kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

আমিই চাঁদের হাটের প্রতিষ্ঠাতা

রফিকুল হক। ‘দাদুভাই’ নামে খ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এবং শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

২৮ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে




আমিই চাঁদের হাটের প্রতিষ্ঠাতা

জমিদার পরিবারে আপনার জন্ম...

আমার জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৩৭, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে। ছোট্ট সেই শহরটিকে বলা হতো রয়াল সিটি। আমার পূর্বপুরুষেরা কোচবিহার মহারাজার অধীনে জমিদার ছিলেন। বাবা ইয়াসিন উদ্দিন আহমেদ ছিলেন মহারাজার অমাত্য (সভাসদ)। আমার সাহিত্যচর্চার পেছনে বড় দুটি কারণের একটি হলো—অতি শৈশবে মা রহিমা খাতুন যখন আমাকে ঘুম পাড়াতেন, তখন সুন্দর সুন্দর ছড়া-কবিতা বলতেন, গান করতেন। সেখানে মানুষের দুঃখ-কষ্ট উঠে আসত। সুর করে ছড়া পড়তে পড়তে হঠাৎ তিনি কেঁদে ফেলতেন। আমি বুঝতাম না তিনি কাঁদছেন কেন। ‘মা, তুমি কাইন্দো না...’ বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়তাম। দ্বিতীয়ত, যখন আমি থ্রি-ফোর-ফাইভে পড়ি, মাঝেমধ্যে বাবা আমাকে আর আমার দুই বছরের ছোট ভাই রেজাউল হককে নিয়ে জোতে (জোতদারি) যেতেন—যেখানে আমাদের জমিদারি। ১০০ বিঘার মতো খাসজমি ছিল আমাদের। সেগুলো আধিয়ারী দেওয়া হতো অর্থাৎ আধা-আধি ভাগে বর্গাচাষ। ধান, পাট, গম, তামাক—এসব আবাদ হতো। বাবা সেগুলো দেখাতে নিয়ে যেতেন আমাদের। কোচবিহার শহর ঘেঁষে ছিল তোরসা নদীর একটি শাখা। স্রোত নেই, একপর্যায়ে গিয়ে থেমে গেছে বলে সেটাকে বলা হতো মরা তোরসা। সেই শাখা নদীটি পার হয়ে আমাদের জোতে যেতে হতো। মনে আছে, আমরা নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াতাম। একটা খেয়ানৌকা যাত্রী পারাপার করত। সময় লাগত পাঁচ-সাত মিনিট। এর পর মাইল তিনেক গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যেতে হতো; ধুলাবালির রাস্তা, বর্ষায় কাদা। এই যে গ্রামের পথে হেঁটে যাওয়া, এভাবে আমি অতি শৈশব থেকে গ্রামকে চিনেছি। গ্রামকে ভালো লাগত। গ্রামের মানুষকে ভালোবেসে ফেললাম। কোনো কোনো সময় বাবাকে ফাঁকি দিয়ে আমরা দুই ভাই জোতে চলে যেতাম। তখন বর্গাচাষি প্রজারা আমাদের খুব আদর করতেন। বলতেন, ‘মিয়ার ব্যাটারা, না খেয়ে তো যাওয়া চলবে না!’ গ্রামের সাধারণ মানুষের এই যে আদর-ভালোবাসা, পল্লী গ্রামের প্রতি এই যে সহজাত মমতা—আমার লেখার মধ্যে গ্রামীণ এই বিষয়গুলো এ কারণেই আসে।

 

বই পড়ার স্মৃতি?

