kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

আমাকে কিছুই দেওয়া লাগবে না

রওশন আরা বাচ্চু। ভাষাসৈনিক। জন্মদিন সামনে রেখে তাঁর জীবন ও বীরত্বের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



কেমন আছেন?

খুব একটা ভালো নেই। কয়েক দিন আগেই হালিমা (ভাষাসৈনিক ও সাহিত্যিক হালিমা খাতুন) মারা গেল। ওর জন্ম আর আমার জন্ম একই সালে। ১৯৩২। আমার ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে, আর ওর জুন মাসে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। একই সঙ্গে আন্দোলন করেছি। ওর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। এখন সেই সব স্মৃতি মনে পড়ে, আর খারাপ লাগে। হালিমার মৃত্যু আমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন আমরা জীবন দিয়ে করেছি। একই চিন্তাধারায় ছিলাম। আমি ব্যারিকেড ভাঙব বলেই মিছিলে গিয়েছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য এক ছিল। আত্মাহুতি দিয়ে হলেও মাতৃভাষাকে রক্ষা করব—এই পণ নিয়ে আমরা সংগ্রাম করেছি। এমন মানুষ এখন আর কোথায় পাব!

 

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে?

আমার জন্ম সিলেটের কুলাউড়ার উছলাপাড়া গ্র্রামে। দাদা ছিলেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন। তাঁর সেই বাড়িটি ছিল বিশাল। চারপাশে মাটির দেয়ালের ওপর মেহেদিগাছের বেড়া। ব্রিটিশদের কায়দায় সাজানো-গোছানো, খুব সুন্দর। সিলেটি মানুষেরা একটু পর্দানশীল ছিল। তাই বাঁশের বেড়া দিয়ে বাড়ির চারপাশ আরো ঘন করে ঘিরে রাখা হয়েছিল। সেই বাড়িতেই কঠোর নিয়ম-কানুনের মধ্যে বেড়ে উঠেছি। আমি প্রথম পড়েছি কুলাউড়া রেলওয়ে প্রাইমারি স্কুলে। যেহেতু স্কুল আর বাড়ি—এই গণ্ডির মধ্যে দিন কাটাতে হতো, বাইরে মেয়েদের বের হওয়ার রেওয়াজ ছিল না, তাই আরেকটু খোলা পরিবেশে পড়াশোনা করার জন্য মা আমাকে ৯ বছর বয়সে আসামের শিলং পাঠিয়ে দিলেন।

 

শিলং কেন?

ওখানেও আমাদের বাড়ি আছে। ওখানে গিয়ে লাবান প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম। সেখান থেকে পড়াশোনা করে তারপর ভর্তি হলাম লেডি কিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। শিলং খুব সুন্দর জায়গা, চারদিকে পানের লতা দিয়ে ঘেরা পাহাড়ি অঞ্চল। এখনো বাতাসের সেই ‘হিসহিস...’ শব্দ আমার কানে বাজে। সেই প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে পা দুলিয়ে আমরা বাদাম খেতাম, গল্প করতাম। এমন সময় কলেজের মেয়েরা আমাদের কাছে আসত। এসে সুভাষ বোসের সংগ্রামের কথা শোনাত। আমি তো তত দিনে রীতিমতো মনের দিক থেকে অনেকটা তৈরি। কেননা আমার চাচা ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর ভক্ত। তিনি গান্ধীজি, সুভাষ বোস, শরত্ বোস—এঁদের বক্তৃতা আমাকে শোনাতেন। বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধীর। কিন্তু গান্ধীজির ‘অহিংসনীতি’টা আমার পছন্দ হয়নি। মনে হয়েছিল, যেন আপসকামী। বরং সুভাষ বোসের সেই মার্চপাস্ট গানটি মনে বাজত : ‘কদম কদম বারাহে যা, খুশি কে গীত গায়ে যা, ইয়ে জিন্দেগি হ্যায় কওম কী, তু কওম পে লুটায়ে যা...’। এই যে তিনি বলছেন, জাতির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দাও—এটা আমার খুব ভালো লেগেছে। এটাই আমার মূলমন্ত্র। এ জন্যই ভাষা আন্দোলন করেছিলাম। অন্যদিকে আমার মা ছিলেন স্বদেশি ভক্ত। ছোটবেলায় দেখতাম, তিনি সারা দিন গুনগুন করে গাইছেন—‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি...’। ক্ষুদিরামের ফাঁসির প্রেক্ষাপটে তৈরি এ গানটি আমার শিশুমনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই ছাপ এখনো রয়ে গেছে। অন্যদিকে আমার দাদাও ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী নেতা। ফলে আমার রক্তে বিপ্লবী ভাব সব সময়ই ছিল।

 

সুভাষ বোসের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ছিল?

