kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

মুসলিম স্থাপত্য

শিল্প ও শক্তির অনন্য নিদর্শন আলেপ্পো দুর্গ

আবরার আবদুল্লাহ   

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



শিল্প ও শক্তির অনন্য নিদর্শন আলেপ্পো দুর্গ

ইসলামী স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন আলেপ্পো দুর্গ। যাকে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী নিদর্শন মনে করা হয়। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটেনিকাতে বলা হয়েছে, ‘টিকে থাকা ইসলামী সামরিক স্থাপত্যগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আলেপ্পো দুর্গ, যা সিরিয়ান শহর আলেপ্পোর মধ্যভাগে দুর্গের ওপর স্থাপিত।’ ইউনেসকো ১৯৮৬ সালে দুর্গটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করেন।

আলেপ্পোর পাহাড়ের ওপর এই দুর্গের নির্মাণকাজ বাইজাইন্টাইন আমলে শুরু হলেও বর্তমান স্থাপত্যটি মুসলিম আমলেই নির্মিত। মূলত ভয়াবহ ভূমিকম্পে রোমান আমলে নির্মিত দুর্গটি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিমরা আলেপ্পো জয় করলে পুনরায় সামরিক স্থাপত্য গড়ে তোলা হয়। আলেপ্পো মুসলিম শাসনাধীন হওয়ার পর একাধিকবার তার নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হয়। ৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে হামদানি শাসকরা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। হামদানি রাজপুত্র সাইফুদ্দৌলা প্রথমে নদীর তীর ঘেঁষে একটি অবকাশকেন্দ্র গড়ে তোলেন। কিন্তু ৯৬২ খ্রিস্টাব্দে বাইজাইন্টাইন সেনারা আলেপ্পোতে আক্রমণ করার পর তিনি তাকে সামরিক দুর্গে রূপান্তরিত করেন। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১০০ ফিট উঁচুতে এই দুর্গ নির্মাণ করেন।

অন্যদিকে ঐতিহাসিক ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হলে আলেপ্পো দুর্গের গুরুত্ব বেড়ে যায়। ফলে আলেপ্পোর তৎকালীন শাসক সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গি (রহ.) দুর্গের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলেন। তিনি একটি উঁচু ইটের দেয়াল, একটি ভবন, একটি যুদ্ধ অনুশীলনীর সবুজ মাঠ যুক্ত করেন। তিনি দুটি মসজিদ পুনর্নির্মাণ করেন এবং একটি কাঠের মেহরাব উপহার দেন, যা ‘ফরাসি ম্যানডেটে’র সময় লুট হয়ে যায়।

আলেপ্পো দুর্গের বর্তমান অবকাঠামোটি সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর নির্মিত। তিনি ১১৯৩ ও ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে আলেপ্পো শাসন করেন। তিনিই পুনর্নির্মাণের মূল কাজটি করেন। নতুন দুর্গ ও অবকাঠামো তৈরি করেন। তিনি দুর্গের সীমানা প্রাচীর শক্তিশালী করেন, টিলা ওপরে সমতল ভূমি তৈরি করেন এবং প্রবেশপথগুলো পাথরের ক্লাডিং দিয়ে ঢেকে দেন। সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) চারপাশের পরিখাগুলো আরো গভীর করেন এবং তাকে প্রাকৃতিক খালের সঙ্গে যুক্ত করেন। একটি সংযোগ সেতু তৈরি করেন, যা এখনো দুর্গের ভেতরে প্রবেশে ব্যবহৃত হয়। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে দুর্গটি প্রাসাদীয় দুর্গে পরিণত হয়, যাতে অন্তর্ভুক্ত হয় আবাসিক ভবন, মসজিদ-মন্দিরের মতো ধর্মীয় স্থাপনা, সামরিক স্থাপনার মধ্যে অস্ত্রাগার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রতিরক্ষা টাওয়ার ও প্রবেশপথে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং পানি ও শস্যভাণ্ডার। সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর ছেলে সুলতান গাজিও দুর্গের দুটি মসজিদ পুনর্নির্মাণ করেন এবং সীমানা প্রাচীর সম্প্রসারণ করেন। 

১২৬০ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল নেতা হালাকু খানের আক্রমণে এবং ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে তৈমুরে লংয়ের আক্রমণে আলেপ্পো দুর্গ ভয়াবহ ধ্বংসের মধ্যে পড়ে। ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে মামলুক গভর্নর সাইফুদ্দিন জাকাম দুর্গটির পুনর্নির্মাণ করেন। এরপর একাধিকবার দুর্গটির সংস্কার করা হলেও দিন দিন তার সামরিক গুরুত্ব কমতে থাকে এবং ক্রমেই তা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় সাত হেক্টর ভূমির ওপর স্থাপিত দুর্গটি। উসমানীয় আমলে দুর্গটির একাংশ সামরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও তা প্রধানত বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহৃত হতো।

শত্রুর আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরও যেখানে টিকে আছে ঐতিহাসিক অনেক নিদর্শন। যেমন—প্রাচীন সেমিটিক দেবতা ‘হাদাদ’-এর মন্দির (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ), আইয়ুবীয় শাসকদের রাজপ্রাসাদ (১২০০ খ্রিস্টাব্দ), সুরক্ষিত প্রবেশপথ (১২০০ খ্রিস্টাব্দ), জামে আল-কাবির (১২১৩ খ্রিস্টাব্দ), দরবার কক্ষ (১৪০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং বার্বারীয় দুর্গ (১৫০৫ খ্রিস্টাব্দ)।

তথ্যঋণ : এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটেনিকা, উইকিপিডিয়া, ইসলামিক আর্ট ডট মিউজিয়াম

 



সাতদিনের সেরা