মদন মোহন তর্কালঙ্কারের বাল্যশিক্ষার বই ‘শিশুশিক্ষা : প্রথম ভাগ’ দিয়েই যথারীতি আমার হাতেখড়ি হয়েছিল। আমি যখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র, তখন আমার প্রথম পড়া প্রথম গল্পের বই—‘ঈশপের গল্প’। সেটি ছিল সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের সহায়ক পুস্তক। আমার চেয়ে দুই ক্লাস উঁচুতে পড়তেন এক খালাতো ভাই। তাঁকে ‘মিয়া ভাই’ বলে ডাকতাম। বছরের শুরুতে মিয়া ভাই বুকলিস্ট ধরে সব বই কিনে ফেলেছিলেন। খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে মিয়া ভাইয়ের নতুন বইগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। তখনই এই চটি বইটা আমার হাতে এসে যায়। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ছোট্ট একটা গল্প পড়তেই খুব মজা পেয়ে গেলাম। মিয়া ভাইকে অনেক অনুরোধ করে রাজি করালাম বইটি ধার দেওয়ার জন্য। তারপর বগলদাবা করে তক্ষুনি বাসায় চলে এলাম। সব গল্প এক বসায় পড়ে ফেলেছিলাম। এর পর অবশ্য কিছুটা বড় হয়ে পড়েছি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’, যার প্রতিটি ছত্র কবিতা হয়ে আজও আমার মনে আছে।

 

প্রথম লেখালেখি?

সেভেন-এইটে পড়ার সময় থেকেই লেখালেখির শুরু। প্রথমে লিখেছি দেয়াল পত্রিকায়। কোচবিহারের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতেও টুকটাক লিখেছি। তবে প্রকৃত অর্থে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম লেখা ছাপা হয় রংপুর আসার পরে; যদিও সেটি ছাপা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ‘লোক সেবক’ পত্রিকায়। দিনটি আমার স্পষ্ট মনে আছে। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। ভাষা আন্দোলনের ঠিক আগের দিন। ছাপার অক্ষরে নিজের লেখাটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম আমি।

 

রংপুরে এলেন কবে?

দেশভাগের প্রভাবে, ১৯৪৯ সালে আমরা মাইগ্রেট করে রংপুর চলে আসি। এর আগে কোচবিহারে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। রংপুরে আগে থেকেই আসা-যাওয়া ছিল আমাদের। এখানে আমার মামার বাড়ি, খালার বাড়ি ছিল। এ কারণে বাবা এখানেই মাইগ্রেট করার ব্যাপারে আকর্ষণ বোধ করলেন। রংপুর থেকেই ১৯৫৩ সালে আমি ম্যাট্রিক পাস করি। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি মাত্র শিক্ষা বোর্ড ছিল—‘ইস্ট বেঙ্গল সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড’ (তখনো ‘ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড’ নামকরণ হয়নি)। এর পর কারমাইকেল কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনা শেষে, সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করি এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং নিই। ১৯৬১ সাল থেকে শুরু করে এখনো আমি সাংবাদিকতা করছি।

 

সাংবাদিকতার শুরুটা কেমন ছিল?

