kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

ওফাত স্মরণ : মুন্সী মহম্মদ মেহেরউল্লা

মুসলিম জাগরণের একজন অগ্রপথিক

আতাউর রহমান খসরু   

৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মুসলিম জাগরণের একজন অগ্রপথিক

১৭৫৭ সালে পলাশীর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর রাষ্ট্রীয় সহায়তায় খ্রিস্টান মিশনগুলো ভারতবর্ষের প্রধান দুটি ধর্ম সনাতন (হিন্দু) ও ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। খ্রিস্টান যাজকদের প্রচেষ্টায় তৎকালে অশিক্ষা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যেপিষ্ট বহু হিন্দু ও মুসলিম খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। খ্রিস্টান মিশনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে হিন্দু ধর্মের পক্ষে যেমন রাজা রামমোহন রায় সোচ্চার হয়েছিলেন, তেমনি ইসলাম ধর্মের পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন মুন্সী মহম্মদ মেহেরউল্লা। অখণ্ড বাংলা, বিহার, আসাম ও ত্রিপুরার মুসলিমদের ঈমান রক্ষায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

 

শিক্ষাজীবন : মুন্সী মহম্মদ মেহেরউল্লা ১৮৬১ সালে যশোর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ঘোপ গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সি মুহাম্মদ ওয়ারেস উদ্দিন। অল্প বয়সে পিতৃবিয়োগ ঘটায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বেশি দূর আগায়নি। তবে তিনি যশোরের মৌলবি মোসহারউদ্দীনের কাছে ধর্মশিক্ষা এবং মৌলবি মোহাম্মদ ইসমাইলের কাছে আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে শিক্ষা লাভ করেন। এ সময় তিনি কোরআন-হাদিস ও ফারসি সাহিত্যেও বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। (বাংলা পিডিয়া, প্রবন্ধ : মেহেরুল্লাহ, মুনশি মোহাম্মদ)

 

কর্মজীবন : মাত্র ১৪ বছর বয়সে যশোর জেলা বোর্ডে কর্মচারী পদে তার কর্মজীবন শুরু হয়। জনৈক ইংরেজ তাঁকে দার্জিলিং নিয়ে গেলে সেখানে তিনি ‘মানসুরে মোহাম্মদী’ পত্রিকা এবং ‘খ্রীস্টধর্মের ভ্রষ্টতা’ নামক পুস্তক পড়ার সুযোগ পান। উক্ত পুস্তক পাঠের পর তাঁর ধর্মানুরাগী মন ইসলাম ধর্মের প্রতি আরো গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়। (মুসলিম বাংলার মনীষা, পৃষ্ঠা ৬১)

এ ছাড়া সোলায়মান ওয়ার্সির ‘কেন আমি আমার পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করেছিলাম’ কেন আমি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হয়েছিলাম’ ও ‘প্রকৃত সত্য কোথায়’ গ্রন্থগুলো তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এর পরই তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দর্জি পেশায় নিয়োজিত হন। (কাজী শওকত শাহী, প্রবন্ধ : মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, যশোর ডট ইনফো, তথ্যসংগ্রহ : ০৩/০৬/২০২১)

 

