kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

ছবিতে সব সময় বাস্তবতার কাছাকাছি থাকি

এমকম পাস করে অন্য কোনো দিকে না গিয়ে সিনেমায় চলে এলেন। আলমগীর কবির, মমতাজ আলীর মতো বিখ্যাত পরিচালকের সহকারী ছিলেন। নায়ক মান্না, খলনায়ক রাজীবকে তুলে এনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ৫০টি ছবির ২৬টিই নিষিদ্ধ হয়েছিল। সেই জীবনের কথাই বললেন প্রখ্যাত পরিচালক কাজী হায়াৎ। শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২০ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৪ মিনিটে



ছবিতে সব সময় বাস্তবতার কাছাকাছি থাকি

কিভাবে সিনেমায় যাত্রা শুরু হলো?

 

কিশোর বয়সে প্রথম দেখা সিনেমার গল্প অনেকে মনে রাখতে পারেন না। কিন্তু সাগরিকার গল্প আমি এখনো বলতে পারব। সেই গল্পটি মেমরিতে কেমন যেন গেঁথে গেল। পর্দায় মানুষ কথা বলে, গল্প করে, কান্নাকাটি হয়—এগুলো আমার কাছে বিস্ময়ের ছিল। তখন ভেবেছিলাম, এ জগতের মানুষ হব। তবে বন্ধুদের কাছে বা যেখানেই এ ইচ্ছার কথা বলেছি—নেগেটিভ কমেন্ট পেয়েছি। ফলে জিদ আরো চেপে বসেছিল। এমকম পরীক্ষার শেষ খাতা জমা দিয়ে প্রার্থনা করেছিলাম—আর যেন আমাকে পরীক্ষা দিতে না হয়, যেন সিনেমায় চলে যেতে পারি। এক পরীক্ষার গ্যাপে জগন্নাথ কলেজের বাণীভবন হোস্টেল থেকে বন্ধু নিমাই দাসকে নিয়ে পরিচালক মন্টু পরদেশীর অফিসে গেলাম। খবরের কাগজে দেখেছিলাম—তিনি ছবি বানাবেন। তাঁর অফিসটিও কাছেই ছিল। অফিসে গিয়ে তাঁকে বললাম, ‘আপনার সহকারী হিসেবে কাজ করতে চাই।’ তখন তিনি বললেন, তাঁর সিনেমা শুরু হতে দেরি আছে। এরপর অনেক জায়গায় গেছি। আজিজুর রহমানের ‘স্বীকৃতি’ ছবিতে এক দিন কাজ করেছি। সেই ছবিতে সহকারী পরিচালক ছিলেন দিলীপ বিশ্বাস। এফডিসিতে তিনি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা শুনে বকাই দিলেন—‘এমকম পরীক্ষা দিয়ে এখানে কী করতে এসেছ? প্রফেসরি করো গিয়ে, নয়তো ব্যাংকে চাকরি করো। যাও,  এখানে আর কোনো দিন আসবে না।’ অনেকের সামনে কথাটি বলায় খুব অপমানিত হলাম। আরো জেদ চাপল। পরিচালক মোস্তফা মোহাম্মদ, এহতেশাম, বাবুল চৌধুরী, হাসমতের কাছে সহকারী পরিচালক হওয়ার অনুরোধ করলাম। তবে সাড়া পেলাম না। একদিন খুঁজে খুঁজে আমজাদ হোসেনের বাসায়ও গেলাম। তিনি ‘বাংলার মুখ’ ছবির কাজ করছিলেন। প্রধান সহকারী পরিচালক ইলতুিমশকে তিনি বললেন, ‘এই ছেলেটি শিক্ষিত, একে নিয়ে নিন।’ তবে তাঁর আরেকজন সহকারী পরিচালক এ জে মিন্টু, সে পরে বড় পরিচালক হয়েছে, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুও হয়েছে, সে আমাকে এফডিসিতে ঢুকতেই দিল না। বলল, সহকারী পরিচালক হতে গেলে সংগঠনের সদস্য হতে হবে। তখনো সেই সংগঠনের নামই জানি না। তখন ফার্মগেটে আড্ডা মারতাম। সেখানে একদিন বন্ধু আলতাফ খান টুলু এসে বলল, ‘আমি তো কাল থেকে মমতাজ আলীর সঙ্গে কাজ করব। সব ঠিক হয়ে গেছে।’ বললাম, ‘কিভাবে তাঁর সহকারী হলি?’ টুলু বলল, ‘তাঁর দুই সহকারী পরিচালকই ছবি পেয়ে চলে গেছেন। ফলে আমি গিয়ে বলতেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন।’ পরদিন বেড়া ডিঙিয়ে, কাদা পেরিয়ে এফডিসিতে গিয়ে হাজির হলাম। শুনলাম, তিনি এডিটিং রুমে আছেন। সেখানে গিয়ে এক লোককে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে মমতাজ আলী শুটিং করছেন। আমার তাঁকে একটু দরকার। তিনি বললেন, ‘কেন?’ তাঁকে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি বললেন, ‘লেখাপড়া কতটুকু করেছেন?’ বললাম। তিনি বললেন, ‘আমিই মমতাজ আলী। কাল থেকে কাজ শুরু করে দিন।’ ১৯৭৪ সালে এভাবেই যাত্রা শুরু হলো। সেই সিনেমার নাম ছিল ‘সোনার খেলনা’। মমতাজ সাহেব আমাকে খুব ভালোবাসতেন। কাজে ভুল হলে তিনি বকা দিতেন। তবে কোনো দিন আমাকে বকা দেননি। কারণ কাজে ত্রুটি পাননি। তিনি আমাকে ছেলের মতো, ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন।

 

আলমগীর কবিরের সঙ্গে কিভাবে পরিচয়?

