kalerkantho

সব সময় ক্রাইসিস সেলকে টার্গেট করেছি

আব্দুল মাতলুব আহ্মাদ। বিশিষ্ট ব্যবসায় উদ্যোক্তা ও সংগঠক। নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন ফারজানা লাবনী ও রুদ্র আরিফ

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে




সব সময় ক্রাইসিস সেলকে টার্গেট করেছি

ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা আপনার...

আমার জন্ম ১৯৫২ সালের ১৫ মার্চ, ঢাকার ফকিরাপুলে। বাবা আবু মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ছিলেন বিচারপতি। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) হাইকোর্টে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর কর্মসূত্রে মদনমোহন বসাক লেন, আরমানিটোলা ও মোহাম্মদপুরে কেটেছে আমার শৈশব। একটি সমাদৃত ও আলোকিত পারিবারিক পরিবেশেই বেড়ে উঠেছি। দাদা খান বাহাদুর তোফাজ্জল ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান নির্বাহী প্রকৌশলী। মা বেগম জাহানারা আব্দুল্লাহ ছিলেন পাবনার দুলাই অঞ্চলের সর্বশেষ জমিদার হোসেন জান চৌধুরীর মেয়ে। অন্যদিকে আমার বড় চাচা আব্দুল মহসিন আহ্মাদ ছিলেন ব্রিটেন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া এ দেশের প্রথম অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি আহছানউল্লা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বর্তমানে বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন এবং রাজশাহী প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ের (বর্তমানে রুয়েট) প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মেজো চাচা আব্দুল মোমেন আহ্মাদ ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংস্থার প্রখ্যাত পরিকল্পনাবিদ। ছোট চাচা আব্দুল মুকিত আহ্মাদ ছিলেন তত্কালীন পিডাব্লিউডির (বর্তমানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড) প্রথম তত্ত্বাবধায়ক পরিচালক।

 

ছোটবেলার বিশেষ স্মৃতি?

বিচারক হওয়ার আগে আব্বা ছিলেন আইনজীবী। আমাদের ১৪ ভাই-বোনের বিরাট পরিবার। আব্বার উপার্জনে সংসার চলত। ফলে খুব বেশি আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। ছোটবেলা থেকেই সাইকেল আমার খুব পছন্দের। একদিন আব্বাকে বলেছিলাম আমাকে একটা সাইকেল কিনে দিতে। কোনো কিছু নিয়ে জিদ করলে, না পাওয়া পর্যন্ত ছাড়তাম না। সেদিন বিকেলে দেখি, আব্বা সাইকেল নিয়ে এসেছেন। খুব খুশি হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে তার পর বাসায় ফিরলাম। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, সাইকেল উধাও! জানতে পারলাম, সাইকেলটা আব্বা কিনে আনেননি, ভাড়ায় এনেছিলেন।

এদিকে আমাদের বাড়িতে একটা সুইমিংপুল ছিল। আমার যখন ১৫-১৬ বছর বয়স, একদিন দুই-আড়াই বছর বয়সী ছোট বোন তানিয়া একা একা খেলতে খেলতে সেই সুইমিংপুলে গিয়ে পড়ে গেল। একটু দূরেই টেবিলে বসে পড়ছিলাম আমি। ছপ-ছপ-ছপ...আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে গিয়ে দেখি, তানিয়া ভাসছে। ওকে ওপরে তুলে আনলাম। ভেবেছিলাম, সে আর বেঁচে নেই। তবে ভাগ্য ভালো, কোনোমতে বেঁচে গিয়েছিল সে। তার পর থেকে তানিয়াই আমার সবচেয়ে প্রিয় বোন। আসলে আমরা নিজ ভাই-বোনদের ঘিরেই বড় হয়েছি। ফলে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। মনে পড়ে, আব্বা দারুণ রান্না করতে পারতেন। প্রতি মাসেই মজার মজার বিরিয়ানি রাঁধতেন, নয়তো একটা স্পেশাল চাপ বানাতেন। এভাবে পরিবারে একটা উত্সবমুখর আবহ সব সময়ই ছিল। আব্বা যখন বিচারক হলেন, তখন পরিবারের আর্থিক অবস্থা আরো খারাপ হলো। কারণ আয় সীমিত হলো তাঁর। বেতন পেতেন চার কি সাড়ে চার হাজার টাকা। আব্বা তাঁর উপার্জনের বেশির ভাগ টাকাই আমাদের শিক্ষাদীক্ষা ও বেড়ে ওঠার পেছনে খরচ করতেন। আমাদের অত বিলাসিতা ছিল না। এখনো মনে আছে, একবার কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার সময় এক গাড়িতে আমরা ১০-১২ জন বসেছিলাম। প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয়—কোন লেয়ারে কে বসবে, এ নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে খুনসুটি লেগে যেত। বড় ভাই বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে এসে পরিবারে অবদান রাখতে শুরু করলে একটু স্বস্তি এলো। আজ আমার যা কিছু আছে, আমরা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছি—এটা ভেবে এখন তৃপ্তি পাই।

