kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

একটা চক্রের কারণে খেলতে পারিনি

বাংলাদেশ একদিন হয়তো বিশ্বকাপও জিতবে, কিন্তু তাতেও    

১৭ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



একটা চক্রের কারণে খেলতে পারিনি

ছবি : মীর ফরিদ

প্রশ্ন : এমন একদিনে (১৩ এপ্রিল) আপনার সাক্ষাৎকার নিতে বসেছি, যে দিনটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঐতিহাসিক দিন। মনে আছে আপনার?

খালেদ মাসুদ : থাকবে না আবার! এই দিনে আমরা আইসিসি ট্রফি জিতেছিলাম। কেনিয়ার সঙ্গে ফাইনালটা আমাদের জন্য 'প্রেস্টিজ' ম্যাচও ছিল। তাতে জেতায় আমাদের আনন্দ পূর্ণ মাত্রা পেয়েছিল। তবে আসল উৎসবটা আমরা করে ফেলেছিলাম এর কয়েক দিন আগেই। কারণ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচটিই আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার ম্যাচ ছিল সেটি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট কনফার্ম করার আনন্দের সঙ্গে তুলনীয় আর কিছুই হতে পারে না।

প্রশ্ন : দলের অন্য যে কারো চেয়ে সেদিন আপনার আনন্দ একটু বেশিই ছিল বোধ হয়। সেমিফাইনালের ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন আপনিই।

খালেদ মাসুদ : সবচেয়ে ভালো লাগে এটা ভাবলে যে দলের আস্থার প্রতিদান আমি সেদিন দিতে পেরেছিলাম। আগের দিন রাতে ম্যানেজার লিপু ভাই (গাজী আশরাফ হোসেন) ডেকে নিয়ে বললেন, তিন নম্বরে ব্যাটিং করতে হবে। পরদিনই ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে আমি ৭০ রানের ইনিংস খেলে ফেললাম। ওই ইনিংসটা খেলার সময় বুলবুল ভাইয়ের (আমিনুল ইসলাম) সঙ্গে কথোপকথনও কম মজাদার ছিল না।

প্রশ্ন : কী নিয়ে কথা বলছিলেন আপনারা?

খালেদ মাসুদ : তখন তো বাংলাদেশে সবে কিছু কম্পিউটার আসতে শুরু করেছে। অল্প কিছু মানুষের কাছে তখন কম্পিউটার। তো স্কটল্যান্ড ম্যাচের আগে সিএনএস নামের একটি কম্পিউটার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দিল, সেমিফাইনালে বাংলাদেশের কেউ ম্যাচসেরা হলে তাঁকে একটি পেন্টিয়াম ওয়ান কম্পিউটার পুরস্কার দেওয়া হবে। আমি বা আমরা তখন কম্পিউটারের কিছুই বুঝি না। ব্যতিক্রম বুলবুল ভাই। ভাবি কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রী ছিলেন। সেই সূত্রে তখন বাংলাদেশ দলে একমাত্র বুলবুল ভাই-ই কম্পিউটার শিক্ষায় শিক্ষিত। উনি যখন উইকেটে আসেন, ততক্ষণে আমি ২৫-৩০ রান করে ফেলেছি। তো উনি এসেই শুরু করলেন, 'তুই-ই ম্যাচসেরা হবি। আর কম্পিউটারটা আমাকে দিবি।' আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমাকে অনুপ্রাণিত করার জন্যই বারবার তিনি ওই কথা বলছিলেন।

প্রশ্ন : এরপর ফাইনালে ৭ বলে দুই ছক্কায় অপরাজিত ১৫ রানের ইনিংসটিকেও তো ম্যাচ উইনিং বলা যায়। ওই সময় এত স্নায়ুচাপ কী করে সামলেছিলেন?

