kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

একুশের মাওলানারা

ভাষা আন্দোলনের নতুন বয়ান

আতাউর রহমান খসরু   

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাষা আন্দোলনের নতুন বয়ান

বাংলার মাটি ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেশের আলেমসমাজ বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রাম ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন কুণ্ঠাহীনচিত্তে; ক্ষেত্রবিশেষে তারা নেতৃত্বও দিয়েছেন। কিন্তু আলেমদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও ভূমিকা আড়াল করার, বরং তা নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে একটি চিহ্নিত মহল। তবে ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামের গণসম্পৃক্ততা তাদের অপপ্রয়াসকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। ইতিহাসের বিস্তৃত অঙ্গনের প্রতিটি পরতে পরতে মুক্তিকামী ও সংগ্রামী আলেমরা যে উজ্জ্বল পদচিহ্ন রেখে গেছেন, দীর্ঘ অপচেষ্টার পরও তা মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে একদল সত্যান্বেষী লেখক, গবেষক ও জ্ঞানসাধক ইতিহাসের অতল সাগর থেকে সত্যের মুক্তাগুলো তুলে এনে জাতির সামনে পেশ করেছেন এবং করছেন। তারা মুক্তি-সংগ্রামের প্রতিষ্ঠিত বয়ানের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন—এ জাতির গৌরবময় কোনো অর্জনেই আলেমদের অংশ কম নয়। আলেম লেখক ও সাংবাদিক শাকের হোসাইন শিবলি সেই জ্ঞানসাধকদের অন্যতম; বরং বলা যায় বয়সে তরুণ হলেও এ ক্ষেত্রে তিনি একজন পথিকৃৎ। তাঁর পাঠকনন্দিত ও বহুল পঠিত বই ‘একাত্তরের চেপে রাখা ইতিহাস: আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’ ছিল এ দেশের ইতিহাসচর্চায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন। একুশের মাওলানারা যেন সে দিগন্ত আরো বিস্তৃত করার প্রয়াস। ‘কিন্তু মুসলিমবাংলার সৌভাগ্য যে উর্দুপ্রীতি যাদের বেশি থাকার কথা, সেই আলেমসমাজই এই অপচেষ্টার বাধা দিয়েছিল। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী উর্দুবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেছিলেন। বাংলার ওপর উর্দু চাপানোর সে চেষ্টা তখনকার মতো ব্যর্থ হয়।’ প্রয়াত লেখক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের উদ্ধৃত বক্তব্যে যে নিগূঢ় সত্য প্রকাশ পেয়েছে  ‘একুশের মাওলানারা’ বইটি সেই সত্যের আলোয় প্রদীপ্ত। দর্শন আচার্য প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান বইটি সম্পর্কে বলেন, “মাওলানা শিবলির এসংক্রান্ত প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘একাত্তরের চেপে রাখা ইতিহাস : আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’র মতো বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটিও ব্যতিক্রমধর্মী এবং জাতির গভীর মনোযোগের দাবিদার।” তিনি বইয়ের ভূমিকার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “মূল গ্রন্থের আগে মাওলানা শিবলি ‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা’ শিরোনামে জ্ঞানোদ্দীপক ও মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টিকারী অসাধারণ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এ প্রবন্ধে আমার যা বলার ছিল তা সবই বলা হয়ে গেছে।” জ্ঞানোদ্দীপক এই ভূমিকায় লেখক মাতৃভাষার প্রতি ইসলামী দৃষ্টিকোণ, বাংলাভাষার জন্মকথা, জীবনবৃত্তান্ত, বাংলা সাহিত্যের বিকাশে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলনে আলেমদের অংশগ্রহণ পর্যন্ত দীর্ঘ ইতিহাসের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন। এ অংশে আছে চমকে ওঠার মতো অনেক ঐতিহাসিক উপাদান। যেমন পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার আগেই আলেমদের দ্বারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি, বাংলা ভাষার জন্য পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর আন্দোলন, মাওলানা তর্কবাগীশ কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের প্রথম প্রতিবাদ, ভাষা আন্দোলনের সময় মাওলানা শামসুল হুদা পাঁচবাগীর কারাবরণ ইত্যাদি।

বইয়ের প্রথম খণ্ডে লেখক ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী পুরোধা আলেমদের ত্যাগ ও সংগ্রামের বিবরণ তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে আছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, মাওলানা অলিউর রহমান, মাওলানা আতহার আলী, খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ, মাওলানা সৈয়দ মুছলেহ উদ্দিন প্রমুখ। প্রথম খণ্ডের পরিশিষ্টে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাভূমি নিয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ মুজতবা আলী ও অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারুকসহ কয়েকজন বরেণ্য মনীষীর লেখা ও বক্তৃতা সংযোজিত হয়েছে। বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে স্থান পেয়েছে রীতা ভৌমিক সংকলিত ও সম্পাদিত ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র (১৯৪৮-৫২) বইয়ের নির্বাচিত অংশ এবং ভাষা আন্দোলন বিষয়ক সরকারি ও বেসরকারি বহু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র।

পরিশেষে বইটি সম্পর্কে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের ভাষায় বলতে চাই—‘আমি মনে করি প্রত্যেক সচেতন বাংলাভাষাভাষী নর-নারীর সংগ্রহে এ বইটি থাকা দরকার এবং গভীর অভিনিবেশসহ গ্রন্থটি পাঠ করা প্রয়োজন।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ গ্রন্থের মনোযোগী অধ্যয়ন পাঠকের মানসজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে, তাঁর মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসার সৃষ্টি করবে এবং পরিণতিতে তিনি একজন নতুন মানুষ হিসেবে রূপান্তরিত হবেন।’



সাতদিনের সেরা