্য চিকিত্সালয়। এখানে রোগীর চিকিত্সা, থাকা-খাওয়া সবই বিনা মূল্যে। এমনও রোগী আসে, যাদের বাড়ি ফেরার টাকাও থাকে না। তাদের আমরা বাড়ি যাওয়ার টাকা দিয়েও সাহায্য করি। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত একটাই—রোগীকে দরিদ্র হতে হবে। অবশ্য কে দরিদ্র, কে দরিদ্র না—এটা যাচাই করা খুব কঠিন। ওরা আসে দূর-দূরান্ত থেকে। যেহেতু জাকাতের সহযোগিতা নেয় এই হাসপাতালটি, তাই যিনি যাকাত দেন, তিনি এখানে ভর্তি হতে পারেন না। এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে এক হাজার ৮০০ রোগীর অপারেশন করিয়েছি।

 

কোনো বিশেষ অপারেশনের ঘটনা মনে পড়ে?

ছোট্ট একটা মেয়ে। বয়স খুব কম। ওর ফিস্টুলা এত কঠিন ছিল, আমি ধরেই নিয়েছিলাম কিছুতেই সারাতে পারব না। তাই অপারেশন করতে চাচ্ছিলাম না। ডাক্তারদের বলেছি ওকে রিলিজ দিয়ে দিতে। একদিন এক বৃদ্ধ আর একটা বাচ্চা আমার আঁচল ধরে বলল, ‘জোড়া না লাগুক, অপারেশনটা আপনাকে করতেই হবে।’ অনেক সময় ধরে অপারেশন করলাম। মেয়েটা ভালো হয়ে গেল। এটি ঢাকা মেডিক্যালের ঘটনা। তা ছাড়া একবার এক রোগী ক্যান্সার-পরবর্তী কঠিন ফিস্টুলায় আক্রান্ত। এ ধরনের রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। রোগী আমার হাত চেপে ধরে বলল, ‘মা, আমি ভালো হলে হব, নয়তো মরলে আপনার হাতেই মরব; আপনি একবার আমার অপারেশন করুন।’ অপারেশনের পর সেই রোগী সুস্থ হয়ে গেল। এ তো গেল আনন্দের কথা। একটা দুঃখের ঘটনাও ছিল। এক মেয়ের খুবই খারাপ ধরনের ফিস্টুলা হয়েছিল। এত ড্যামেজ হয়ে গেছে, তাকে বললাম, অপারেশন করা যাবে না। রোগী অপারেশন করতে বলল। অপারেশন ভালোই হলো, কিন্তু ইনফেকশনের কারণে তাকে শত চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না। সেই ঘটনা মনে পড়লে খুব খারাপ লাগে।

 

প্রতিবন্ধকতা বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা?

ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকের কটু কথা শুনতে হয়েছে। ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার গড়ার জন্য নানা জায়গায় ধরনা দিয়েছি। অনেকে নিরাশ করেছেন। অনেকে আবার অনুপ্রাণিতও করেছেন। একদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এক মিটিংয়ে আমি ফিস্টুলা সেন্টারের কথা তুলতেই তখনকার পরিচালক রেগে সবার সামনে বলে ফেললেন, ‘আপনি যখনই আসেন শুধু ফিস্টুলা, ফিস্টুলা করেন। আমাদের তো অন্য কাজও আছে।’ সেদিন খুব অপমানিত বোধ করেছিলাম। মিটিং থেকে বের হয়ে অনেক কেঁদেছি। মনে মনে ঠিক করেছি, আর কখনো ফিস্টুলা নিয়ে আলাপ করব না; কিন্তু আবার যখন রোগীদের সংস্পর্শে এলাম, তাদের দুর্দশা দেখে সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারিনি। কারণ মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, তার বিনিময়ে আমারও কিছু দেওয়ার আছে বলে মনে করেছি।

 

‘সেভ দ্য চিলড্রেন’সহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, দেশে উদ্বেগজনক হারে অপ্রয়োজনীয় সিজার বেড়েছে। এর কারণ কী?

