kalerkantho

‘বিয়ে করেই টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হই’

চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান। রাজনীতির হাতেখড়ি ছাত্র আন্দোলন আর ন্যাপ (ভাসানী)-এর মধ্য দিয়ে। আশির দশকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যুক্ত হন বিএনপির রাজনীতিতে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন পাঁচবার। মন্ত্রী হয়েছিলেন চারবার। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিজীবনের নানা অধ্যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এনাম আবেদীন ও শায়েখ হাসান, ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

প্রেস বিজ্ঞপ্তি   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



‘বিয়ে করেই টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হই’

চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বিকাশে আপনাদের পরিবারের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। আপনার বেড়ে ওঠা ও নেতৃত্ববোধ বিকাশে পরিবারের ভূমিকা কেমন ছিল?

আমাদের জীবনে অন্যতম প্রেরণা আমার দাদা আবদুল লতিফ মাস্টার। আজীবন শিক্ষানুরাগী ছিলেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্ররা আমাদের বাড়িতে আসত। তিনি তাদের পড়াতেন। এর মধ্যে অনেকেই এখন দেশে-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন। আমার দাদা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক ছিলেন না। এলাকাবাসীই তাঁকে ‘মাস্টার’ উপাধি দিয়েছিল। পরে আমাদের বাড়ির নামই হয়ে গিয়েছিল মাস্টার বাড়ি। বাবার মধ্যেও শিক্ষানুরাগের বিষয়টি দেখেছি। আমরা নিজেরাই বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় জড়িত।

বাবা যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাতে দূরের ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তখন বাড়িটি ছিল তিনতলা। দাদা বেঁচে থাকতে যে ঘরে ছাত্রদের পড়াতেন ওটাসহ বাবা আমাদের বাড়ির প্রায় অর্ধেকটাই ছাত্রদের থাকার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমাদের বাসার বাইরের দিকের যে ঘরগুলো ছিল, সেগুলোও স্কুলের জন্য দিয়েছিলেন। কিছু ছাত্রকে এলাকায় লজিং ঠিক করে দিয়েছিলেন। এসব দেখেই বড় হয়েছি। বলা যায়, শিক্ষানুরাগ ও রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে আমরা বড় হয়েছি।

 

এ নিয়ে আপনার নিজের ভূমিকাটা কেমন ছিল?

বাবা যে স্কুলটা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত করেছিলেন, আমি সেটাকে কলেজ পর্যায়ে উন্নীত করেছি। এ ছাড়া আমাদের এলাকায় কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি, মাদরাসাও করেছি। বাংলাদেশে একমাত্র ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি আছে চট্টগ্রামে। এটিও আমার প্রতিষ্ঠা করা। সর্বশেষ ২০০৬ সালে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি—ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি। আমার ছেলে সাঈদ আল নোমান এটার দেখাশোনা করছে। গত ১০ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠান করেছি আমরা। নাসিরাবাদের মোজাফফরনগর এলাকায় প্রায় তিন একর জায়গার ওপর ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাস। আমার লক্ষ্য এটাকে বিশ্বমানের ইউনিভার্সিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। শিক্ষাবিদ আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আমাদের প্রি-কনভোকেশনে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় একটি সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম।’

 

শৈশবের দিনগুলো কেমন ছিল? পড়াশোনার পাশাপাশি আর কী করেছেন?

ছেলেবেলাটা সবার জন্যই অন্য রকম একটা সময়। কাঁধে কোনো দায়িত্ব নেই, মাথায় বোঝা নেই, টেনশন নেই। যেটুকু চাপ তা লেখাপড়া নিয়েই। ছেলেবেলায় লেখাপড়াটাই মনোযোগের সঙ্গে করেছি। আর দশজনের মতো ঘুড়ি উড়িয়েছি, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন খেলেছি। নাটক করার নেশা ছিল। তখন ধান কাটা হয়ে গেলে বন্ধু-বান্ধবরা মিলে নাটক করতাম। রিহার্সালও করতাম। অভিনয়ও করেছি। আবৃত্তির প্রতিও আমার দুর্বলতা ছিল। এখনো সেটা অনুভব করি। তবে আগের মতো সুযোগ তো আর হয় না।

 

রাজনীতিতে আসার গল্পটা?