খুব ছোটবেলায় একের পর এক প্রশ্ন করে বাবাকে অস্থির করে তুলতাম। বাবার একটা গুণ ছিল, যতক্ষণ না বিরক্ত হতেন, সব প্রশ্নের উত্তর দিতেন। বিরক্ত হলে প্রসঙ্গ বদলে ফেলতেন; কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। এই যে বাবার গ্রাম দেখানো, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, এই যে অনুসন্ধিত্সু মানসিকতা—এ কারণেই বোধ হয় সাংবাদিক হয়েছি! শুরুতে আমার পুঁজি ছিল লেখালেখি। ‘খেলাঘর’ পাতায় লিখতাম বলে সেটির পরিচালক কবি হাবীবুর রহমান আমাকে চিনতেন। শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ পেলাম ‘সংবাদ’-এ। পত্রিকাটির তখন দুর্দিন। ঠিকমতো পয়সা পেতাম না। সে সময়ে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, বেলাল চৌধুরী, ফজল শাহাবুদ্দীন, দিলওয়ার, কাইয়ুম চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমদ, জহির রায়হান, শহীদুল্লা কায়সার, শহীদ সাবের, খালেদ চৌধুরীসহ আমরা বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতাম। সেখানে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীও যেতেন। একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে ‘জেহাদ’-এ চাকরি দিলেন। তিনি ছিলেন কাগজটির বার্তা সম্পাদক। পত্রিকাটি মুসলিম লীগ কিনে নিলে গাফ্ফার ভাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’য় যোগ দিলেন। আমাকেও সঙ্গে নিলেন। একপর্যায়ে এই পত্রিকাটিও মুসলিম লীগপন্থীরা কিনে নিল। সঙ্গে সঙ্গেই আবারও চাকরি ছাড়লেন গাফ্ফার ভাই। আমিও ছাড়লাম। এবার তিনি বললেন, ‘রফিক, আমি না হয় চলে যাব, তুমি কেন যাবে? তোমার দায়িত্বভার তো আমি জানি।’ তখন আমার বাবার প্যারালিসিস। পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গাফ্ফার ভাই আমার হাতটা ধরলেন, ‘‘নতুন একটা পত্রিকা বের হবে। আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি। তুমি কালকেই ওখানে জয়েন করো। কাগজটা মোনেম খাঁ বের করবে ঠিকই, তবে তোমাকে একটা ভরসা দিচ্ছি। বার্তা সম্পাদক এ এম জি মহিউদ্দীন, উনি ‘আজাদ’-এর বার্তা সম্পাদক ছিলেন। খুব প্রগতিশীল লোক, তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। তুমি তোমার নীতি বাঁচিয়ে, পেটের দায়ে ওখানে চাকরিটি করো।’’ পরের দিন সেখানে গেলাম। চিঠিটি মহিউদ্দীন ভাইয়ের হাতে দিলাম। তিনি বললেন, ‘যাও বসো, কাজ করো।’ সেখানে সহকর্মী হিসেবে পেলাম হেদায়েত হোসেন, নাজিম উদ্দিন মানিক—এদের। এখানেই সাংবাদিক হিসেবে গোলাম সারওয়ারের (‘সমকাল’-এর প্রয়াত সম্পাদক) অভিষেক হয়। আমি সেদিন ছিলাম শিফট ইনচার্জ। তাঁকে প্রথম নিউজটি আমিই ধরিয়ে দিয়েছিলাম অনুবাদ করার জন্য। পত্রিকাটির নাম ছিল ‘পয়গাম’।

 

মোনেম খাঁর পত্রিকায় আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

রাতের শিফটে কাজ শেষে এক দিন আমি, আরেক দিন হেতায়েত হোসেন মোর্শেদ—এভাবে পালাক্রমে প্রতিদিন মোনেম খাঁর বিরুদ্ধেই ছড়া লিখে, নোটিশ বোর্ডে আঠা দিয়ে টানিয়ে রেখে চলে যেতাম। এগুলোকে আমরা বলতাম ‘নোটিশ বোর্ডের ছড়া’। পরের দিন মোনেম খাঁর ছেলে এসে সেই ছড়া পড়তেন, আর ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় বলতেন, ‘জানি জানি! আমার কাগজে ক্যাডা ক্যাডা নামকরা পদ্য লেখক, কবি আছে; আমি জানি না?’ এর মধ্যে ১৯৬২ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকতার ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ করালো ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই)। আইপিআইয়ের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া; কনভেনর ছিলেন কবি আবদুল গণি হাজারী। আমি প্রশিক্ষণ নিলাম। একদিন হাজারী ভাই আমাকে আড়ালে ডেকে বললেন, ‘সাপ্তাহিক পূর্বদেশ’-এ (তখনো দৈনিক হয়নি) চলে আসুন, এখন যা বেতন পান, তার চেয়ে এক শ টাকা বেশি দেব।’ তখনকার দিনে আমরা ছয় আনা, মানে ৩৭ পয়সায় রেস্টুরেন্টে ভরপেট গোশত-ভাত খেতে পারতাম। ‘পয়গাম’-এর চাকরি না ছেড়েই ‘পূর্বদেশ’-এ জয়েন করলাম। পয়গামে ছিলাম শিফট ইনচার্জ, পূর্বদেশে চিফ রিপোর্টার। ‘পয়গাম’ কর্তৃপক্ষ জানলেও, নাইট শিফটে আমার মতো দক্ষ হাত পাবে কই! পূর্বদেশের সম্পাদক ছিলেন কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “মালিকপক্ষ টের পেয়ে গেছে, তুমি এখনো ‘পয়গাম’-এর চাকরি ছাড়োনি। কালকের মধ্যে তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” তখন ‘পয়গাম’ ছেড়ে দিলাম। কেননা প্রগতিশীল ‘পূর্বদেশ’ আমার জন্য স্বস্তির ছিল। পত্রিকাটিতে তখন সৈয়দ শামসুল হকও ছিলেন।

