kalerkantho

মানুষের কীসে আগ্রহ, রুচি বুঝে নেওয়া বড়ই মুশকিল

সমুদ্রগামী জাহাজের একসময়ের নাবিক ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বংশীবাদক। তিনি জীবনে বহু সাগর পাড়ি দিয়েছেন। সাগরের বুকে নিঃসঙ্গ প্রহরগুলো তিনি কাটাতেন বাঁশিবাদনের রেওয়াজে। সে সময় স্বর্গীয় পান্নালাল ঘোষের বাজানো রেকর্ড এবং অন্যান্য বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীর রেকর্ড ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। তাঁর সাক্ষাত্কার নিয়েছেন শেখ মেহেদী হাসান, ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মানুষের কীসে আগ্রহ, রুচি বুঝে নেওয়া বড়ই মুশকিল

আপনার জন্ম রাজবাড়ী, বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামে; কেমন ছিল আপনার ছেলেবেলা?

আমার জন্ম ১৯৪৫ সালে, পিতার তত্কালীন কর্মস্থল রাজবাড়ীতে। পিতা রফিকুল ইসলাম এবং মা আজিজা খাতুন। তবে আমাদের আদিবাড়ি বিশ্বনন্দিত সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিছোঁয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আমার গ্রামের নাম ভাতশালা। শৈশবকাল থেকেই স্থায়ীভাবে আমরা বসবাস করছি চট্টগ্রামে। বাবার কর্মসূত্রে আমি শাহজাদপুর হাই স্কুল, উল্লাপাড়া হাই স্কুল, সিলেট এইডেড হাই স্কুলে পড়াশোনা করেছি। পরে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করি। ইচ্ছা ছিল বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করব। সে আশা পূরণ হয়নি। শখের বসে মেরিন একাডেমিতে ভর্তি পরীক্ষা দিই। কারণ প্রতিষ্ঠানটি সবে শুরু হয়েছে। প্রথম ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলাম।

 

মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হলেন কত সালে?

১৯৬২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তত্কালীন ইপুয়েট (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) ও মেরিন একাডেমি দুটিতেই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। আমি চেয়েছিলাম ইপুয়েটে পড়ব। আর মেরিন একাডেমি নতুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র। তখন মা-বাবার ইচ্ছায় মেরিনে ভর্তি হই। এক বছরের কোর্স শেষ করে সরাসরি জাহাজে চলে যাই। কারণ তখন চাহিদা অনুযায়ী নাবিক কম ছিল। সমুদ্রের একাকিত্ব কাটানোর জন্য প্রচুর বাঁশির রেকর্ড আমার সঙ্গে থাকত। সেগুলো শুনে নিয়মিত চর্চা করতাম। তিন-চার মাস পর পর জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসত। তখন ছুটি নিয়ে বাঁশির তালিম নিতাম। ওই সময় বিশ্ববিখ্যাত সরোদবাদক ওস্তাদ বাহাদুর খানের শিষ্য হয়ে যাই। তিনি সরোদ বাজালেও আমাকে বিভিন্ন নোটেশন দেখিয়ে দিতেন।

 

সংগীতচর্চার শুরু কিভাবে?

ছেলেবেলায় বেতারে নিয়মিত গান শুনতাম, বিশেষ করে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে খ্যাতিমান শিল্পীদের অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। সে অনুষ্ঠান শুনে নিজের মধ্যে একটি পরিবর্তন আসে। তা ছাড়া ভাটিয়ালি গানের প্রতি আমার ঝোঁক ছিল। ভাটিয়ালি গানের বাঁশির সুর আমাকে বেশ টানত। মুগ্ধ শ্রোতার মতোই বাঁশির মায়াবী সুরে কান পেতে রাখতাম। প্রকৃতগতভাবেই বাঁশি বাজানোর প্রতি আকৃষ্ট হই। বাঁশির সুর আমার মনকে সব সময়ই দোলা দেয়। বলা যায়, বাঁশি ছিল আমার কাছে নেশার মতো। সময় পেলে বাঁশি নিয়ে বসে যেতাম। ১৬ বছর বয়সে চট্টগ্রামের আর্য সংগীত সমিতির প্রয়াত প্রিয়দা রঞ্জন সেনগুপ্তর কাছে আমার সংগীতের হাতেখড়ি হয়। আমার বোন বেলা ইসলাম তাঁর কাছে শিখতেন। এরপর শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতশিল্পী ওস্তাদ বেলায়েত আলী খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করি। এরই মধ্যে আমি মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হয়ে গেলাম।

 

সমুদ্রের নাবিকরা তাদের নিঃসঙ্গতা কাটায় অনেকভাবেই। আপনি বাঁশি বেছে নিলেন?

