kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩০ নভেম্বর ২০২১। ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

প্রিয় নবীর (সা.)-এর শিক্ষারীতি

জাওয়াদ তাহের   

২৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রিয় নবীর (সা.)-এর শিক্ষারীতি

আল্লাহ তাআলা রাসুলকে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। যাতে অন্তরে বদ্ধমূল হয়। রাসুলের অসংখ্য হাদিস পাঠে দেখা যায়, তিনি সাহাবিদেরকে কতভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। কখনো তিনি প্রশ্ন করেছেন, আবার কখনো উত্তর দিয়েছেন, কখনো তিনি প্রশ্ন পরিমাণ উত্তর দিয়েছেন, আবার কখনো এর ব্যতিক্রম অতিরিক্ত কথা বলেছেন, কখনো উপমা দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন, কখনো শপথ করে কথা বলেছেন, কখনো হাতে এঁকে উত্তর দিয়েছেন, কখনো রসিকতার সঙ্গে। এভাবে তিনি বিভিন্ন সাহাবিকে বিভিন্নভাবে শিখিয়েছেন। আমরা তার কয়েকটি উপমা পেশ করব।

 

চরিত্র মাধুরী দিয়ে শিক্ষাদান : রাসুল (সা.)-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী পদ্ধতি ছিল, উত্তম চরিত্র দ্বারা শিক্ষাদান। তিনি যখন কোনো বিষয়ে আদেশ করতেন সর্বপ্রথম তিনি তা করে দেখাতেন। তারপর অন্যরা তাঁর অনুকরণ করতেন। আল্লাহ তাআলা রাসুলকে তাঁর বান্দাদের জন্য আদর্শ বানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসুলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ, তার জন্য, যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করার। (সুরা আহজাব, আয়াত : ২১)

রাসুল (সা.) যখনই কোনো বিষয়ে আদেশ করতেন সর্বপ্রথম তা নিজে করে দেখাতেন। আর কোনো জিনিস থেকে যদি বারণ করতেন সর্বপ্রথম তিনি তা পরিহার করতেন। (আল ইসাবা : ১/৫৩৮)

 

ক্রমান্বয়ে শিক্ষা দেওয়া : শিক্ষার ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার নীতি অবলম্বন করতেন। তাই তিনি সাহাবাদেরকে ভাগ করে শিক্ষা দিতেন। যাতে তাঁরা সহজেই আয়ত্ত করতে পারেন। আবু আব্দুর রহমান সুলামি (রহ.) থেকে বলেন, ‘আমাদেরকে আমাদের ওস্তাদগণ বর্ণনা করেছেন যে, যাঁরা নবী (সা.)-এর ছাত্র ছিলেন তাঁরা ১০টি আয়াত শিখলে ততক্ষণ পর্যন্ত আর আগে বাড়তেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই ১০টি আয়াতের বর্ণিত ইলম ও আমল শিক্ষা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘আমরা ইলম ও আমল উভয়ই (একই সময়) শিক্ষা করেছি।’ (আহমাদ, হাদিস : ২৩৪৮২)

 

বিরক্তিকর পন্থা পরিহার করতেন : রাসুল (সা.) সাহাবাদের সময় ও অবস্থার প্রতি লক্ষ রেখে তাঁদেরকে উপদেশ ও শিক্ষা দিতেন। যাতে তাঁরা কোনো ধরনের বিরক্তিবোধ না করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতেন। আবু ওয়াইল (রা.) থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন, ইবনে মাসউদ (রা.) প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের নসিহত করতেন। তাঁকে একজন বলল, ‘হে আবু ‘আবদুর রহমান! আমার ইচ্ছা জাগে, যেন আপনি প্রতিদিন আমাদের নসিহত করেন।’ তিনি বলেন, ‘এ কাজ থেকে আমাকে যা বাধা দেয় তা হচ্ছে, আমি তোমাদেরকে ক্লান্ত করতে পছন্দ করি না। আর আমি নসিহত করার ব্যাপারে তোমাদের (অবস্থার) প্রতি খেয়াল রাখি। নবী (সা.) আমাদের অবস্থার প্রতি লক্ষ রেখে নির্দিষ্ট দিনে নসিহত করতেন, আমরা যাতে বিরক্তিবোধ না করি।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০)