 

দাদুভাই হলেন কিভাবে?

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পাকিস্তানিরা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দিয়েছিল। ‘পূর্বদেশ’-এর ছোটদের পাতা ‘চাঁদের হাট’ নামটি দিয়েছিলেন আবদুল গণি হাজারী। তখন ছোটদের পাতার পরিচালকদের বিশেষ নাম থাকত। ‘চাঁদের হাট’-এর প্রথম পরিচালক ছিলেন কথাসাহিত্যিক লায়লা সামাদ। তিনি ‘পিউ আপা’ নামে এটি পরিচালনা করতেন। তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর দায়িত্ব নেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক গোলাম রহমান; তিনি ‘গল্প দাদু’ নাম ধারণ করেছিলেন। ‘ইত্তেফাক’ পুড়ে যাওয়ায় পত্রিকাটির ছোটদের পাতা ‘কচিকাঁচার আসর’-এর পরিচালক ‘দাদাভাই’ (রোকনুজ্জামান খান) তখন বেকার হয়ে যান। প্রায় প্রতি শুক্র-শনিবার তিনি আমাদের অফিসে আসতেন আমি, কাজী ইদ্রিস, মাহফুজ সিদ্দিকী, কাদের মাহমুদ, হাজারী ভাই—এঁদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। এ সময় হঠাৎ করে ইউনিটি পাবলিশার্স নামে এক প্রকাশনা সংস্থা খুলে গোলাম রহমান চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর দাদাভাইকে একদিন কাজী সাহেব বললেন, ‘রোকনুজ্জামান, তোমার তো কাগজ নাই, এখন বইসা আছো। তুমি আমাদের ছোটদের পাতাটা দেখ না কেন?’ ‘ঠিক আছে; পয়সা দেবেন তো?’ ‘হ্যাঁ দেব। সবাই তো এই পাতা করতে গিয়ে একটা করে নাম নেয়—পিউ আপা, গল্পদাদু..., তা তুমিও কি নতুন কোনো নামটাম নিবা?’ দাদাভাই তখন বললেন, “ইদ্রিস ভাই, ‘ইত্তেফাক’ তো বন্ধ, আমার ‘কচিকাঁচার আসরে’র ছেলেমেয়েগুলো যে কে কোথায় আছে! অন্যদিকে ‘দাদাভাই’ নামটা তো ‘ইত্তেফাকে’র, ওইটা নেওয়া যাবে না; বরং তারই কাছাকাছি কোনো একটা নাম আমি চিন্তা করছি। ‘দাদুভাই’ নাম দিয়া আমি পাতাটা চালাইতে চাই।” ‘ভালো কথা! এই সপ্তাহ থেকে আরম্ভ করো কাজ।’ সেই তিনি শুরু করলেন। প্রতি রবিবার বের হতো ‘চাঁদের হাট’, পরিচালক ‘দাদুভাই’। এভাবে রোকনুজ্জামান খান ‘দাদাভাই’ই হয়ে গেলেন ‘দাদুভাই’। এক বছর চলল। এরপর ‘ইত্তেফাক’ খুলে গেলে দাদাভাই বললেন, ‘আমি তো এখন আমার জায়গায় যাব চলে।’ হাজারী ভাই আর কাজী ইদ্রিস আলোচনা করলেন : ‘আর বাইরে যাওয়ার দরকার কি? আমাদের এখানেই তো নামকরা শিশুসাহিত্যিক আছে।’ কাজী ভাই বললেন, ‘রফিকই করুক।’ হাজারী ভাইও খুশি। এই পাতা দেখার জন্য আমি এক হাজার টাকা এক্সট্রা পেতাম। মন্দ কি! কাজী ভাই আমাকে বললেন, ‘তুমি কি নাম পাল্টাবা নাকি? তোমার কোনো পুরান নামটাম নিয়া আরম্ভ করবা?’ এর আগে ‘পয়গাম’-এর ছোটদের পাতা ‘নওনেহালের আসর’ আমিই করতাম। তারপরে ‘সোনার বাংলা’র ছোটদের পাতা ‘সবুজ পাতা’ চালাতাম ‘সবুজ ভাই’ নাম নিয়ে। বললাম, ‘না, দাদুভাই নামটি খুব সুন্দর। আমি এটা বদলাব না। তা ছাড়া এ রকম একজন মহান শিশুসাহিত্যিক নামটি দিয়েছেন।’ এভাবে দাদুভাই হয়ে উঠলাম আমি।