তাঁর সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। দেখা হলে কথা হতো। সব সময় বড় মানুষদের সঙ্গে নির্ভয়ে কথা বলেছি—এটি আমার আলাদা একটি গুণ। জানতাম—তিনি শিক্ষিত মানুষ, ভালো ছবি বানান। দেখা হলেই স্যার, এ বিষয়ে একটু জানতে চাই—এভাবে নানা বিষয় জেনে নিতাম। তাঁরাও অবাক হতেন যে এ তো খুব দুঃসাহসী ছেলে। একদিন তিনি এফডিসিতে আমাকে দেখে ডাকলেন। বললেন, “আমার ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির শুটিং অল্প একটু বাকি আছে। এডিট পুরোটাই বাকি। একজন সহকারী পরিচালক প্রয়োজন। আপনি আমাকে সহযোগিতা করবেন?” তিনি আমাকে সব সময় ‘আপনি’ করে বলেছেন। বললাম, বেকার আছি, আমি কাজ করব। তিনি বললেন, ‘আপনাকে মাসে ২০০ টাকা বেতন দেব। আর প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে পাবেন।’ তিনি খুব পরিষ্কার লোক ছিলেন। এটি বোধ হয় ১৯৭৬ সালের ঘটনা। তিনি আরো বললেন, ‘এই টাকায় কাজ করতে পারবেন? আপনার বোধ হয় পোষাবে না।’ আমি বললাম, ‘টাকা না দিলেও আপনার সঙ্গে কাজ করব।’ এর পর তো এ ছবির পুরো এডিটই করেছি। ‘সীমানা পেরিয়ে’র এডিটর বশির হোসেন ছিলেন নামকরা এডিটর। তিনি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পালঙ্ক’ ছবি এডিট করেছেন। কাজ করতে করতে এই ছবির বিভিন্ন শট নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করতাম। তিনি আমার কথা শুনে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়, আর কাজ করতে পারছেন না—দেখা করতে গিয়েছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম—‘ভাই, আপনি আমাকে একটি সনদপত্র দিতে পারবেন?’ তিনি বললেন, ‘কাল আসো।’ যাওয়ার পর তিনি আমার হাতে একটি টাইপ করা কাগজ দিলেন। সেখানে লেখা—‘কাজী হায়াৎ সিনেমার এডিটিং, শুটিংয়ে খুব পারদর্শী। সে প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেছে। সেই সময় তার সঙ্গে আমার পরিচয়। পরিচয়ে মনে হয়েছে, সিনেমায় যদি থাকে, তাহলে সে অনেক নামকরা পরিচালক কিংবা এডিটর হবে।’ নিচে তাঁর সই।

 

মমতাজ আলী ও আলমগীর কবিরের কাছে কী শিখেছেন?

দুজন দুই ধরনের পরিচালক। আলমগীর কবির কিন্তু প্রথমেই আমাকে একটি বই দিয়েছিলেন—‘হু ইজ ডিরেক্টর, হোয়াট ইজ ডিরেক্টর’। বইটির প্রথম প্যারায় ছিল—একজন পরিচালকের প্রথম গুণ হলো—তাঁকে একজন ভালো প্রশাসক হতে হবে। তাঁকে সবাই সম্মান করবেন এবং তিনি হবেন সিনেমাটির প্রধান ব্যক্তি। তাঁদের দুজনকেই আমি তা-ই দেখেছি। আলমগীর কবির সাহেবের কাছে শিখেছি—কত সস্তায় ছবি বানানো যায়। তাঁর না ছিল ট্রলি, না ছিল জুম। নিজের ক্যামেরায় তিনি শুটিং করতেন। প্রতিদিন ৫০ টাকা হিসেবে মেকআপম্যান ভাড়া করতেন। প্রতি শিফট ভাড়া দিতেন ৫০ টাকা। তাঁর কাছ থেকে শিখেছি—বিশাল আয়োজন না করে প্রয়োজনে অফ ট্র্যাক স্টোরি নিয়েও অল্প টাকায় ছবি বানানো যায়। মমতাজ আলী শিখিয়েছেন বিশাল আয়োজনে, বিরাট আকারে ছবি কিভাবে বানাতে হয়। কোনটি বেছে নেব সেটি আমার ব্যাপার।

 

দি ফাদারের গল্পটি কিভাবে মাথায় এলো?