খালেদ মাসুদ : অনেক সময় কেউ বড় ইনিংস খেললেও সেটির কথা মানুষ খুব একটা মনে রাখে না। কিন্তু দেখা যায় ছোট্ট একটি ইনিংস খেলেও মানুষের মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকা যায়। ২০১১ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে যেমন শফিউলের ইনিংসের অনেক বড় অবদান। ক্রিকেটে ছোট্ট একটি ইনিংসের ওপর দাঁড়িয়েই অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে। আইসিসি ট্রফির ফাইনালে আমার ইনিংসটিও ছিল সে রকম কিছুই। শেষ ১২ বলে ১৮ রান দরকার। এরপর ৬ বলে ১১। সত্যি কথা বললে ওই সময়ে আমি যেন আইসিউতে চলে গিয়েছিলাম। দর্শকদের হইচই-চিৎকারের কিছুই তখন কানে শুনছি না। দলকে জেতাতে হবে, এই বোধই শুধু কাজ করছিল। এমন তীব্র দেশাত্মবোধ জেগে উঠল যে আমি ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করছিলাম। এই ব্যাপারটি আসলে আমি খুব কাছের দু-একজন ছাড়া কারো সঙ্গেই কোনো দিন শেয়ার করিনি। তাই বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না।

প্রশ্ন : শুরু যখন করেছেন, তখন শেষ করলেই ভালো হয়।

খালেদ মাসুদ : একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার যদিও, তবু বলছি। আল্লাহর কাছে চাইছিলাম, 'আমার খুব প্রিয় একটি জিনিস কেড়ে নিয়ে হলেও বাংলাদেশকে ম্যাচটি জেতাও।' সৌভাগ্য যে আল্লাহ আমার প্রার্থনা শুনেছিলেন। ওই প্রার্থনার কারণে পরবর্তীতে নিজের ব্যক্তি-জীবনেও উপকৃত হয়েছি আমি।

প্রশ্ন : বলছেন কী! কিভাবে?

খালেদ মাসুদ : এরপর জীবনে যখনই খারাপ সময় এসেছে, ওই প্রার্থনাই আমাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। নিজেকে এই বলে বোঝাতাম যে আমি তো আইসিসি ট্রফির ফাইনালে জেতার বিনিময়ে একটা প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে রাজিই ছিলাম। তাই যখনই খারাপ সময় আসত, তখনই মনে হতো এবার বোধ হয় আল্লাহ সেটা কেড়ে নিতে চলেছেন।

প্রশ্ন : কিন্তু সেই আইসিসি ট্রফি থেকে তো আপনার অনেক পাওয়ার শুরুও।

খালেদ মাসুদ : এটা ঠিক বলেছেন। আইসিসি ট্রফি যেমন বাংলাদেশ ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট, তেমনি আমারও। গায়ক হিসেবে মানুষের মনে ঠাঁই করে নিতে হলে একটি ভালো অ্যালবামই কিন্তু যথেষ্ট। আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই ছিল। ক্রিকেটার খালেদ মাসুদ পাইলটকে মানুষ চিনল সেই আইসিসি ট্রফি থেকেই। ওটা তাঁর উত্থানের শুরুও।

প্রশ্ন : এবার আপনার ক্রিকেটার হওয়ার গল্পটিও শুনতে চাই।

খালেদ মাসুদ : ক্রীড়ামনস্ক পরিবারে জন্ম আমার। আব্বারা সাত ভাই, প্রত্যেকেই ফুটবল খেলতেন। আব্বা ২০ বছর ঢাকার লিগে খেলেছেন। এমন পরিবারে জন্ম হলে যা হয় আর কি! ছোটবেলা থেকেই খেলার প্রেমে মজে যাই। এমন কোনো খেলা নেই যেটা খেলতাম না। মনে আছে, একবার হকির বিশ্বকাপের সময় রাজশাহীতে আমরা লাকড়ি দিয়ে হকিস্টিক বানিয়ে হকিও খেলেছি। আর রাজশাহীতে আমাদের বাসা সাগরপাড়ায়। যেখানে ১২-১৪টা পুকুর আছে। সেসব পুকুরে কত যে সাঁতরেও বেড়িয়েছি!

