kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

মুসলিম নেতৃত্বের সংকট যেখানে

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.)   

২০ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুসলিম নেতৃত্বের সংকট যেখানে

একটি ধারণা মুসলিমসমাজকে হতাশ ও দ্বিনের ব্যাপারে উদাসীন করে তুলছে। তা হলো, মুসলিমসমাজে দ্বিনদারির পরিমাণ কমছে। তাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণ, নিষ্ঠাবান ও সৎ লোক নেই। এটি অত্যন্ত অন্যায় ও ভুল কথা।

বিজ্ঞাপন

এটি সত্য সমাজে এমন লোকের সংখ্যা কম। এটা নতুন কোনো কথা নয়। সব যুগেই সৎ ও ভালো মানুষের সংখ্যা কম হয়। আল্লাহর এই বিস্তীর্ণ পৃথিবীতে এমন হাজার হাজার মানুষ আছে, যাদের ব্যাপারে নিম্নোক্ত বক্তব্যটি সত্য, ‘কত ধুলাধূসরিত এলোমেলো চুলের অধিকারীরা এমন, যদি তারা আল্লাহর নামে শপথ করেন তবে আল্লাহ তা পূরণ করেন। ’ এমন মানুষ যদিও খুব বেশি দেখা যায় না, তবে এমন ভালো মানুষ অবশ্যই পৃথিবীতে আছে। আর সত্য নবীর অনুসারী মুসলিম জাতির ভেতরই সৎ ও ভালো লোকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রত্যেক যুগেই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজের জীবন, সম্পদ, আশ্রয়, ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বিসর্জন দেওয়ার মতো লোক মুসলিমসমাজে ছিল এবং এখনো আছে। সংখ্যায় তারা কম হওয়া আল্লাহর নীতি ও প্রজ্ঞার অংশ। কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এক সম্মানিত রাসুলের বাহিত বার্তা। এটা কোনো কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস করো। এটা কোনো গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন করো। ’ (সুরা হাক্কাহ, আয়াত : ৪০-৪২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলো, তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তঃকরণ। তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। ’ (সুরা মুলক, আয়াত : ২৩)

আল্লাহ আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে তার শাস্তি দেন আর যখন তারা নামাজে দাঁড়ায়, তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়, শুধু লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে। ’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৪২)

ঈসা (আ.)-এর বক্তব্য অনুসারে এই অল্পসংখ্যক কৃতজ্ঞ বান্দার জন্যই এই পৃথিবী স্থিতিশীল আছে, তার অস্তিত্ব টিকে আছে। তবে এই বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে যে অতীতের তুলনায় বর্তমান যুগে ভালো মানুষের সংখ্যা আরো বেশি কমে গেছে। অন্যদিকে সত্য অস্বীকারকারীদের সংখ্যা বহু গুণে বেড়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সমাজের এই অধপতনের জন্য কারা বেশি দায়ী। সাধারণ মানুষ, নাকি মুসলিমসমাজের নেতারা?

ঢালাওভাবে বলা হয়, বর্তমানে মুসলিম জাতি সেনাপতিহীন একটি সেনাবাহিনীর মতো। এই জাতি সঠিক নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত। বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের ব্যাপারে বলা হয়, তারা নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে একজন ধর্মীয় রাজনীতিক আমাকে বলেন, এখানে নেতৃত্বের অভাব নেই; বরং সাধারণ শ্রেণির ভেতর আনুগত্যের অভাব আছে। তিনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের ভেতর পার্থিব জীবনের মোহ এত প্রবল হয়েছে যে তাদের ভেতর উম্মাহচিন্তা লোপ পেয়েছে এবং তারা পাশ্চাত্য ফেতনায় আক্রান্ত। নতুবা যোগ্য নেতা সমাজে আছে।

নেতৃত্বের অভাব নেই। নেতৃত্বের ভিড় বেড়ে গেছে এবং প্রত্যেক নেতা নিজের মতের পক্ষে অনড় হওয়ায় মুসলিমসমাজে বিভক্তি ছড়াচ্ছে। যেমন—তারা আল্লাহর বাণী ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধোরো, বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ দ্বারা মানুষকে উপদেশ দেয়। তারা বলে, পৃথিবীর সব অগ্রসর জাতির উন্নতির রহস্য জাতিগত ঐক্য। তারা সব রকম যুক্তি দেবে। কিন্তু কাজের ক্ষেত্র হিসেবে তারা এমন গোষ্ঠীকে বেছে নেয়, যারা আগে থেকেই স্বাতন্ত্র্যের দাবি করে এবং নতুন ধারার প্রবর্তক। সুতরাং তাদের ঐক্যের আহ্বানের অর্থ হলো সবাই আমার পতাকাতলে একতাবদ্ধ হও, আমার আনুগত্যের শপথ কোরো এবং মত ও মতাদর্শ প্রচারে সর্বাত্মক মনোযোগ দাও। আমার মতাদর্শকেই সিরাতে মুস্তাকিম হিসেবে মেনে নাও।

একই সময়, একই দেশে বাস করে এবং একই ধর্মের অনুসারী হয়ে এভাবে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাওয়া দুঃখজনক। বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্র মুসলিমরা সংকটকাল কাটাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে বহুমুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কত কত গোষ্ঠী সক্রিয়। বিপরীতে খুব সামান্যসংখ্যক মুসলমানের পক্ষে কাজ করছে। এখন যদি আমরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকি, তবে আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। আমরা সর্ব বিষয়ে একমত হতে না পারলেও ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থে একত্রে কাজ করে যাব।

তামিরে হায়াত থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর



সাতদিনের সেরা