kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

দেখিয়ে দাও বাংলাদেশ

বিশ্বকাপে দুর্দান্ত নৈপুণ্য ও সম্প্রতি পাকিস্তানকে   

৫ জুন, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেখিয়ে দাও বাংলাদেশ

একটা সময় এটা ছিল নিছকই রোমাঞ্চ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি রূপ নেয় প্রত্যাশায়, যার প্রায় পুরোটাই কল্পনানির্ভর। ২০১৫ সালের জুনেও কল্পনার মিশ্রণ আছে, তবে এ মিশ্রণে প্রথমবারের মতো মিশে গেছে বাস্তবতাও। হ্যাঁ, টেস্টে এখনই সম্ভব না হলেও তিন ওয়ানডের এক-দুটো জেতার সামর্থ্য বাংলাদেশ দলের আছে। ঠিক ধরেছেন, এক দিনের ক্রিকেটে অমিত শক্তিধর ভারতকে হারানোর ক্ষমতা মাশরাফি বিন মর্তুজাদের আছে।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশ যে সমীহ জাগানিয়া দল, সেটি আর না বললেও চলে। এখনো ঘাটতি আছে অনেক, তবু ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যেকোনো দিন যেকোনো প্রতিপক্ষকে বাংলাদেশ হারাতে পারে; এ বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আর গলা ফাটাতে হয় না। তাই প্রচণ্ড ভারতমুখী স্টার স্পোর্টসও তাদের 'প্রোমো'তে গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশকে। মাত্র এক বছর আগেই 'বি' টিম পাঠানো ভারতও আসছে সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে। এখন আর বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ শুনলেই ক্লান্তির অজুহাত তোলেন না ভারতের মহাতারকারা। মাঠের লড়াই শুরুর আগে এ পরিবর্তনটাই বাংলাদেশের প্রথম জয়ও বটে!

অবশ্য ওয়ানডেতে ভারতের সেরা তারকা বিরাট কোহলি কি আর বাংলাদেশ সিরিজ চলাকালে শুয়ে-বসে কাটাতে পারেন! দলের ফলটাই আগে, তবু বাংলাদেশ সিরিজটা তো ব্যক্তি কোহলির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ঝিমিয়ে পড়া পুরনো শত্রুতা যে বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন করে জ্বালিয়ে দিয়েছেন রুবেল হোসেন! কোহলিকে আউট করার পর রুবেল হোসেনের 'মার্চিং অর্ডার' ২০১৫ বিশ্বকাপেরই সেরা ফ্রেম হয়ে আছে। তবে ওই ছবিই আক্রমণের একমাত্র দৃশ্য নয়, বাংলাদেশ দলের সূত্র থেকে জানা এমন কিছু একটা বলেছিলেন রুবেল, যা বাকি জীবন 'বাংলাদেশ'কে মনে করিয়ে দেবে কোহলিকে! কোনো সন্দেহ নেই ব্যাটসম্যান কোহলি বনাম বোলার রুবেল আসন্ন বাংলাদেশ-ভারত সিরিজের সেরা 'লড়াইয়ের ভেতর লড়াই' হয়ে থাকবে। সে লড়াইয়ে কে জিতবেন বলা মুশকিল, তবে আপাতত অবশ্যই এগিয়ে রয়েছেন রুবেল হোসেন। মুশফিকুর রহিম তো একাই লড়ে যাচ্ছেন ভারতের বিপক্ষে! আইপিএল নিলামের আগে সব দেশের শীর্ষ তারকাদের 'এনওসি' চেয়ে নেয় বিসিসিআই। কিন্তু গতবার সে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরই করেননি বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক। কারণটা বোধগম্য, শুধু শুধু আগ বাড়িয়ে সই করে লাভ কি, আইপিএল তো আর ডাকবে না! একজন সাকিব আল হাসান ছাড়া চাপা এ ক্ষোভ বাংলাদেশ দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের মনেই আছে, যা প্রকাশ করেছেন শুধু মুশফিকই। তাই কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে অন্তত ভারতের বিপক্ষে মরণঝাঁপ দেওয়ার জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী কোনো বক্তব্যের প্রয়োজন হবে না। ভারতকে 'দেখিয়ে দেওয়ার' তাগিদ এমনিতেও কম নেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে।

ক্রিকেট ইন্ডিয়া তো কেবল একটি দেশই নয়, সবচেয়ে অর্থকরী ব্র্যান্ডও। আইপিএলের লেজ ধরে বিশ্বের সাবেক-বর্তমান তারকারা ভিড় করেন ভারতে। ভারত একবার সফরে এলেই যেকোনো দেশের ক্রিকেট বাজেট ঘাটতি মিটে যায়। আর তাই বিখ্যাত হওয়ারও সেরা উপায় ভারতের বিপক্ষে জ্বলে ওঠা। ২০০৭ বিশ্বকাপে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তামিম ইকবাল কিংবা এবারের আসরের রুবেল হোসেনের স্টারডোমে প্রবেশ ভারতের আগল ভেঙেই।

তবে এর সবটাই মাঠের বাইরের আবহ। খেলাটা এমন যে প্রথম বল থেকেই মুছে যায় মাঠের বাইরের সব হিসাব-নিকাশ। ডাউন দ্য উইকেটে এসে উমেশ যাদবকে হাঁকাতে গিয়ে আউট হলে কেউ মনেও রাখবেন না এভাবেই ত্রিনিদাদে জহির খানকে ভড়কে দিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। সবশেষ সিরিজে এই বাংলাদেশেই বোলারদের ছাতুপেটা করেছিলেন বিরাট কোহলি। এবার সেটির পুনরাবৃত্তি হলে রুবেলই উল্টো গ্যালারি থেকেই নির্মম স্লেজিংয়ের শিকার হবেন। বিষয়টা তামিম এত দিনে ভালোভাবে বুঝে গেছেন, আশা করায় যায় উপলব্ধিটা রুবেলের মনেও আছে।