প্রশ্ন : আপনার বাবা বিখ্যাত ফুটবলার শামসুল ইসলাম। ফুটবলার না হয়ে ক্রিকেটার হলেন কিভাবে?

খালেদ মাসুদ : আমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো হয়ে গেছে। আব্বা ক্রিকেটই বেশি ভালোবাসতেন। রাত জেগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ম্যাচের ধারাভাষ্য রেডিওতে শুনতে দেখেছি! কিন্তু তিনি হয়েছেন ফুটবলার। আর আমি ফুটবল বেশি ভালোবাসতাম। এখনো ফুটবলই আমার পছন্দের শীর্ষে। অথচ হয়েছি ক্রিকেটার।

প্রশ্ন : কিভাবে ক্রিকেটার হতে শুরু করলেন?

খালেদ মাসুদ : ১৯৮৭ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় রাজশাহীতে জেলখানা মাঠে মিঠু স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হলো। বড়রা খেলছে, তাঁদের সঙ্গে ছোট্ট আমিও রাজশাহী স্পোর্টিং ক্লাবে খেলার সুযোগ পেয়ে গেলাম। সেভেন-এইটে পড়ি তখন। প্রথম ম্যাচেই ফিফটি করে ফেলি। সেই ছোট্ট আমি এত ভালো খেলি যে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ স্কোরারও হয়ে যাই। তখন ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট কাঁপানো শ্রীলঙ্কার ডুমিন্ডাও ওই টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়েছিলেন। ওনাকে কেউ খেলতে পারে না কিন্তু আমি তাঁকে মেরে-ধরে এক ম্যাচে ৯৪ রান করি। ওই টুর্নামেন্ট থেকেই আমার নাম ছড়িয়ে পড়ে। সুবাদে পরের বছর ইউনাইটেড স্পোর্টিংয়ের হয়ে লিগ খেলার সুযোগ পাই। লিগেও ভালো খেলি এবং সেখান থেকেই ঢাকার লিগে খেলার সুযোগ এসে যায়। সুযোগ পাওয়া নিয়েও একটা মজার গল্প আছে।

প্রশ্ন : বলুন না।

খালেদ মাসুদ : আমাকে ঢাকার লিগে খেলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন আসলে একজন শ্রীলঙ্কান। রাজশাহী লিগে খেলতে যাওয়া চামিলা গামাগির (এখন যিনি বাংলাদেশ মহিলা দলের হেড কোচ) খুব মনে ধরেছিল আমার খেলা। তিনি ঢাকার লিগে ওয়ারীর হয়ে খেলতেন। ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে ওয়ারীর রেলিগেশন ম্যাচের আগে তিনিই আমাকে শানু ভাইয়ের (সাবেক ক্রিকেটার শাহনেওয়াজ শহীদ) মাধ্যমে ডেকে পাঠান। ওই ম্যাচে যদিও ভালো খেলতে পারিনি। ওয়ারীও হেরে যায়। আবার রাজশাহীতে ফিরে যাই। পরের মৌসুমে কলাবাগান ক্লাবের টুটুল ভাই (দেওয়ান শফিউল আরেফীন) ডেকে পাঠান। কলাবাগানে তিন বছর খেলার পর মোহামেডান-আবাহনী হয়ে আমার ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের জায়গা করে নেওয়ার পরের গল্প তো আপনারা জানেনই।

প্রশ্ন : অনূর্ধ্ব-১৯ দল, 'এ' দল হয়ে ১৯৯৭-র আইসিসি ট্রফির অনেক আগেই আপনার আন্তর্জাতিক অভিষেকও হয়ে যায়।

খালেদ মাসুদ : হ্যাঁ, ১৯৯৫ সালের শারজা এশিয়া কাপে। ১৯৯৪ সালের শেষদিকে বাংলাদেশ সফরে আসা ইংল্যান্ড 'এ' দলের বিপক্ষে সেঞ্চুরিই আমার জন্য জাতীয় দলের দরজা খুলে দিয়েছিল।