আমি রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে। পরিবারের প্রায় সবাই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমার চাচা ছিলেন অবিভক্ত পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের সদস্য। আমার ভাই আব্দুল্লাহ আল হারুন ছিল ছাত্র ইউনিয়নে, যেটা আজকের ছাত্র ইউনিয়ন—এটার চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা।

আমাদের বাসার পাশেই ‘বিস্কিটের তন্দুল’ নামে একটা জায়গা ছিল। সেখানে নিয়মিত বাম রাজনীতির নেতারা আসতেন। সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে আলাপে মেতে উঠতেন তাঁরা। তাঁদের আলোচনার মধ্যে একটি পরিবর্তনের ধারা খেয়াল করতাম। কৃষকদের সংগঠিত করা, শ্রমিকদের সংগঠিত করা—এসব নিয়ে আলাপ হতো। ওটা আমাকে খুব আকৃষ্ট করত। একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। আমি তখন কাজেম আলী হাই স্কুলে ক্লাস নাইনে। স্কুলের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষকের কাছে দাবিদাওয়া নিয়ে একাই কথা বলেছিলাম। আমার ওই দাবির সঙ্গে সহপাঠীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। আমার দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই পরে বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছিল। এর পরই আত্মবিশ্বাস জন্মায়। পরে অন্যান্য বিষয় নিয়েও কথা বলেছি। বাহ্বাও কুড়িয়েছি। ওই বয়সে এসব ভালোই লাগত। সেই সঙ্গে এটা আমার অভ্যাসও হয়ে গেল।

আমার ফুফাতো ভাই মাহবুবুল আলম চৌধুরী। তিনি তত্কালীন অবিভক্ত পাকিস্তানে বেশ পরিচিত ছিলেন। তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের গুণ ছিল। যদিও তিনি কখনো রাজনীতিতে সরাসরি জড়িত হননি, তবে তাঁর সাহচর্যও আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

 

সরাসরি রাজনীতিতে পা রাখলেন কবে?

বলা যায় হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি নীতিগতভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। সাংগঠনিকভাবে জড়িত হয়েছি কলেজে ওঠার পর। ১৯৬২ সালে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হই। দেশে তখন আইয়ুববিরোধী আন্দোলন চলছে। সঙ্গে শিক্ষা আন্দোলন। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করল। তখন আমরা মিছিল করেছি। আমি মিছিলের সামনের কাতারে ছিলাম। পুলিশ আমাকে আটক করেছিল; কিন্তু উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে আমাকেসহ আরো কয়েকজনকে সেদিন নিয়ে যেতে পারেনি পুলিশ। সেই প্রথম ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আমার গায়ে প্রথম পুলিশের হাত লাগে। তখন থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে যাঁরা বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই যোগাযোগ করতেন আমার সঙ্গে। এর পরপরই আমাদের কলেজে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হলো। প্রগতিশীল ছাত্রপ্রতিনিধি হিসেবে ইউনাইটেড স্টুডেন্টস প্রগ্রেসিভ পার্টির হয়ে নির্বাচন করে জয়ী হই। তখন জড়িত হই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। যদিও মার্শাল ল’র কারণে প্রকাশ্যে খুব একটা রাজনৈতিক তত্পরতা দেখানো যেত না। তখন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী খুব জনপ্রিয় ছিলেন। আমিও তাঁর রাজনৈতিক দর্শন পছন্দ করতাম এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হই। একসময় আমি ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক হই। চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি হই। কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকও হয়েছিলাম।

বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি ছিলাম আমি। এর সভাপতি ছিলেন কাজী জাফর সাহেব। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখ।

১৯৬৯ সালের দিকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের একটি ঢেউ সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন আমি ছাত্রাবস্থায়ই নাসিরাবাদের একটি স্টিল রোলিং কারখানার সিবিএ নেতা হই।

 

 

বিয়ের দিনই কাগমারী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ তাত্পর্যবাহী জাতীয় সম্মেলন ছিল। এটা পরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৫৭ সালের ৮ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলার কাগমারীতে ওই সম্মেলন হয়। পরের বছরগুলোতে সম্মেলনের বার্ষিকী পালন করা হতো। তখন আন্দোলন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি চলত প্রকাশ্যে ও গোপনে। ভাসানীর নেতৃত্বে আমরা কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য গোপনে সংগঠিত হয়ে কাজ করতাম। ১৯৭০ সালে সম্মেলনের দিন ছিল আমার বিয়ের তারিখ; কিন্তু দুপুরেই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য আমাকে ডেকে পাঠানো হয়। সেদিন বিয়ে করেই বিকেলে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হই। বিয়ের প্রথম রাত আমার স্ত্রীর একাই কেটেছিল। সেই সম্মেলনে ভাসানী সাহেবের ইচ্ছায় আমাকে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।

 

