kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

মক্কা ছেড়ে মদিনার পথে নবীজি (সা.)

আতাউর রহমান খসরু   

৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মক্কা ছেড়ে মদিনার পথে নবীজি (সা.)

হত্যার জন্য সমবেত যুবকদের সামনে দিয়ে মহানবী (সা.) ঘর থেকে বের হয়ে আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে উপস্থিত হন এবং তাঁকে আল্লাহ পক্ষ থেকে হিজরতের অনুমতি লাভের সংবাদ দেন। আবু বকর (রা.) বলেন, আমি কি আপনার সঙ্গী হবো? রাসুলুল্লাহ (সা.) হ্যাঁ বললে তিনি আনন্দে কেঁদে ফেলেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি সেদিনের আগে জানতাম না যে মানুষ আনন্দে কাঁদতে পারে। সেদিন আবু বকর (রা.)-কে আনন্দে কাঁদতে দেখেছিলাম।’ (আর-রাসুল, পৃষ্ঠা ১১২)

মহানবী (সা.) অপেক্ষা করতে বলার পর থেকে আবু বকর (রা.) হিজরতের প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি সফরের জন্য দুটি উট কিনে প্রতিপালন করেন। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত নামে এক ব্যক্তিকে ভাড়া করেন। সে আরবের পথঘাট সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিল। সকালে আলো ফোটার আগেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.) বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যান। ২৭ সফর মোতাবেক সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসুলুল্লাহ হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর ত্যাগ করেন। তিনি তাঁর দুই স্ত্রী আয়েশা ও সাওদা (রা.)-কে এবং দুই ছোট কন্যা উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা (রা.)-কে মক্কায় ছেড়ে যান। অন্য কন্যা জয়নব (রা.) মুশরিক স্বামীর সঙ্গে তখনো মক্কায় অবস্থান করছিলেন। (মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস : ১/৩৮৪ ও ৩৮৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১৭৪)

ঘর থেকে বের হয়ে মহানবী (সা.) সতর্কতাস্বরূপ মদিনার বিপরীত দিক তথা ইয়েমেনের দিকে পাঁচ মাইল এগিয়ে যান। তাঁরা মক্কা থেকে দক্ষিণে অবস্থিত ‘ছুর’ পাহাড়ের একটি গুহায় আশ্রয় নেন। এটা ছিল অত্যন্ত উঁচু পাহাড়। পাহাড়ে আরোহণের সময় মহানবী (সা.)-এর পা কেটে যায়। আবু বকর (রা.) আগে গুহায় প্রবেশ করেন এবং তা পরিষ্কার করেন। নিজের ‘তহবন্ধ’ ছিঁড়ে গুহার গর্তগুলো বন্ধ করেন এবং অবশিষ্ট দুটি গর্ত নিজের পা দিয়ে তা বন্ধ করে রাখেন। রাতের বেলা তাঁর পায়ে বিষাক্ত কিছু দংশন করলে মহানবী (সা.) ক্ষতস্থানে নিজের থুথু মোবারক লাগিয়ে দেন। ফলে ব্যথা দূর হয়ে যায়। (খাতামুন নাবিয়্যিন, পৃষ্ঠা ৪৫৯)

হিজরতের বিষয়টি শুধু আবু বকর (রা.)-এর পরিবারের কয়েকজন সদস্য জানতেন। আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা.) সারা দিন ঘুরে ঘুরে মক্কা নগরীর সংবাদ সংগ্রহ করতেন এবং রাতের বেলা তা মহানবী (সা.)-এর কাছে পৌঁছে দিতেন। আবু বকর (রা.)-এর আজাদ করা গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা আবদুল্লাহ (রা.)-এর চলার পথে বকরির পাল নিয়ে যেতেন, যেন পায়ের চিহ্ন মুছে যায়। তিনি সন্ধ্যার সময় গুহার কাছে গিয়ে বকরির দুধ পান করিয়ে আসতেন। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১৭৫)

