kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সাপ ও কুমিরের চামড়া ব্যবহারের বিধান

বর্তমানে অত্যন্ত উন্নত প্রক্রিয়ায় চামড়া সংগ্রহ এবং ট্যানিং করা হয়। এই চামড়া দিয়ে তৈরি জুতা, মোজা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই। সুতরাং সাপ কিংবা কুমিরের পরিশোধিত চামড়া ব্যবহার করে প্রস্তুতকৃত ব্যাগ বা অন্যান্য জিনিস ব্যবহার করা জায়েজ

মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাপ ও কুমিরের চামড়া ব্যবহারের বিধান

পশুর চামড়া ব্যবহারের ব্যাপারে শরিয়তের মূলনীতি হলো, বিশেষ প্রক্রিয়ায় চামড়া পরিশোধন (টানিং) করা সম্ভব হলে প্রক্রিয়াজাত চামড়া থেকে তৈরি পণ্য ব্যবহার করা জায়েজ। এ ক্ষেত্রে পশুর চামড়া তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। তা হলো—

১.         ইসলামে কেবল সেসব প্রাণীর চামড়ার তৈরি পণ্য ব্যবহার করা বৈধ যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া হালাল এবং তা শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে জবাই করা হয়েছে।

২.         যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া হালাল নয়, সেগুলোর চামড়া থেকে প্রস্তুতকৃত কোনো কিছুই বৈধ নয়।

বিজ্ঞাপন

৩.         আর কোনো হালাল প্রাণী যদি মারা যায় অথবা শরিয়ত মোতাবেক জবাই না করা হয়, তাহলে তার চামড়া অপবিত্র। তবে যদি তা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিশোধন (টানিং) করা হয়, তাহলে তা পবিত্র হয়ে যাবে।

হাদিসের বক্তব্য : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রক্রিয়াজাতের পর যেকোনো চামড়া পবিত্র হয়ে যায়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৭২৮)

মায়মুনা (রা.) বলেন, তাঁর মুক্তদাসীকে জাকাত থেকে একটি বকরি দান করেছিলেন। বকরিটি মারা গেলে তা ফেলে দেওয়া হলো। নবী (সা.) সেটির পাশ অতিক্রমকালে বলেন, এরা এর চামড়াটা খুলে নিল না কেন? এটা প্রক্রিয়াজাত করে কাজে লাগাতে পারত! সাহাবিরা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এটা তো মৃত। তিনি বলেন, মৃত জীব খাওয়া হারাম। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬১০)

ইবনু ওয়ালা আস-সাবায়ি (রহ.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম যে আমরা মাগরিবে (পশ্চিমাঞ্চল) থাকি। সেখানে আমাদের কাছে অগ্নিপূজকরা মশক নিয়ে আসে, যাতে পানি এবং চর্বিজাতীয় পদার্থ থাকে (আমরা সেগুলো ব্যবহার করব কি?)। তিনি বললেন, তা পান করে নাও। আমি বললাম, এটা কি আপনার নিজের অভিমত? ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, চামড়া  দাবাগাত (পরিশোধন) করলেই তা পবিত্র হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭০১)

ইমামদের বিশ্লেষণ ও মতামত : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদিস মোতাবেক বেশির ভাগ অভিজ্ঞ আলেম আমল করেছেন। তাঁরা মৃত প্রাণীর চামড়ার বিষয়ে বলেছেন, প্রক্রিয়াজাতের পর তা পবিত্র বলে বিবেচিত। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন, প্রক্রিয়াজাতের পর যেকোনো চামড়া পবিত্র হয়ে যায়, কুকুর ও শূকরের চামড়া ছাড়া (তা অপবিত্র ও হারাম)। তাঁর মতের সপক্ষে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

হিংস্র প্রাণীর চামড়ার বিধান : হিংস্র প্রাণীর চামড়ার ব্যবহারকে একদল সাহাবি ও তাঁদের পরবর্তী ইমামরা মাকরুহ বলেছেন। তা পরিধান এবং তার ওপর নামাজ আদায় করতে তাঁরা নিষেধ করেছেন। এই মত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.), আহমদ (রহ.) ও ইসহাকের (রহ.)।

ইসহাক ইবনে ইবরাহিম (রহ.) বলেন, ‘প্রক্রিয়াজাতের পর যেকোনো চামড়া পবিত্র হয়ে যায়’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই কথার তাৎপর্য হলো, যেসব পশুর গোশত খাওয়া বৈধ, এখানে শুধু সেসব পশুর চামড়ার কথা বলা হয়েছে। নজর ইবনে শুমাইলও একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, যেসব পশুর গোশত খাওয়া বৈধ তাকেই (আরবি ভাষায়) ইহাব বলা হয় এবং সে ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদিস প্রযোজ্য।

সিদ্ধান্ত : উল্লিখিত আলোচনার ভিত্তিতে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যেতে পারে।

এক.       সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর, কচ্ছপ ইত্যাদি প্রাণীর যেহেতু গোশত খাওয়া হারাম, সেহেতু এগুলোর চামড়াও অপবিত্র। সাধারণত অপবিত্র জিনিস দ্বারা তৈরীকৃত ব্যাগ, জুতা, মোজা ইত্যাদি ব্যবহার করাও বৈধ নয়।

দুই.       বর্তমানে অত্যন্ত উন্নত প্রক্রিয়ায় চামড়া সংগ্রহ এবং ট্যানিং করা হয়। ইসলামে এ প্রক্রিয়াকে ‘দাবাগাত’ বলা হয়েছে। দাবাগাতকৃত চামড়া পবিত্র এবং তার ব্যবহার জায়েজ। এ চামড়া ব্যবহারে তৈরি জুতা, মোজা, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই। সুতরাং সাপ কিংবা কুমিরের পরিশোধিত চামড়া ব্যবহার করে প্রস্তুতকৃত ব্যাগ বা অন্যান্য জিনিস ব্যবহার করা জায়েজ।

আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভালো জানেন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা



সাতদিনের সেরা