kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

তাওয়ারিখে মোহাম্মদী

শতবর্ষী বাংলা সিরাত কাব্যগ্রন্থ

মুফতি মাহমুদ হাসান   

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শতবর্ষী বাংলা সিরাত কাব্যগ্রন্থ

মাওলানা মোহাম্মদ সাঈদ (১৮৮১—১৯৪৭ ইং) রচিত তাওয়ারিখে মোহাম্মদী

মাওলানা মোহাম্মদ সাঈদ (রহ.) ব্রিটিশ কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চল তদানীন্তন ‘চাঁদপুর’ থানার (বর্তমানে জেলা) ‘নরসিংহপুর’ পোস্ট অফিসের অন্তর্গত ‘ইবরাহিমপুর’ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তৎকালীন সুশিক্ষিত, দ্বিনদার ও সম্ভ্রান্ত খান্দানের লোক ছিলেন। তিনি নিজেও একজন বড় মাপের আলেম হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায়ও শিক্ষিত ছিলেন। বিশেষত বাংলা ভাষায় সুদক্ষ পণ্ডিত ছিলেন, যার জ্বলন্ত সাক্ষ্য হলো তাঁর অমর কীর্তি সহস্রাধিক পৃষ্ঠাব্যাপী বাংলা সিরাত কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া তিনি কোরআনের একটি কাব্য তাফসিরগ্রন্থও লিখেছিলেন; কিন্তু উপকরণের অভাবে তা ছাপার মুখ দেখেনি। আজও তা পাণ্ডুলিপি আকারে সংরক্ষিত আছে।

 

গ্রন্থের ধরন : পদ্যে লিখিত সিরাতগ্রন্থ। দুই খণ্ডে সমাপ্ত। খণ্ডপ্রতি ৫০০ পৃষ্ঠা করে সর্বমোট ১০০০ পৃষ্ঠাব্যাপী বৃহৎ ও বিশালকায় সিরাতগ্রন্থ। ১০টি অধ্যায়ে বিভক্ত রাসুল (সা.)-এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনালেখ্য।

 

গ্রন্থ লেখার কারণ : লেখক নিজেই গ্রন্থের ভূমিকায় পদ্যাকারে গ্রন্থ লেখার কারণ উল্লেখ করেন। এর প্রধানত দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন :

এক হলো, তিনি তাঁর সময়ের মানুষকে দেখলেন, তারা পুথি পাঠে অভ্যস্ত ছিল। আর এসব পুথি গ্রন্থ মিথ্যা ও কল্পকাহিনিতে ভরপুর ছিল। যেমন—গাজি-কালু, লালবানু, সোনাভান, চন্দ্রভান, শিরি-ফরহাদ, বেহুলা, চম্পাবতী, পদ্মাবতী, মধুমালতী, কমলাপরী ও চৌদ্দ উজিরের পুথি ইত্যাদি। আর কিছু কিছু সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা হলেও তার সঙ্গে হাজারো মিথ্যা মিশ্রিত করে লেখা হতো। যার কারণে মানুষ ভুল জ্ঞানার্জন ও সময় অপচয়ের গুনাহে লিপ্ত ছিল। তাই তিনি মানুষের রুচির সঙ্গে সংগতি রেখে পুথির মতো কাব্য আকারে রাসুল (সা.)-এর একটি জীবনীগ্রন্থ লেখার মনস্থ করলেন, যেন মানুষ তা পড়ে সঠিক জ্ঞানও অর্জন করতে পারে এবং তা তাদের জন্য পরকালের সম্বল হিসেবে কাজে লাগে। তা ছাড়া তখনকার যুগে বাংলায় নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ কোনো উল্লেখযোগ্য সিরাতগ্রন্থ ছিল না। যা কিছু ছিল তা হয়তো অসম্পূর্ণ বা অনেকাংশেই অনির্ভরযোগ্য কথায় ভরপুর। তাই বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ সিরাতগ্রন্থের প্রয়োজনও ছিল। সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে পাঠে আগ্রহী করার জন্য সে যুগের সাধারণ রুচি অনুসারে কাব্যে লিখিত হলে অধিক সুখপাঠ্য হওয়ার বিবেচনায় গ্রন্থটি লেখা হয়েছে।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে তিনি স্বীয় ছাত্র জামানায় একটি বরকতময় স্বপ্ন দেখেছিলেন। তা হলো, তিনি স্বপ্নে রাসুল (সা.)-কে দেখলেন যে রাসুল (সা.) শোয়া ছিলেন, আর তিনি তাঁর পায়ের কাছে বসে তাঁর পা দাবিয়ে দিচ্ছিলেন। ছোটকালের সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা বড় হয়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে স্বপ্নে রাসুল (সা.)-এর ওই খিদমত দ্বারা তাঁর দ্বিনের খেদমতের দিকে ইঙ্গিত আছে। তাই লেখক দ্বিনের খেদমতের উদ্দেশ্যে রাসুল (সা.)-এর এই জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন।

