kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে অনেক চরিত্রে অভিনয় করিনি

দিলারা জামান। একুশে পদকজয়ী অভিনেত্রী। অসংখ্য টিভি নাটকের তুখোড় এই অভিনেত্রীর জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে



সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে অনেক চরিত্রে অভিনয় করিনি

শৈশব কেমন ছিল?

১৯৪২ সালের (সার্টিফিকেটে ১৯৪৩ সাল) ১৯ জুন, আব্বার কর্মস্থল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে আমার জন্ম। আম্মার তখন ১৬ বছর বয়স। কিশোরী মা জানতেন না কী করে সন্তান পালন করতে হয়। আমার জন্মের পরপরই তাঁর ম্যালেরিয়া হয়েছিল। ঠিকমতো দুধ খাওয়াতে পারেননি। এদিকে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। গরু পালতেন যাঁরা, তাঁরাও পালিয়ে গেছেন। গরুর দুধ পাওয়াও তাই সম্ভব ছিল না। কোনোমতে বার্লি, ভাতের মাড়—এসব খাইয়ে বাঁচানো হয়েছিল আমাকে। ইঞ্জিনিয়ার বাবা বদলি হয়ে বর্ধমান থেকে আসানসোল, তারপর দেশভাগের সময় যশোরে চলে এলেন। আমার শিক্ষাজীবন শুরু মোমেন গার্ডেন স্কুলে, এখন সেটা যশোর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। টিফিনের জন্য দুই আনা পয়সা দিত। মুড়কি কিনে খেতাম। স্কুল থেকে ফিরে খেলতে যেতাম পাশের মাঠে।

 

যশোরে কোথায় থাকতেন?

আমাদের বাসা ছিল ষষ্ঠীতলায়। ট্রেনের হুইসেল শুনলে বাসা থেকে দুই মিনিটের সেই পথ দৌড়ে, রেললাইনের পাশে দাঁড়াতাম। ট্রেন যখন চলে যেত, পরনের ফ্রকটি বাতাসে উড়ত। আমাদের বাসার বারান্দাগুলো সব ছিল লাল টালির। সামনে দুটি নারকেলগাছ ছিল গেটের মতো। ৬৫-৬৭ বছর পর গত বছর যশোর গিয়ে ষষ্ঠীতলা খুঁজে পেলাম, কিন্তু বাসাটি আর পাচ্ছি না! সব বিরাট দালানকোঠা হয়ে গেছে। একেবারেই হতাশ হয়ে পড়েছি যখন, পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ভদ্রলোক রিকশা থামিয়ে বললেন, ‘আপনি দিলারা জামান না?’ ‘জি’। ‘আপনার ডাকনাম লিলি?’ ‘আপনি কেমন করে জানেন?’ ‘এই বাসা, এই বাসা...!’ ঠিক যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেই বাসাটাই আমাদের! তিনি বললেন, ‘এই বাড়িটা আমার ফুফু কিনেছেন। উনি টেলিভিশনে আপনাকে দেখে সব সময়ই আপনার ছোটবেলার কথা, আপনার বাবার কথা বলেন।’ আমি তখন হাউমাউ করে কেঁদে রাস্তার পাশে, মাটিতে বসে পড়লাম। তিনি আমাকে বাসার ভেতরে নিয়ে গেলেন। কত স্মৃতি মনে পড়ল!

 

ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলেন?

ঝড় এলে, দৌড়ে বাড়ির পেছনের আমবাগানে চলে যেতাম আম কুড়াতে। পাশের বাড়িটি ছিল পরবর্তীকালে পরমাণু শক্তি কমিশনের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার, বিজ্ঞানী ড. এম শমসের আলীর। আমার যখন চার-পাঁচ আর ওনার সাত-আট বছর, একদিন ওনাদের গাছে উঠে পেয়ারা পেড়েছিলাম। উনি বের হয়ে বলেছিলেন, ‘পড়াশোনা বাদ দিয়ে পেয়ারা পাড়া? দুষ্টু মেয়ে, দাঁড়াও, তোমাকে গরুগাড়ির চাকার সঙ্গে বেঁধে রাখব।’ আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সত্যি সত্যি তিনি এ কাজটি করবেন! তাঁর ছোট ভাই তোতা ছিল আমার খেলার সাথি। বহুবছর পর, সম্ভবত ১৯৮০ দশকে, ঢাকায় একবার শিশু একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি, আমি বিশেষ অতিথি। তাঁকে আমার আর ঠিক খেয়াল নেই। তিনি যখন বক্তৃতায় সেই স্মৃতিচারণা করলেন, আমি চিত্কার করে উঠলাম—‘শান্তি ভাই!’ সেই যে ভীষণ চমক খাওয়া এবং সেই চমকটা যে এত আনন্দ, এত সুখের—আমি তা কোনো দিন ভুলব না।

 

একবার মিছিল করে পিটুনি খেয়েছিলেন!