অন্যদিকে কোরাইশরা মহানবী (সা.)-কে বিছানায় না পেয়ে উন্মাদনা শুরু করে। তারা সর্বপ্রথম আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে যায় এবং আবু জাহল আসমা (রা.)-এর কাছে তাঁর পিতা ও নবীজি (সা.)-এর সংবাদ জানতে চায়। তিনি কিছু জানেন না মর্মে জবাব দিলে তাঁকে এমন প্রচণ্ড জোরে থাপ্পড় মারে যে কানের দুল খুলে মাটিতে পড়ে। কোরাইশ নেতারা ঘোষণা করে কেউ মুহাম্মদ (সা.)-কে জীবিত বা মৃত উপস্থিত করতে পারলে তাকে এক শ উট উপহার দেওয়া হবে। ফলে বহু মানুষ তাঁর সন্ধানে বের হয়। এমনকি একটি অনুসন্ধানী দল ‘ছুর’ পর্বতের গুহার সামনে উপস্থিত হয়। আবু বকর (রা.) তাদের দেখে ভয় পেয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন। অন্যদিকে আল্লাহর ইশারায় গুহার মুখে মাকড়সা ও বন্য কবুতর বাসা বেঁধে ছিল। তাই অনুসন্ধানকারী কোনো ধরনের সন্দেহ না করেই চলে যায়। (মিন মুয়িনিস সিরাতে, পৃষ্ঠা ১৫৮; সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা ৪৮)

পবিত্র কোরআনে সে মুহূর্তের বিবরণ এভাবে এসেছে, ‘যখন অবিশ্বাসীরা তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, বিষণ্ন হয়ো না, আল্লাহ তো আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৪০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.) ‘ছুর’ গুহায় তিন দিন অবস্থান করেন। মুশরিকরা কিছুটা হতোদ্যম হলে তারা মদিনার পথে পা বাড়ান। আসমা (রা.) তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। কিন্তু উটের গদির সঙ্গে খাবার বাঁধার মতো কোনো রশি ছিল না। তিনি নিজের পায়জামার ফিতা কেটে অর্ধেক দিয়ে খাবার বেঁধে দেন। এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে তাঁকে ‘জাতুন-নিতাকাইন’ (দুই ফিতাওয়ালা) বলা হতো। কাফেলা পরিচিত পথ ছেড়ে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে এগিয়ে যায়। ছেড়ে আসার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হে মক্কা, নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের না করে দিত আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ (খাতামুন নাবিয়্যিন, পৃষ্ঠা ৪৫৮)

পথিমধ্যে দুটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। কোরাইশের পুরস্কারের লোভে সুরাকা ইবনে মালিক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করে এগিয়ে আসে। মহানবী (সা.)-এর নিকটবর্তীয় হওয়ার আগে দুবার তার ঘোড়া হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না। শেষ পর্যন্ত সে খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন মহানবী (সা.)-এর দোয়ায় তার ঘোড়ার দুই পা মাটিতে দেবে যায়। এতে সুরাকার হুঁশ ফিরে আসে। সে গোপনীয়তা রক্ষা করে ফিরে যেতে সম্মত হয়। বিনিময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে পারস্য সম্রাট কিসরার হাতের কঙ্কন প্রদানের অঙ্গীকার করেন। ওমর (রা.)-এর যুগে মুসলিমদের হাতে কিসরার পতন হলে এই অঙ্গীকার পূর্ণ করা হয়। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার বরকতে উম্মে মাবাদ নামের এক নারীর শীর্ণ বকরি দুধে পূর্ণ হয়ে যায়। (নবীয়ে রহমত, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৭৭)

অবশেষে এই মোবারক কাফেলা নবুয়তের চতুর্দশ বছরের ৮ রবিউল আউয়াল মতান্তরে ১২ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ২৩ সেপ্টেম্বর মদিনার উপকণ্ঠে অবস্থিত কোবায় পৌঁছায়। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১৮১)

 



সাতদিনের সেরা