প্রশ্ন : এরপর ১৯৯৭-র আইসিসি ট্রফি-পরবর্তী সময়টা তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য স্বপ্নের মতোই ছিল।

খালেদ মাসুদ : একেবারেই তাই। ওই সময়টায় মাঠের বাইরে ক্রিকেট প্রশাসনের পারফরম্যান্সও দুর্দান্ত ছিল। ১৯৯৯-র বিশ্বকাপ সামনে রেখে তারা আগের বছর দেড় মাসের জন্য যুক্তরাজ্য সফরে পাঠিয়েছিলেন আমাদের। পরের বছর বিশ্বকাপে এর সুফলও আমরা পাই। তবে পাকিস্তানকে হারানোর সময়ও আমরা ভাবিনি যে এত তাড়াতাড়ি টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যাব। ক্রিকেট প্রশাসনের উদ্যোগের ফলেই সেটি সম্ভব হয়েছিল। স্বপ্নের মতো যে সময়টার কথা আপনি বললেন, সেই সময়ে দুজন বিদেশির অবদানের কথাও না বললেই নয়।

প্রশ্ন : বুঝতে পারছি যে কাদের কথা বলতে চলেছেন...

খালেদ মাসুদ : গর্ডন গ্রিনিজ ও এডি বারলো। বাংলাদেশে অনেক বিদেশি কোচ এসেছেন। কিন্তু এঁদের মতো কেউ ছিলেন না। অন্য বিদেশি কোচদের মধ্যে অনেকে বেশ ভালো মানুষও ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশকে কোচিং করিয়ে মোটা অঙ্কের উপার্জনই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এটা অন্যায়ও নয়। কিন্তু গর্ডন ও বারলো ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁরা বাংলাদেশের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণও হয়ে উঠেছিলেন। সত্যিই তাঁরা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের লম্বা সময়ের জন্য না পাওয়াটা তাই আমাদের দুর্ভাগ্যই।

প্রশ্ন : কঠোর পরিশ্রমী ক্রিকেটার হিসেবে আপনার সুনাম ছিল। এখন যেমন মুশফিকুর রহিমের ক্ষেত্রে এটা বলা হয়। তা এত কষ্ট করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল কিভাবে?

খালেদ মাসুদ : আমি খুব ডানপিটে ছিলাম। খুব ভালো গাছে চড়তে পারতাম। তিনতলা সমান ডাবগাছেও দিব্যি উঠে যেতে পারতাম। বাবা-মাকেও যথেষ্ট কষ্ট দিতাম। এর গাছের ডাব চুরি, ওর গাছের আম চুরি-এসব কারণে বাসায় প্রতিবেশীদের অভিযোগ নিয়ে আসার ব্যাপারটি ছিল নিয়মিত। বি বি হিন্দু একাডেমি থেকে এসএসসি পাস করার পর নিজের মধ্যে একটা উপলব্ধি এলো। ঠিক করলাম এমন কিছু করব যেন সারা জীবন বাবা-মা গর্ব করতে পারেন। খেলার জন্য পড়াশোনায়ও অত ভালো করতে পারিনি। তাই খেলা দিয়েই বাবা-মার হাসিমুখ দেখতে চেয়েছি। স্কুল পাস করার পর থেকেই তাই কঠোর অনুশীলনে ডুবে যাই। সেই যে হার্ড ট্রেনিং করার অভ্যাস হয়ে গেল, আজও তা রয়ে গেছে।

প্রশ্ন : ২০০০ সালে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে আপনি ছিলেন অধিনায়ক নাঈমুর রহমানের ডেপুটি। তা একদিন অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্নটা কি তখন থেকেই দেখতে শুরু করেছিলেন?