তখন আমার ভাতিজা বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসে চাকরি করত। তখনকার দিনের একমাত্র কম্পিউটারটি সেখানে ছিল। সেই কম্পিউটার সেকশনের প্রধান ছিলেন আমেরিকান জন নেপিয়ার অ্যাডামস। সেই আমলে তাঁর বেতন ছিল এক লাখ ১০ হাজার টাকা। ধানমণ্ডিতে সরকারি বাড়ি, গাড়িও ছিল। সিনেমা তাঁর বাতিক ছিল। তাই ভাতিজার কাছে তিনি আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন। তিনি মমতাজ আলীর ‘ঈমান’ ছবির শুটিংও দেখতে এসেছিলেন। সেখানে আমি সহকারী পরিচালক ছিলাম। আমাদের সম্মানে তিনি তাঁর বাসায় পার্টি দিয়েছিলেন। পার্টিতে গিয়ে দেখি, তিনি একটি শিশুকে জুস খাওয়াচ্ছেন, আদর করছেন। অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম, শিশুটি কে? তিনি বললেন, এটি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়া তাঁর ড্রাইভারের ছয় মাসের বাচ্চা। শিশুটির মাও তাঁর কাছে আছে। যত দিন বাংলাদেশে থাকবেন, শিশুটির যত্ন নেবেন। সেই রাতেই সারা রাত না ঘুমিয়ে গল্পটি লিখলাম—‘দি ফাদার’। তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা ও কালোদের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘাত চলছে। এই শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমে সেই সাদা ও কালোর ভেদাভেদ দূর করা যাবে—এমন একটি গল্প আমি লিখেছিলাম। পরদিন ভোরে ভাতিজার মাধ্যমে গল্পটি তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিলাম। আহমেদ ফুডসের মালিক আহমেদ সাহেব ছবিটির টাকা দিলেন। তখন একটি ছবি বানাতে ২০-২৫ লাখ টাকা খরচ হতো। আমি তাঁকে তিন লাখ টাকার বাজেট দিলাম। বুলবুল আহমেদ ও সুচরিতাকে প্রধান চরিত্রে নির্বাচন করা হলো।

 

এটিই কি আপনার প্রথম গল্প? কেন নিজে চিত্রনাট্য লেখেন?

হ্যাঁ, আমি নিজে গল্প তৈরি করি। সেভাবেই সিনেমাটি বানাই। আমার সব ছবির গল্প নিজের লেখা। দুটি ছবিতে দুজন প্রথিতযশা গল্পকারকে দিয়ে গল্প লেখানোর চেষ্টা করেছি। দি ফাদারের গল্প লেখার জন্য রফিকুজ্জামানকে টাকাও দিয়েছিলাম। তবে তাঁর খুব অনাগ্রহ দেখতাম। তিনি আমার সঙ্গে খুব তর্ক করতেন। বাসায় গেলে পেতাম না। সব মিলিয়ে মনে হলো—সবাই লিখতে পারলে আমি পারব না কেন? সেভাবেই গল্প তৈরি করলাম। স্পটে বসেই সংলাপ লিখলাম। এখন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যেমন শিল্পীদের বলেন, এই দৃশ্যগুলোর সংলাপ ও অভিনয় আপনারাই করেন, তেমন দু-তিনটি দৃশ্য বুলবুল আহমেদ ও সুচরিতাকে দিয়ে  দি ফাদারেই অভিনয় করিয়েছি। বলেছি, টেপ রেকর্ডার চালাচ্ছি, এই দৃশ্যের ডাবিং এভাবে হবে। আপনারা কথা বলুন। এসব শুনে বুলবুল খুব হাসতেন। আমার ক্যামেরাম্যানকেও তিনি নিরুত্সাহিত করতেন। বলতেন, ‘এসব কি সিনেমা? এভাবে তো সিনেমা হবে না।’ তবে সেন্সর প্রিন্ট দেখানোর পর তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘হায়াৎ, আমি আপনাকে আন্ডারএস্টিমেট করেছি, অনেক কষ্ট দিয়েছি। আসলে আপনি এত ভালো সিনেমা করবেন, বুঝতে পারিনি।’ আরেকবার আইন-আদালত ছবির জন্য ‘টুক’ু নামে পাশের এলাকার এক ভদ্রলোককে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তিনি এক মাস আমার বাসায় খেয়েছেন, নিয়মিত এসেছেন। আমি গল্প বলেছি, তিনি চিত্রনাট্য লিখেছেন। পরে দেখি, এক বস্তা গল্প লিখে ফেলেছেন। সেটির সঙ্গে সিনেমার কোনো সংগতি নেই। পরে নিজেই লিখে ফেললাম। নিজে লেখার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—গল্পটি তো সবার আগে পরিচালক তাঁর মনের পর্দায় দেখেন। চিত্রনাট্যকারের নিজস্ব গল্প বলার ভঙ্গি থাকলেও তাঁর কাছ থেকে পরিচালক তাঁর মনের মতো করে শতভাগ পান না। তবে নিজে লিখলে তাঁর অবজারভেশনটি পুরোপুরি পাওয়া যায়। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ছবির জন্য মানসম্পন্ন কোনো চিত্রনাট্যকার আছেন বলে আমার মনে হয় না। কারণ আমাদের সিনেমার গল্প এখনো যাত্রা ও নাটকে বন্দি। সাহিত্যনির্ভর সিনেমা হলেও সাহিত্য ও সিনেমার মধ্যে অনেক তফাত আছে। এ দেশের খুব বিখ্যাত একটি ছবির নাম হলো—‘এতটুকু আশা’। এই ছবিতে কাজী খালেক ও সাইফুদ্দিন দুজনই গ্রামের লোক। তাঁরা নদীর পাড়ে হাঁটছেন, কথা বলছেন। একটি ডায়ালগ এমন—ওদের কথা আর বোলো না, বিষ নাই তার আবার কুলোপানা। সাহিত্যের জন্য ভালো সংলাপ হলেও একটি সিনেমা যে বাস্তবতাকে তুলে ধরে, সেটির সঙ্গে মেলে না। সাহিত্য ও যাত্রা আমাদের সিনেমায় একেবারে জেঁকে বসেছিল। সিনেমাকে আমরা এগুলো থেকে আলাদা করতে পারিনি। বিখ্যাত ছবি ‘সুতরাং’ দেখে পরিচালক হিসেবে আমার লজ্জা হয়। পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে কবরী ও সুভাষ দত্ত দৌড়াচ্ছেন, শরৎ সাহিত্যের ভাষায় কথা বলছেন। গ্রামের লুঙ্গি, শাড়ি পরা ছেলে-মেয়ে কি শরত্চন্দ্রের ভাষায় কথা বলে? আমার যে মাতৃভাষা সেটি কি খারাপ?