আমি ব্যতিক্রম। অথৈ সমুদ্র। চারদিকে পানি আর পানি। কবে ডাঙার সন্ধান পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। নিঃসঙ্গতা আঁকড়ে ধরে সব জাহাজিকেই। এক বন্দর থেকে মাল নিয়ে আরেক বন্দরে খালাস করাই ছিল আমার কাজ। জাহাজ বন্দর ত্যাগ করলেই নিঃসঙ্গতা যেন আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরে। সেই নিঃসঙ্গতা কাটিয়েছি বাঁশির রেওয়াজ করে।

তখনো কোনো ওস্তাদের কাছে তালিম নেওয়ার সুযোগ পাইনি। সম্ভব ছিল বড় বড় ওস্তাদের অডিও ক্যাসেট সংগ্রহ করা; বিশেষ করে পান্নালাল ঘোষের অডিও ক্যাসেট। সেগুলো শুনে শুনে সুর আয়ত্ত করতাম। এ মুহূর্তে বাঁশি নিয়ে আমার দুটি মজার স্মৃতি মনে পড়ছে। এক. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের স্বরলিপিকার বিখ্যাত শিল্পগুরু শৈলজারঞ্জন মজুমদার একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমার বাঁশি শুনতে চেয়েছিলেন। বাজানোর পর তিনি বেশ প্রশংসা করেছিলেন, যা আমাকে আলোড়িত করেছিল। দ্বিতীয়ত. প্রয়াত ওয়াহিদুল হক এক অনুষ্ঠানে আমার বাঁশি শুনে অনেক প্রশংসা করেছিলেন। এটাও স্মরণীয় হয়ে আছে। মহান এই দুই ব্যক্তির প্রেরণা আমায় পথ চলতে সহায়তা করেছে। ১৯৭৩ সালে আমি নাবিক জীবনে ইস্তফা দিয়ে নিবিড়ভাবে বাঁশিতে নিবেদিত হই।

 

আপনার গুরু কারা?

স্বর্গীয় পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের ঘনিষ্ঠ শিষ্য পণ্ডিত দেবেন্দ্র মুদ্রেশ্বর ও পণ্ডিত ভিজি কারনাডের কাছে শেখার সুযোগ পেয়েছি। দুজনই আমার গুরু। শিল্পীজীবনে আমার প্রতিষ্ঠার পেছনে পণ্ডিত ভিজি কারনাডের অশেষ সহযোগিতা পেয়েছি। তাঁর কাছেও আমি ভীষণ ঋণী।

 

পণ্ডিত ভিজি কারনাডের সঙ্গে সম্পর্ক হলো কী করে?

ভিজি কারনাড আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। মুম্বাইতে তাঁর বাড়িতে আমি শিখেছি। আমার পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ হয়েছে তাঁর হাতেই। রীতিমতো নাড়া বেঁধে তাঁর কাছে শিখেছি।

 

প্রথম একক পারফরম্যান্স কবে হয়?

দেশ স্বাধীনের পর ঢাকার তবলা শিক্ষালয়ের উদ্যোগে ওস্তাদ কামরুজ্জামান মনি আমাকে একক বংশীবাদনের আমন্ত্রণ জানান। ঢাকার ওয়াবদা মিলনায়তনে প্রথম একক অনুষ্ঠান করেছিলাম ১৯৭৩ সালে।

 

কী রাগ বাজিয়েছিলেন?