খালেদ মাসুদ : বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। তবু বলি। অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন আসলে আমি কখনোই দেখিনি। সত্যি কথা বললে, নেতৃত্বের প্রতি নেশাটা আমার কম ছিল।

প্রশ্ন : তবু তো একদিন ঠিক অধিনায়কত্ব পেয়ে গেলেন।

খালেদ মাসুদ : কিন্তু যেভাবে অধিনায়ক হয়েছিলাম, সেভাবে কোনো দিনই হতে চাইনি। যদিও ২০০১ সালের শেষদিকে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময়ই শুনতে পাচ্ছিলাম দুর্জয়কে (নাঈমুর) অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। তাই বলে সিরিজের মাঝপথেই যে সরিয়ে দেওয়া হবে, সেটা ভাবিনি। চট্টগ্রামে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট শেষ হওয়ার পর ম্যানেজার আমাকে ডেকে যখন নির্বাচকদের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই বুঝেছিলাম কিছু একটা হতে চলেছে। আমাকে বলা হল যে ওয়ানডে সিরিজে আমিই অধিনায়ক। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের অনুরোধ করেছিলাম, 'আমি খুব খুশি হব, যদি এই সিরিজে দুর্জয়কে রেখে পরের সিরিজে আমাকে অধিনায়ক করা হয়। কারণ এভাবে সিরিজের মাঝপথে কাউকে ছুড়ে ফেলাটা ভীষণ অসম্মানজনক।' কিন্তু তাঁরা অনুরোধ রাখেননি। কয়েক বছর পরে আরো একবার আমাকে সিরিজের মাঝপথে অধিনায়ক করতে চাওয়া হয়েছিল। সেবার অবশ্য আমি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।

প্রশ্ন : কবে সেটা?

খালেদ মাসুদ : ২০০৩ সালের পাকিস্তান সফরে। মুলতানে সিরিজের শেষ টেস্টের আগে এক বোর্ড কর্মকর্তা পাকিস্তান উড়ে গেলেন। তাঁকে পাঠানোই হয়েছিল আমাকে রাজি করানোর জন্য। এক সন্ধ্যায় তাঁর রুমে ডেকে পাঠানো হলো। গিয়ে দেখি কোচ ডেভ হোয়াটমোরও আছেন। যাওয়ার পথে অধিনায়ক সুজনের (খালেদ মাহমুদ) সঙ্গে হোটেলের করিডরে দেখা। ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কও বেশ ভালো ছিল। ওকে বললাম, 'চাচা, চিন্তা কোরো না। আমি তো জানিই যে কী করব।' ওই রুমে যাওয়ার পর মুলতান টেস্টে আমাকে অধিনায়ক হতে বলা হলো। আমি সরাসরি বলে দিলাম, 'আমি আর নেব না। কারণ আমাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।' সেই সঙ্গে এও বলে আসি, 'দুর্জয়কে বাদ দেওয়ার সময় আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আপনাদের কাছে অনুরোধ, পারলে সুজনকে এই অসম্মানটা করবেন না।'

প্রশ্ন : ওই বছরের শুরুতেই বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার আগে আপনি অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এত দিন পর নিশ্চয়ই বলা যায় যে ঠিক কী কারণে হুট করে ওরকম করেছিলেন।

খালেদ মাসুদ : বিশ্বকাপের আগে বিকেএসপিতে অনুশীলন ম্যাচ খেলতে গিয়েছি। ওখানে বাংলাদেশ দলের থাকা এবং অন্যান্য ব্যবস্থা আগে থেকেই করে রাখার কথা ক্রিকেট প্রশাসনের। কিন্তু গিয়ে দেখি আমরা যে যাচ্ছি, সেটা ওখানে আগে থেকে জানানোই হয়নি। অনুশীলনে বল লাগবে পাঁচটি কিন্তু চেয়ে পাচ্ছি একটি, এ রকম কত যে ঘটনা! মাঠের বাইরের এসব ব্যাপার নিয়ে তো অধিনায়কের ভাবার কথা নয়। দিন দিন মনটা এতই বিষিয়ে উঠছিল যে একদিন ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বিশ্বকাপের পর নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বোর্ডকে জানিয়ে দেই।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ দলের সংবাদ সম্মেলন হয়েছিল পূর্বাণী হোটেলে। মনে পড়ছে, সংবাদ সম্মেলন শেষ করে হোটেলের লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আপনি নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদেই ফেলেছিলেন।