 

তবে আপনার ছবির ডায়ালগে শ্লীল ভাষা কম থাকে, এমন অভিযোগ আছে।

এটি বাস্তবতা। বাংলামোটর থেকে মগবাজার পর্যন্ত রিকশায় গেলে এই ১০ মিনিটে অন্তত কয়েকবার যেকোনো রিকশাওয়ালাকে গালি শুনতে হবে। এই যে গালি, সেটিও তো বাস্তবতা বোঝানোর একটি ভাষা। যে এই শব্দটি বলছে, সে তো এই মাটি থেকে, এই সমাজের কাছ থেকে ভাষাটি শিখেছে। বাস্তবতা বোঝানোর জন্য সচেতনভাবেই এই শব্দগুলোর ব্যবহার করে চলেছি। তবে এ জন্য আমাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে, আমার ‘ধর’ নিষিদ্ধও হয়েছে। শহীদুল ইসলাম খোকন তখন পরিচালক সমিতির সভাপতি। তখন আমি কলকাতায় চিকিত্সার জন্য ছিলাম। এই ছবির প্রতিটি শো হাউসফুল ছিল। তার পরও তৃতীয় দিন তিনি ও প্রযোজক সমিতির সভাপতি মাসুদ পারভেজ মিলে সব হল থেকে ছবিটি নামিয়ে আনলেন। আমার ছবি নিষিদ্ধ করা হলো। এই ছবির গল্পটি ছিল একটি পাগলীকে নিয়ে। মগবাজারের সেই পাগলীটি এখনো আছেন। তাঁকে দিয়ে এই ছবির শুরু ও শেষ। ছবিটি অবশ্য পরে আবার চলেছে। কিন্তু অশ্লীলতার দায়ে আমি এক ধরনের খ্যাতি পেয়ে গেলাম, বিখ্যাত হয়ে গেলাম। তবে সান্ত্বনা ছিল, দেশে ও দেশের বাইরে বহু শিক্ষিত বাঙালি ফোন করে আমাকে বলেছেন, একটি অদ্ভুত ভালো ছবি বানিয়েছেন। একবার এফডিসিতে নতুন মুখের সন্ধানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক এসেছিলেন। তাঁকে শিবলী সাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, কোনো স্মরণীয় ছবির সংলাপ বলতে পারবেন? তিনি বলেছিলেন, বিচারক প্যানেলে কাজী হায়াৎ বসে আছেন, তাঁর ‘ধর’ ছবির একটি দৃশ্য এবং সংলাপ অপূর্ব লেগেছে। তিনি সেই বিখ্যাত ডায়ালগটি অভিনয় করে দেখিয়েছেন।  এখন আমি যদি সাহিত্যনির্ভর, প্রমিত ভাষার ছবি বানাই, তাহলে আমার দর্শকদের সেটি কখনো ভালো লাগবে না। এই লড়াইটি আমার জীবনের প্রথম থেকেই ছিল। ছবিতে সব সময় আমি বাস্তবতার কাছাকাছি থাকি। বাস্তবতার কাছাকাছি ছবি বানাতে পছন্দ করি। এই পরিচয়েই খ্যাতি পেয়েছি। আমি কিন্তু খুব জৌলুসপূর্ণ ছবি কখনো বানাইনি। আমার ছবিতে রাজপ্রাসাদ বা অনেক বড় সেট থাকে না। ঘরের মধ্যে, রাস্তায় শুটিং করেছি। তার পরও কাজী হায়াৎ জনপ্রিয় হয়েছেন। তাঁর ছবি মানেই আলাদা ধরনের ছবি। দেশে কোনো ঘটনা ঘটলে অনেকে ফোন করে সেই বিষয়ে আমাকে ছবি বানাতে বলেন।

 

দি ফাদারও তো রিলিজ হতে সমস্যা হচ্ছিল?