 

‘চাঁদের হাট’-এর জার্নিটা কেমন ছিল?

পাতাটির দায়িত্ব নিয়ে আমি দেশজুড়ে সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক বিনি সুতোর মালার মতো গাঁথতে চেয়েছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ঠিক করলাম, এই নতুন দেশে এমন একটা সংগঠন করা দরকার, যেটা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী। সংগঠন হিসেবে ‘চাঁদের হাট’-এর জন্ম পহেলা বৈশাখে; ১৪ এপ্রিল ১৯৭৪। আমি এর প্রতিষ্ঠাতা। ‘খেলাঘর’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে, সেটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হাবীবুর রহমানের কাছ থেকে সংগঠনের পাঠ আমি শিখেছিলাম। ‘খেলাঘর’ থেকেই সেই সময়ে আমি, সুকুমার বড়ুয়া, আল মাহমুদ, দিলওয়ার, ওমর আলী, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, নাজমা জেসমিন চৌধুরী—এত সব উজ্জ্বল মুখ বের হয়েছিলাম। পরবর্তীকালে হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ইমদাদুল হক মিলন, ফরিদুর রেজা সাগর, হানিফ সংকেত, লুত্ফর রহমান রিটন, আলী ইমাম, আফজাল হোসেন, রফি হক, এনায়েত রসুল, রোকেয়া খাতুন রুবী, ধ্রুব এষ, শাহ আলমগীর, রেজাউদ্দীন স্টালিন—কত উজ্জ্বল মুখই যে ‘চাঁদের হাট’ থেকে বের হওয়া! এখনো সংগঠনটি সক্রিয়। জানেন বোধ হয়, আমাকে এ দেশে শিশু সাংবাদিকতার পথিকৃৎও বলা হয়...।

 

‘কিশোর বাংলা’র কারণে?