পাকিস্তান সরকার আপনাকে কারাগারে পাঠিয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাই।

আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের শেষ দিকে ১৯৬৯ সালে নিরাপত্তা আইনের অধীনে আমাকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বাহিনী। ১৯৭০ সালে ক্ষমতায় আসে ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া খান আমাকে কারাদণ্ড দেয়। সাত বছরের জেল, ১০ বেত এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। সেই রায় মাথায় নিয়েই আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম।

 

আপনার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মুক্তিযুদ্ধে আমি মূলত সংগঠক হিসেবে কাজ করেছি। তখন ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। যুেদ্ধর প্রথম দিকে চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণের জন্য এবং নিরাপত্তার স্বার্থে অনেককে ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্প ও আশ্রয় শিবিরে পাঠানোর কাজ করেছি। এর মধ্যে সন্তুষ্টিটা হলো চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রসিদ্ধ নূতনচন্দ্র সিংহের পরিবারকে আমি বাঁচাতে পেরেছিলাম।

১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক-বুদ্ধিজীবীদের আশ্রয় ও পরামর্শস্থল ছিল নূতনচন্দ্রের কুণ্ডেশ্বরী কমপ্লেক্স। তত্কালীন অনেক রাজনীতিকেরই যাতায়াত ছিল সেখানে। পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে আসা ইপিআর সদস্যদের খাদ্য সরবরাহ ও যুদ্ধ প্রস্তুতিতে সহযোগিতা দেন নূতনচন্দ্রের ছেলে প্রয়াত সত্যরঞ্জন সিংহ ও প্রফুল্লরঞ্জন সিংহ। এই বাড়িতে বসেই ডা. আবু জাফর, ড. এ আর মল্লিক (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য), অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল ওয়াহাবসহ আরো অনেকে মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতি ও কলাকৌশল নিয়ে আলাপ-আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত নিতেন। পাকিস্তানি সেনারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে ৩১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ২৮টি পরিবারের সদস্যরা কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যামন্দিরের বিভিন্ন কক্ষে আশ্রয় নেন এবং ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান, ড. মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক ফজলে হোসেন, ড. রশিদুল হক, ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী প্রমুখ। এ ছাড়া এসেছিলেন মাহবুব তালুকদার, এম এ হান্নান, ক্যাপ্টেন অলি আহমদসহ অনেকে। আমার মনে হলো, কুণ্ডেশ্বরী কমপ্লেক্সে কোনো ধরনের আঘাত আসতে পারে। তাই ১২ এপ্রিল একটি গাড়ি নিয়ে ওই কমপ্লেক্সে গিয়ে নূতনচন্দ্র সিংহকে বললাম, আপনাকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া উচিত। পরিবারসহ আমার সঙ্গে চলুন; কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। বললেন, ‘আমি এখান থেকে যাব না। তুমি আমার পরিবারের অন্যদের নিয়ে যাও।’ আমি বললাম, আমি ব্যবস্থা করে এসেছি। আপনিও চলুন। কিন্তু তিনি গেলেন না। আমি তাঁর পরিবারের অন্যদের নিয়ে গাড়িতে করে ত্রিপুরার সাব্রুমের দিকে যাত্রা করলাম। পরে শুনলাম, পরের দিন ১৩ এপ্রিল নূতনচন্দ্র সিংহকে হত্যা করা হয়।

এরপর যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য আমি দেশে এসেছিলাম; কিন্তু বৈরি পরিবেশ থাকায় আমাকে আবার ভারতে ফিরে যেতে হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আমি তথ্যগত যোগাযোগ, অস্ত্র সরবরাহ, কৌশল নির্ণয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে গেছি। আমাদের পরিবারের অন্য অনেক সদস্য সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে পেরেছিল।

 

বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হলেন কবে?

মওলানা ভাসানীর যে দল ছিল ওই দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। আমার মনে হয়েছে প্রগতিশীল ও গণমানুষের রাজনীতি করার জন্য বিএনপি ভালো প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। তা ছাড়া জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলাপেও মনে হয়েছিল এর মাধ্যমে পরিবর্তন আসতে পারে। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সততা ও নিষ্ঠার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। এ রকম বেশ কিছু কারণে ওই সময় বিএনপিতে আমার যোগদানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল।

 

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কোনো বিশেষ স্মৃতি?