রাগ দেশ বাজিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে সেদিন তবলা বাজিয়েছিলেন বিজন কুমার চৌধুরী। তিনি ২০১৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে আমার অনুষ্ঠানে তবলা বাজানোর সময় মঞ্চেই দেহত্যাগ করেন। আমি বাঁশি বাজাচ্ছিলাম তিনি তবলা সংগত করছিলেন। চল্লিশ মিনিট বাজানোর পর হঠাৎই তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। ঘটনাটি আজও নাড়া দেয়।

 

বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্রে কোন বিষয়টি জরুরি?

নিষ্ঠা ও পরিশ্রম। যেকোনো শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে এ দুটির বিকল্প নেই।

 

আর কোনো বিষয়?

একনিষ্ঠ চর্চা। উপমহাদেশীয় রাগসংগীত কিংবা যন্ত্রসংগীত দুটিই গুরুমুখী বিদ্যা। গুরুর অধীনে পদ্ধতিগতভাবে এর তালিম নিতে হয়। এ জন্য ঐকান্তিক মনোযোগ দরকার। রাগের যেমন বৈচিত্র্য আছে, সুরেরও তেমন বৈচিত্র্য রয়েছে। একজন শিল্পী অনুশীলনের মাধ্যমে রাগ ও সুরের বৈচিত্র্য, আঙ্গিক এবং অন্যান্য কলাকৌশল আয়ত্ত করেন। এখানে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সুযোগ নেই। নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া দরকার। যে শিল্পী সুরশৈলী সম্পর্কে যত দক্ষতা অর্জন করেন, তিনি সুরের চলনগুলো পূর্ণরূপে শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। তা ছাড়া রাগসংগীত ও যন্ত্রসংগীতের শ্রোতারা তৈরি থাকেন, তাঁদের কানকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। সুর, মাত্রা ভুল হলেই তাঁরা ধরে ফেলেন। সুতরাং শিল্পীকে যথেষ্ট অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

 

উল্লেখযোগ্য কোন কোন আসরে বাজিয়েছেন?

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ভারতের সংগীত রিসার্চ একাডেমি, কলকাতার ডোভারলেন সংগীত সম্মেলন, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, দিল্লির হ্যাবিটেট সেন্টার, মুম্বাইয়ের নেহরু সেন্টার এবং চেন্নাইয়ের মাস্টার মেরিনার্স অ্যাসোসিয়েশনে। এ ছাড়া বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সোনারগাঁও হোটেলসহ বিভিন্ন স্থানে আমি একক পরিবেশনা উপস্থাপন করেছি। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্মৃতি হয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত বেহালাবাদক পদ্মভূষণ পণ্ডিত ভিজি যোগের সঙ্গে যুগলবন্দি বাজানো। কলকাতার কলামন্দিরে এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রধান মিলনায়তনে পণ্ডিত ভিজি যোগের সঙ্গে বাজিয়েছি। ওই অনুষ্ঠানে তবলা সংগত করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত তবলাবাদক ওস্তাদ সাবির খান। সিঙ্গাপুরে সিঙ্গাপুর-ইন্ডিয়ান ফাইন আর্টস অ্যাসোসিয়েশন (ঝওঋঅঝ) আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক কনফারেন্স ফর ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক অ্যান্ড ড্যান্সের অনুষ্ঠানে বাজিয়েছি। আমেরিকা বঙ্গমেলা-ওয়াশিংটন, হিউস্টন, নিউ ইয়র্ক, ক্যানবেরাতে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়ায় দ্য গ্রিন টাউন ইন্ডিয়ান কালচারাল সোসাইটি-কুয়ালালামপুরসহ আরো কিছু দেশে বাজিয়েছি।

 

ডোভারলেন শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলনের সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশ থেকে আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