বাংলাদেশ তো বটেই, এই উপমহাদেশের প্রথম শিশু পত্রিকা ‘কিশোর বাংলা’র সম্পাদক ছিলাম আমি। ১৯৭৪ সালে সরকারি আদেশে ‘অবজারভার’, ‘ দৈনিক বাংলা’, ‘ইত্তেফাক’, ‘বাংলাদেশ টাইমস’ আর সিনেমার পত্রিকা ‘চিত্রালী’ বাদে সব পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেল। পত্রপত্রিকার দায়িত্ব সরাসরি নিল সরকার। ‘পূর্বদেশ’ বন্ধের পর আমার চাকরি হলো তথ্য মন্ত্রণালয়ে। এরপর জিয়াউর রহমানের আমলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলেন কবি হুমায়ুন কবীরের ভাই আকবর কবীর। এ বি এম গোলাম মোস্তফা তখন তথ্য সচিব। আকবর কবীর আমাকে পছন্দ করতেন। একদিন দেখা করে বললাম, ‘ছোটদের জন্য পত্রিকা করেন না কেন?’ তিনি প্রপোজাল দিতে বললেন। তিন দিন খেটে তৈরি করলাম প্রপোজাল। জমা দিলাম। এরপর একদিন তথ্য সচিব আমাকে বললেন, ‘আপনার আইডিয়াটি সুন্দর; দেখি কী করা যায়।’ তারপর আর খবর নাই। হঠাৎ একদিন শুনি, ‘দৈনিক বাংলা’ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’ বের হবে। এটা তো আমার আইডিয়া; অথচ আমি কিছুই জানি না। সানাউল্লাহ নূরী হলেন সেটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তিন সংখ্যা বের হওয়ার পর আমি আকবর কবীরের সঙ্গে আবার দেখা করলাম। বললাম, ‘চাচা, এটা কী হলো?’ ‘ঠিকই তো! তুমি নাই!’ আমি পরামর্শ দিলাম, “এটা তো চাররঙা কাগজ হওয়া দরকার। ‘দৈনিক বাংলা’য় চাররঙার মেকানিজম নাই। সরাসরি নিউজপেপার ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের অধীনে চাররঙা ‘চিত্রালী’ বের হয়। সেটির সম্পাদক পারভেজ ভাইকে (এইচ এম পারভেজ) ‘কিশোর বাংলা’র সম্পাদক আর আমাকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে এটি যদি সেখান থেকেই প্রকাশ করেন, সুন্দরভাবে করা যাবে।’’ সচিবালয় থেকে সেই অর্ডারই হলো। আমি আর আবদুর রহমান (সাবেক বাচসাস সভাপতি) অর্ডারটি নিয়ে এসে, সব কিছু নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে, সারা রাত জেগে ডামি বানিয়ে, রাতারাতি ‘কিশোর বাংলা’ ছেপে ফেললাম। দারুণ হলো। সবাই খুশি। পারভেজ ভাইয়ের মৃত্যুর পর ‘চিত্রালী’র সম্পাদক হলেন আহমেদ জামান চৌধুরী, আমি হলাম ‘কিশোর বাংলা’র সম্পাদক। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল ‘কিশোর বাংলা’।

 

প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?

লেখালেখি শুরু করার দীর্ঘকাল পর, ১৫ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে আমার প্রথম বই ‘বর্গী এলো দেশে’ প্রকাশিত হয়। কারণ একটাই, আমার শম্বুক চরিত্র। প্রচুর লিখতাম। দেশের বড় বড় কাগজে ছাপাও হতো সেসব লেখা। ছড়াকার হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছিলাম। কিন্তু কোনো প্রকাশককে পাণ্ডুলিপি দিয়ে বই প্রকাশ করতে বলতে ইচ্ছা করেনি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হাশেম খানসহ অনেকেই বই বের করার চাপ দিতেন। অবশেষে বই প্রকাশে রাজি হলে যত্নের সঙ্গে ছবি এঁকে দিয়েছিলেন তিনি। এ বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে লুত্ফর রহমান রিটনের কাছে আমি ঋণী। বইটির নামকরণের পেছনে শিকড়ের প্রতি আমার অকৃত্রিম পক্ষপাতের বিষয়টি কাজ করেছে। ‘মাটি খাঁটি’—এ কথাটি আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। বইটার মুদ্রণকাজ চলার সময় একটা মজার কাণ্ড ঘটেছিল। বাংলা একাডেমির প্রেসে যখন ছাপা হচ্ছে, সে সময় একদিন আমি আর রিটন অগ্রগতি দেখতে সেখানে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ছোট-মাঝারি আর অবিশ্বাস্য রকমের বড় বড় আকারের প্রবল শিলাবৃষ্টি শুরু হলো। সেদিন এক কেজি-দুই কেজি ওজনেরও শিলাবৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের দুজনেরই মাথা ফাটেনি অল্পের জন্যে। তবে আমাদের বাহন ছিল যে গাড়িটি, অলৌকিকভাবে উইন্ডশিল্ডটা না ভাঙলেও সেটির বনেট এবং পেছনের দিকটা সেই শিলাবৃষ্টির আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল!