 

মায়ের ভূমিকা?

মা এ দেশের প্রথম দিকের শীর্ষস্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের একজন। নিজে ছোটখাটো হলেও ব্যবসা করতেন। যেমন ধরুন, নিজ হাতে টুপি বানাতেন। সেই টুপিগুলো আমরাই বিক্রি করতাম। স্টিম দিয়ে রান্না করা যায়, এমন একটি ইকো-কুকারও তিনি বানিয়েছিলেন। এখনো আমাদের কাছে তাঁর বানানো অনেক জিনিসই রয়েছে। মা শুধু আমাকেই নন, আমার স্ত্রীকেও ব্যবসার ব্যাপারে উত্সাহ দিতেন। সব সময় সততার ওপর চাপ দিতেন। বলতেন, ‘তোমার সততা যত প্রকাশ পাবে, ব্যবসাও ততই বাড়বে।’

 

পড়াশোনা কোথায় করেছেন?

এসএসসি পাস করেছি সেন্ট গ্রেগরিস হাই স্কুল থেকে, ১৯৬৯ সালে। এর পর নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। তার পর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার বড় ভাই তখন আইন বিভাগের উপসচিব। তিনি অক্সফোর্ড গিয়েছিলেন, ট্রেনিংয়ে। তাঁকে বলেছিলাম ওখানে আমার ভর্তির ব্যাপারে খোঁজ নিতে। কেননা পড়াশোনার ব্যাপারে আমি সব সময়ই খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলাম। পড়াশোনা ছিল আমার কাছে নেশার মতো। মনে পড়ে, এসএসসি পরীক্ষার সময় দিনে ১৬ ঘণ্টার নিচে পড়তাম না। ভোরবেলায় উঠে সারাক্ষণই পড়া, মাঝে একটু-আধটু বিরতি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সরকার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন এবং অর্থনীতি বিষয়ে ১৯৭৬ সালে স্নাতক পাস করেছি। সে সময়ে অনেক দেশ, এমনকি বিশ্বব্যাংক থেকেও আমাকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভেবেছিলাম, যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যঃস্বাধীন দেশকে আমাদেরই গড়ে তুলতে হবে। তাই সোজা দেশে চলে এসেছি। এখনো মনে করি, আমার দেশে ফেরার সেই সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।

 

ব্যবসার শুরু কখন?

শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার স্বপ্ন ছোটবেলা থেকেই দেখতাম। নিজেকে সেভাবেই গড়ে তুলেছি। ব্যাবসায়িক দক্ষতা ও বিচক্ষণতার ব্যাপারে সব সময় সজাগ ছিলাম। তাই ১৯৮০ দশকের শুরুর দিকে ইংল্যান্ড ও জাপান থেকে যানবাহন আমদানির মাধ্যমে এ জগতে কাজ শুরু করি। ১৯৮৩ সালে নিজের ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গড়ে তুলি ‘নিটল মোটরস (প্রা.) লিমিটেড’। এর দুই বছর পর ভারতের শীর্ষস্থানীয় অটোমোবাইল সংস্থা ‘দ্য হিন্দুস্তান মোটরস লিমিটেড’-এর ডিলারশিপ পাই। ১৯৮৭ সালে জাপানের বিশ্বখ্যাত মোটরযান উত্পাদন প্রতিষ্ঠান ‘মিত্সুবিশি’র ভারতীয় শাখার সঙ্গে সংযুক্ত হই। আর মিনিবাস বাজারজাতকরণে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে ভারতের শীর্ষ যানবাহন উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘টাটা ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর বাংলাদেশের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পাই। এ পর্যায়ে ‘টাটা’র ট্রাক, বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার, ফোর হুইল ড্রাইভ বাহন, জিপ ইত্যাদি ভারী যানবাহন এবং ডাম্প ট্রাক, ট্রাক্টর-ট্রেইলার, এক্সকাভেটর, পে’লোডার, ডেলিভারি ভ্যান, প্রাইম মুভার, টুইন-এক্সেল, এরিয়াল লিফট ইত্যাদি শিল্পবাহন ও বিশেষায়িত পরিবহন এ দেশে বাজারজাত করতে থাকি। এগুলো বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে; বিশেষ করে বিক্রয়োত্তর সেবার সুব্যবস্থা ও সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য গ্রাহকদের কাছে আমার প্রতিষ্ঠানটি আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। একই বছর যানবাহন বাণিজ্যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ‘নিকিতা অ্যান্ড কোং লিমিটেড’ নামে আরেকটি কম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছি।

 

এ পর্যায়ে কৃত্রিম ফুল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন...

১৯৮৯ সালে সিঙ্গাপুরের যৌথ কারিগরি সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেছি দেশের প্রথম কৃত্রিম ফুল প্রস্তুতকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘নালিতা অ্যান্ড কোং লিমিটেড’। এই শিল্প গাজীপুরের নারীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। কেননা এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরা কৃত্রিম ফুল তৈরি করতে শিখেছেন। আমরা ভারত, নেপাল, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে সেই ফুল বাজারজাত করেছি। এ রকম একটি একেবারে অপরিচিত খাত থেকেও যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব, আমরা তা দেখাতে পেরেছি।

 

পরের দশকে ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে আপনার?

১৯৯১ সালে ভারতের ‘টেলকো’ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় (সিকেডি) ট্রাক, মিনিবাস ইত্যাদির চেসিস আমদানি এ দেশে সেটিই প্রথম। এর পরের বছর টঙ্গীতে দেশের বৃহত্তম ও সর্বাধুনিক সেবাকেন্দ্র ‘ক্যাপিটাল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেছি। এখানে শুরু থেকেই দেশ-বিদেশের দক্ষ অটোমোবাইল প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা কাজ করছেন। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেছি ‘নিটল মোটরস লিমিটেড’। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পরিবহন খাতের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এটি। এরই মধ্যে সাফল্যের সঙ্গে সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার বাজারজাত করেছি আমরা। এদিকে ঢাকা, গাজীপুর, খুলনা, বগুড়া, দিনাজপুর, কক্সবাজার, যশোর, ফেনী, রংপুরসহ দেশের নানা প্রান্তে কম্পানির নিজস্ব স্থাবর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেছি রিয়েল এস্টেট কম্পানি ‘সেন্ট্রাল প্রপার্টিজ লিমিটেড’। এর দুই বছর পর লিজিং ও মূলধন বাজারের উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছি স্বতন্ত্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘বে-লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’।

 

নির্মাণ উপকরণ ব্যবসায়ও অংশ নিয়েছেন...