খালেদ মাসুদ : হ্যাঁ, কোনো একটি পদ ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট তো থাকেই। সেই সঙ্গে নিজেকে তখন খুব অপরাধীও মনে হচ্ছিল। আমি জানতাম যে আমাদের প্রস্তুতি মোটেও ভালো হয়নি। অথচ সংবাদ সম্মেলনে বলতে হয়েছে খুব ভালো। মনে হচ্ছিল, আমি আসলে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছি। নিজের মনে প্রশ্ন জাগছিল, অধিনায়কত্বের জন্য এসব আমি কেন করব? কেন মিথ্যে বলব?

প্রশ্ন : তবু তো বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে বিশ্বকাপের অধিনায়ক হিসেবে আপনার নামই লেখা হয়ে আছে?

খালেদ মাসুদ : যেটা খারাপ গেছে, সেটাকে খারাপ বলতেই হবে। বেশি খারাপ দেখায় এ জন্যই যে আমরা এমন দুটো ম্যাচ হেরেছি, যাদের বিপক্ষে আমাদের জেতা উচিত ছিল। কানাডা ও কেনিয়া ম্যাচে। তবে ওই সময়ের কেনিয়া আমাদের চেয়ে অনেক শ্রেয়তর দল ছিল। ওদের স্টিভ টিকোলো মানের ব্যাটসম্যান এখন থাকতে পারে কিন্তু ১০ বছর আগে বাংলাদেশে ছিলই না। আর কানাডা ম্যাচের আগে আমরা জানতামই না ওই দলের খেলোয়াড় কারা কারা। যদিও ভিডিও ফুটেজ দেখে এ বিষয়ে আগাম ধারণা পাওয়ার উপায় আমাদের ছিল। এ ক্ষেত্রে টিম ম্যানেজমেন্ট ফুটেজ সংগ্রহ না করে বিরাট ভুল করেছিল।

প্রশ্ন : সেই বিশ্বকাপ ব্যর্থতার জন্য আপনিও কম অভিযুক্ত হননি। দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার জন্য আপনাকেই দায়ী করে আসা হয়েছে। এত দিন পর আপনি এর কী ব্যাখ্যা দেবেন?

খালেদ মাসুদ : আসলে আমাকে নিয়ে ওই সব নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছিলেন ক্রিকেট বোর্ডেরই কিছু কর্মকর্তা। যাতে মানুষ আমাকে খারাপ চোখে দেখে। বিশ্বকাপের আগে নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার ব্যাপারটি অনেকেই ভালো চোখে দেখতে পারেননি। সেই ক্ষোভ ঝাড়তেই নানাভাবে আমাকে নেতিবাচক জিনিসের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা হয়েছে।

প্রশ্ন : তাঁদের নাম এখন বলা যায়? ওইসব ঘটনায় তখনকার বোর্ড সভাপতি আলী আসগার লবির কী ভূমিকা ছিল?

খালেদ মাসুদ : আমি কারো নামই বলতে চাই না। তবে এটা বলতে দ্বিধা নেই যে লবি ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু উনি সভাপতি হলেও ওনার কোনো ক্ষমতা ছিল না। ক্ষমতা ছিল আরেকজনের হাতে। তবে এটা ঠিক যে ওই সময়ের বোর্ড খুব অগোছালো ও অপেশাদার ছিল। না হলে বিশ্বকাপ দলের প্রস্তুতি নিয়ে এত কাণ্ড হয় নাকি!

প্রশ্ন : তাহলে ২০০৩ বিশ্বকাপ ব্যর্থতার জন্য আপনি কোনো দায় নিতে চান না?