 

গানও লিখেছেন...

আবদুল আলীমের বিখ্যাত গান ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা, কোন দূরে যাও চইলা...’ আমারই লেখা। আরো অনেক গানই লিখেছি।

 

আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কারা ছিলেন?

প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, আমজাদ হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, মোস্তাফিজুর রহমান (বিটিভির সাবেক মহাব্যবস্থাপক), আল মাহমুদ, হাশেম খান, ড. শামসুজ্জামান খান—এঁদের কথা মনে পড়ছে। ১৯৫৮ সালের কথা। আমি ২৫ কোর্ট হাউস স্ট্রিটের মতিমহল রেস্ট হাউস বোর্ডিংয়ে একটা রুম ভাড়া করে থাকতাম। মাসিক ভাড়া ১৫ টাকা। আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ফেল করে বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমজাদ ছিল আমার ‘খেলাঘর’-এর কলম-বন্ধু; চিঠির মাধ্যমে সম্পর্ক। আল মাহমুদ, দিলওয়ার, ওমর আলী—এরাও তাই। আমি তখন নাগড়া জুতা আর পাঞ্জাবি পরতাম; সেই সময়ের ফ্যাশন ছিল এটি। একদিন সকালে আমি রুমে বসে জুতা রং করছি, একটা ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘এইখানে রফিকুল হক থাকে কোথায়?’ ‘আপনি কে?’ ‘আমি রফিকুল হকের কলম-বন্ধু। আমার নাম আমজাদ হোসেন। জামালপুর থেকে এসেছি।’ সে-ও ইন্টারমিডিয়েট ফেল করে বাড়ি থেকে পালিয়েছে! আমি বললাম, ‘আরে ব্যাটা, আমার নামই রফিকুল হক!’ তখন সে ‘আরে দোস্ত’ বলে গলা জড়িয়ে ধরল। আমি ওকে রুমে রেখে বাইরে বের হলাম। আমার তখন বাড়ি থেকে খরচ আসে এক শ টাকা। সেই টাকায় কলেজের বেতন দিই, বই-খাতা কিনি, থাকা-খাওয়ার খরচ মেটাই। দুপুরে রুমে ফিরে দেখি, আমজাদ গল্প-কবিতা লিখছে। বললাম, ‘খাইছিস?’ ‘খাব! কোথায় খাব?’ আমাদের মেসে ভাত ছিল। ভাগ করে খেলাম। সেই থেকে দীর্ঘদিন আমরা ভাগ করে একই বিছানায় ঘুমিয়েছি, একই খাবার খেয়েছি। এই করতে করতে, একসময় আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হলো। আমি বাড়ি ফিরে যাব। আমজাদের কী হবে? পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিখ্যাত নেতা এস এ মহসীন। তিনি রংপুরের মানুষ; আমরা তাঁকে ‘সাজু মিয়া’ নামে চিনি। তিনি ছিলেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানের খুবই ঘনিষ্ঠজন। বর্তমান গুলিস্তান ভবনের পেছনে তখন ছিল রমনা রেস্ট হাউস। সেটির ৩০ নম্বর রুমটিতে তিনি থাকতেন। সেই সময়কার ঢাকার অনেক বিখ্যাত মানুষের আড্ডা ছিল সেই রুমে। ফুটবল রেফারি ননী গোপাল থেকে শুরু করে কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, কায়সুল হক, শামসুর রাহমান...। তাঁকে বলে আমি আমজাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দিলাম। এক মাস পর ওর যখন প্রথম বেতন হলো, আমার খাট, বইপত্র, টেবিল—সব কিছু ওকে দিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলাম। আমজাদ বহুদিন ওই রুমটিতে ছিল। এখানে থেকেই ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ সিনেমায় অভিনয় করেছে সে।