হ্যাঁ, তবে ছবিটি নিয়ে গোপনে কী হচ্ছিল, তা জানতাম না। সেসব অনেক পরে জেনেছি। ইফতেখারুল আলম, খলিলুল্লাহ খানদের কাছে ছবিটি রিলিজের জন্য ধরনা দিয়ে বেড়াচ্ছি। তবে এই হল মালিকদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, এটি কোনো দিন রিলিজ হবে না। এর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে গেল। তখনকার বিখ্যাত নায়িকা শাবানার বাসায় এক পার্টিতে তথ্যসচিব খোরশেদ আলম সবাইকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখানে ‘দি ফাদার’ ছবির কেউ আছেন?” তখন মমতাজ ভাই বললেন, ‘এই ছবির পরিচালক আমার সহকারী ছিলেন।’ তিনি আমাকে দেখা করতে বললেন। যাওয়ার পর কেন ছবিটি রিলিজ হচ্ছে না জানতে চাইলেন। বললাম, খলিলুল্লাহ সাহেবরা ছবিটি রিলিজ করতে চাইছেন না। তিনি বললেন, ‘কাল সকালে স্টারে গিয়ে কেবল আপনার উপস্থিতি জানিয়ে দিয়ে আসবেন।’ রাজউক ভবনের পেছনে স্টার ফিল্মস করপোরেশনে গিয়ে বললাম, আমি ‘দি ফাদার’—এর পরিচালক কাজী হায়াৎ। শুনেই খলিলুল্লাহ খান দৌড়ে এলেন। তিনি কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না, তোতলাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, কাল ৭টার সময় ছবিটির একটি প্রিন্ট নিয়ে আমার আজাদ সিনেমা হলে যাবেন। আমি থাকব। তবে তিনি সেখানে ছিলেন না। অফিসে যাওয়ার পর তাঁর ছেলে ইমরান বললেন, ‘এগুলো তো আর্ট ফিল্ম, এগুলো চলে না। তবুও খোরশেদ আলম সাহেব যখন বলেছেন, আমরা রিলিজের ব্যবস্থা করে দেব।’ তিনি প্রযোজককে নিয়ে আসতে বললেন। আমার লজ্জা হয়—সেদিন প্রযোজকের সামনে দি ফাদারের নির্মাতা কাজী হায়ােক খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আহমেদ ফুডসের মালিক আহমেদ সাহেবকে খলিলুল্লাহ খান বললেন, ‘আপনাকে দেখে তো অবাঙালি মনে হচ্ছে। এসব ছবি তো চলে না। কী করেন?’ আহমেদ সাহেব বললেন, ‘আমার ওষুধের ব্যবসাও আছে, নাম অ্যামিকো ল্যাবরেটরিজ।’ তাঁর সঙ্গে কথা বলে শুক্রবার ছবিটি রিলিজ করা হলো। শুক্র-শনিবার দর্শক না থাকলেও রবিবার থেকে দর্শক আসতে লাগল। মুখে মুখে প্রচার হলো। বুধবার হাউসফুল, বৃহস্পতিবারেও। অভিসারে ১৫ টাকার টিকিট ব্ল্যাকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলো। ঢাকার কয়েকটি হলে যাতে আরো কিছুদিন চলে সে জন্য খলিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি বললেন, ‘বাবা, আমি খুব দুঃখিত। আপনার প্রতি অবিচার করেছি। ছবিটি যে এত ভালো চলবে বুঝতে পারিনি।’ এর পর থেকে তিনি আমাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তিনি আমার ছবিতে অর্থ লগ্নি করতেন। কিন্তু কোনো ইন্টারেস্ট নিতেন না। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। এখনো পর্যন্ত আমি আমার প্রতিটি ছবিতে লিখি—‘ধন্যবাদ, মরহুম খলিলুল্লাহ।’ আমি অকৃতজ্ঞ নই।    

 

এরপর কী ছবি বানালেন?

রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষাণ অবলম্বনে ‘রাজবাড়ি’। এটি আমার শখের ছবি ছিল। তবে সত্যি কথা হলো, সোহেল রানা ছবির গল্পটি ধরতে পারেননি। মূল গল্পটিকে আমি সমকালীন করতে চেয়েছিলাম। এই ছবির অর্ধেক কাজ হয়ে যাওয়ার পর ছবিটির প্রযোজক মঈনুল হককে মরহুম পরিচালক বেলাল আহমেদ ও অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ বোঝালেন, ছবিটি হলে চলবে না। ফলে তিনি আমাকে বললেন, ‘ছবিতে ফাইট আনেন।’ বললাম, তাহলে তো আর এটি ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ থাকবে না। তিনি বললেন, ‘তাহলে এটি থাকুক। আমার কাছে কয়েক লাখ টাকা আছে, এক মাসের মধ্যে এই টাকায় কোনো ছবি বানাতে পারবেন?’ ফলে সদ্য পড়া সত্যজিৎ রায়ের ‘ফটিকচাঁদ’ অবলম্বনে এফডিসির মধ্যেই শুটিং করে সাত লাখ টাকায় ‘দিলদার আলী’ তৈরি করলাম। টেলি সামাদই এই চরিত্রের জন্য আদর্শ ছিলেন। তবে তাঁর সঙ্গে কোনো নায়িকা অভিনয় করতে রাজি নন বলে নাচে এমন একটি মেয়ে জুলিয়াকে নিলাম। ছবিটি সুপারহিট হয়ে গেল। এরপর তিনি ‘রাজবাড়ি’ করতে গেলেন। তবে শর্ত ছিল, স্ক্রিপ্ট বেলাল ও আসাদ লিখবেন। সেই ছবির শুটিং করতে গিয়ে জীবনের প্রথম ও শেষবার আমি কেঁদেছি। কারণ আমাকে যে দুটি সিকোয়েন্স দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো ছবির কোথায় ব্যবহার করা হবে আমি জানতাম না। এভাবে পাঁচ-সাত দিন শুটিংয়ের পর আর মন মানল না। অনুপস্থিত থাকতে লাগলাম। প্রযোজক অন্য পরিচালককে দিয়ে শুটিং শেষ করলেন। সেন্সর প্রিন্ট শোর দিন তিনি আমাকে ডেকেছিলেন। ছবি দেখে মনে হলো, এটি না হয়েছে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, না কোনো সিনেমা। তাঁকে আমার নামটি বাদ দিতে অনুরোধ করলাম; বললাম, এটি চলবে না। হয়েছেও তা-ই। বহু হল থেকে শনিবারই ছবিটি নামিয়ে নিতে হয়েছে।