দর্জি থেকে ধর্মপ্রচারক : তৎকালে খ্রিস্টান যাজকরা বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার করত এবং প্রচলিত সনাতনী হিন্দু ধর্ম ও ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারও চালাতেন। প্রথমে তিনি পাদ্রিদের এসব কথার বিপরীতে প্রশ্ন ও প্রতিবাদ করতেন, পরবর্তী সময়ে পাদ্রিদের মতো গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরে অপপ্রচারের উত্তর দিতেন এবং ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতেন। কথার যুক্তি, বক্তৃতার ধার ও অতুলনীয় বাগ্মিতার কারণে অচিরেই তিনি বাঙালি মুসলমানের নয়নমণি হয়ে উঠলেন। এ কাজে ফুরফুরার পীর আবু বকর সিদ্দিকসহ অসংখ্য মনীষী তাঁকে স্নেহাশিস দেন। ধর্মীয় আন্দোলনে মুন্সী মেহেরউল্লার কাজ অনেকটা সংস্কারধর্মী ছিল। ড. আনিসুজ্জামানের মতে, ‘মেহেরুল্লাহ্ ইসলামকে কেবল খৃস্ট ধর্মাবলবম্বীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে চাননি, প্রচলিত ধর্মজীবনের সংস্কারও তাঁর কাম্য ছিল। সৈয়দ আহমদ বেরিলভীর সংস্কারান্দোলন তাঁকে প্রভাবান্বিত করেছিল, এমন ধারণা করা স্বাভাবিক। সৈয়দ আহমদ-পন্থীরা মুসলমানদের প্রচলিত জীবনধারা থেকে অনেক কুসংস্কার দূর করতে যেমন শিক্ষা দিয়েছিলেন, তেমনি তাঁদের রক্ষণশীলতা আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে কোন আপোষ করতে দেয়নি।’ (মুন্সী মেহেরউল্লা : জীবন ও কর্ম, পৃষ্ঠা ১২২)

কথাসাহিত্যিক শাহেদ আলী মুন্সী মহম্মদ মেহেরউল্লার বক্তৃতার প্রভাব সম্পর্কে সমকালীন একজন কবিকে উদ্ধৃত করেছেন। যে লিখেছেন, ‘তিনি এসেছিলেন অকল্যাণের অবসান ঘটাতে, কাজেই তাঁর বাক্যেও এমন ছিল যা মুসলমান সমাজের জড়তা ভেঙ্গেছে, তাদের চেতনা ফিরিয়েছে, বাংলার আত্মবিস্তৃত মুসলমানের আত্মোপলব্ধি করতে শিখেছে, তাদের মধ্যে নব নব প্রতিভার উন্মেষ সাধিত হয়েছে, এক কথায়, সমাজ জেগেছে।’ (মুন্সী মেহেরউল্লা : জীবন ও কর্ম, পৃষ্ঠা ১৩১)

 

লেখালেখি : ইসলাম প্রচারে তাঁর দ্বিতীয় মাধ্যম ছিল লেখালেখি। খ্রিস্টবাদের অসারতা, খ্রিস্টান মিশনারির অপপ্রচারের উত্তর, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া সাপ্তাহিক ‘মিহির ও সুধাকর’, মাসিক ‘ইসলাম প্রচারক’-সহ বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ১৮৯২ সালে ‘খ্রীস্টীয় বান্ধব’ পত্রিকা ধর্মান্তিত খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারক জন জমিরুদ্দীন ‘আসল কোরআন কোথায়?’ শিরোনামে একটি বিভ্রান্তিকর লেখা প্রকাশ করেন। তাতে তিনি কোরআনের ওপর ছয়টি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে মুন্সী মেহেরউল্লা সুধাকর পত্রিকায় (১৮৯২ সালের জুন মাসের ২০ ও ২৭ তারিখে) ‘ঈসাই বা খ্রীস্টানী ধোকা ভঞ্জন’ ও ‘আসল কোরআন সর্বত্র’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ লেখেন। উত্তর সন্তুষ্ট হয়ে জমিরুদ্দীন ইসলাম ধর্মে ফিরে আসেন এবং মুন্সী জমিরুদ্দীন নাম ধারণ করেন। (কাজী শওকত শাহী, প্রবন্ধ : মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, যশোর ডট ইনফো, তথ্যসংগ্রহ : ০৩/০৬/২০২১)