 

বাংলাদেশিদের মধ্যে আপনিই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম ছড়াটি লিখেছেন...

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরেন। কিন্তু পাকিস্তানে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ থাকার ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাই চিকিত্সার জন্য আগস্টে লন্ডন গেলেন। চিকিত্সা শেষে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ১৪ সেপ্টেম্বর। সেদিন ‘পূর্বদেশ’ একটি বিশেষ সংখ্যা বের করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর ভালোবাসায় লিখে ফেললাম একটি ছড়া। তখন পত্রিকাটির দায়িত্বে ছিলেন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। তাঁকে ছড়াটি দিলাম। তিনি বললেন, এই ছড়ার নামেই বিশেষ সংখ্যাটির নামকরণ হবে—‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’। তখন তো আর জানতাম না, এটিই তাঁকে নিয়ে কোনো বাংলাদেশির লেখা প্রথম ছড়া হয়ে গেছে!

 

আপনার বইপত্র?

ছড়ার বই ‘বর্গী এলো দেশে’, ‘পান্তাভাতে ঘি’, ‘নেবুর পাতা করমচা’, ‘ঢামেরিক’, ‘আমপাতা জোড়া জোড়া’, ‘সমকালীন ছড়া’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’ ইত্যাদি। নাটক ‘বই বই হইচই’, মুক্তিযুদ্ধের শিশু-কিশোর উপন্যাস ‘একাত্তরের বিচ্ছু বশির’ ও রূপকথার বই ‘প্রাচীন বাংলার রূপকথা’সহ বেশ কিছু বই-ই প্রকাশ পেয়েছে।

 

অনেক সম্মাননা পেয়েছেন...

বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি। তবে শিশুদের মুখে মুখে যখন আমার লেখা ছড়া শুনতে পাই, সেই প্রাপ্তির কোনো তুলনা চলে না।

 

ব্যক্তিগত জীবন?

প্রথম স্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা হামিদা হকের মৃত্যুর অনেক বছর পর কবি ফাতিমা হককে বিয়ে করেছি। প্রথম সংসারের বড় ছেলে জয় হক আমেরিকাপ্রবাসী চিকিত্সক; ছোট ছেলে জ্যোতি হক ছাত্রাবস্থায় দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে। দ্বিতীয় সংসারে আমার কন্যা জয়িতা হক। আর সর্বকনিষ্ঠ পুত্র জীবন হকের বয়স এখন তিন বছরের মতো।

 

বর্তমান শিশুসাহিত্য নিয়ে ভাবনা?

একালে আমরা যারা শিশুসাহিত্য করি, আমাদের হাতে ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল’র মতো লেখা আসে না। আধুনিকতার চমক দেখাতে গিয়ে ছন্দ মিলিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ভাবি, কী অসাধারণ আমার সৃষ্টি! শিশুরা কী বুঝল, কী বুঝল না; কী শিখল, কী শিখল না—এসব নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই আমাদের! দায়বদ্ধতার ব্যাপারটা তো অনেক দূরের কথা।

(শান্তিনগর, ঢাকা; ২৪ জুন ২০১৯)



সাতদিনের সেরা