কলেজের ছাত্রীরা যখন আমাদের কাছে স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে আসত, আমি তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতাম। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমরা ছিলাম আট-দশজন মেয়ে। এভাবেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হলাম। সুভাষ বোসের স্মৃতি এখনো চোখে ভাসে। তিনি তখন শিলং টাউন হলে বক্তৃতা দিতেন। সেখানে উপস্থিত বেশির ভাগই মানুষই ছিলেন বয়স্ক। আমরা ছিলাম ছোট মানুষ। তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা হয়নি। তবে তাঁর বক্তৃতা খুব মন দিয়ে শুনতাম। আর অবাক হয়ে তাঁকে দেখতাম। দেখতে খুব সুপুরুষ ছিলেন। ভীষণ ফরসা লোক। মোটা ফ্রেমের চশমায় তাঁকে অদ্ভুত সুন্দর লাগত। দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে তাঁর সেই ভাষণ আমাকে এতটাই উদ্বুদ্ধ করেছিল, বুঝে গেলাম—সত্যিকারের দেশমুক্তির জন্য যদি কেউ কিছু করতে পারেন, তাহলে এই সুভাষ বোসই পারবেন। আমি সেই নীতি মেনে চললাম। কী হওয়া উচিত, কী করলে আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে—সে বিষয়টি সবার সামনে তিনি যেভাবে তুলে ধরেছিলেন, আজকাল কোনো রাজনীতিবিদের মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্যের দেখা পাই না। তাঁর সেই তুলে ধরাটা আমাদের শিশুমনে এতই প্রবলভাবে দাগ কেটেছিল, আমরা যারা তাঁর বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম, তাঁকে সামনে থেকে দেখেছি—কোনো দিনই তাঁকে ভুলিনি। কিছুদিন পর আমাকে শিলং ছাড়তে হলেও সুভাষের আদর্শ এখনো ছাড়িনি। আমাদের প্রজন্মের সবার মনকে তিনি নাড়া দিয়েছিলেন। সেই রকম করে দেশকে, জাতিকে যদি কেউ ভালোবাসেন, তাহলে তাঁকেই আমি একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক বলব। অন্যদিকে শিলংয়ে থাকার সময় বেগম জাহানারা শাহনেওয়াজের বক্তৃতাও আমি শুনেছি। তিনিও সুভাষ বোসের রাজনীতি করতেন।

 

শিলং ছাড়লেন কেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শিলংয়ে জাপানি বোমা হামলার আতঙ্ক চরমে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে শিলং ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। আমার আব্বা তখন পিরোজপুরে সরকারি চাকরি করেন। আমি সেখানে চলে এলাম। ১৯৪৯ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর, সে বছরই ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার কর্মকাণ্ড কী ছিল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। তখন ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের সরাসরি কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ প্রয়োজনে প্রক্টরের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে হতো। তা না হলে ১০ টাকা জরিমানা দিতে হতো। ক্যাম্পাসে গিয়ে কমনরুমে বসে থাকতে হতো ছাত্রীদের। শিক্ষকরা ক্লাসে ঢোকার আগে তাদের সেখান থেকে ডেকে নিয়ে যেতেন। ক্লাসরুমে ছাত্রীদের বসতে হতো সামনের সারিতে। নিয়মের একটু এদিক-সেদিক হলেই হোস্টেল থেকে বহিষ্কার, ভার্সিটি থেকে বহিষ্কার—এসব হুমকি ছিল। অন্যদিকে বাড়ি থেকে বহিষ্কার তো করে দেবেই! বলবে, ‘তোমাদের আমরা লেখাপড়া শিখতে পাঠিয়েছি। ছেলেদের সঙ্গে আড্ডাবাজি করার জন্য পাঠাইনি।’ সুতরাং আমাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের পরিবেশটা তখন এমনই ছিল। এরই মধ্যে আমরা যথেষ্ট সাবধানে নানা গোপন সভায় অংশ নিতাম। সেসব সভায় আমি, সুফিয়া খান, সুফিয়া আলী, বেবী আপা, রোকেয়া আপা, হালিমা—আরো কেউ কেউ নিজেদের মত প্রকাশ করতাম। ছাত্রদের গোপন সভাগুলো অনুষ্ঠিত হতো মেইন বিল্ডিংয়ের ৭৪ নম্বর রুমে। বেশির ভাগ সভারই সিদ্ধান্তগুলো দু-একটি ছাত্রের মাধ্যমে ছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। পোস্টার লেখার দায়িত্ব দেওয়া হতো ছাত্রীদের। মনে পড়ে, সারা রাত জেগে নুরুন্নাহার কবির পোস্টার লিখতেন।