কোরিয়া রানগ্র্যান্ডো জেনারেল ট্রেডিং করপোরেশনের কারিগরি সহযোগিতায় ১৯৯৭ সালে ‘নিলয় সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেছি। যশোরে এটির তিনটি ইউনিট বছরে দুই লাখ মেট্রিক টন গ্রে সিমেন্ট উত্পাদন করছে। এর দুই বছর পর দেশের প্রথম সাদা সিমেন্ট উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিটল সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ গড়ে তুলেছি। ডেনমার্ক ও ইন্দোনেশিয়ার ক্লিংকার এবং থাইল্যান্ডের জিপসাম ব্যবহার করে এটি বছরে উত্পাদন করছে ৪০ হাজার মেট্রিক টন সাদা সিমেন্ট। এ ছাড়া বীমা খাতে কাজ করার দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণে ১৯৯৯ সালেই প্রতিষ্ঠা করেছি ‘নিটল ইনস্যুরেন্স কম্পানি লিমিটেড’। পরের বছর সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান ‘পিটার কং’-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রথম বেসরকারি হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু করেছি। ২০০১ সালে কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠা করেছি ‘নিটল বে-রিসোর্ট’। ২০০২ সালে ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘ভিআইপি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করা ‘ভিআইপি-নিটল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ স্যুটকেস ও প্লাস্টিক ফার্নিচার উত্পাদন ও বাজারজাতকরণে কাজ করছে।

 

সংগঠক হিসেবে আপনার ভূমিকা?

সংগঠক হিসেবে কোনো সভায় কোনো প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলা যত সহজ, ‘না’ বলা ততই কঠিন। আমি সব সময়ই খেয়াল রাখি, কখন কাকে ‘না’ বলছি, সেটি আমার ব্যক্তিগত ও ব্যাবসায়িক সম্পর্ক তো বটেই, সংগঠনটির ওপর কতটুকু প্রভাব ফেলবে। এফবিসিসিআইয়ের (ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ) প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠনটির কার্যক্রম আরো গতিশীল করার চেষ্টা করেছি। এ সময়ে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কুয়েত, মালয়েশিয়া, মরক্কো, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, বেলারুশ, বেলজিয়াম, ভুটান, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, কানাডা, চীন, চেক রিপাবলিক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, জর্জিয়া, হংকং, নেদারল্যান্ডস, ওমান, পাকিস্তান, পেরু, ফিলিপাইন, কাতার, রোমানিয়া, রাশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উগান্ডা, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের জাতীয় ব্যাবসায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গে জয়েন্ট চেম্বার কিংবা সহযোগিতামূলক চুক্তিতে (কো-অপারেশনাল অ্যাগ্রিমেন্টে) পৌঁছতে পেরেছি। এ ছাড়া আইসিসি (ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স), আইসিসিআই (ইসলামিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি), সিএসিসিআই (কনফেডারেশন অব এশিয়া-প্যাসিফিক চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি) ও সার্ক সিসিআইয়ের (সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি) মতো আন্তর্জাতিক ব্যাবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার, কর্মশালা, কনফারেন্স ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। অন্যদিকে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ও বাংলাদেশ অটোমোবাইলস অ্যাসেম্বলারস অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং সিল্ক রোড চেম্বার অব ইন্টারন্যাশনাল কমার্সের (সিআরসিইসি) প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজেরও সাবেক সভাপতি আমি। বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক, বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চায়না, ইন্ডিয়া অ্যান্ড মিয়ানমার) বিজনেস ফোরামের চেয়ার, বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট—এ রকম অনেক দায়িত্বই সামলিয়েছি ও সামলাচ্ছি।

 

ব্যবসায়ী হিসেবে আপনার পর্যবেক্ষণ?