খালেদ মাসুদ : দেখুন, মাইকেল ক্লার্ককে তো খুব ভালো অধিনায়ক বলা হয়। তা ক্লার্ককে স্কটল্যান্ড দলে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলিয়ে দিলেই বোঝা যাবে উনি কত ভালো অধিনায়ক। বলতে চাইছি ভালো অধিনায়ক হতে দলেরও পারফরমেন্স লাগে। ওই বিশ্বকাপে দল হিসেবেই আমরা খুব খারাপ করেছিলাম। অথচ ওই বিশ্বকাপে আমি ছিলাম দলের অন্যতম সর্বোচ্চ স্কোরার। আমার প্রশ্ন, পুরো দলের খারাপ করার দায় কেন শুধু পাইলটকেই নিতে হবে? আসলে ২০০৩ বিশ্বকাপের পর থেকে আমার সঙ্গে সেই যে 'গেম' খেলা শুরু হয়েছিল, সেটি আমার ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়া পর্যন্ত চলেছে। ন্যায়ের কথা বলতে গিয়ে অন্যায়েরও শিকার হয়েছি। আমি জাতীয় দলে আরো দু-এক বছর অনায়াসেই খেলতে পারতাম। কিন্তু কোনো একটা চক্রের কারণে খেলতে পারিনি।

প্রশ্ন : একটু খুলে বলুন।

খালেদ মাসুদ : এত দিন পর এসব বলার খুব ইচ্ছেও নেই আমার। আপনারা তো জানেনই যে নির্বাচক ফারুক আহমেদ ও আতহার আলী খানদের সঙ্গে আমি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলাম। ২০০৪-র ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ম্যানেজার হিসেবে গিয়েছিলেন ফারুক ভাই। আমাদের অনেকের ব্যাটেই তখন কোনো স্টিকার শোভা পায় না। তো একদিন ফারুক ভাই অলক কাপালিসহ আরো কিছু ক্রিকেটারকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে একটি ক্রীড়াসামগ্রী প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ধরিয়ে দিয়ে বলেন ব্যাটে লাগিয়ে নিতে। উনি নিজেও সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অংশীদার। একটা অঙ্ক প্রস্তাব করেন কিন্তু এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব অলকদের আরো ছিল। ওরা এসে আমাকে ধরল। আমি যেন ফারুক ভাইকে গিয়ে কথাগুলো বলি। আমি বলেছিলামও। সেই থেকে ফারুক ভাইদের সঙ্গে আমার যুদ্ধের শুরু।

প্রশ্ন : সেই যুদ্ধে সাদা পতাকা ওড়ানোর চেষ্টা হয়নি?

খালেদ মাসুদ : উল্টো যুদ্ধ আরো বেড়েছে। উনারা রিবকের এজেন্ট হলেন। আমি গিয়ে তাঁদের বললাম, এটা ঠিক হবে না। কারণ এতে করে রিবকের স্পন্সর নিয়ে খেলা ক্রিকেটারদের দলে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। নির্বাচক হিসেবে এই কাজটা করা যে ঠিক হবে না, আমি সেটিই তাঁদের বোঝাতে গিয়ে উল্টো নিজেই ফেঁসে যাই। উনারা ব্যাপারটা ভালোভাবে নেননি। তাই আমাকে 'সাইজ' করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। ওই বিতর্ক সংবাদমাধ্যমেও এসেছিল। কিন্তু বোর্ডের ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় উনারা বেঁচে যান। আর আমাকে ওই ঘটনার বলি হতে হয়। ২০০৭ বিশ্বকাপটা আমার এ জন্যই খেলা হয়নি।

প্রশ্ন : কিন্তু তাঁদের কারো কারো সঙ্গে তো আপনি এখন ব্যবসাও করছেন?

খালেদ মাসুদ : আমি আসলে এত দিন পর ওইসব মনে পুষে রাখতে চাই না। যাঁরা ভুল করে হলেও অন্যায় করেছেন, তাঁদের ক্ষমাও করে দিয়েছি।

