kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

মুসলিম মনীষা

খ্যাতনামা সংস্কারক জামালউদ্দিন আফগানি

ইকবাল কবীর মোহন   

৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



খ্যাতনামা সংস্কারক জামালউদ্দিন আফগানি

১৮ ও ১৯ শতকে যে কয়েকজন বিপ্লবী নেতা মুসলিম দুনিয়ায় জাগরণ সৃষ্টি করেন, তাঁদের একজন সৈয়দ জামালউদ্দিন আফগানি। তাঁর নেতৃত্বে ধর্মীয়, জাতীয়, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সৈয়দ জামালউদ্দিন কাবুলের নিকটবর্তী ‘আসাদ-বাবাদ’ নামক স্থানে ১৮৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাবুল ও ইরানের কয়েকটি বিখ্যাত শিক্ষায়াতনে পড়াশোনা করেন। তিনি আরবি সাহিত্য, ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, হাদিস, তাফসির, ফিকাহ, তর্কশাস্ত্র, দর্শন, সুফিবাদ, অধিবিদ্যা, প্রকৃতিবিজ্ঞান, অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ফারসি, আরবি, তুর্কি, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় তাঁর বেশ দখল ছিল।

১৮৫৭ সালে সৈয়দ জামালউদ্দিন হজের উদ্দেশ্যে মক্কা শরিফ গমন করেন। সেখানে তিনি প্রবীণ ও খ্যাতনামা আলেমদের সাহচর্য লাভ করেন। মক্কা থেকে ফিরে এসে জামালউদ্দিন আফগানিস্তানের আমির দোস্ত মোহাম্মদ খাঁর অধীনে চাকরি করেন। ১৮৬৪ সালে আমিরের মৃত্যু হলে তাঁর ভাইদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। জামালউদ্দিন মোহাম্মদ আজমের পক্ষাবলম্বন করেন। আজম সিংহাসন অধিকার করলে জামালউদ্দিন তাঁর উজিরে আজম নিযুক্ত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর মাত্র। কিছুকাল পর ব্রিটেনের সহায়তায় আজম ক্ষমতাচ্যুত হলে শের আলী কাবুলের সিংহাসনে আরোহণ করেন। পরে জামালউদ্দিন গোপনে আফগানিস্তান ত্যাগ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে আগমন করেন। কিন্তু এখানেও তিনি স্বস্তিতে থাকতে পারেননি। ব্রিটিশরা তাঁকে নজরবন্দি করে রাখে। তাই জালালউদ্দিন মাত্র এক মাস এখানে অবস্থান করে কায়রো চলে যান। সেখানে বিশ্বের বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দিন বক্তৃতা করেন।

কায়রোতে কিছু সময় কাটিয়ে জামালউদ্দিন তুরস্কের ইস্তাম্বুলে গমন করেন। তখন তুরস্কের সুলতান ছিলেন আবদুল হামিদ। সুলতান জামালউদ্দিন আফগানিকে বিপুল সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন। জামালউদ্দিন অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। তাঁর অগ্নিঝরা বক্তৃতায় ইস্তাম্বুলের সুধীবৃন্দ ও ছাত্রসমাজ প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট হয়। দিন দিন তুরস্কে জালালউদ্দিনের প্রভাব বেড়ে যায়। কিন্তু সেখানে অনেকের বিরাগভাজন হয়ে পুনরায় তিনি কায়রো গমন করেন। এবার কায়রোতে জামালউদ্দিন অত্যন্ত সমাদৃত হন। এ সময় তিনি মিসরের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করেন। মিসরে তখন ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য ছিল প্রবল। তখন ইসমাইল পাশার উচ্ছৃঙ্খলতা ও অমিতাচারের দরুন রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। ফলে মিসরে তখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের আধিপত্য বিস্তার লাভ করে।

জামালউদ্দিনের চেষ্টায় মিসরের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক সংস্কার হয়। অন্যদিকে দেশের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিও সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়। এ জন্য জামালউদ্দিনকে ‘নয়া মিসরের জন্মদাতা’ বলা হয়।

একসময় জামালউদ্দিন রাশিয়া সফর করেন। তিনি রাশিয়ায় প্রায় চার বছর অবস্থান করেন ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে জোরালো ভাষায় তাঁর রাজনৈতিক প্রচারকার্য চালাতে থাকেন।

১৮৮৯ সালে তাঁর সঙ্গে ইরানের শাসক শাহের সাক্ষাৎ হয়। শাহ নাসিরুদ্দিন তাঁকে ইরানের উজিরে আজম পদে নিয়োগ করেন। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে শাহের মনোমালিন্য সৃষ্টি হলে জামালউদ্দিন প্রথমে বসরা ও পরে লন্ডনে চলে যান। সেখানে কিছুকাল অতিবাহিত করে তিনি ১৮৯২ সালের শেষের দিকে কনস্টান্টিনোপলে গমন করেন। সুলতান আবদুল হামিদ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। এখানেই ১৮৯৭ সালের ৯ মে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জামালউদ্দিন নিজের স্বপ্ন ও স্থির বিশ্বাসকে রূপায়িত করার জন্য নিজের সব কিছু কোরবানি করেছেন। তিনি মুসলিম জাহানকে যে ধরনের কর্মচঞ্চল গতিশীল জীবনের দিকে পরিচালিত করেছেন, তার জন্য যুগ যুগ ধরে মুসলিমবিশ্বে তিনি চির অম্লান হয়ে থাকবেন।

 



সাতদিনের সেরা