 

একুশে ফেব্রুয়ারির কথা জানতে চাই।

১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এত বিধি-নিষেধের মধ্যেও ১৯৫২ সালে স্বাধিকারের প্রশ্নে, মাতৃভাষার মর্যাদার দাবিতে নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও ছাত্র-ছাত্রীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারার ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিকল্পনা করা হয়—পুলিশি গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য প্রতিটি দলে ১০ জন ছাত্র-ছাত্রী থাকবে। এর মধ্যে সামনের দিকে থাকবে একজন করে ছাত্রী। স্লোগান দেওয়ার জন্য প্রথমেই আমি, শাফিয়া খাতুন ও হালিমা খাতুন গেটের কাছাকাছি চলে আসি। দেখি গেটের অপর পাশে পুলিশ অস্ত্র তাক করে পজিশন নিয়ে আছে। কিছু পুলিশ লাঠির ব্যারিকেড দিয়ে আমাদের বেরোনোর পথরোধ করে রেখেছে। দুটি খালি ট্রাক আর একটি জিপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাসুদ নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা। গেটের কাছে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রক্টর মুজাফ্ফর আহম্মদ ও ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর মতিউর রহমান। ড. শহীদুল্লাহ আমাদের দেখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘ওরা পজিশন নিয়ে আছে!’

আমরা ভয় পেলাম না। প্রথম দুটি দল ব্যারিকেড পেরিয়ে গেল। কেউ লাঠির ওপর দিয়ে, কেউ নিচ দিয়ে। এই দুই দলের কয়েকজনকে পুলিশ ধরে ট্রাকে তুলে নিল। বাকিরা স্লোগান দিতে থাকল। আমার তৃতীয় দলে বের হওয়ার কথা। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগল, ব্যারিকেড না ভাঙলে তো ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম লাঠির ওপর বা নিচ দিয়ে নয়, বরং ব্যারিকেড ভেঙেই বের হব। পুলিশের লাঠি দুই হাতে শক্ত করে ধরে সামনে-পেছনে সমানে ধাক্কা দিলাম আমি। আমার দেখাদেখি অন্যরাও ধস্তাধস্তি করে ব্যারিকেড ভেঙে দিল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো লাঠিচার্জ আর টিয়ারশেল নিক্ষেপ। একটি শেল এসে পড়ল গাজীউল হকের ওপর। ছাত্ররা তাঁকে ধরাধরি করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল।

 

আপনি তখন কী করলেন?

লাঠিচার্জে আমি মারাত্মক আহত হলাম। টিয়ারশেলের কারণে চোখ জ্বালা করছিল। কাঁদানে গ্যাসের সঙ্গে তখনো আমাদের অনেকেরই পরিচয় ছিল না। মেডিক্যালের উল্টো দিকে এসএম হলের প্রভোস্টের বাড়ি। সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া। রাস্তার পাশে দুটি বইয়ের দোকান আর একটি রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁর এক কোনে উপুড় করে রাখা ভাঙা রিকশার স্তূপ। কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ থেকে বাঁচতে আমি দৌড়ে সেই স্তূপে আশ্রয় নিলাম। সেখানেও নিরাপদ মনে না হওয়ায় কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু পার হওয়ার সময় আমার শাড়ি আটকে গেল। পেছনে তাকানোর সময় তখন ছিল না। কোনো এক অচেনা লোক কাঁটাতার থেকে শাড়িটি ছাড়িয়ে দিলেন। কে ছিলেন সেই মহান ব্যক্তি—আমি আজও জানি না। প্রভোস্টের বাড়িতে ঢুকে দেখি সারা তৈফুর, বোরকা শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, সুরাইয়া ডলি, সুরাইয়া হাকিম—প্রত্যেকেই আহত। ওঁরাও আমার মতো গুলির মধ্যেই কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে এসেছেন। আমার অবস্থা দেখে ওঁরা বিচলিত হয়ে গেলেন। আমাকে পানি খাওয়ালেন। আমরা সবাই তখন আতঙ্কগ্রস্ত। কে কতটুকু আহত হয়েছি—সেদিকে খেয়াল নেই। এ অবস্থায় হোস্টেলে ফেরার সাহস হচ্ছিল না কারো। হঠাত্ রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর সেই চিন্তিত মুখটি এখনো আমার মনে ভাসে। আমি তাঁকে ‘মুনীর ভাই’ বলে ডাক দিলাম। তিনিই আমাদের হোস্টেলে পৌঁছে দিলেন।

 

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি আপনাকে এখনো কতটা উদ্বেলিত করে?