ব্যবসায় প্রথম থেকেই নিজের শিক্ষা ও বুদ্ধি দিয়ে প্রডাক্ট গ্যাপগুলো খুঁজে বের করেছি। যে মুহূর্তে দেশে যে পণ্যের প্রয়োজন—সেটা নিয়ে এসেছি। আমাদের শুরুর দিকে ব্যবসা মানে ছিল ফুলফিলমেন্ট অব প্রডাক্ট গ্যাপ। আমার নীতি ছিল, আজ যদি রসুনের ঘাটতি পড়ে, কালই রসুন আমদানি করে পরশু বাজারে দেব। অনেক সময় আমরা এয়ার ফ্লাইটে পণ্য নিয়ে এসেছি। কারণ দেশটি তখনো নতুন, সদ্যঃস্বাধীন। অনেক জায়গায়ই ঘাটতি ছিল। আমরা সেগুলো পূরণের চেষ্টা করেছি। ফলে পণ্যের দামে স্থিতিশীলতা চলে আসত। এতে আমাদের যেমন লাভ হয়েছে, দেশও উপকৃত হয়েছে। আমরা সব সময় ক্রাইসিস সেলকে টার্গেট করেছি। ব্যবসায় ঝুঁকি তো নিতেই হবে। সব সিদ্ধান্তই যে সঠিক হবে, তা তো নয়। তবে মনে রাখতে হবে, আমরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করি। ব্যবসায় লোকসান গুনেছি, তবু কোনো দিন ঋণমুক্তির আবেদন করিনি। আমি যদি লোকসানও করি, অন্য ব্যবসা থেকে হলেও ব্যাংকের টাকা যথাসময়ে শোধ করে দিই। এভাবে ব্যাংক যদি বন্ধু হয়ে যায়, তাহলে ব্যবসায় আপনার কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। যেকোনো অঙ্কের ঋণ আপনি পাবেন। তাই ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রেখে ব্যবসা করা উচিত। মনে রাখবেন, ব্যাংক নয়, বরং আপনিই উদ্যোক্তা। নিজের লাভ-লোকসানের সঙ্গে ব্যাংককে জড়ালে ব্যবসা বড় করতে পারবেন না।

 

ব্যবসা ঘিরে ব্যক্তিগত বিশেষ স্মৃতি?

শুরুতে আমদানিমূলক ব্যবসা করতাম। এ জন্য অনেক সময় দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হতো। আমার প্রথম সন্তান জন্মের পর খেয়াল করলাম, প্রতিবারই বিদেশ থেকে ফিরে দেখি সে অনেকটুকুই বড় হয়ে গেছে। তাই ভাবলাম, সন্তানের এই বড় হয়ে ওঠা সামনে থেকে দেখা দরকার। ওকে সময় দেওয়া দরকার। এ কারণে একসময় রপ্তানিমূলক ব্যবসায় জড়িয়ে গেলাম। এখন আবার আমদানিমূলক ব্যবসার দিকে নজর দেওয়ার কথা ভাবছি।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশিদের একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও গর্বিত জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে হলে যত দ্রুত সম্ভব শিল্পায়ন ঘটাতে হবে। যত দ্রুত আমদানীকৃত সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারব, জাতি হিসেবে আমাদের জন্য ততই মঙ্গল। আমদানির পরিবর্তে আমাদের এমন সব সামগ্রী স্থানীয়ভাবে উত্পাদন করতে হবে, যেগুলো দেশের মানুষের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এভাবেই আমরা প্রবৃত্তির কাঙ্ক্ষিত গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারব। নিটল-নিলয় গ্রুপ মূলত শিল্প লালন করে। এই গ্রুপের প্রধান অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে নিটল মোটরস লিমিটেড, নিতা কোং লিমিটেড, নিলয় মোটরস লিমিটেড, হিরো নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড, নিটল-আয়াত প্রপার্টিজ লিমিটেড, নিলয়-উস্মান মোটর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নিটল ইলেকট্রনিকস লিমিটেড, এনআইটিএস সার্ভিস (প্রাইভেট) লিমিটেড, এনরিচ-নেট প্রাইভেট লিমিটেড, নিটল গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড, নিটল-নিলয় ফিল্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রেডিও নেক্সট এফএম ৯৩.২, নিলয় সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নিটল সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নিটল ইনস্যুরেন্স কম্পানি লিমিটেড, নিটল কার্টিজ পেপার মিলস লিমিটেড ও কিশোরগঞ্জ ইকোনমিক জোন (প্রাইভেট ইকোনমিক জোন)। ভবিষ্যতে গ্লাস শিট, ব্যাটারি, টায়ার, হোটেল, পাবলিক বাস সার্ভিস (পরিবহন), ড্রাইভিং ইনস্টিটিউট, চিনি ইত্যাদি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং খাতগুলোকে সম্প্রসারণের কথা ভাবছি। আখ ও গুড় থেকে চিনি উত্পাদনের জন্য থাইল্যান্ডের ‘ব্যাং পং’ কম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘নিটল গুড় প্রসেসিং মিলস লিমিটেড’, চীনা কারিগরি সহযোগিতায় স্থানীয় বালুর সাহায্যে গ্লাস শিট (কাচ) উত্পাদনকারী ‘নিটল গ্লাস প্রাইভেট লিমিটেড’, ভারতীয় কারিগরি সহযোগিতায় স্থানীয় রাবার দিয়ে গাড়ির টায়ার উত্পানকারী ‘নিটল টায়ার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’, যানবাহন চালনার প্রশিক্ষণ দিতে প্রথম বেসরকারি উদ্যোগ ‘নিটল ইনস্টিটিউট অব ড্রাইভিং টেকনোলজি’, ঢাকা মহানগরীর যানবাহন সংকট নিরসনে সিটি বাস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট কম্পানি’, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সিএনজি গ্যাস রি-ফিলিং স্টেশন প্রতিষ্ঠান ‘নিটল-শ্রাবণী গ্যাস স্টেশন প্রকল্প’ প্রভৃতি নতুন শিল্পোদ্যোগের কাজ চলছে।

