kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

আশুরার ভিত্তিহীন ৬ বর্ণনা

আশুরা দিবস এলেই কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার প্রচার হয়। যেমন—ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এ ঘটনাগুলো লোকমুখে প্রসিদ্ধ থাকলেও এ সম্পর্কে কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা নেই

ইবরাহিম সুলতান   

৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আশুরার দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে

আশুরা দিবস সামনে এলেই আমাদের দেশের অনেক আলোচক তাঁদের আলোচনায় আশুরা দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে বলে থাকেন, ‘হাদিস শরিফে এসেছে, এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে। ’

হাদিসবিশারদদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই বর্ণনাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওজি ওই বর্ণনা সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, ‘এটা নিঃসন্দেহে মওজু বর্ণনা। ’ হাফেজ সুয়ুতি (রহ.) ও আল্লামা ইবনুল আররাক (রহ.)-ও তাঁর ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

(কিতাবুল মওজুআত : ২/২০২, আল লাআলিল মাসনুআ : ২/১০৯, তানজিহুশ শরীআতিল মরফুআ : ২/১৪৯)

তবে জুমার দিন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা বিশুদ্ধ বর্ণনায় এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, জুমার দিনই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (মুসলিম, হাদিস : ১৮৬২)

আশুরার রোজার নির্দিষ্ট ফজিলত

আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকে বলে থাকেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখে সে ৬০ বছর দিনে রোজা রাতে ইবাদত করার সওয়াব লাভ করে। ’ হাদিসের ইমামদের মতে এটি  জাল বর্ণনা। কারণ এই বর্ণনাটি  হাবিব ইবনে আবি হাবিব নামক এক হাদিস জালকারী থেকে বর্ণিত। এ জন্য ইবনুল জাওজি  (রহ.). বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে ভিত্তিহীন বর্ণনা। ’ (আলমাউজুআত : ২/২০৩)

আশুরায় নির্দিষ্ট নিয়মে নামাজ পড়া

এদিনে নির্দিষ্ট নিয়মে নামাজ পড়ার অনেক পদ্ধতি ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন—জোহর ও আসরের মাঝখানে চার রাকাত নামাজ পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে সুরা ফাতিহা ও ১০ বার আয়াতুল কুরসি পড়বে, ১১ বার সুরা ইখলাস পড়বে, পাঁচবার সুরা নাস ও ফালাক পড়বে। যখন সালাম ফিরাবে, ৭০ বার আসতাগফিরুল্লাহ বলবে বা প্রতি রাকাতে সুরা ফাতিহার সঙ্গে ৫০ বার সুরা ইখলাস পড়বে। তাহলে আল্লাহ তাআলা তার ৫০ বছরের গুনাহ মাফ করবেন এবং জান্নাতে তার জন্য ১০০০ প্রাসাদ তৈরি করবেন।

এ ধরনের যত বর্ণনা আছে সবই ভিত্তিহীন। কারণ আশুরায় নির্দিষ্ট নিয়মে নামাজ পড়ার কোনো বিধান শরিয়তে নেই। এগুলো মূলত শিয়া সম্প্রদায় রচনা করেছে।

নবীদের নামে মিথ্যা বর্ণনা

আশুরা দিবস এলেই আমাদের মাঝে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার প্রচার হয়। যেমন— ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ইউসুফ (আ.) জেল থেকে মুক্ত হয়েছেন এবং আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল ইত্যাদি। এ ঘটনাগুলো লোকমুখে প্রসিদ্ধ থাকলেও এ সম্পর্কে কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা নেই। কেবল মুসা (আ.) তাঁর কওমসহ ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা পান এবং ফেরাউন তার দলবলসহ সমুদ্রে ডুবে মারা যায়—এ কথা সত্য। (আল-আছারুল মারফুআ পৃষ্ঠা : ৯৪-১০০)

শোক পালনার্থে  পিপাসার্ত থাকা

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) লিখেছেন, কিছু মনপূজারি লোক আশুরার দিন কুসংস্কারে লিপ্ত হয়। যেমন—পিপাসার্ত থাকা, পেরেশান হওয়া, ক্রন্দন করা ইত্যাদি। এগুলো বিদআত। এগুলো আল্লাহ, তাঁর রাসুল, সালফে সালেহিন, আহলে বাইত প্রমুখ অনুমোদিত নয়। নিশ্চয়ই হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে পূর্ব যুগে ফিতনার সূচনা হয়। তাতে আমাদের করণীয় হলো, যা মসিবতের সময় করণীয়। সেটি হলো, ইন্না লিল্লাহ... পড়া, ধৈর্য ধরা, হা-হুতাশ না করা, নিজের আত্মাকে কষ্ট না দেওয়া। অথচ বর্তমানে বিদআতিরা এসব করে থাকে। তাতে তারা অনেক মিথ্যা ও সাহাবাদের ব্যাপারে খারাপ বিবরণ পেশ করে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অপছন্দ করেন। (হাকিকাতুস সুন্নাহ ওয়াল বিদআতি : ১/১৪৭)

আশুরায় রোগীর সেবার ফজিলত

অনির্ভরযোগ্য বই ‘মকছুদোল মোমেনিন’-এ উল্লেখ আছে, ‘আশুরার তারিখে যে ব্যক্তি কোনো রোগীর শুশ্রূষা করল সে যেন সমস্ত আদম সন্তানের সেবা-শুশ্রূষা করল। ’

বর্ণনাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ ধরনের বর্ণনা নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিসের কিতাবে নেই।

 

 



সাতদিনের সেরা