আমার বড় খালু ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ‘তসবির মহল’ সিনেমা হলটির পাশেই বাড়ি ছিল তাঁর। বাসা থেকেই হলে চলা সিনেমার সংলাপগুলো শোনা যেত। খালুর বাসায় বেড়াতে গেলে যখন-তখন দৌড়ে চলে যেতাম সিনেমা হলে। ভিআইপি বক্সে বসে ১০-১৫ মিনিট দেখে, আবার দৌড়ে বাসায় ফিরতাম। আমি যখনকার কথা বলছি, তখন ভাষা আন্দোলনের কাল। আব্বা-আম্মার মুখে শুনেছি, ঢাকায় ছাত্রদের মেরে ফেলা হয়েছে। সে কথার অর্থ ঠিক বুঝিনি। ২১শে ফেব্রুয়ারির পর কোনো একদিন আমাদের বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যাচ্ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। আমিও মিছিলের পেছন পেছন স্লোগান দিয়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। যখন ফিরলাম, দেখি আম্মা গেটে দাঁড়ানো। আমাকে খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে ছিলেন। পেয়েই হাতপাখা দিয়ে হালকা পিটুনি দিলেন!

 

ঢাকায় এলেন কবে?

১৯৫৩ সালে আব্বা ঢাকায় বদলি হয়ে এলেন। আমি ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম বাংলাবাজার স্কুলে। সেখান থেকেই ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছি। তারপর ইডেন কলেজে পড়ার সময়, আমার ভাবনারাজ্যে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা ভর করল। আরো যাঁরা বিপ্লবী ছিলেন, তাঁদের কবিতা ও জীবনী পড়তে পড়তে মনে হতো, এইসব সংগ্রামী মানুষের মতো একটুও যদি হতে পারতাম! তখন থেকেই লেখালেখি শুরু। আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৫৮ সালে, ইত্তেফাকের ‘কচি কাঁচার আসরে’। এই প্রথম নিজের নাম ছাপা হলো—আব্বা রফিক উদ্দিন আহমেদের নাম অনুসারে দিলারা আহমেদ (লিলি)। তবে লুকিয়েই লিখতাম। আব্বা-আম্মার কথা ছিল, আগে পড়ালেখা! তখন মেয়েদের একটাই পত্রিকা ছিল ‘বেগম’। সেখানেও গল্প লিখতে শুরু করলাম।

১৯৫৩ সালের ঢাকার সঙ্গে আজকের ঢাকাকে মেলানো যাবে না। তখন রিকশায় করে কোথাও গেলে, রিকশার চারপাশে শাড়ি দিয়ে পর্দা দেওয়া হতো। রাস্তায় গাড়িটাড়ি তেমন ছিল না। শুধু আব্বার অফিসের জিপ গাড়িটা আসত বাসার সামনে। তখন ঢাকার অভিজাত এলাকা ছিল র্যাংকিন স্ট্রিট। ১৯৬২ সালে, নিউ মার্কেট যখন তৈরি হচ্ছে, আমি বাসা থেকে হেঁটে সেখানে আসতাম বড় গেটটা দেখার জন্য।

 

নাটকের সঙ্গে পরিচয় কখন?