ডোভারলেন সংগীত সম্মেলন বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এখানে নানা স্থান থেকে খ্যাতিমান শিল্পীরা পরিবেশনার সুযোগ পেয়ে থাকেন। তাঁদের সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আমাকে একক পরিবেশনার জন্য আমন্ত্রণ জানালে বিস্মিত হয়েছিলাম। অত বড় অনুষ্ঠানে আমাকে সুযোগ দেওয়া হলো, এটা একজন শিল্পীর জন্য সত্যি আনন্দের ব্যাপার। পরে জেনেছি, এ দেশের কোনো সংগীতজ্ঞের ভাগ্যে এটাই প্রথম অভিজ্ঞতা। মনে পড়ে, আমার রেকর্ড হিন্দুস্তান মিউজিক সেন্টার অ্যালবাম আকারে পরে প্রকাশ করেছিল। সেদিন কলকাতার স্বামী বিবেকানন্দ হলে ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁর একক পরিবেশনা ছিল। দর্শক-শ্রোতায় মিলনায়তন ছিল ভর্তি। ওস্তাদজির পরিবেশনার আগে আমার অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়।

 

বাজানোর সময় শ্রোতা-দর্শকের সঙ্গে কিভাবে যোগসূত্র তৈরি করেন?

উচ্চাঙ্গসংগীত ধ্যানের শিল্প। সুর সর্বত্র, সর্বজনীন। পবিত্র কোরআন, ত্রিপিটক, বেদ পাঠ করা হয় সুরে। আজান দেওয়া হয় সুরে। অর্থাৎ মানুষের হূদয়ে সুর লুকিয়ে থাকে। আমি প্রার্থনা করে আসরে বাজাতে বসি। বাঁশিতে সুর তুলে ভিন্ন এক জগতে প্রবেশ করি। সংগীত আমার কাছে প্রার্থনার মতো। আমি শ্রোতাদের সঙ্গে নিয়ে বাঁশির সুরে সে প্রার্থনায় মগ্ন হই। শ্রোতারা আমার সহগামী। সেটাই আমার যোগসূত্র। তাদের ব্যাকুলতা অনুভব করা আমার কর্তব্য।

 

যন্ত্রসংগীত চর্চার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট?

বাঙালি সংস্কৃতি অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। তার যত্ন নেওয়া জরুরি। আমাদের দেশে শিল্প-সংস্কৃতির যথাযথ যত্ন নেওয়া হয় না। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয়। রাজা-বাদশাদের আমলেও উচ্চাঙ্গসংগীতের শ্রোতা-বোদ্ধা যে খুব বেশি ছিল তা নয়; কিন্তু তাদের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। মাইহার রাজদরবারে সভাপ্রধান শিল্পী ছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। উপমহাদেশীয় সংগীতে তাঁর অবদান বিশ্ববিশ্রুত। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁসহ একাধিক বিশ্বমানের শিল্পী তাঁর হাতে তৈরি হয়েছে। অথচ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমিতে উচ্চাঙ্গ ও যন্ত্র সংগীতের চর্চার বেহাল দশা আমাদের হতাশ করে।

 

এর পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব?

প্রধানত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমির মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে চর্চার সুযোগ তৈরি করবে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ রয়েছে তারা আন্তরিকভাবে অনুশীলন ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে। যেহেতু উচ্চাঙ্গ কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীত গুরুমুখী বিদ্যা, এ জন্য শিল্পকলা একাডেমি বিশেষ উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। প্রয়োজনে বিত্তবান ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করা যেতে পারে।

 

আমাদের দেশে বাঁশি, সানাই, সরোদ ইত্যাদি যন্ত্রের সঙ্গে তবলা সংগত করার মানুষের অভাব।

ভীষণ সত্যি। আমাদের যন্ত্রসংগীত চর্চার ক্ষেত্রে এক রকমের উদাসীনতা রয়েছে। আমার নিজের পরিবেশনার সময় তবলাবাদক ওস্তাদ সাবির খান, পণ্ডিত সমর সাহা, পণ্ডিত শুভেন চট্টোপাধ্যায়, পণ্ডিত অংশুভা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভারত থেকে নিয়ে এসেছি। সংগতকার তৈরির জন্য সংগীত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগকে দায়িত্ব নিতে হবে।

 

আপনি দীর্ঘদিন রোটারি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

রোটারি ক্লাব এক রকমের সমাজসেবামূলক সংগঠন। আমি একসময় চট্টগ্রামের সভাপতি ছিলাম। চেয়েছিলাম এ ক্লাবের মাধ্যমে উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রচার-প্রসার ঘটাব। চেয়েছিলাম কিছু শ্রোতা তৈরি করব। সেটা সম্ভব হয়নি। মানুষের কীসে আগ্রহ, রুচি বুঝে নেওয়া বড়ই মুশকিল।