 

রাজীবকে কিভাবে পেলেন?

সে তখন পেট্রোবাংলায় চাকরি করে। সাত্তারের ‘রাখে আল্লাহ মারে কে?’ ছবির ডাবিংয়ে তার সঙ্গে পরিচয়। সুসম্পর্ক হয়ে গেল। তখন তারা রমনা রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিত। সেখানেই ‘খোকন সোনা’র গল্পটি শোনালাম। তখন সে জানতে চাইল, ‘এই ছবিতে কে কে অভিনয় করছেন?’ বললাম, কাঞ্চন, সুচরিতা। পরদিন সে আমার বাসায় এসে হাজির। বলল, ‘ওদের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট হয়ে গেছে?’ বললাম, কেন? সে বলল, ‘এই ছবির হিরো তো সেই শিশুটি। মা-বাবার চরিত্র তো তেমনভাবে ফোটে না। আমাকে নেবেন?’ এই বলে সে আমার হাতে-পায়ে ধরল। এমনকি সে এই ছবির প্রযোজনার জন্য টাকা দিল। এটি ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। ছবির প্রধান নারী চরিত্রের জন্য সুবর্ণা মুস্তাফা, অঞ্জু ঘোষের কাছে গেলাম। তাঁরা কেউই রাজীবের বিপরীতে অভিনয় করবেন না। শেষ পর্যন্ত জুলিয়াকে নিয়ে ছবিটি করা হলো। রাজীব আমার বন্ধু ছিল। তাঁর ভালো নাম ওয়াসিমুল বারী। রাজীব নামটিও আমার দেওয়া।

 

মান্নার শুরু?

১৯৮৫ সালের একদিন রাত ১০টায় ডিপজলের ভাই বাদশা আমার বেগুনবাড়ীর বাসায় এসে হাজির। তাঁকে আমি চিনতাম না। তিনি বললেন, আমি এশিয়া সিনেমা হলের মালিক। তাঁর প্রডাকশন ম্যানেজারকে দেখিয়ে বললেন, ‘আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সবচেয়ে দ্রুত কোন পরিচালক ছবি বানাতে পারেন? সে আপনার নাম বলেছে। আমি জেদ করেছি, কাল থেকে একটি ছবির শুটিং শুরু করব। ফলে আজ রাতের মধ্যেই সব ব্যবস্থা করতে হবে। এক মাসের মধ্যে ছবি শেষ করতে হবে। কে আর্টিস্ট হবেন—কিছুই আমি জানতে চাই না।’ হঠাৎ নামটি মনে হলো। বললাম, ছবির নাম ‘পাগলী’ হলে কেমন হয়? তাঁরা রাজি। এর পর বললাম, নতুন মুখের সন্ধানেতে নির্বাচিত হওয়ার পর একটি লম্বা ছেলে মিঠুনের মতো নেচেছিল। তাকে আমার সকালের মধ্যে লাগবে। ম্যানেজার সকালে আমাকে তাঁর মোহাম্মদপুরের বাসায় নিয়ে গেলেন। মান্নাই দরজা খুলল। ম্যানেজার পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি কাজী হায়াৎ। ভেতরেও গেলাম না। বললাম—কথা একটাই, আপনি আমার ছবির নায়ক। এখনই যেতে হবে। সে সম্মোহিত হয়ে আমার পেছনে চলল।  এই ছবিতে আরেক নায়ক ছিলেন সাত্তার। এই ছবিতে তাঁরও শুরু। আর ফারজানা ববিকে একদিন এক হোটেলে দেখেছিলাম। তাঁর হাতিরপুলের বাসায় গেলাম। তাঁকে নিয়ে এসে এক দিনের মধ্যে শুটিং শুরু করলাম। এক মাসের মধ্যে শুটিং শেষ। ‘পাগলী’ ভালো ব্যবসা করেছে। এর পর থেকে মান্না আমার কাকরাইলের অফিসে এসে বসে থাকে। এর মধ্যে ১৯৮৮ সালে এ টি এম শামসুজ্জামানকে নিয়ে ‘দায়ী কে’ করলাম। আমি তো সব সময় অফট্র্যাকের ছবির চিন্তা করেছি। এটিও সুপারহিট হয়েছে। বিদেশের ফিল্ম ফেস্টিভালেও গেছে। ইলিয়াস কাঞ্চন তখন প্রচণ্ড ব্যস্ত। মান্না রাজীবের মতোই হাতে-পায়ে ধরল। বললো, ‘আমাকে আরেকটি ছবিতে নেন, প্লিজ!’ ফলে তাকে নিয়ে ‘যন্ত্রণা’ করলাম। ছবিটিতে তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তবে ২০ লাখ টাকার এই ছবিতে ১০ লাখ টাকা লস হলো।

 

এর পরই তো ‘দাঙ্গা’ বানালেন?