মঞ্চে প্রথম নাটক দেখার সুযোগ হলো ১৯৫৭ সালে, কার্জন হলে। বিশ্ববিদ্যালয়েরই নাটক। অভিনয় করেছিলেন মমতাজ লিলি খান ও ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের নায়িকা জহরত আরা। তখন আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, একটা মঞ্চের মধ্যে জীবন্ত মানুষ আমাদের মতোই কথা বলছে, কাঁদছে, আবার হাসছে। অভিনয়ের এই জাদুকরী ব্যাপারটি আমার মনের মধ্যে একটা বীজ হয়ে বপিত হলো। সেই বীজই পরবর্তী সময়ে আস্তে আস্তে ডালপালা ছড়িয়েছে। সে বছরই, স্কুলে ম্যাট্রিকের বিদায়ী অনুষ্ঠানে ছোট্ট একটি নাটিকায় অভিনয় করলাম। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মামলার ফল’ গল্পটি আমাদের পাঠ্য ছিল। সেটিকেই নাট্যরূপ দিয়ে আমরা অভিনয় করেছিলাম। কী অভিনয়—জানি না; ঝড়ের মতো এসে সংলাপ বললাম, আবার ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেলাম। তখন তো এখনকার মতো মেকআপ ছিল না; শাঁখারীবাজার থেকে আনা চকের গুঁড়ার মধ্যে সিঁদুর মিলিয়ে, সেগুলো মেখে মুখটাকে ফরসা করে, চোখে টানা টানা কাজল দিয়ে সাজানো হতো। সেদিন অভিনয় শেষে আমি মুখ ধুইনি। বাংলাবাজার স্কুল থেকে লালবাগে আমাদের বাসা পর্যন্ত বাসে সারাটা পথ মুখটা জানালার বাইরে বের করে রেখেছিলাম, যেন সবাই দেখে—এই মেয়েটি অভিনয় করেছে! নিজেকে খুব গর্বিত একটা মানুষ মনে হয়েছিল তখন, যেন বিশাল কিছু জয় করে ফেলেছি!

 

কলেজের দিনগুলো কেমন ছিল?

অধ্যাপিকা রোকেয়া রহমান কবির ছিলেন খুব সংস্কৃতিমনা ও আধুনিক মনের মানুষ। তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো গাইড করতেন। কলেজের নাটকেও অভিনয় করতাম। তখনই বর্তমান সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি ছিলেন ছাত্রসংসদের ভিপি, আমি সাহিত্য সম্পাদিকা। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনে মিছিল করার জন্য আমরা দেয়াল টপকিয়ে কলেজ থেকে বের হয়ে যেতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, আমতলা—ওসব জায়গায় জড়ো হয়ে রাশেদ খান মেননসহ অন্যান্য ছাত্রনেতার বক্তৃতা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। রক্ত টগবগ করত। সেই থেকে বাম রাজনীতির প্রতি আমার একটা টান জন্মে গেল।

 

ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন?

১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। তবে ও রকম বিরাট কোনো ছাত্রনেতা আমি ছিলাম না। থাকতাম পেছনের সারিতে। তা ছাড়া তখন লেখালেখিতে নিয়মিত হলাম। ‘বেগম’-এর ঈদ সংখ্যায় ছবিসহ গল্প ছাপা হলো। আমাদের বাসার কাছেই ছিল ‘আজাদ’ পত্রিকার অফিস। ওখানে কবি হাবীবুর রহমান কাজ করতেন। তাঁর ও কবি আহসান হাবীবের স্নেহধন্য হলাম। লেখালেখির সূত্রেই আমার জীবনসঙ্গী ফখরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হলো। ১৯৬৪ সালের কথা। তখন বাংলা একাডেমিতে বিকেলবেলা সাহিত্যের আসর বসত। একদিন আম্মা অসুস্থ বলে আমি ঝটপট একটি কবিতা পড়েই হাসপাতালে চলে এসেছিলাম। ফখরুজ্জামান চৌধুরী তখন বাংলা একাডেমির রিসার্চ ফেলো। আমি তাঁকে চিনতাম না; নামও শুনিনি। সেদিন বাংলা একাডেমির সেই আসরে তিনি আমার একটা গল্পের বেশ সমালোচনা করেছিলেন—‘লেখিকা লেখার প্রতি উদাসীন’ ইত্যাদি। পরে অন্যরা যখন আমাকে সে কথা জানাল, ভাবলাম, কে এই লোক, দেখতে হবে! ঘটনাচক্রে তাঁর ভাগ্নি পড়ত আমাদের সঙ্গেই। পরের দিন সেই মেয়েটিও বলল, ‘লিলি আপা, কালকে তো আমার মামা আপনার লেখার সমালোচনা করেছেন। আপনি বোধ হয় শোনেননি।’ বললাম, ‘তোমার মামা কে?’ নাম বলল। আমি বললাম, ‘তোমার মামাকে বলবে, ওনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। তাঁকে কড়া জবাব দেব।’ আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম।

 

রাগ ঝাড়লেন কিভাবে?

