kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

কোরআন ও হাদিসে স্বর্ণ প্রসঙ্গ

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

২৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোরআন ও হাদিসে স্বর্ণ প্রসঙ্গ

স্বর্ণ একটি হলুদ বর্ণের ধাতু। মহান আল্লাহ এই মূল্যবান ধাতু দিয়ে পৃথিবীকে সুশোভিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালোবাসা—নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রুপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগ্যসামগ্রী।

বিজ্ঞাপন

আর আল্লাহ—তাঁর কাছেই আছে উত্তম আশ্রয়স্থল। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪)

হাজার হাজার বছর থেকে স্বর্ণকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও অভিজাত মানুষদের ব্যাপকভাবে স্বর্ণের অলংকার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তারই ধারাবাহিকতায় মুসা (আ.) নবুয়তের দাবি করলে তাঁর গোত্রের লোকেরা মুসা (আ.)-এর কাছে কী পরিমাণ স্বর্ণ আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তবে সে নবী হলে তাকে স্বর্ণের বালা দেওয়া হলো না কেন, অথবা তার সঙ্গে দলবদ্ধভাবে ফেরেশতারা এলো না কেন?’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৫৩)

তাফসিরের কিতাবে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখা হয়, সে যুগে মিসর ও পারস্যের বাদশাহরা (জনসাধারণের ওপর) পৃথক মর্যাদা ও বিশেষ সম্মানকে বিকশিত করার জন্য সোনার বালা পরিধান করত। অনুরূপ গোত্রের সর্দারদের হাতেও সোনার বালা এবং গলায় সোনার হার ও চেন পরিয়ে দেওয়া হতো। আর এগুলোকে তাদের সর্দারির নিদর্শন মনে করা হতো। এ জন্যই ফিরাউন মুসা (আ.) সম্পর্কে বলল যে যদি তাঁর কোনো মর্যাদা ও পৃথক কোনো বৈশিষ্ট্য থাকত, তবে তাঁর হাতে সোনার বালা থাকা উচিত ছিল। (তাফসিরে আহসানুল বয়ান)

বাস্তবতা হলো দুনিয়া বিপুল পরিমাণ সোনা-রুপা লাভ করার জন্য আল্লাহর বিশেষ বান্দা হওয়া জরুরি নয়। দুনিয়াতে মহান আল্লাহর এই নিয়ামত বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সবাই ভোগ করতে পারবে। যেহেতু দুনিয়া পরীক্ষাগার।

যারা দুনিয়াতে এই নিয়ামত পেয়ে তার শুকরিয়া আদায় করবে এবং মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তা পরিচালনা করবে, তারা সফলকাম হবে। যারা তা করবে না, তাদের জন্য কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, নিশ্চয়ই পণ্ডিত ও সংসার বিরাগীদের অনেকেই মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, আর তারা আল্লাহর পথে বাধা দেয়। এবং যারা সোনা ও রুপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে সেগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে এবং সে সব দিয়ে তাদের কপাল, পাঁজর আর পিঠে দাগ দেওয়া হবে, বলা হবে, এগুলোই তা, যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। কাজেই তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তার স্বাদ ভোগ করো। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৪-৩৫)

এর বিপরীতে যারা ঈমানদার, আখিরাতে এই নিয়ামত আরো বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে তাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্থায়ী জান্নাতে তারা প্রবেশ করবে। যেখানে তাদের স্বর্ণ ও মুক্তার কঙ্কণে অলংকৃত করা হবে। যেখানে তাদের পোশাক হবে রেশমের। ’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৩৩)

অন্য আয়াতে আছে, ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদের (জান্নাতবাসীদের) প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তা-ই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী। (সুরা : আজ-জুখরুফ, আয়াত : ৭১)

রাসুল (সা.) যখন মিরাজে গমন করেন, তখন মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধুর সম্মানার্থে সিদরাতুল মুনতাহায় সোনার প্রজাপতির মেলা বসিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন কুলগাছটিকে যা আচ্ছাদিত করার তা আচ্ছাদিত করেছিল। ’ (সুরা : আন-নাজম, আয়াত : ১৬)

অর্থাৎ যখন বদরিকা বৃক্ষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আচ্ছন্নকারী বস্তু। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, তখন বদরিকা বৃক্ষের ওপর স্বর্ণ নির্মিত প্রজাপতি চতুর্দিক থেকে এসে পতিত হচ্ছিল। (নাসায়ি, হাদিস : ৪৫১)

মনে হয়, আগন্তুক মেহমান রাসুল (সা.)-এর সম্মানার্থে সেদিন বদরিকা বৃক্ষকে বিশেষভাবে সজ্জিত করা হয়েছিল। (কুরতুবি)

বাল্যকালে মহানবী (সা.)-এর বক্ষ বিদীর্ণ করার জন্য মহান আল্লাহ যে ফেরেশতাদের পাঠিয়েছিলেন, তারাও স্বর্ণের পাত্রে রেখে জমজমের পানি দ্বারা মহানবী (সা.)-এর কলব মোবারক ধৌত করেছিলেন। (মুসলিম, হাদিস : ৩০২)

স্বর্ণ নিয়ে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী আছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে ফোরাত নদী তার ভূগর্ভস্থ সোনার খনি বের করে দেবে। সে সময় যারা উপস্থিত থাকবে তারা যেন তা থেকে কিছুই গ্রহণ না করে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৭১১৯)

শুধু তা-ই নয়, আইয়ুব (আ.)-এর কাছেও মহান আল্লাহ স্বর্ণের পঙ্গপাল পাঠিয়েছেন বলে হাদিসে বর্ণনা পাওয়া যায়। (বুখারি, হাদিস : ৭৪৯৩)

পৃথিবীতে একসময় সোনা-রুপার মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন ছিল, এখন মানুষ সরাসরি  সোনা-রুপার মুদ্রা ব্যবহার না করলেও সোনা-রুপার ব্যবহার ও বেচাকেনার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এগুলোর বেচাকেনার ব্যাপারে ইসলামের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে, যদি কেউ সঠিক পদ্ধতিতে এগুলোর বেচাকেনা না করে, তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আবু বকর (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, সমান সমান ছাড়া তোমরা সোনার বদলে সোনা বিক্রয় করবে না। অনুরূপ রুপার বদলে রুপা সমান সমান ছাড়া (বিক্রি করবে না)। রুপার বদলে সোনা ও সোনার বদলে রুপা যেভাবে ইচ্ছা, কেনাবেচা করতে পারো। (বুখারি, হাদিস : ২১৭৫)

এ ছাড়া পুরুষের জন্য স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করা ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নাজরানের এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এলো, তার হাতে ছিল সোনার আংটি। তখন রাসুল (সা.) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বলেন, তুমি আমার কাছে এসেছ, অথচ তোমার হাতে রয়েছে আগুনের অঙ্গার। (নাসায়ি, হাদিস : ৫১৮৮)

এবং নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য স্বর্ণের তৈজসপত্র ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

উম্মে সালামাহ (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে লোক স্বর্ণ বা রৌপ্য দ্বারা নির্মিত বাসনে পান করে সে শুধু তার পেটে জাহান্নামের অগ্নি প্রবেশ করায়। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৫২৮১)

প্রতিটি মুমিনের উচিত, মহান আল্লাহর নিয়ামতগুলো আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে ব্যয় করা।



সাতদিনের সেরা