kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

জ্যোতির্বিজ্ঞানের আধুনিকায়নে মুসলমানদের অবদান

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে




জ্যোতির্বিজ্ঞানের আধুনিকায়নে মুসলমানদের অবদান

বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় অসামান্য অবদান রেখেছে মুসলমানরা। গ্রহের তির্যক গতি সম্পর্কে আল মাইমুন এবং বায়ুমণ্ডলসংক্রান্ত প্রতিফলন তথ্য আবুল হাসান আবিষ্কার করেন।

এখানেই শেষ নয়, সর্বপ্রথম মুসলমানরাই ইউরোপে মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করে। তারা দূরবীক্ষণ, দিকনির্ণয় যন্ত্রসহ দোলক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে উন্নতির সোপানে পৌঁছে দেয়।

বিজ্ঞাপন

‘দি ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্ট ইন ইউরোপ’ গ্রন্থের লেখক জে ডাব্লিউ ড্রেপার এ কথা স্মরণ করে অকুণ্ঠচিত্তে তাই স্বীকার করেন, ‘আরবরা নভোমণ্ডলে যে অম্লান হস্তছাপ রেখে গেছে, তা ভূমণ্ডলের নক্ষত্র সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণকালে যেকোনো অনুসন্ধিত্সু ব্যক্তিই উপলব্ধি করতে পারবে। ’

৭৬২ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল মনসুর বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা মনসুরের দরবারের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম আল ফাজারি। তিনি এ বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনাসহ বেশ কিছু দরকারি যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেন। আল নিহওয়ালি প্রথম যুগের একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি স্বীয় গবেষণাসিক্ত ‘মুশতামাল’ নামের যে নির্ঘণ্ট প্রণয়ন করেন, তা গ্রিক ও হিন্দু উভয় জ্যোতির্বিদ্যার দিশারি হিসেবে সম্মানপ্রাপ্ত হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসের অনন্য সাধারণ বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ আল-খাওয়ারিজমি (৭৮০-৮৫০ খ্রিস্টাব্দ) জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কেও অসাধারণ আলোচনা করেন। তাঁর তৈরি নির্ঘণ্ট পরবর্তী সময়ে সম্পাদিত হয় এবং এডোলার্ড কর্তৃক লাতিনে অনূদিত হয়, যার ওপর ভিত্তি করে রচিত হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ। খাওয়ারিজমি চন্দ্র, সূর্য ও তখনকার আমলে জানা পাঁচটি গ্রহের গতিবিধির চমৎকার ছক তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ, সূর্যের উত্তরায়ণ-দক্ষিণায়ন, ঋতু পরিবর্তন প্রভৃতির হিসাবসংবলিত ছকগুলোও তিনি আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং বিভিন্ন ত্রিকোণমিতির হিসাবও এসেছে তাঁর রচনায়।

আলী ইবনে ঈসা ও ট্রান্স অক্সিয়ানার অধিবাসী আল ফারগানি ওই সময়ের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। ‘এলিমেন্টস অব অ্যাস্ট্রনমি’র গ্রন্থকার আল ফারগানি ইউরোপে ‘আলফ্রাগানাম’ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থটি লাতিনে অনুবাদ করেন ক্রিমোনার জিরার্ড।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে আল বাত্তানি একটি বিশিষ্ট নাম। তাঁকে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ বলা হয়। এই প্রতিভাবান মৌলিক গবেষকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন মধ্যযুগের লাতিন পণ্ডিতরা। ৮৭৭ থেকে ৯১৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাক্কায় জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ চালিয়েছিলেন।

প্রখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে সিনা বিজ্ঞানের অন্যান্য জটিল বিষয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করেন। তিনি সংখ্যা গণনার জন্য যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন। এর ফলে ইবনে সিনা সূক্ষ্ম গণনার উপযোগী ভার্নিয়ারের মতো একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। দশম শতকের শেষ দিকে বহু মুসলিম জ্যোতির্বিদ বাগদাদে বাস করতেন। তাঁদের মধ্যে আলী বিন আমজুর, আবুল হাসান আলী, আল খুজান্দি, মাসলামা বিন আহমদ উল্লেখযোগ্য। গাণিতিক ও কবি ওমর খৈয়ামও একজন জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি নিশাপুরে মানমন্দির স্থাপন ও পারস্য পঞ্জিকা সংস্কার সম্মেলনে যোগ দেন। মঙ্গোলীয় যুগে নাসিরুদ্দীন তুসি প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। মুসলিম বিশ্বে জ্যোতির্বিদ হিসেবে আরো অবদান রেখেছিলেন কুতুবুদ্দীন সিরাজি, আল হাসিব, বখি, নাইরিজা, সাহল কুহি, আবদুর রহমান সুফি, ইবনে হাতিম, খাজিনি, ইবনে তোফায়েল, বিতরুজি, উদি মহিউদ্দিন, মাগরিবি, গিয়াসুদ্দিন জামশেদ, উলুঘ বেগ, কাদিজাদা রুমি, ইবনে আমাজুর, আবুল হাসান প্রমুখ বিজ্ঞানী ও মনীষী। তাঁদের আবিষ্কার, গবেষণাগ্রন্থ ও সূত্রের মাধ্যমে আধুনিক ইউরোপ আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করে।

 



সাতদিনের সেরা