সব সময়ই উদ্বেলিত করে। আবার কখনো কখনো মন খারাপ হয়। এই যে হালিমা মারা গেল, সে কিভাবে মারা গিয়েছে—এই যে আমরা সব বিপদ-আপদ মাথায় নিয়ে সংগ্রাম করতে রাস্তায় নেমেছিলাম, নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ ভেবেছি, আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। আমি সব সময়ই এই দোষারোপটা করব। আমি দেখেছি আবদুল মতিন, গাজীউল হক ও অন্য ভাষাসৈনিকদের ঠিকমতো মূল্যায়ন করা হয়নি। আমার কী মূল্যায়ন হবে—তা-ও জানি। আমাদের বাড়িতে কবরস্থান আছে। মরে গেলে এলাকার মানুষ আমাকে সেখানেই পুঁতে রাখবে। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে কিছুই দেওয়া লাগবে না। আমি কিছু চাইও না!

 

ভাষা আন্দোলনের বাইরে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত—দুজনই ছিলেন আমার ব্যাচমেট। ১৯৪৯-৫০ সালের দিকে সলিমুল্লাহ হলের আয়োজনে ঢাকা শহরের প্রথম আবৃত্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন ফিজিকসের ছাত্র রফিকুল ইসলাম, আমি হয়েছিলাম দ্বিতীয়, আর মুহিত পেয়েছিলেন বিশেষ সান্ত্বনা পুরস্কার। সেদিন মুহিতের খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ওঁর সেই মুখটা এখনো মনে পড়ে।

 

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল?

তত দিনে আমি বিয়ে করে সংসার-সন্তান নিয়ে গৃহিণীজীবনে ঢুকে গেছি। আমার স্বামী সরকারি চাকরি করতেন। ছিলেন ডিরেক্টর অব অ্যাগ্রিকালচার। আমরা তখন আজিমপুরের ৪৮ নম্বর বিল্ডিংয়ে থাকতাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সব বাঙালি মুসলমান নারী একজোট হয়ে গেলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের সাধ্যমতো সাহায্য করতাম। সারা রাত রুটি বানাতাম। ছয়টা ফ্ল্যাটের রুটি জমিয়ে, বালিশের ওয়ারের মধ্যে গুড়সহ ঢোকাতাম। তারপর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিতাম সেই থলেটি। একবার দেখলাম, হয়তো ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে মুক্তিযোদ্ধারা থলেটি ড্রেনের পাশেই ফেলে রেখে গেছেন। আমাদের মধ্যে এক সিনিয়র আপা ছিলেন। তিনি চিন্তা করলেন, হয়তো বোঝা নিয়ে যেতে ওঁদের অসুবিধা হয়, তাই এভাবে সাহায্য করলে বিপদ। বরং ওঁদেরকে টাকা-পয়সা দিতে হবে। এরপর থেকে আমরা বিছানার চাদরের কোনায় মুড়িয়ে ওঁদের টাকা দিতাম।

 

ব্রিটিশবিরোধী, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ—তিনটি বিজয় আপনি দেখেছেন। বর্তমান বাংলাদেশ আপনাকে কতটুকু আনন্দিত করে, কতটুকু অসন্তুষ্ট করে?

একটা জাতিকে এগোতে হলে তার সংস্কৃতি, ভাষা—সব কিছুকেই একত্রে চলমান হতে হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা সামনে যাচ্ছি, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি পেছনে পড়ে থাকছে। আমরা এগোচ্ছি, কিন্তু ঠিক যেভাবে এগোনো উচিত—সেটা হচ্ছে না। আমরা ভিন্ন ভাষায় কথা বলছি, বাংলাটা বাংলা থাকছে না; এটা উর্দু না ফার্সি, না আরবি না কী—বোঝার উপায় নেই। এ রকম একটা ভাষাবিকৃতি চলছে। সংস্কৃতি বলতে আমি বুঝি বাঙালি জাতির সংস্কৃতি—সেটা আমরা মানছি না। ভাষা চলমান জিনিস, সংস্কৃতি চলমান জিনিস, উন্নততর জীবন চাইলে সব কিছুকেই আমাদের চলমান রাখতে হবে। কিন্তু সেটি কিভাবে সম্ভব? এভাবে ভাষাবিকৃতি চলতে থাকলে একদিন আমাদের নিজস্বতার কোনো চিহ্নও থাকবে না। বাঙালি ও বাঙালিত্ব সঠিকভাবে রেখে যদি এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে সেটাই হবে আমাদের ভাষার উন্নতি, সংস্কৃতির উন্নতি। আমাদের চলনে-বলনে যতটা সম্ভব বাঙালিত্বকে বজায় রাখতে হবে।