‘যন্ত্রণা’র দেনা শোধ করার জন্য দাঙ্গা বানাতে হলো। ছবিটি বানানোর সময়ই বলেছিলাম, এটি না চললে আর সিনেমাই বানাব না। তখনো কিন্তু মান্না-সুচরিতা জুটিকে দর্শক গ্রহণ করে না। এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক ছবি ছিল। গল্পও অন্য রকম। রাজীবের ক্যারেক্টারও অন্য রকম ছিল। এখানে বেশ কিছু অলৌকিক ব্যাপারও ঘটেছে। একটি দৃশ্য ছিল এমন—রাজীব গাঁজা খেতে খেতে চোখ তুলে ফেলছে। এর শুটিংয়ের সময় হঠাৎ মনে হলো, সে তখন গজল শুনছে।  দৌড়ে বাসায় এসে স্ত্রীকে বললাম, গুলাম আলীর গজল আছে না? প্রথম যে ক্যাসেটটি পেলাম, শুনেই মনে হলো, একেবারে এই ছবিটির জন্যই তিনি গজলটি গেয়েছেন। গজলের মানে ছিল—তোমার-আমার দেখা হবে মরণের পরে, সেদিন ফয়সালা হবে। ফলে আত্মবিশ্বাস তৈরি হলো। ছবিটির ২৫টি প্রিন্ট করেছিলাম। ১৯৯১ সালের কোরবানির ঈদের আগের সপ্তাহে ছবিটি রিলিজ দিয়েছিলাম।  তবে চলছিল না। প্রতিদিন মান্না অফিসে এসে বসে থাকে। বলে, ‘কই, ওস্তাদ ছবি তো চলে না।’ তাকে বলেছিলাম, মান্না, এই ছবি সুপারহিট হবেই। আসলে মান্নাকে দর্শক নিতে পারছিল না। ২২টি প্রিন্ট বুকিং হয়েছে। তিনটি অফিসে পড়ে আছে। পরিচালক উত্তম আকাশের মা মালতী দেবী কুষ্টিয়ায় হল বুকিং করতেন। তিনি তাঁর মেয়ের জামাই পরিচালক প্রদীপ দে’কে ঈদের আগের দিন ফোন করে বললেন, ‘এখনো তো কোনো ছবি পেলাম না।’ তখন প্রদীপ বললেন, ‘এখনো এই ছবির দুুটি প্রিন্ট বাসায় আছে। আপনি পারসেন্টেজে যান, আস্তে আস্তে এটির বিক্রি বাড়ছে।’ সুচরিতার স্বামীর সঙ্গে আমি এই ছবির ইনভেস্টমেন্ট পার্টনার ছিলাম। প্রদীপের মাধ্যমে ছবিটি কুষ্টিয়ার কেয়া সিনেমা হলে গেল। টানা দুই মাস সেটি হল থেকে নামানো যায়নি। মালতী দেবী একাই পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে ছবিটির ক্যানভাস করেছেন। এরপর যে হলেই গেছে, অন্তত এক মাস চলেছে। শান্তাহারের এক হল মালিক বাসায় মিষ্টি নিয়ে এসে আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার হলটি দেনার দায়ে বন্ধ ছিল। আপনার ছবি বিক্রি করে দেনা শোধ করেও লাখ টাকা লাভ করেছি।’ এই ছবির পর মান্নার পারিশ্রমিক সোয়া লাখ-দেড় লাখে চলে গেল। রাজিব ২০ হাজার থেকে দেড় লাখে গেল। তবে এই ছবিটিও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জীবনে দুঃখ থেকে গেল, আমার ৫০টি ছবির মধ্যে ২৬টির জন্যই সেন্সর বোর্ড থেকে বেরিয়ে সদস্যরা বলেছেন, এটি নিষিদ্ধ। যুদ্ধ করে সেগুলো ছাড়াতে হয়েছে। এরপর ‘সিপাহী’ সুপার হিট হলো। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলে এটিও এক বছর নিষিদ্ধ ছিল। আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক, শেখ রেহানার শাশুড়ি, তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীন ছবিটি দেখে বললেন, এই ছবির জন্য প্রয়োজনে আমরা রাস্তায় নামব। তখনকার তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে পুরো ঘটনা জানানোর পর তাঁর সহযোগিতায় ছবিটি দেখানো গেল। গোপালগঞ্জে বাড়ি হয়েও কোনো দিন আওয়ামী লীগ থেকে আমি কোনো সুবিধা নিইনি। অথচ তত্কালীন আওয়ামী লীগের কালচারাল সেক্রেটারি আলমগীর কুমকুম ছবিটির প্রিন্ট নিয়ে এফডিসি থেকে মেশিন ভাড়া করে জনতার মঞ্চে দুই রাত শো করেছেন।

 

দাঙ্গার পরই তো মান্নার সঙ্গে জুটি গড়ে উঠল? 