উল্লেখ করার মতো অনেক স্মৃতিই আছে। চট্টগ্রাম আসার আগে তিনি আমাকে বলে রাখতেন তিনি চট্টগ্রাম আসবেন। আমি যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। জিয়াউর রহমান সব সময়ই তাঁর সফরে কে কে যাবেন, বিমানবন্দরে কারা থাকবেন, তা নিজেই ঠিক করতেন; এমনকি শেষ যেবার তিনি চট্টগ্রাম এসেছিলেন সার্কিট হাউসে, আমাকে আসতে বলেছিলেন। দুপুরের আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘ভালো কিছু হবে ইনশাআল্লাহ, সঙ্গে থাকেন।’

 

কোনো অতৃপ্তি আছে কি?

রাজনীতিক হিসেবে মূল্যায়নটা প্রকৃতপক্ষে জনগণের কাছ থেকে আসে। আমি মনে করি আমি আমার যাবতীয় দায়িত্ব একনিষ্ঠভাবেই পালনের চেষ্টা করেছি। কতটা সফল হয়েছি সেটা না ভেবে আমি ভাবি, আর কী করতে পারতাম। রাজনীতিক হিসেবে, কর্মী হিসেবে, চারবারের মন্ত্রী হিসেবে বলব, আমি যথেষ্ট তৃপ্ত।

তবে অতৃপ্তির একটি বিষয় বলতে পারি, আমি প্রথমে বলেছিলাম যে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করব। এ বিষয়ে প্রথম বলেছিলাম সেই ১৯৯০ সালের আগেই। পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আমি মন্ত্রিসভায় এ প্রস্তাব তুলি। প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে পাসও হয়েছিল; কিন্তু তত দিনে আমাদের দলের ক্ষমতা শেষ হয়। পরেরবার যখন মন্ত্রিসভা গঠন করি, তখন আবার এর উদ্যোগ নিই। বিষয়টি সভায় অনুমোদনও পেয়েছিল; কিন্তু বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারিনি।

 

আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল আপনার। এ কারণে রাজনৈতিকভাবে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অনেকের ধারণা।

তিনি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ছিলেন। এসব বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমার ভালো একটি সম্পর্ক ছিল; কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সময় তাঁর যে উদ্যোগ ছিল, তাতে নৈতিকভাবে আমার সমর্থন ছিল না। অনেকে হয়তো বলেন, মান্নান ভূঁইয়া কিছুতে থাকলে নোমানও থাকবে, কিন্তু তা সত্য নয়, কারণ ওই সময় আমি দেশেই ছিলাম না। এমনকি তিনি কখনো এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে থাকতে আমাকে বলেননি। অনেকে অনেক কথা বলতে পারে; কিন্তু আমি রাজনীতি করি একটি আদর্শের জায়গা থেকে। এখানে ব্যক্তির চেয়ে চিন্তা ও দলকে বড় মনে করি।

 

বিএনপির বর্তমান রাজনীতি ও অবস্থান প্রসঙ্গে বলুন। চেয়ারপারসন কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দেশের বাইরে। এ অবস্থায় দলটির নেতৃত্বের অবস্থা কোন পর্যায়ে আছে?

বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই বহুদলীয় গণতন্ত্র আদর্শের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমরা এখনো সেই আদর্শ ধারণ করে চলছি। আদর্শিক অবস্থান অটুট। রাজনৈতিকভাবেও বিএনপি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ বলেই মনে করি।

বিএনপির এখন সবচেয়ে প্রয়োজন হচ্ছে নিজেকে সুসংগঠিত করা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বাড়ানো এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত রাখা। তা হলে বিএনপি আরো জনগণের কাছাকাছি যেতে পারবে। এমনিতে আমাদের জনসম্পৃক্ততা রয়েছে, তখন সেটা আরো বাড়বে।

আর যদি বলি সংকট নেই, সেটা হবে কথার কথা। চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে না থাকায় সংকট তো আছেই। শূন্যতাও রয়েছে। তবে একে রাজনৈতিক ও সাংগঠিক সক্ষমতা দিয়ে পূরণ করতে হবে, পূরণ করাও সম্ভব।

 

রাজনৈতিক পরিবারের ধারাবাহিকতায় আপনার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা কেমন?

এটি এককথায় বলা যাচ্ছে না। আমার ছেলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট করে যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে এমএসপি এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমফিল করে এখন আবার লন্ডনে পিএইচডি করছে। মেয়ে ডাক্তার। আমেরিকায় থাকে। আমার স্ত্রী অর্থনীতির প্রফেসর। আর আমি রাজনীতিতে ফুলটাইমার। অতএব বুঝতেই পারছেন, আগাম কিছুই বলা যাচ্ছে না।

শ্রুতলিখন : সিদ্দিকা তুলি

মন্তব্য