গ্রহণযোগ্য সূত্রে মুন্সী মেহেরউল্লার মোট ১২টি গ্রন্থ রচনা করেন। তা হলো—খ্রীষ্টীয় ধর্ম্মের অসারতা, রদ্দে খ্রীষ্টিয়ান ও দলিলে এছলাম, মেহেরুল এছলাম, সাহেব মুসলমান (অনুবাদ), পান্দেনামা (অনুবাদ), খ্রীষ্টান মুসলমান তর্কযুদ্ধ, জাওয়াবোন্নাছারা, বাবু ঈশানচন্দ্র মণ্ডল ও চার্লস ফ্রেন্সের এছলাম গ্রহণ, ঈসাই বা খ্রীস্টানী ধোকা ভঞ্জন, মানব জীবনের কর্ত্তব্য। (মুন্সী মেহেরউল্লা : জীবন ও কর্ম, ভূমিকা, পৃষ্ঠা ১৭-১৮)

 

বাহাস বা বিতর্ক : ইসলাম প্রচারের অংশ হিসেবে বরেণ্য এ মনীষী কখনো কখনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে ‘বাহাস’ বা বিতর্কেও লিপ্ত হয়েছেন। ১২২৮ বঙ্গাব্দে ফিরোজপুরে তাঁর জীবনের অন্যতম আলোচিত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিনব্যাপী এই তর্কযুদ্ধে তিনি খ্রিস্টান মিশনারিদের পরাজিত করেন। ঐতিহাসিক সে বিতর্কের বিবরণ তাঁর ‘খ্রীষ্টান-মুসলমানে তর্কযুদ্ধ’ পুস্তিকায় স্থান পেয়েছে। (মুসলিম বাংলার মনীষা, পৃষ্ঠা ৬৬)

 

সভা সংগঠন : কর্মী, সদস্য, পৃষ্ঠপোষক ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুন্সী মহম্মদ মেহেরউল্লা একাধিক সভা-সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো—কলিকাতা মোহামেডান ইউনিয়ন, বঙ্গীয় সাহিত্য বিষয়িনীয় মুসলমান সমিতি, আঞ্জুমানে নুরুল ইসলাম, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতি, নিখিল ভারত ইসলাম প্রচার সমিতি ইত্যাদি। (মুন্সী মেহেরউল্লা : জীবন ও কর্ম, পৃষ্ঠা ১৫২-১৫৫)

 

আন্দোলনের পরবর্তী প্রভাব : কর্মজীবনে মুন্সী মেহেরউল্লার একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। সৈয়দ আলী আহসান তাদের ‘সুধাকর দল’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এ ‘সুধাকর দল’টি ‘বাংলায় মুসলিম জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির নেশায় এঁরা যেমন করে মেতেছিলেন এবং প্রাণঢালা সাধনা করেছিলেন, এঁদের আগে তেমন আর কাউকে দেখা যায় না। ...এ ‘সুধাকর দল’ই যেভাবে মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্যের ভিত্তি রচনা করেছিলেন সে পথেই অর্ধ শতাব্দীব্যাপী সাধনায় বাঙালী মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্য বিকশিত হয়েছে।’ (সৈয়দ আলী আহসান, প্রবন্ধ : মুন্সী মেহেরুল্লাহ্ এবং সে সময়কার পরিপ্রেক্ষিত, সঞ্চারণ ডটকম, তথ্যসংগ্রহ : ০৩/০৬/২০২১)

 

মৃত্যু : ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদালাপি ও বিনম্র। অত্যন্ত সাদামাটাভাবে তিনি জীবনযাপন করতেন। উত্তরবঙ্গে একদিনে তিনটি সভা করে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বর ক্রমে নিউমোনিয়ায় রূপান্তরিত হয়। এ রোগেই ৭ জুন ১৯০৭ মোতাবেক ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৪ বঙ্গাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর। বৈবাহিক জীবনে দুই স্ত্রীর গর্ভে তিনি তিন ছেলে ও তিন মেয়ে পিতৃত্ব লাভ করেন। (মুসলিম বাংলার মনীষা, পৃষ্ঠা ৬৯)

 



সাতদিনের সেরা