তার পর থেকে আমার ছবি মানেই মান্না। সে আমাকে আব্বা ডাকত। অনেক মিটিংয়েও বলেছে, ‘কাজী হায়াত আমার আব্বা। ফিল্মে আমার জন্মদাতা।’ আমরা একসঙ্গে ১৯টি ছবি করেছি। ‘যন্ত্রণা’ ছাড়া সবগুলো সুপারহিট। ‘আম্মাজান’ তো লিজেন্ড ছবি। সে আমার ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত নকল করত। আমার ইশারা বুঝত। মান্না কখনোই ভালো অভিনেতা ছিল না। ‘দেশদ্রোহী’ করতে গিয়ে সে ভালো অভিনেতার স্বীকৃতি পেয়ে গেল। তাকে নিয়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করেছি। যেমন—দেশদ্রোহীতে তাকে দ্রুত কথা বলতে হবে। সে পারছে না। ডেকে বললাম, তোদের টাঙ্গাইলের ভাষায় দ্রুত কথা বলতে পারবি না? সেই থেকে পুরো ছবিতে সে টাঙ্গাইলের ভাষায় কথা বলেছে।

 

১২ বছর পর শবনমকে কিভাবে সিনেমায় আনলেন?

আম্মাজানের কাহিনীটি তৈরির পর সিদ্ধান্ত নিলাম, এই চরিত্রে শাবানাকে নেব। এফডিসির মেকআপরুমে গল্প শুনে তিনি কেঁদে বললেন, ‘কাল শিডিউল দেব।’ তিনি ‘ঈমান’ ছবির নায়িকা ছিলেন, আমি সহকারী পরিচালক। সেই সূত্রে সখ্য ছিল। পরদিন যাওয়ার পর আমার মাথায় হাত রেখে তিনি বললেন, ‘ছবিটি করতে পারব না, দুঃখিত। জসিমকে গল্পটি বলেছি, তারা নিষেধ করেছে।’ তখন তাঁরা জুটি ছিলেন। আওলাদ হোসেন আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। তিনি বলেছেন, শাবানার একমাত্র বিকল্প হতে পারেন শবনম। আপনি আহমেদ জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাঁর স্বামী রবিন ঘোষের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক। আজাচৌকে গল্প বলার পর তিনি যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। শবনমের সঙ্গে চুক্তি হলো। তবে এই ছবিটিও ঈর্ষাবশত ছয় মাস নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ছবিটিতে এক কোটি দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এটি পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা ব্যবসা করেছে। 

 

মান্নার সঙ্গে আপনার কোনো সমস্যা হয়েছিল?

‘মিনিস্টার’ই তার সঙ্গে আমার শেষ ছবি। সেই সমস্যাটির কথা তাহলে বলেই ফেলি—সাধারণত পুরো ছবিটি তৈরি করে ফাইট ডিরেক্টরের হাতে ফাইটের কাজ ছেড়ে দিতাম। প্রথমে আরমান, পরে মোসলেম আমার ফাইট ডিরেক্টর ছিল। এফডিসিতে সেদিন শুটিং করে চলে এসেছি। রাত ৮টা বেজে গেছে, সে সাংবাদিকদের সঙ্গে গল্প করছে। ফাইটের জন্য মোসলেম তাকে ডাকতে সাহস পাচ্ছে না। আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হাসিব গিয়ে তাকে বলল—‘মান্না ভাই, শুটিং করতে আসেন। ওস্তাদ শুনলে রাগ করবেন।’ মান্না খেপে গেল, ‘এই ব্যাটা চুপ কর। আমি মেকআপ না নিলে তোগোরও ভাত নাই, তোগোর ওস্তাদেরও ভাত নাই।’ ডাবিং শেষ হওয়ার ১০-১২ দিন পর হাসিব আমাকে ঘটনা বলল। সারা রাত ঘুম হলো না। রাতভর ছবির গল্প বানালাম। রাত ৩টায় ছেলে মারুফকে ঠেলে জাগিয়ে দিলাম, ওঠো। সে বলল—‘আব্বা, তুমি কি অসুস্থ? হাসপাতালে যাবে?’ বললাম—না, আগামী সপ্তাহ থেকে শুটিং শুরু হবে। তুমি হবে নায়ক। সে স্বপ্নেও এমন কিছু ভাবেনি। কিন্তু আমার জেদ চেপে গেছে, কাজী হায়াৎ মরেনি। সে যে কাউকে হিরো বানিয়ে ছবি হিট করতে পারে। মারুফ ডায়ালগও দিতে পারছিল না। প্রথম চার দিনের শুটিংয়ের চার হাজার ফুট ফেলে দিতে হয়েছে। এই ছবি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে, প্রথম ছবিতেই মারুফ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, আমি শ্রেষ্ঠ পরিচালক। আমার গর্ব—ছাত্ররাজনীতি নিয়ে ‘ত্রাস’ করেছি, মুক্তিযুদ্ধের ওপর ‘সিপাহি’ করেছি, যখন রাজাকার শব্দটিই কোথাও ব্যবহার করা যেত না, আমার ‘ত্রাস’-এ এটি ছিল। তবে সেটি কেটে দিয়েছে, ছবিটি নিষিদ্ধ করেছে।

 

শ্রুতলিখন : রবি হোসাইন

[২৫ আগস্ট ২০১৬, বাংলামোটর, ঢাকা]



সাতদিনের সেরা