 

উপমার মাধ্যমে শিক্ষা : অনেক সময় রাসুল (সা.) উদ্দিষ্ট বিষয়বস্তু স্পষ্ট করার জন্য উপমার সাহায্য নিতেন। মানুষ যা সচরাচর বোঝে তা দ্বারা তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করতেন। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের অনেক জায়গায় উপমান মাধ্যমে আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। রাসুল (সা.) এক হাদিসে মুনাফিকদের উদাহরণ দিয়েছেন। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন : মুনাফিকের উদাহরণ ওই বকরির ন্যায়, যে দুই বকরির পালের মধ্যস্থলে থাকে। কখনো এই পালের দিকে আসে, কখনো ওই পালের দিকে যায়, সে বুঝতে পারে না সে কোন দলের সঙ্গে থাকবে। (নাসায়ি, হাদিস : ৫০৩৭)

 

চিত্রাঙ্কন করে শিক্ষা : কখনো রাসুল (সা.) কোনো বিষয় স্পষ্ট করার জন্য চিত্রাঙ্কনের সাহায্য নিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন নবী (সা.) একটি চতুর্ভুজ আঁকলেন এবং এর মাঝখানে একটি রেখা টানলেন, যা তা থেকে বের হয়ে গেল। তারপর দুই পাশ দিয়ে মধ্যের রেখার সঙ্গে ভেতরের দিকে কয়েকটা ছোট ছোট রেখা মেলালেন এবং বললেন, এই মাঝের রেখাটা হলো মানুষ। আর এই চতুর্ভুজটি হলো তার আয়ু, যা বেষ্টন করে আছে। আর বাইরে বেরিয়ে যাওয়া রেখাটি হলো তার আশা। আর এই ছোট ছোট রেখাগুলো বিপদাপদ। যদি সে এর একটি এড়িয়ে যায়, তবে আরেকটি তাকে দংশন করে। আর আরেকটি যদি এড়িয়ে যায় তবে আরেকটি তাকে দংশন করে। (বুখারি, হাদিস : ৬৪১৭)

 

সংক্ষিপ্ত বলে বিস্তারিত বলতেন : রাসুল (সা.) কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় বলার সময় প্রথমে সংক্ষেপে বলতেন। এরপর সবিস্তারে আলোচনা করতেন, যাতে করে শ্রোতাগণ আগ্রহের সঙ্গে শোনে এবং তা দিলে বসে যায়।

কাতাদাহ ইবনে রিবঈ আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুল (সা.)-এর পাশ দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি বলেন, সে সুখী অথবা (অন্য লোকেরা) তার থেকে শান্তি লাভকারী। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! ‘মুস্তারিহ’ ও মুস্তারাহ মিনহু’-এর অর্থ কী? তিনি বলেন, মুমিন বান্দা দুনিয়ার কষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে পৌঁছে শান্তি প্রাপ্ত হয়। আর গুনাহগার বান্দার আচার-আচরণ থেকে সব মানুষ, শহর-বন্দর, বৃক্ষলতা ও জীবজন্তু শান্তি হয়। (বুখারি, হাদিস : ৬৫১২)

কৌতুক রসিকতার সঙ্গে শিক্ষা : আমাদের প্রিয় নবী (সা.) কখনো শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কৌতুক ও রসিকতার পন্থা অবলম্বন করতেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মানুষ হাস্যরসহীন কাটাতে পারে না। সরস উক্তি মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। দুঃখ কষ্ট কিছুটা লাঘব করে। আর মানুষ হাসি-খুশির সঙ্গে যত বেশি শিখতে পারে মলিনতা ও গোমড়া মুখ নিয়ে তা শিখতে পারে না। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা এক লোক নবী (সা.)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে একটি আরোহীর ব্যবস্থা করে দিন। নবী (সা.) বলেন, আমি তোমাকে আরোহণের জন্য একটি উটনীর বাচ্চা দিব। লোকটি বলল, উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? নবী (সা.) বললেন, উটকে তো উটনীই জন্ম দেয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯৮)

[email protected]



সাতদিনের সেরা