ক্লাস শেষ হতেই আমি সোজা বাংলা একাডেমিতে চলে এলাম। রিকশা থেকে নামতেই দেখি ভেতর থেকে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, ‘আপনি দিলারা আহমেদ?’ বললাম, ‘আপনিই ফখরুজ্জামান চৌধুরী?’ তাঁর সঙ্গে নিচের অন্ধকার লাইব্রেরিতে গিয়ে বসলাম। তিনি সেখানে বসেই গবেষণা করতেন। দেখলাম, খুবই জ্ঞানীর মতো দেখতে, চশমা পরা লোক। আমি ঝগড়া করার যত প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলাম, সব ভুলে গেলাম। তাঁর সঙ্গে সেদিন বেশি কথা হয়নি। একসময় তিনি বললেন, ‘আপনি এখন বাসায় যাবেন?’ বললাম, ‘না, হাসপাতালে যাব।’ তখন অভ্যাস ছিল ক্লাস শেষে, আব্বার দেওয়া টিফিনের পয়সা কিছু বাঁচিয়ে দুই আনা দিয়ে ছোট পাউরুটি আর কমলা কিনে, হাঁটতে হাঁটতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে যাওয়া। যেসব রোগীর কোনো আত্মীয়-স্বজন আসে না, বা একা থাকেন—তাঁদের সঙ্গে একটু কথা বলতাম। একটু খাবার দিতাম। যখন ওনাকে এ কথা জানালাম, খুব অবাক হলেন। বললাম, ‘অবাক হওয়ার কিছু নেই। সব মানুষই নিঃসঙ্গ। একটা মানুষ শত জনতার মধ্যে, কোলাহলের মধ্যে থেকেও নিঃসঙ্গ হতে পারে।’ কথাগুলো তিনি খুব মুগ্ধ হয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, ‘আজ রাত ১০টায় রেডিওর সাহিত্য আসরে আমি গল্প পড়ব। আমার গল্পের প্লট পাচ্ছিলাম না। আপনার সঙ্গে কথা বলে...।’ কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘আপনি কিন্তু আমার সম্পর্কে একদম খারাপ কিছু বলবেন না!’ ‘না, না। আপনার কথা শুনে একটা থিম পেলাম।’

 

কী ছিল সেই গল্পের পরিণতি?

তখন তো ব্যাটারিচালিত ছোট্ট রেডিও ছিল। রেডিওটি মাথার কাছে নিয়ে শুনছি, তিনি গল্প পড়ছেন। গল্পের নাম ‘প্রহরা’। একটি মেয়ে হাসপাতালে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনহীন রোগীদের সঙ্গ দেয়, তার ‘করুণ শঙ্খের মতো চোখ’! আমি জীবনেও এমন বিশেষণ শুনিনি। গল্পে গল্পে আমারই বর্ণনা করছেন তিনি। বেশ রোমাঞ্চিত হলাম। আমি তখন সদ্য যৌবনে পদার্পণ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়ি। তিনিও আমাদের বিভাগেরই সাবেক ছাত্র। গল্পের শেষটা আমি শুনতে পারিনি; ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! পরের দিন আবার তাঁর কাছে গেলাম। কথা বললাম। আস্তে আস্তে সম্পর্ক গড়ে উঠল। এরপর সে বছরেরই ২৪ ফেব্রুয়ারি বিয়ে করলাম আমরা। সেটি ছিল আমার পক্ষে তাঁর সঙ্গে অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা। কারণ তিনি তখনো চাকরি করেন না। মাত্র আড়াই শ টাকা বৃত্তি পান। সবার অমতেই বিয়ে করলাম। পরে সবাই মেনে নিয়েছিল। ২০১৪ সালে আমাদের বিয়ের ৫০ বছর পূর্তি হলো। তখন তিনি খুবই অসুস্থ। আমরা আমেরিকা থেকে চলে এসেছি। তাঁকে অক্সিজেন দিয়ে রাখতে হয়। আমেরিকা থেকে আসার পর দুই বছরে তাঁকে ছয়বার আইসিউতে নিতে হয়েছে। বাসায়ও হাসপাতালের মতোই সেটআপ করে রাখতে হয়। আমি তখন একটু একটু কাজ করতাম। সবাইকে বলতাম, আমাকে যেন সন্ধ্যার মধ্যে ছেড়ে দেয়। সেদিন বাসার কাছেই একটা নাটকের শুটিং ছিল। বাসা থেকে একাধিকবার ফোন করা হলো আমাকে। এসে দেখি, বাসার সামনে অনেক গাড়ি। আমার প্রাণটা একদম ধক করে উঠল, হয়তো তাঁর কিছু হয়েছে। কিভাবে ওপরে উঠেছি, জানি না। দেখি বাসাভর্তি মানুষ। এর আগে যখন আমেরিকায় চলে গিয়েছিলাম, আমার ৪৫ বছরের সংসারজীবনের সব জিনিসপত্র মানুষকে বিলিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছি। আবার যে ফিরে আসব, ভাবিনি। দুই বছরের মাথায়, দেশের জন্য মন খারাপ হচ্ছিল বলে আমরা দুজনে ফিরে এসেছিলাম। ওখানেও তিনি দুইবার আইসিউতে ছিলেন। যাহোক, সেদিন বাসায় ফিরে দেখি, বিয়েবার্ষিকী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রেখেছে আমাদের দুই কন্যা। সেটিই ছিল আমার জীবনের শেষ বিয়েবার্ষিকী। সে বছরই ১২ জুন তিনি মারা গেলেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন কেমন ছিল?

বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মুনীর চৌধুরী, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, ড. আনিসুজ্জামান, ড. মনিরুজ্জামান, বাংলা বিভাগের প্রধান ড. আব্দুল হাই—এঁদের পেয়েছি। সবাই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ক্লাস শেষে মিছিল করতে করতে নবাবপুর, ইসলামপুর হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত যেতাম; আবার মিছিল করে ফিরতাম। সংস্কৃতিচর্চা, সংস্কৃতিকে মনে লালন করার যে বীজ বপন হয়েছে; এবং নাটক, অভিনয়, সাহিত্যকে ভালোবাসার যে মানুষটির জন্ম আমার ভেতরে ঘটেছে—সেটি এই সময়েই। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। তখন ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে নাটক করত না। ছেলেরা মেয়ে সাজত, আবার মেয়েদের হলে মেয়েরাই ছেলে সাজত। ১৯৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে নাটক করবে। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা ‘মায়াবী প্রহর’। সেই নাটকে ইতিহাস বিভাগের আবদুল্লাহ আল মামুন, বিজ্ঞানের ছাত্র ড. ইনামুল হক—এঁরাও অভিনয় করবেন। আমি বললাম, ‘জানি না, বাসা থেকে অনুমতি দেবে কি না।’ এ কথা শুনে মুনীর স্যার আমার আব্বার উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখলেন। সে সময় আম্মার দূরসম্পর্কের ভাই শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীও বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু তাঁকে বলার সাহস পাইনি আমি। মুনীর স্যার যেহেতু নাটকের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাঁর চিঠি পেয়ে আব্বা অমত করেননি।

 

অভিনয়ে সিরিয়াস হলেন কখন?

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম টেলিভিশন এলো। সন্ধ্যা থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চলত। ডিআইটিতে ছিল টেলিভিশন স্টেশন। ছোট্ট একটা ঘরের মধ্যে স্টুডিও। পরীক্ষার পড়ার মতো মুখস্থ করতে হতো সংলাপ। পাঁচ-ছয় দিন ধরে রিহার্সাল চলত। যেদিন সন্ধ্যায় নাটক হবে, সেদিন দুপুর ২টার মধ্যে ডিআইটিতে গিয়ে হাজির হতে হতো। সরাসরি সম্প্রচার। এক হাত সরে গেলেই আউট-অব-ফ্রেম হয়ে যাওয়ার ভয়। এভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই নাটক করতে হতো তখন। আমি টেলিভিশনে প্রথম নাটক করি ১৯৬৫ সালের শুরুর দিকে। মোহাম্মদ জাকারিয়ার প্রযোজনায় ‘ত্রিধারা’ নাটকটিতে মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী লিলি চৌধুরী আমার মা হয়েছিলেন।

 

কতগুলো টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন?