প্রশ্ন : এই সুযোগে আপনার বর্তমান পেশাগত জীবনটাও একটু জেনে নিতে চাই।

খালেদ মাসুদ : ওই যে আকরাম ভাই ও আতহার ভাইয়ের সঙ্গে 'থ্রি ক্রিকস' নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলেছি। ক্রিকেটের বিভিন্ন ইভেন্ট করছি। সেই সঙ্গে আকিজ গ্রুপের কোমল পানীয় ক্লেমনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবেও কাজ করছি। তাদের সাতটি ক্রিকেট একাডেমির কার্যক্রমও দেখাশোনা করি। খেলোয়াড়ও তুলে আনতে পারছি। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত রাজশাহীর ক্লেমন একাডেমিরই ফসল।

প্রশ্ন : কোচিংয়ে আছেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ে কোচিংয়ের স্বপ্নও নিশ্চয়ই আছে।

খালেদ মাসুদ : তা আছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন কোনো দিন পূরণ হবে বলে মনে হয় না। খেলা ছাড়ার পর বাংলাদেশ দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এখানে স্থানীয় লোকের ভাত নেই। কাজ হয়তো আপনি পাবেন কিন্তু ভালো সম্মানী পাবেন না। তবে আমার কাছে 'হ্যাপিনেস' মানে এই নয় যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজ করতে হবে। আমি মনের সুখে বিশ্বাসী। জাতীয় দল থেকে চক্রান্তের শিকার হয়ে বাদ পড়লেও আমি ক্লাব ক্রিকেট খেলে দেখিয়ে দিয়েছি যে কী করতে পারি। কোচিংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ছোট পরিসরে কাজ করেই আমি সুখে আছি।

প্রশ্ন : আপনার ব্যক্তিজীবন নিয়েও একটু জানতে চাই।

খালেদ মাসুদ : আমার এক ছেলে। নাম আহনাফ মাসুদ ইউশা। ও স্কলাসটিকায় ক্লাস নাইনে পড়ে। খেলাধুলায় ওর আগ্রহ আছে কিন্তু অত বেশি নয়।

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো আফসোস আছে?

খালেদ মাসুদ : একদমই নেই। যা পেয়েছি, তাতে খুবই খুশি। আইসিসি ট্রফি জয়, বিশ্বকাপ ও অভিষেক টেস্টে খেলাসহ কত ইতিহাসের সাক্ষী আমি নিজেও। যখন ড্রিঙ্কস ব্রেকে বালতিতে করে পানি আসত, বিদেশ সফরে মাত্র ৫ ডলার দৈনিক ভাতা দেওয়া হতো-সেই যুগ থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেট দেখেছি। ভালো সময়টাও দেখেছি। আর কী চাইতে পারি?

প্রশ্ন : ২০০৭ সালের শ্রীলঙ্কা সফরে শেষ টেস্ট খেললেন। আপনিই নাকি সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে আপনাকে বাদ দিয়ে মুশফিককে খেলাতে বলেছিলেন?

খালেদ মাসুদ : এখানেও আমাকে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এক নির্বাচককে বলেছিলাম, শ্রীলঙ্কাকে অলআউট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে উইকেট যেহেতু ফ্ল্যাট, এখানে দেড়-দুই দিন ব্যাটিং করে ফেলতে পারলে টেস্ট ড্র করার একটা সুযোগ তৈরি হবে। বিশ্বাস করতাম মুশফিক আমার চেয়ে ভালো ব্যাটসম্যান। তাই বলেছিলাম আমার জায়গায় ওকে খেলানো যেতে পারে। কিন্তু এর পরই শুনলাম বলাবলি হচ্ছে, পাইলট ভয় পায়। আরে, আমি দক্ষিণ আফ্রিকার মতো জায়গায় গিয়ে ওপেন পর্যন্ত করেছি। আর সেই আমি কিনা ভয় পাব শ্রীলঙ্কার বোলারদের! ওদের এমন কোনো ফাস্ট বোলার কি ছিল যাঁকে ভয় পাব? আশরাফুল যদি মুরালিকে সবচেয়ে ভালো সামলে থাকে, তাহলে দ্বিতীয় নামটাই হবে আমার। যাঁরা ওসব বলে বেড়িয়েছে, তাঁরা রেকর্ড ঘেঁটে দেখুক!

 

 



সাতদিনের সেরা