 

২০১৭ সালে আপনাকে একুশে পদক প্রদান করা হয়েছে।

শিল্পের চর্চায় পদক গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিল্প সমাজে নীরব বিপ্লব নিয়ে আসে। মানুষের মনে মানবিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটায়। জানি না, আমার পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মানুষের মনে কতখানি ছাপ ফেলতে পেরেছি। তবে এ কথা বলতে চাই, সংগীত সত্য ও আত্মিক সাধনা। পবিত্র সাধনা। সুর মানুষের অন্তরে পবিত্র অনুভূতিকে জাগরুক রাখে। আমি বাঁশি বাজিয়ে সেই অনুভূতিকে শাণিত করতে চাইছি। রাষ্ট্র যে আমাকে সম্মানিত করেছে, এ জন্য আমি গর্বিত।

 

আপনার পরিবারের কথা জানতে চাই। তারা কী আপনার শিল্পচর্চার সমর্থন করে?

সহধর্মিণী ডা. আনজুমান আরা ইসলাম চট্টগ্রামের একজন সুপরিচিত শিশু বিশেষজ্ঞ। আমাদের দুই কন্যা আমিনা ইসলাম ও ড. দুর্দানা ইসলাম কানাডায় বসবাসরত। তাদের দুজনেরই একটি করে পুত্র ও কন্যাসন্তান রয়েছে। আমার মেয়েদের সরোদ শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিছুদিন তারা চর্চা করেছিল। পরে পড়াশোনা ও পেশাগত জীবনের চাপে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

 

এ প্রজন্ম যে গান শুনছে, সেটা কি আপনার ভালো লাগে?

আমি তরুণ প্রজন্মের পক্ষে। তারাই তো দেশটাতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে তাদের সামনে আমরা কখনো শুদ্ধসংগীত, সংস্কৃতি তুলে ধরতে পারছি না। অন্যদিকে বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন তো রয়েছে। তারা সেদিকেও ঝুঁকছে। তা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুব বেশি হাতে নেই। তার পরও আমার বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্ম দেশপ্রেমী। দেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে তারা লালন করে। সাময়িক উন্মাদনায় হারালেও তারা বাঙালির ঐতিহ্যকে তুলে ধরছে বিশ্বব্যাপী।

 

তরুণদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

তরুণদের এখন নানামুখী আগ্রহ। তারা অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। তবে যারা সত্যিকার সংগীত ভালোবাসে তাদের বলব বড় বড় গুরুর রেকর্ড নিয়মিত শুনতে হবে। যারা চর্চা করে, তাদের বলব নিরবচ্ছিন্ন চর্চা করতে হবে। নিয়মিত নিমগ্ন চর্চা।

 

উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে আপনার বর্তমান পরিকল্পনা কী?

২০১৭ সালে আমি একক প্রদর্শনী করেছিলাম জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী মিলনায়তনে। সেখানে আমার সংগীত জীবনের নানা বিষয়, আমার অ্যালবাম, সংগৃহীত বিশেষ অ্যালবাম প্রভৃতি স্থান পেয়েছিল। সম্প্রতি আমি ভাবছি উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে একটি বিশেষ আর্কাইভ তৈরি করব। বিশ্বসংগীতের দুর্লভ সংগ্রহ সেখানে থাকবে। আগ্রহীরা সেটি ব্যবহার করবেন। গবেষকরা গবেষণার কাজ করবেন। আরেকটি পরিকল্পনা রয়েছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীতবিষয়ক লেকচার পরিবেশন করা। তাহলে সংগীতের কিছু শ্রোতা তৈরি হবে। দেখুন, উচ্চাঙ্গসংগীতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পৃষ্ঠপোষকতা এবং শিল্পীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। যদি কারো সহযোগিতা পাই, তাহলে শিল্পীদের পেশাদারি চর্চার সুযোগ তৈরি করব।

(ধানমণ্ডি, ঢাকা; ১৬ এপ্রিল ২০১৯)

 

মন্তব্য