দেশ-বিদেশে সব জায়গায়ই সিজার বেড়ে গেছে। আগে মানুষ অনেক বেশি বাচ্চা নিত। তখন ভাবত, নরমাল ডেলিভারিই হোক, একটি বাচ্চা মারা গেলে আরেকটি তো টিকবে! এখন মানুষ একটি বা দুটি বাচ্চা নেয়। এখন সাধারণত কেউ রিস্ক নিতে চায় না। মানুষ মনে করে, সিজারটা বেশি নিরাপদ। কিন্তু এই ধারণা সত্য নয়। নরমাল নরমালই। কিন্তু মানুষ সব কিছু নিজের পরিকল্পনামাফিক করাতে চায়। ন্যাচারাল ডেলিভারি তো মানুষের পরিকল্পনা মেনে চলে না। ওটা ন্যাচারালিই আসে। আরেকটি বিষয় হলো, মানুষের এখন ধৈর্য নেই বললেই চলে। প্রসবকালীন ব্যথা হওয়াটাই স্বাভাবিক। পরিবারের সবাইকে এ ব্যাপারে ধৈর্য ধরতে হবে; কিন্তু এই ৮-১০ ঘণ্টা ধৈর্য ধরার মতো মানসিকতা অনেকেই হারিয়ে ফেলেছে। শুধু যাদের বাচ্চা হবে, তারা না—ডাক্তাররাও হারিয়ে ফেলেছেন। তবে মনে রাখা উচিত, একবার সিজার হলে পরে নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা কমে যায়।

 

ব্যক্তিগত জীবন?

নিজেকে আমি খুব ভাগ্যবান মনে করি। আব্বা পেশায় শিক্ষক হলেও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিলেন মা। খুব যত্ন করে আমাদের পড়াতেন। পরে মাকে জিজ্ঞেস করেছি, ‘এত কঠিন কঠিন অঙ্ক কিভাবে করাতেন?’ বলেছিলেন, ‘উদাহরণ দেখে শিখে তোমাদের করাতাম।’ আমি বিয়ে করি ১৯৭৮ সালে। বিয়ের পর স্বামী আমাকে ঘরে কাজ করতে দিতেন না। তিনি বুঝতেন সারা দিন কতটা খাটুনি গেছে আমার। স্বামীর সাহায্য ও উত্সাহ আমি সব সময়ই পেয়েছি। আমার সহকর্মী, ছাত্র-ছাত্রী, বন্ধুবান্ধবরাও সব সময় পাশে ছিল। আমাদের তিন মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে ডা. জাকিয়া কবির। ইংল্যান্ডে থাকে। মেজো মেয়ে সারওয়াত্ জাহান কবির পেশায় ব্যাংকার। ছেলে ব্যারিস্টার মারগুব কবির। ছোট মেয়ে সুমাইয়া কবির কানাডায় পড়াশোনা করছে।

 

অবসর কাটে কিভাবে?

এখন তো মনে হয় আমার ব্যস্ততা আরো বেড়ে গেছে। হাসপাতালটা চালাতে হয়। প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করি। সময় পেলে লেখালেখি করি। বিভিন্ন জায়গায় কনফারেন্সে যেতে হয়।

 

ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা?

হাসপাতালটা চালাচ্ছি ভাড়া করা জায়গায়। আমার উপার্জনে হাসপাতাল চললে এতটুকুই থাকবে। কিন্তু এটিকে আরো বড় করার স্বপ্ন দেখি। হাসপাতালের পরিধি বাড়ানো ও ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য নিজস্ব জায়গা দরকার, যেখানে গরিবদের চিকিত্সা দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারব। এ কাজে সাহায্য করতে সামর্থ্যবানরা এগিয়ে এলে অনেক মানুষেরই উপকার হবে।

 

হাসপাতালের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে কাজ করেন?

পরিবারে নিজে কখনো লিঙ্গবৈষম্যের শিকার না হলেও দেখেছি আমাদের দেশে এখনো মেয়েরা অনেক অবহেলিত। অনেক দিন ধরেই কিশোরীদের নিয়ে কাজ করছি। তাদের পড়াশোনা ও উন্নতির কথা ভাবি। সে জন্য ঢাকায়ও ‘মাতৃছায়া’ নামে একটি সেন্টার করেছি। কিছু মেয়েকে মগবাজারের একটি মাদরাসায় পড়ানোর ব্যবস্থা করেছি। ওদের খরচটা আমিই জোগাড় করে দিই। গাইবান্ধায়ও ২০টি মেয়ের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া ফিস্টুলা রোগীদের পুনর্বাসনেও যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।

 

(মগবাজার, ঢাকা; ১৭ আগস্ট ২০১৯)

শ্রুতলিখন : জুবায়ের আহম্মেদ

মন্তব্য