 

বৈশিষ্ট্য : কোরআনে কারিম ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরগ্রন্থাবলি, গ্রহণযোগ্য হাদিস ও হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং নির্ভরযোগ্য সিরাত ও ইতিহাস গ্রন্থাবলির উদ্ধৃতিসহ নির্ভরযোগ্য একটি সিরাতগ্রন্থ। এতে লেখক বিভিন্ন স্থানে সরাসরি কোরআনের আয়াত ও হাদিসের আরবি পাঠও উল্লেখ করে দিয়েছেন। যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন সিরাতগ্রন্থটি জাল বর্ণনামুক্ত রাখার জন্য। আর ইতিহাস ও সিরাত বর্ণনায় যেহেতু শাস্ত্রীয় দুর্বল বর্ণনা গ্রহণ করার কিছু সুযোগ রয়েছে, তাই তিনি কিছু দুর্বল বর্ণনা উল্লেখ করে থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশ স্থানে বর্ণনার মানসহ উল্লেখ করে দিয়েছেন। তিনি ১৩২৮ থেকে ১৩৩৩ হিজরি সন পর্যন্ত ধারাবাহিক ছয় বছর নিরলস মেহনতের মাধ্যমে তা লেখা শেষ করেন। অতঃপর পুনরায় কোরআন-হাদিস ও অসংখ্য সিরাতগ্রন্থ চষে গ্রন্থটির সংশোধন ও পরিমার্জনের পেছনে পাঁচ-ছয় বছর মেহনত করেন। সব মিলিয়ে গ্রন্থনা, বিন্যাস ও বিশুদ্ধকরণের পেছনে লেখক প্রায় ১২ বছর শ্রম দিয়েছেন। তাই বলা যায় যে এটি বাংলা ভাষায় রচিত একটি প্রাচীন সুনির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ সিরাতগ্রন্থ।

 

উপসংহার : শতবর্ষী এ সিরাতগ্রন্থ সেকালে পুরনো টাইপের মাধ্যমে ছাপানো হলেও পরবর্তী সময়ে সর্বশেষ সপ্তম সংস্করণ ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে পুনর্মুদ্রণের সময় কম্পিউটার কম্পোজের মাধ্যমে ‘আইডিয়াল পাবলিকেশন্স’ প্যারীদাস রোড, ঢাকা থেকে ছাপানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি আর ছাপা হচ্ছে না। বর্তমানে যদিও মানুষের রুচি পরিবর্তন হওয়ায় পুথি-সাহিত্যের প্রচলন নেই; কিন্তু গ্রন্থটির বিষয়বস্তুর উচ্চতা, বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা ও ঐতিহ্যের বিবেচনায় গ্রন্থটির গুরুত্ব বর্তমান যুগেও কোনো অংশে কম নয়।

 

লেখক : শিক্ষক

ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা



সাতদিনের সেরা