kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

বইপ্রেমী শায়খ আবদুর রশিদের সংগ্রাম ও সাফল্য

বেলায়েত হুসাইন   

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বইপ্রেমী শায়খ আবদুর রশিদের সংগ্রাম ও সাফল্য

বইপত্রের প্রতি ভালোবাসার নানা চমকপ্রদ ঘটনা প্রায় শোনা যায়। যদিও সমকালে এমন ঘটনা খুব কমই চোখে পড়ে, তবে বিরল হলেও এখনো সমাজে বইপ্রেমী মানুষ রয়েছে। সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত কাতারের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ শায়খ আবদুর রশিদ সুফি তেমনি একনজন। ধর্মীয় বই-পুস্তকের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভক্তি ও ভালোবাসার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। যেমন তখন তিনি মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরীক্ষার পর ছুটি হলো। হাতে কিছু অর্থও এলো। আগপিছ না ভেবে তা দিয়ে বই কিনে ফেললেন। বিমানের নিয়মকানুন জানা ছিল না। সব কিতাব নিয়েই বাড়িমুখো হয়েছেন। বিমানবন্দরে এসে পড়লেন ঝামেলায়। এত কিতাব দেখে ইমিগ্রেশন অফিসারের দুই চোখ ছানাবড়া। তিনি বলেন, আপনি দেখছি কায়রোর ‘সব’ কিতাব বগলদাবা করে বাড়ির পথ ধরেছেন। এত কিতাব নেওয়া যাবে না। বিনয়ের সুরে শায়খ বললেন, দয়া করে একটু দেখুন না, কিতাবগুলো নেওয়া যায় কি না। কিতাবগুলো আমার খুবই প্রয়োজন। সুদূর আফ্রিকায় বাড়ি। আবার ফিরে আসতে পারব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিতাবগুলো থাকলে, ইলমচর্চায় সহায়ক হতো। অফিসারের পাল্টা আপত্তি—একজন যাত্রীর জন্য এত ওজন অনুমোদিত নয়। আপনার সামনে দুটি পথ খোলা। হয় কিতাব কমিয়ে আপনি যাবেন, না হয় শুধু কিতাব যাবে।

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার এমন আচরণে শায়খ বিচলিত হয়ে পড়লেন। পরক্ষণেই সামলে উঠলেন। তাঁর মনে পড়ল কোরআন কারিমের সুরা নামলের ৬২ নম্বর আয়াত। যাতে বলা হয়েছে, ‘কিংবা তিনি (শ্রেষ্ঠ), যিনি বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেন, যখন (নিরুপায় হয়ে) সে তাঁকে ডাকতে থাকে, তখন (তার) বিপদ তিনি দূর করে দেন।’

পরবর্তী ঘটনার বিবরণে তিনি বলেন, ‘এরপর মনে মনে আয়াতখানা বারবার পড়তে থাকলাম। কোত্থেকে কী  জানি, মুহূর্তেই মনের সব ভয় কেটে গেল। অফিসারকে দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, আমিও যাব, আমার কিতাবও যাবে ইনশাআল্লাহ! অফিসার আমার কথায় উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। বললেন, আমি দেখে নেব কিভাবে এই কিতাব বিমানে ওঠে। তখন গভীর রাত। ফ্লাইটের তখনো অনেক দেরি। মসজিদে চলে এলাম। তাহাজ্জুদ আর দোয়ার ফাঁকে ফাঁকে আয়াতখানা পড়তে লাগলাম। ফজরের সময় সুন্নতি পোশাক পরিহিত দেখে মুসল্লিরা আমাকে ইমামতির জন্য সামনে বাড়িয়ে দিল।

সালাম ফেরানোর পর মুসল্লিদের দিকে ফিরে বসতেই দেখলাম একজন অফিসার বসা। দুই চোখ ভেজা। আমার পাসপোর্ট-টিকিট পাশেই রাখা ছিল। তিনি হাত টেনে পাসপোর্ট খুলে দেখে বললেন, আপনার ফ্লাইটের তো আর বেশি দেরি নেই। আপনি কি দয়া করে নামাজে যেভাবে তিলাওয়াত  করেছেন, কষ্ট করে আরেকবার সেভাবে তিলাওয়াত শোনাতে পারেন? আমি দ্বিধা না করে তিলাওয়াত শুরু করলাম। কোরআনের আয়াত অফিসারের হৃদয়তন্ত্রীতে দোলা জাগাল। তিনি আল্লাহর পবিত্র কালাম শুনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি ছিলেন বিমানবন্দরের নিরাপত্তাপ্রধান। কথার ফাঁকে কিতাবের কথা জানতে পেরে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠালেন। নিমেষেই আমার কিতাবসমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আমার হৃদয়ে এ কথার প্রতি আরো প্রবল বিশ্বাস জন্মাল যে অসহায় বান্দার ডাকে আল্লাহ অবশ্যই সাড়া দেন।

প্রসঙ্গত, শায়খ আবদুর রশিদ সুফি সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও কাতারে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। রাজধানী দোহার আনাস ইবনে মালিক মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দাওয়াহর কাজে সময় দেন। ১৯৬২ সালে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা শায়খ আলী বিন আব্দুর রহমান সোমালিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি ও কারি ছিলেন। ইসলাম প্রচারের কাজে কাতারের বাইরে এবং বিশেষত ইউরোপের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন।

আলজাজিরা ও অন্যান্য গণমাধ্যম