kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনে অবহেলা নয়

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি   

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনে অবহেলা নয়

বহু মানুষ, যাদের সামান্য লেখাপড়া আছে, যাদের কিছু লেখালেখি, যাদের প্রতি মানুষের মনোযোগ আছে, তারা মনে করে আমরা কিছু জানি-বুঝি, তাহলে কেন অন্যের কথা শুনতে যাব, অন্যের কাছে বুঝতে যাব। কারো সান্নিধ্যে থেকে উপকৃত হওয়ার প্রয়োজন আমার নেই। তাদের এমন চিন্তা মোটেও ঠিক নয়, বরং বাস্তবতা হলো, একজন মানুষ যে স্তরেরই হোক এবং যে বয়সেরই হোক, সে খ্যাতিমান হোক বা অখ্যাত হোক, সে আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন ও কোনো বুজুর্গের সান্নিধ্য থেকে অমুখাপেক্ষী নয়। সাহাবায়ে কিরাম (রা.), যাঁরা মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন এবং যে সান্নিধ্যের মূল্য ও প্রভাব আমরা ভাষায় বর্ণনাও করতে পারব না, তার পরও তাঁরা নিজেদের ঈমান বৃদ্ধির চিন্তায় থাকতেন, তাঁরা ভাবতেন কিভাবে তাঁদের দ্বিনি অবস্থার উন্নতি ঘটবে, অন্তরে ঈমানের সেই অনুভূতি জাগ্রত হবে, যা মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্যে হতো। ইমাম বুখারি (রহ.) সাহাবিদের একটি উক্তি বর্ণনা করেছেন, ‘আমাদের সঙ্গে বসো, আমরা কিছুক্ষণ ঈমানের আলোচনা করি।’ অর্থাৎ এসো ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করি, ঈমানের অনুভূতি জাগ্রত করি এবং সে আনন্দ ভাগ করে নিই। এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, ঈমান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সান্নিধ্য ও আলোচনার প্রয়োজন সাহাবায়ে কিরাম (রা.) অনুভব করেছিলেন। তাহলে পরবর্তী লোকেরা কিভাবে তা থেকে অমুখাপেক্ষী হয়? অভিজ্ঞ লোকেরা জানে, মানুষের আলোচনা শুনলে তার প্রভাবে অন্তরে বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। নিজে বললে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় না। সুতরাং যারা অন্যদের উদ্দেশে কথা বলে, তাদের উচিত কখনো কখনো অন্যের কথা শোনা, কখনো কখনো অন্যের থেকে উপকৃত হওয়া, কখনো বক্তা না হয়ে শ্রোতা হওয়া, মনোযোগসহ কোনো বুজুর্গ ব্যক্তির আলোচনা শোনা। যেন অন্তরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়, যাকে অন্তরের জীবন বলে।

যাদের সামান্য অভিজ্ঞতা আছে এবং যাদের অন্তর মৃত নয়, তারা জানে অন্যের তুলনায় নিজের ঈমানকে হাজার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আর তা হয় আল্লাহওয়ালাদের কথা বিনয় ও শিষ্টাচারের সঙ্গে শোনার দ্বারা। যদি সে মনে করে, আমি বড় হয়ে গেছি এবং আমি অমুখাপেক্ষী, তবে তার চেয়ে বড় বঞ্চিত ও হতভাগ্য কেউ নেই। বুজুর্গ আলেমরা বিষয়টিকে এভাবে উপস্থাপন করেন, কোনো ফকির যদি চিৎকার করে বলে যে আমার কাছে সব কিছু আছে, তবু আমি চিৎকার করি। তবে বড় বড় দানশীল ব্যক্তিরও তার জন্য দয়া হবে না। মানুষের দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করতে হলে নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করা আবশ্যক। আল্লাহর সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভের জন্যও প্রয়োজন হলো আল্লাহওয়ালাদের দরবারে নিজেকে নিঃস্ব, অসহায় ও মুখাপেক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা এবং এটি বোঝানো যে তাঁর দরবার থেকে কিছু নেওয়ার জন্যই এখানে আসা হয়েছে।

কিছুদিন পর পর আমার মনে হতো, আমি এমন কোনো বুজুর্গের সেবায় উপস্থিত হই। এমন সময়ে আমাদের কাছাকাছি বুজুর্গদের মধ্যে মাওলানা ওয়াসিউল্লাহ (রহ.)-কে সবচেয়ে বেশি স্নেহপরায়ণ মনে হতো। আর মুনাসিবাতের (সব দিক থেকে অনুকূল হওয়া) বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে মানুষের ইচ্ছার বাইরে। এ ক্ষেত্রে কোনো নির্ধারিত নিয়ম বা মূলনীতি নেই যে আনুকূল্য কেন তৈরি হয়, কিভাবে হয় এবং কখন হয়? কোনো বুজুর্গের সঙ্গে আনুকূল্য তৈরি আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। যা-ই হোক, আমি হজরতের কাছ থেকে উপকৃত হতাম।

তাঁর স্নেহ সম্পর্কে অনেকেই জানেন, তাই বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করছি না। হজরতের দরবারে উপস্থিত হলে নিজের কাছে আমাকে মূর্খ ও বোবা বলে মনে হতো। তিনি যা বলতেন, তাঁর কাছ থেকে যা শিখতাম, তা আমার সাধ্যের বাইরে মনে  হতো। আমার উপলব্ধি হলো, দ্বিনের মর্ম বুজুর্গদের সান্নিধ্যে গেলেই জানা যায়। তাদের যদি কোনো উপকার না হয়, তবে এতটুকু উপকার তো হয়ই যে সে কিছু জানে না, তার জানার প্রয়োজন আছে। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি যখন কোনো বুজুর্গের সান্নিধ্য লাভ করে, তখন বড় আঘাতটি লাগে তার মস্তিষ্কে। তার মনে হয়, আমি তো নিতান্তই মূর্খ ও অজ্ঞ। আমি শুধু কিছু অক্ষরজ্ঞান রাখি। দ্বিনের প্রকৃত জ্ঞান থেমে আমি বহুদূরে। আমার স্মরণ আছে, যখন মাওলানা সাইয়েদ সোলায়মান নদভি (রহ.) হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.)-এর দরবার থেকে ফেরেন, তখন তাঁর বহু অনুসারী তাঁর ওপর মনঃক্ষুণ্ন হয়। তারা সাইয়েদ সাহেবকে বলে, আমরা আপনার অনুসরণে দলবদ্ধ হয়েছি। আমরা আপনাকে বড় বানিয়েছিলাম। সর্ববিষয়ে আপনি আমাদের ইমাম ছিলেন। এখন আপনিই অন্যের আঁচল ধরেছেন। বিষয়টি আমাদের অবস্থানকে খাটো করেছে। সাইয়েদ সাহেব তাদের বলেন, তারা তো আশ্চর্য লোক! একদিকে তারা আমার অনুসারী দাবি করে, অন্যদিকে আমার ওপর আস্থা রাখে না। অর্থাৎ আমি নিজের উপকার মনে করে সেখানে গিয়েছি আর তারা তার বিরোধিতা করছে। যেন তারা আমার শিক্ষক হয়ে আমাকে উপদেশ দিচ্ছে যে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? যেন আমি তাদের জিজ্ঞেস করে সেখানে যাব। আমি তো সেখানেই আমার কল্যাণ দেখছি, অথচ তাদের দাবি তাদের জন্য আমি যেন সেখানে না যাই। তারা তো আমাকে এই সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে চাচ্ছে।

তামিরে হায়াত থেকে

মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর



সাতদিনের সেরা