তার কোনো হিসাব নাই! আমাদের সময়ে, অন্তত ১৯৯০ দশক পর্যন্ত আমরা অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারিনি। বিশেষত মেয়েদের জীবিকা নির্বাহের জন্য অভিনয়ের পাশাপাশি অন্য কিছু করতে হয়েছে। অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিয়ে খুব ভালোভাবে জীবিকা নির্বাহ করা—এই বিষয়টির উত্তরণ স্বাধীনতার পরবর্তীকাল থেকে ধীরে ধীরে ঘটেছে। মঞ্চনাটকে যেমন একটা বিপ্লব এসেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে, তেমনি এখন এত টিভি চ্যানেল যে হয়েছে, এটাকে আমি বলি ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠা। এতগুলো চ্যানেল হওয়ার কারণে, এতগুলো মানুষ জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে এবং অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিতে পারছে। শুধু অভিনয় নয়, কয়েক হাজার মানুষ নাটক নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থেকে জীবন কাটাতে পারছে। আমি আগে শিক্ষকতা করতাম, আর সময় বের করে অভিনয় করতাম। তবে গত ১৮ বছর ধরে অভিনয়ই আমার পেশা।

 

শিক্ষকতার গল্প...

শেরে বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাম ছিল তখন নারীশিক্ষা মন্দির। বিয়ের পর স্বামীর আড়াই শ টাকার বৃত্তি দিয়ে তো সংসার চলত না। বাসা ভাড়াই দিতে হতো দুই শ টাকা। তখন রেডিও ও টেলিভিশনে চার-পাঁচ মাসে একটা করে নাটক করতাম। তাই নারীশিক্ষা মন্দিরে শিক্ষকতা শুরু করি। সেখান থেকে, ১৯৬৮ সালে ময়মনসিংহে গিয়ে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিএড, এমএড পাস করেছি। ময়মনসিংহে গিয়েছিলাম স্বামীর চাকরিসূত্রে। চলতে না পেরে তিনি পিএইচডির গবেষণাপত্র আর জমা দেননি; সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে চাকরি নিয়েছিলেন (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ছিলেন তিনি)। ময়মনসিংহে থাকার সময়ই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আমরা গ্রামের দিকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। গোলাঘরের পেছনে আমাকে লুকিয়ে রাখা হতো, যেন কেউ বুঝতে না পারে এখানে কোনো যুবতি এসেছে। স্বাধীনতার পরে আবার ময়মনসিংহ শহরে ফিরে এলাম। এরপর স্বামীর বদলি হলো চট্টগ্রামে। আর আমি প্রথম মা হলাম ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই। চট্টগ্রামে তখন টেলিভিশন দেখা যেত না। রেডিওতে নাটক করতাম। সে বছরই আমি ‘অরিন্দম নাট্যগোষ্ঠী’র সঙ্গে যুক্ত হলাম। প্রতি রবিবার মুসলিম হল (বর্তমানে চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরি) ভাড়া করে নাটক করতাম। এ ছাড়া ছুটির দিনে সেন্ট মেরিজ স্কুলের হল ভাড়া নিতাম। এখন যেটা শিল্পকলা, সেটা তখন ছিল একতলা একটি বিল্ডিং; লাইব্রেরির মতো। ওটার মাঠে কিংবা বারান্দায় আমরা রিহার্সাল করতাম। তখন প্রতিবছর শিল্পকলার আয়োজনে সারা দেশের প্রতিনিধিত্বশীল নাট্যদলগুলোকে নিয়ে নাট্যোত্সব হতো। আমরা তিন-চার বছর এসেছিলাম। এর মধ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রেখটের লেখা ‘মা’ নাটকটিতে আমার অভিনয় খুব প্রশংসিত হয়েছিল।

 

মঞ্চনাটক কত দিন পর্যন্ত করলেন?

১৯৮০ সালে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকার অনেক নাট্যদল থেকেই আমার ডাক এসেছে, কিন্তু এরপর আর মঞ্চনাটক করতে পারিনি। কারণ তখন মেয়েরা ছোট, স্কুলে যায়; ওদের সময় দিতে হতো। অবশ্য এখন আবার মঞ্চনাটক করতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু শরীর সায় দেয় না।

 

ঢাকায় এসেও শিক্ষকতা করেছেন?

তখন ভূতের গলিতে, আমাদের বাসার কাছেরই মেহেরুন নেসা স্কুলে শিক্ষকতা করতাম। সেখান থেকে বিএএফ শাহীন স্কুলে অনেক বছর পড়িয়েছি। এর পর ভিকারুননিসা নূন স্কুলে শিক্ষকতা করে, ২০০০ সালে অবসর নিয়েছি। শিক্ষকতা করতে গিয়ে অনেকবারই অভিনয়ের সঙ্গে সংঘাত হয়েছে। স্কুল বাদ দিয়ে কখনো অভিনয় করিনি। তবু স্কুলের কারো কারো কটু কথা শুনতে হয়েছে। এখনকার মতো এত ঔদার্য থাকলে হয়তো আরো বেশি কাজ করতে পারতাম।

 

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক?

