kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

হাফসা বিনতে সিরিন

সোনালি যুগের বিদূষী নারী

উম্মে জাওয়াদ হাবিবা   

২০ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সোনালি যুগের বিদূষী নারী

মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবিদের শিক্ষা ও সান্নিধ্যে যে আলোকদীপ্ত কাফেলার সৃষ্টি হয় তাদের তাবেঈন বলা হয়। তাবে-তাবেঈনরাই পরবর্তী সময়ে মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আলোর মশালধারী এই কাফেলায় পুরুষের পাশাপাশি ছিল নারীদেরও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। হাফসা বিনতে সিরিন তেমনই একজন বিদূষী নারী ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

জন্ম : হাফসা বিনতে সিরিন ৩১ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তখন ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাসনামল। তাঁর পিতা সিরিন (রহ.) ছিলেন সাহাবি আনাস বিন মালিক (রা.)-এর আজাদকৃত দাস এবং তাঁর মা সাফিয়্যা (রহ.) ছিলেন আবু বকর (রা.)-এর আজাদকৃত দাসী।

শৈশব ও জ্ঞানার্জন : সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর সান্নিধ্যেই হাফসা বিনতে সিরিন (রহ.)-এর শৈশব কেটেছে। তিনি আয়েশা (রা.)-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আয়েশা (রা.)-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা তাদের মেধা, প্রতিভা ও জ্ঞানের কারণে প্রসিদ্ধ ছিলেন, হাফসা বিনতে সিরিন তাদের অন্যতম। নারীদের মধ্যে কেউ আয়েশা (রা.)-এর শিক্ষার্থী উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান, হাফসা বিনতে শিরিন ও আয়েশা বিনতে তালহা (রহ.)-এর চেয়ে বেশি জ্ঞানী কেউ ছিল না। ’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)

কোরআনের প্রতি ভালোবাসা : মাত্র ১২ বছর বয়সে কোরআন হিফজ করে হাফসা বিনতে সিরিন (রহ.)। কোরআনের ভালোবাসা ছিল তাঁর আজীবনের সঙ্গী। তিনি প্রতি রাতে অর্ধেক কোরআন পাঠ করতেন। আল্লামা ইবনুল জাওঝি (রহ.) বলেন, ‘হাফসা ১২ বছর বয়সে কোরআন হিফজ করেন এবং প্রতি দুই দিনে একবার কোরআন খতম করতেন এবং বছরের বেশির ভাগ দিনে রোজা রাখতেন। ’ (আল-মুনতাজিম)

হাফসা বিনতে সিরিন (রহ.)-এর ভাই মুহাম্মদ বিন সিরিন (রহ.), যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য বিখ্যাত ছিলেন তাঁর কাছে কোরআনের কোনো বিষয় জটিল মনে হলে তিনি বলতেন, যাও হাফসার কাছে যাও, দেখো সে কী বলে? (সিফাতুস সাফওয়া : ২/২৪২)

যুগশ্রেষ্ঠ আলেমা : হাফসা বিনতে সিরিন ছিলেন তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, ইসলামী আইনজ্ঞ ও হাদিস বিশারদ। অসংখ্য পুরুষ ও নারী তাঁর কাছে কোরআন ও হাদিসের জ্ঞান লাভ করেছে। তিনি তাদের সম্বোধন করে বলতেন, ‘হে যুবকরা, যৌবন থাকতে তোমরা তোমাদের পাথেয় অর্জন করে নাও। কেননা যুবকরাই তাদের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়। ’ তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বসরার বিচারক ইয়াস বিন মুয়াবিয়া আল-মুজনি (রহ.) সবচেয়ে বিখ্যাত। তাঁকে প্রথম হিজরি শতকের শেষ ভাগের অন্যতম তাবেঈন গণ্য করা হয়। এ ছাড়া আইয়ুব আস-সাখতিয়ানি, কাতাদা বিন দিআমা, হিশাম বিন হিসান, খালিদ আল-হাজ্জার নাম উল্লেখযোগ্য।

বহু ঐতিহাসিকের মত হলো সমসাময়িকদের মধ্যে হাসান বসরি ও মুহাম্মদ বিন সিরিন (রহ.) বেশি বিখ্যাত হলেও জ্ঞানগত মর্যাদার দিক থেকে অগ্রগামী ছিলেন হাফসা বিনতে সিরিন (রহ.)। মুহাম্মদ বিন সিরিন বলেন, ‘আমি তাঁর চেয়ে কাউকে বেশি মর্যাদাবান মনে করি না। ’ (সিয়ারু আলামুন নুবালা : ৪/৫০৭)

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা : হাফসা বিনতে সিরিনের আল্লাহপ্রেম ছিল প্রবাদতুল্য। তিনি সব সময় আল্লাহর সাক্ষাতের অপেক্ষা করতেন। মৃত্যুর প্রস্তুতি হিসেবে সঙ্গে কাফনের কাপড় বহন করতেন। বিশেষত রমজানের শেষ দশকে কাফনের কাপড় পরিধান করে থাকতেন। তিনি দিন-রাত ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। হাফসা বিনতে সিরিনের সেবিকাকে যখন তাঁর সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন সে বলে—তিনি অত্যন্ত নেককার নারী। কেমন যেন তিনি বড় কোনো পাপ করেছেন। ফলে পুরো রাত নামাজ পড়ে ও কান্না করে।

মৃত্যু : ১০১ হিজরিতে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ভাই মুহাম্মদ বিন সিরিন তাঁর জানাজার নামাজের ইমামতি করেন। বসরা সর্বশ্রেণির মুসলমান তাঁর জানাজায় অংশ নেন।

     তথ্যসূত্র : মানার আল-ইসলাম

ও আর-ইত্তিহাদ

 



সাতদিনের সেরা