kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মাওলানা উমায়ের আহমদের উদ্যোগ

অনলাইনে কোরআন শিখছে হাজারো মানুষ

রায়হান রাশেদ   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অনলাইনে কোরআন শিখছে হাজারো মানুষ

মাওলানা উমায়ের আহমদ। নরসিংদী সদরে জন্ম। পড়ালেখার হাতেখড়ি নরসিংদী সাহেপ্রতাপ মাদরাসায়। দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছেন মতিঝিল ওয়াবদা মাদরাসা থেকে। বর্তমানে থাকেন ঢাকার খিলগাঁওয়ে। অনলাইনে মানুষকে কোরআন শেখাচ্ছেন। অনলাইনে হাজারো মানুষ তাঁর কাছ থেকে কোরআন শিখছে।

উমায়েরের কষ্ট : অভাবের সংসার ছিল উমায়েরের। কষ্টে পড়ালেখা করেছেন। বহুদিন খুঁজে টিউশনির ব্যবস্থা করেন—কোরআন শেখানোর টিউশনি। দুজন শিক্ষার্থী। মাদরাসা থেকে দুই মাইলের পথ। প্রতিদিন হেঁটে যেতেন। ২০১২ সালে ঢাকার মতিঝিল মাদরাসায় ভর্তি হলেন উমায়ের। এখানে খরচ বেশি। টিউশনি খুঁজে বের করেন। পাঁচ শ টাকা মাইনে পেতেন। পাঁচতলার সিঁড়ি ভেঙে পড়াতে যেতেন। এর মধ্যে একদিন প্রতিজ্ঞা করলেন, সাধারণ মানুষের কাছে কোরআন শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবেন। মানুষকে কোরআনের কাছে নিয়ে আসবেন।

বিনা মূল্যে কোরআন পাঠদান : ২০১৭ সাল। খিলগাঁওয়ে এক প্রাইভেট মাদরাসায় বাচ্চাদের পড়াতেন উমায়ের। অল্প বেতন পেতেন। বিকেলে পথে পথে দেখা মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। অনেকেই কোরআন পড়তে জানে না—শুনে কষ্ট পেতেন। ঠিক করলেন, ফ্রি কোরআন পড়াবেন। পকেট তখন ফাঁকা। একজনের কাছ থেকে এক হাজার টাকা ধার নেন। এক স্কুলের একটি রুম বিকেলের জন্য ভাড়া নেন। মানুষকে বোঝাতে থাকেন। লিফলেট বিতরণ করেন। মসজিদে মসজিদে নামাজ শেষে কোরআন শিক্ষার কথা বলেন। শুরুতে কেউ আসেনি। একদিন এক ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণকে বুঝিয়ে নিয়ে আসেন। অন্যদিন হোটেলের দুই কর্মচারী। তাঁদের হাতখরচও দেন। এভাবে চলতে থাকে। এভাবে কয়েক শ মানুষকে পড়িয়েছেন উমায়ের।

ইউনেসকোর অধীনে কোরআন পাঠদান : ইউনেসকোর অধীনে মানুষকে কোরআন শিখিয়েছেন উমায়ের। ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ড. দীপু মনির উদ্বোধনের মাধ্যমে এই কোর্স চালু হয়। সেগুনবাগিচার একটি ভবনে সচিব, উপসচিবসহ সরকারি কর্মকর্তারা কোরআন শিখতেন। ইউনেসকো এই আয়োজন করেছিল। উমায়ের সেখানে কোরআন শেখানোর শিক্ষক হয়েছিলেন। ২৮ দিনের কোর্স ছিল। লোকেরা ১০ মাস পড়েছিল। সপ্তাহে দুই দিন। ইউনেসকো উমায়েরকে বেশ সম্মান করেছিল। উমায়ের বলেন, ‘সেখানে সবাই ছিল সরকারি বড় বড় আমলা। কোরআনের প্রতি তাঁদের দরদ দেখে আমার যারপরনাই ভালো লেগেছিল। আমি সাধ্যমতো তাঁদের শিখিয়েছি। কোরআনের কাজে এটা বোধ হয় ইউনেসকোর প্রথম কাজ।’

এখন অনলাইনে পড়ান : খিলগাঁওয়ে মাদরাসা থাকাকালে করোনা দেখা দেয়। মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। আর ঢাকায় থাকা সম্ভব হয়নি। বাড়ি ফিরলেন একদিন। এর মধ্যে রমজান এলো। ভাবলেন, অনলাইনে কোরআন পড়াবেন। ‘সহজে কোরআন শিক্ষা’ শিরোনামে শুরু করলেন অনলাইনে ক্লাস। ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে লিখে পড়াতেন। এখন অনলাইনে তাঁর হাজারো শিক্ষার্থী। মাত্র ২৮ দিনে এক ঘণ্টা করে পড়ান। এতেই মানুষ কোরআন পড়তে জানে।

উমায়ের নিজে একটি ফেসবুক পেজ খোলেন। নাম দেন ‘কোরআন শিক্ষা একাডেমি’। সেখানে ১৮ হাজার ফলোয়ার আছে। সপ্তাহে দুই দিন পড়ান সেখানে।

লাখো মানুষ কোরআন পড়ছে : দেশের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ বিনা মূল্যে কোরআন পড়াচ্ছে। ‘এভারগ্রিন বাংলাদেশ, ইসলামিক জীবন’-এ ক্লাস করিয়েছেন। ইসলাম প্রতিদিন ইউটিউব চ্যানেলে কোরআন শেখার ১২০টি ক্লাস ভিডিও করেছেন। ‘দ্য লাইট অব ইসলাম’ ফেসবুক পেজে কোরআন শেখান সপ্তাহের শনি, রবি ও বুধবার। রাত ৯টায় সেখানে ক্লাস নেন। সেখানে সদস্য আছেন প্রায় ৩০ লাখ। নিয়মিত পড়ান উস্তাদ.কমের ফেসুবক পেজে। সেখানে নিয়মিত দুই হাজার মানুষ কোরআন শেখেন। তাঁর একটি ক্লাসের সর্বোচ্চ ভিউ হয়েছে ২৮ লাখ।

শিক্ষার্থী আছে বিদেশেও : উমায়েরের কাছে এখন হাজারো মানুষ কোরআন শেখে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও শিক্ষার্থী আছে অনেক। সৌদি আরব, লন্ডন, আমেরিকা, জাপান, ইংল্যান্ড, মেক্সিকো, ভারত, কলকাতাসহ নানা দেশের শিক্ষার্থী আছে। তাদের জন্য আলাদা আলাদা সময় বেছে দিয়েছেন। ইমু, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও জুমের মাধ্যমে তাদের পড়ান। বিদেশি অনেকে পড়তে চাচ্ছেন। উমায়ের তেমন ইংরেজি জানেন না। এখন ইংরেজি শিখছেন। আশা করছেন, দুই মাস পর বিদেশিদেরও কোরআন শেখাবেন।



সাতদিনের সেরা