যখন শাহীন স্কুলে পড়াতাম, টেলিভিশনে ‘ডালাস’ নামে একটা বিদেশি সিরিয়াল দেখানো হতো। সেটির নায়িকার নাম ছিল স্যু এলেন। ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে ‘স্যু এলেন ম্যাডাম’ নামে ডাকত। আমার এত ছাত্র-ছাত্রী, ওদের প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালীন চেহারা হয়তো মনে আছে; কিন্তু এখন ওরা বড় হয়ে গেছে, দেখলে চিনতে পারি না। একবার আমেরিকায় যাওয়ার পথে, দোহা বিমানবন্দরে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ টোকেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ এক ছেলে এসে বলল, ‘ম্যাডাম, আমি আপনার ছাত্র।’ আমি যেন সমুদ্রের মধ্যে খড়কুটো খুঁজে পেলাম। ছেলেটি সেই এয়ারলাইনসে চাকরি করে। সে বিকল্প ব্যবস্থা করে দিল। এদিকে গত বছর, চিটাগাং পাবলিক স্কুলে আমরা যাঁরা পুরনো শিক্ষক ছিলাম, তাঁদের একটা মিলনমেলা করল ছাত্র-ছাত্রীরা। সংবর্ধনা দিল। রাস্তাঘাটেও যখন কেউ বলে উঠে, ‘আমি আপনার স্টুডেন্ট ছিলাম’—মনে হয় শিক্ষক হিসেবে এ আমার বড় পাওয়া।

 

টিভি নাটক যখন সরাসরি সম্প্রচার থেকে শুটিংয়ের পর্যায়ে এলো, তখনকার অভিজ্ঞতা?

ভুল হলে নতুন করে করা যায়—শুটিংয়ের এটাই সুবিধা। এটা যেমন ভালোও, আবার মন্দও। অনেকবার রিহার্সাল করে সংলাপ আয়ত্তে আনা, একটা চরিত্রকে আত্মস্থ করা—এই মনোযোগটা অনেকখানি কমে গেছে। এমনও দেখা যায়, একই দিনে একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী দুই-তিনটি নাটকে কাজ করছেন। তখন সপ্তাহে হয়তো এক-দুই দিন নাটক হতো; বাড়ি তো বটেই, আশপাশের সবাই একটা টেলিভিশন ঘিরে বসে থাকত। সেই নাটকের কথা, চরিত্রগুলো দর্শকের ভেতরে আলোড়ন সৃষ্টি করত। এখন টেলিভিশনের নাটক যেহেতু শুধুই বিনোদন হয়ে গেছে, তখনকার মতো সমাজের, জীবনের সমস্যা ও কথাগুলো নিয়ে ভাবার ব্যাপারটি যেন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমার একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। যখন কাজ করি, আমি মনে করি আমার এই সংলাপ, আমার এই চরিত্র কারো না কারো মনে একটা প্রভাব বিস্তার করবে। ফলে অনেক কিছু ভেবে, বুঝে কাজটি করতে হয়। শিক্ষকতা করতাম বলে আগে আমি অনেক চরিত্রেই অভিনয় করতে পারিনি। ভাবতাম, ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর যদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে?

 

চলচ্চিত্রে অভিনয়?

‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪), ‘মনপুরা’ (২০০৯), ‘হালদা’সহ (২০১৭) বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। ‘চন্দ্রগ্রহণ’ (২০০৮) ছবির জন্য পেয়েছি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

 

আপনার বইপত্র?

গল্পের বই ‘অস্তরাগ’ (১৯৬২), ‘আর্শিতে আমি’ (১৯৭৬), ‘মৃগয়ায় শরবিদ্ধ’ (১৯৮৬) ও ‘গল্পসমগ্র’ (২০১০); উপন্যাস ‘আকাশে অনেক নীল’ (১৯৬৪) এবং স্মৃতিকথা ‘জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়’ (২০১১)।

(উত্তরা, ঢাকা; ১১ জুন ২০১৯)

মন্তব্য