 

এখন আপনার সময় কাটে কিভাবে?

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস অনেকেই অনেকভাবে লিখেছেন, শুনিয়েছেন। অনেক লেখায়ই ভ্রান্তিকর তথ্যের ছড়াছড়ি। তাই আমি একটি বই লিখছি। আর বেশির ভাগ সময় বই পড়ছি। বই সংগ্রহ করছি, পড়ছি; কিন্তু শেষ করতে পারছি না। ওরে বাবারে, কী বিশাল সাগর! কোথাও ভালো বই পেলে আমার মেয়ে এনে দেয়। কিছুদিন আগেই এনে দিল নেলসন ম্যান্ডেলার ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’। আমার কাছে আছে পুরনো আমেরিকান সাহিত্যের বইপত্র। এগুলো নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছি। বিশেষ করে কবীর চৌধুরীর কাছ থেকে। তিনি ছিলেন আমার ননদের স্বামী। তিনিই আমার পাণ্ডুলিপিটার নাম ঠিক করে গেছেন—‘বাঙালির ভাষা ও ভূখণ্ড’। বইটি লেখার কাজ মোটামুটি শেষ। শিগগিরই প্রকাশ করতে চাই।

 

ওই সময়ের শিল্প-সংস্কৃতির লোকজনের সঙ্গে আপনার সরাসরি ওঠা-বসা ছিল।

তাঁদের সবার কথা পরিষ্কারভাবে মনে পড়ে। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সরদার ফজলুল করীম, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, কবীর চৌধুরী...এঁরা একে একে বছর কয়েক আগে মারা গেলেন। এঁদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর বাসায় প্রায়ই আড্ডা বসত। কারো বিয়েবার্ষিকী, কারো জন্মদিন—এ রকম ঘরোয়া অনুষ্ঠান আমরা ওখানেই করতাম। খাওয়াদাওয়া হতো। আমরা হৈ-হুল্লোড় করতাম। এঁদের কথা খুব মনে পড়ে।

 

আপনার ব্যক্তিজীবনের গল্প শুনতে চাই।

আমরা ছিলাম দুই বোন, দুই ভাই। আমি সবার বড়। মা-বাবা, ভাই-বোন—কেউই বেঁচে নেই এখন। বাবাকে বলা হতো ‘ডিউক অব শিলং’। তিনি ঘোড়ায় চড়ে স্কুল-কলেজে যেতেন। শিলংয়ে খাসিয়া রাজার মন্ত্রী ছিলেন আমার দাদার বাবা। ওখানে আমাদের পরিবারের বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। দাদা ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহর বন্ধু। একটি বন্দুক, দুটি পোষা কুকুর ও একটি জায়নামাজ—বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ এগুলো দাদাকে উপহার দিয়েছিলেন নবাব। আমি বিয়ে করেছি ভাষা আন্দোলনের একটু পরে। আমার চার কন্যা।

 

শুরুতেই হালিমা খাতুনের কথা বলছিলেন...

আমরা থাকতাম ‘চামেলি হাউসে’। একসঙ্গে খেতাম। শাড়ি অদল-বদল করে পরতাম। একসঙ্গে আড্ডাবাজি করতাম। ওর মৃত্যুর কিছুদিন আগেও আমি ওকে দেখতে গিয়েছিলাম। ও তখন চিকুনগুনিয়ায় ভুগছিল। আমাকে বলল, ‘তুই আমার কাছে একটু শুয়ে থাক।’ আমি ওর পাশে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। ওর কাছ থেকে বাসায় ফিরে আমিও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলাম। এরপর আক্রান্ত হলেন আমার স্বামী। তিনি তো মারাই গেলেন। আমি এখনো ভুগছি।

(মিরপুর, ঢাকা; ১১ অক্টোবর ২০১৮)

মন্তব্য