তিনটি ওয়ানডেই হবে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে। ২০১১ বিশ্বকাপের দুঃসহ স্মৃতিটা বাদ দিলে সাম্প্রতিক সময়ে এ মাঠে ভারতের বিপক্ষে সাফল্য আছে বাংলাদেশের। ২০১২ এশিয়া কাপে শচীন টেন্ডুলকারের শততম সেঞ্চুরির উৎসবে জল ঢেলে দেয় বাংলাদেশ। দলের থিঙ্কট্যাঙ্কের হাবভাবে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ওয়ানডের জন্য মিরপুরে স্পোর্টিং উইকেটই দাবি তাদের। কারণটা পরিষ্কার, পেস বোলিংয়ের চেয়ে ভারতের স্পিনটাই বড় দুর্ভাবনা আর বাউন্সারে দূর্বলতা আছে দুই দলেই। তাই অবস্থাদৃষ্টে বাউন্সারের সঙ্গেই 'আপস' করার কথা বাংলাদেশ দলের। তাতে সিরিজের ফল যেকোনো দিকেই হেলে পড়তে পারে। তবে ফল যা-ই হোক না কেন, আসন্ন তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে রোমাঞ্চের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়।

তবে সিরিজ শুরু হচ্ছে টেস্ট দিয়ে। প্রায় ৯ বছর পর আবার ফতুল্লায় ফিরছে টেস্ট ক্রিকেট। ২০০৬ সালে এ মাঠে অনুষ্ঠিত একমাত্র টেস্টটিতে অজেয় অস্ট্রেলিয়াকে প্রায় হারিয়েই দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিছুটা সৌভাগ্য আর রিকি পন্টিংয়ের 'ক্যাপ্টেন্স নক' সেবার আক্ষেপে পুড়িয়েছিল বাংলাদেশকে। যদি ওই টেস্টটিকে বিশ্লেষণ করে ১০ জুন শুরু হতে যাওয়া ম্যাচের ফল আগাম নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়, তাহলে ফেভারিট অবশ্যই বাংলাদেশ। কিভাবে? প্রথমত রিকি পন্টিং-শেন ওয়ার্নের সেই অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে সামর্থ্যে যোজন দূরত্বে পিছিয়ে ভারত। আবার সে সময়ের চেয়ে বর্তমান বাংলাদেশ দল অনেক শক্তিশালী। তাহলে যদি অস্ট্রেলিয়াকে ৯ বছর আগে কাঁপিয়ে দেওয়া বাংলাদেশ কেন হারাতে পারবে না ভারতকে?

আমি-আপনি সবাই জানি, এ প্রশ্নটা পুরোপুরি আবেগনির্ভর। যে সিরিজের উদাহরণ টেনে আনা, সেই সিরিজের পরের টেস্টেই বাংলাদেশের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছিলেন জেসন গিলেস্পি। আসলে ওটা ছিল 'ফ্লুক'। একটি ভালোর পর আরেকটির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘকাল। সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, এখন নিয়মিতই সমানে পাল্লা দেয় মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বাধীন টেস্ট দল। তবে এ দলটিরও জয়ের পক্ষে নিশ্চিত বাজি ধরা যায় একমাত্র জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তাই আমরা প্রবল আশাবাদীরাও বড় দলের বিপক্ষে টেস্টটা ড্র করতে পারলেই খুশি।

আশা করা যায়, সে লক্ষ্যেই ব্যাটিং সহায়ক উইকেট তৈরি হচ্ছে ফতুল্লায়, যেখানে ভারতের কোহলি-পূজারাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান করবেন তামিম-মমিনুল হকরাও। ভারতীয় ইনিংসে তিনটি বড় জুটির বিপরীতে অন্তত দুটো বড় জুটি যেন গড়ে বাংলাদেশ। ওয়ানডের মতো টপাটপ ক্যাচ উঠবে না, তাই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেন স্নায়ুতে ঢিল না দেন বাংলাদেশি ফিল্ডাররা। বোলারদের কাছেও চাওয়া একটাই-টেস্টে হতাশার জায়গা নেই। হতাশা ভুলে ওত পেতে থাকতে হবে সুযোগের জন্য। কাজটা কঠিন। দিনভর মনোসংযোগ ধরে রাখার পরামর্শ দেওয়া যতটা সহজ, তার চেয়েও বহু গুণ কঠিন সেটি মেনে চলা। জানি, কিন্তু টেস্টে ভালো করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। এটা ক্রিকেটাররা আরো ভালো করে জানেন, কিন্তু মাঠে বাস্তবায়নটা পারেন না সেভাবে।

ভারতের বিপক্ষে এ সিরিজের একমাত্র টেস্টটা হোক সে সামর্থ্য মেলে ধরার মঞ্চ, 'টেম্পারামেন্ট' দেখিয়ে দেওয়ার ম্যাচ। তাহলেই হবে সত্যিকারের দেখিয়ে দেওয়া, সেটি শুধু ভারতকে নয়, পুরো ক্রিকেট বিশ্বকেও।

 

 



সাতদিনের সেরা