 

সামাজিক দায়বদ্ধতা?

আমি বিশ্বাস করি, কোনো উদ্যোগ ও সৃজনশীল উদ্যমে যত বেশি মানুষকে সংশ্লিষ্ট করা যায়, সেটির সুফল তত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। এ কারণে শিল্পোদ্যোগের খাত নির্বাচন ও গণমুখিতাকে বিবেচনায় রাখি। সার্বিকভাবে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

 

তরুণদের প্রতি পরামর্শ?

উদ্যোক্তা হতে হলে ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করাই ভালো। যে ব্যবসায় হাত দেবেন, সেটি নিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা ও গবেষণা করুন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ধনী পরিবার থেকে উদ্যোক্তা হলে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়লে তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ থাকে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির পক্ষে এমন সুযোগ পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপেই বাড়তি সংগ্রাম করতে হয়। তাই মনে সাহস রাখতে হবে। আপনি কী পেতে চান এবং কিভাবে সেটি পাবেন, সেই লক্ষ্য ঠিক করে নেওয়ার বিকল্প নেই। উদ্যোক্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ ধৈর্য। শুরুতে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা বেশি আসা অস্বাভাবিক নয়। তাই আপনাকে অত্যন্ত ধৈর্য ধরে খারাপ সময়টি কাটিয়ে উঠতে হবে।

 

ব্যক্তিগত জীবন?

বিয়ে করেছি ১৯৭৭ সালের ১৯ জুন। স্ত্রী সেলিমা আহ্মাদ একজন সফল উদ্যোক্তা, শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠক এবং জাতীয় সংসদ সদস্য। সে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচিত পরিচালক হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছে। ‘বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব বিজনেস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’রও প্রতিষ্ঠাতা সে। আমাদের দুই সন্তান আব্দুল মুসাব্বির আহ্মাদ নিটল ও আব্দুল মারিব আহ্মাদ নিলয়।

 

অবসরে কী করেন?

সেতার বাজাতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে। তবে এখন অবসর পেলে পাঁচ নাতি ঈমান, আমীন, আমান, উস্মান ও আয়াতের সঙ্গে সময় কাটাই। ওরা আমাকে ওদের বয়সী বন্ধু মনে করে।

(মহাখালী, ঢাকা; ১৮ জুলাই ২০১৯)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা